RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     সোমবার   ৩০ নভেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ১৬ ১৪২৭ ||  ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

‘পরিচালকের টয়লেটও কি এমন নোংরা’

আরিফ সাওন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:০৭, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
‘পরিচালকের টয়লেটও কি এমন নোংরা’

ময়মনসিংহ থেকে গত ৩ ডিসেম্বর স্বামী কালামকে (৪০) নিয়ে এসেছেন স্ত্রী সাথী। স্বামীকে টয়লেটের সামনে দাঁড় করিয়ে বারান্দায় নাক চেপে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। টয়লেটে লোক থাকায় দরজার সামনে সিরিয়ালে অপেক্ষা করতে হচ্ছে কালামকে। অন্তত ২৫ মিনিট তাকে অপেক্ষা করতে হয়। এরপর তিনি টয়লেটে যেতে পারেন। এত সময় তিনি নাকে-মুখে গামছা পেঁচিয়ে রাখেন। কিছুক্ষণ পর পর গামছা উঁচিয়ে থুথু ফেলতে দেখা গেছে। এই চিত্র জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের।

বেশ কয়েক দিন ক্যানসার হাসপাতালে ঘুরে দেখা গেছে, বহির্বিভাগের রোগীদের টয়লেটগুলোর অবস্থা এতটা নোংরা। যেমন দুর্গন্ধ, তেমন অপরিষ্কার। ব্যবহারের একেবারেই অনুপযোগী। অনেক দূর থেকেও দুর্গন্ধে মাথা ঘুরিয়ে আসে। টয়লেট থেকে বের হওয়ার পর অভক্তিতে অনেককেই বমি করার ভাব দেখা গেছে। বেশির ভাগ লোকই টয়লেট থেকে বেরিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করতে করতে হেঁটে গেছেন। হাসপাতালে রোগীদের ব্যবহারের সব টয়লেটই যেন ক্যানসার আক্রান্ত! এমন মন্তব্য রোগী ও তার স্বজনদের।

তবে, চিকিৎসকের জন্য নির্ধারিত টয়লেটগুলো তালাবদ্ধ। সেগুলোর পাশ থেকে কোনো দুর্গন্ধ আসে না।

শহীদুল নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, রোগীদের টয়লেটের মতো হাসপাতাল পরিচালক বা অন্য দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের টয়লেটেরও কি একই অবস্থা? তাদের টয়লেটও কি এত নোংরা থাকে? আশপাশ থেকে কি এত দুর্গন্ধ আসে? যদি তাই না হয়, তাহলে আমরা রোগী বলেই কি এত অবহেলিত? তাদের (পরিচালক) যদি ১০টা মিনিট এখানকার টয়লেটে এনে দাঁড় করিয়ে রাখা যেতো, তাহলে তারা আমাদের ভোগান্তিটা বুঝতেন।

চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে রোগীদের আসতে হয় খুব ভোরে। দূর থেকে আসা অনেক রোগীর ঢাকায় থাকার জায়গা না থাকায়, তারা আশ্রয় নেন হাসপাতালের বারান্দায়।

ভোরে আসার কারণে তাদের অনেকেই হাসপাতালে এসে টয়লেট ব্যবহার করতে হয়। তাছাড়া, যারা হাসপাতালের বারান্দায় আশ্রয় নেন, তারা তো রয়েছেনই। তাদেরও তো সকালে টয়লেট ব্যবহার করতে হয়। তাই সেখানে ভিড় লেগেই থাকে।

গাড়ি থেকে নেমে ডান পাশে হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবন। বাম পাশের ভবনে প্রবেশ করে সিড়ির পাশ থেকে গিয়ে আল্ট্রাসনো রুম। এই রুমের পাশে বারান্দা। সেখানে রয়েছে তিনটি টয়লেট। এতে যাওয়া তো দূরের কথা, বারান্দায় দাঁড়ানোও দায়।

জানা গেছে, দেশে বছরে অন্তত ২ লাখ লোক নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হলেও অন্তত ১ লাখ রোগীর জন্য মহাখালীর ক্যান্সার হাসপাতাল বড় ধরনের আশীর্বাদ। এই হাসপাতালটি যদি না থাকতো, তাহলে এই বিপুলসংখ্যক রোগী সেবা বঞ্চিত হতেন।

এখানে চিকিসা নিতে আসা রোগীদের একটি বড় অংশই বিনামূল্যে কেমোথেরাপির ওষুধ পান। দিনে প্রায় ৩০০ জন করে হলেও বছরে ৮৬ হাজার রোগী কেমোথেরাপি সেবা পেয়ে থাকেন।

তবে, সেই সেবা পেতেও রোগীদের জীবন একপ্রকার ওষ্ঠাগত। এই সেবাপ্রাপ্তির কক্ষে পৌঁছাতে রোগীদের আরও কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে আসতে হয়। যেতে হয় আরও কয়েকটি রুমে। লাইন থাকে খুব দীর্ঘ। লাইন দীর্ঘ হলেও রোগীরা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন। এখানে যারা আসেন, তারা নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের। আর্থিক সচ্ছলতা যাদের ভালো, তাদের খুব কমই এখানে আসেন। ন্যূনতম ব্যয়ে স্বাস্থ্যসেবা পেতে রোগীদের পোহাতে হয় নানা ভোগান্তি।

দ্বিতীয় তলায় সিঁড়ি দিয়ে উঠে জায়গাটা ফাঁকা। কোনো চেয়ার নেই। দূর-দুরান্ত থেকে আসা রোগীরা রাতে বিছানা পেতে এখানে ঘুমান। সিঁড়ি থেকে উঠে হাতের বায়ে সার্জিক্যাল অনকোলজি বহির্বিভাগ। এখানে রোগীদের ভিড় একটু বেশিই থাকে। কিন্তু বসার ব্যবস্থা আছে মাত্র ১৫ জনের। বাকিরা ফ্লোরেই বসেন। এই রুমের উল্টো পাশে এন্ডোস্কপি রুম, ব্রংকোস্কপি রুম, আরও একটি রুম রয়েছে। যেখানে অপারেশনের রোগীদের সেলাই কাটা হয়। কিন্তু বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। প্রতিদিন এত ভিড় হয় যে, ঠেলে সামনে যাওয়াই দায়।

দ্বিতীয় তলার ডান পাশে বহির্বিভাগ অনকোলজি, মেডিকেল অনকোলজি, ইএনটি অনকোলজি ও ভর্তি রুম। এপাশে ঢুকে বাঁয়ে পেছনের দিকে বারান্দা। বারান্দার ডান পাশে রোগী সাধারণের জন্য দুটি টয়লেট আছে। সেগুলোরও একই অবস্থা। বেসিন ব্যবহারের সুযোগ নেই। তার উপর দরজা রাখা। অজু করা বা পা- ধোয়ার জায়গাটা আরও নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে।

বারান্দার ডান পাশে রয়েছে আরও ৩টি টয়লেট। সেগুলোয় তালাবদ্ধ থাকে। কারণ, সেগুলো শুধু ডাক্তার বা স্টাফদের জন্য। একজন যখন ভেতরে তালা খুলে ঢুকলেন উঁকি দিয়ে দেখা গেলো, ভেতরটা বেশ পরিষ্কার, কোনো দুর্গন্ধ নেই।

চিকিৎসক দেখানোর জন্য যেসব রুমের সামনে রোগী ও স্বজনদের অপেক্ষা করতে হয়, সেসব রুমের সামনে নেই পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোগীদের বসতে হয় ফ্লোরে।

৩ তলায় সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডে-কেয়ার। এখানেই রোগীদের কেমোথেরাপি দেয়া হয়। ডে-কেয়ারে প্রবেশের ডানে যে কয়টা চেয়ার আর বেঞ্চ আছে, তাতে কিছু রোগী বসতে পারেন। তবে, আগত রোগী ও স্বজনদের জন্য তা মোটেও পর্যাপ্ত নয়। কারণ, তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বেশির ভাগ রোগীই থাকেন অসুস্থ। তাই তাদের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকাও সম্ভব নয়। তাই অনেক রোগীকে ফ্লোরে জায়গা খুঁজে নিতে হয়। ৩০৮ নম্বর রুমের সামনে পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা নেই। চেয়ার বসানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা আছে। যে জায়গা আছে পরিকল্পিতভাবে যদি চেয়ার বসানো যায়, তাহলে আরও অনেকের বসা সম্ভব। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে রোগী তো ক্লান্ত হনই, সাথে রোগীর স্বজনরাও।

৩ ডিসেম্বর সকাল ৯টা। ৩১১ নং কক্ষের পাশে ফ্লোরে হেলান দিয়ে বসে আছেন কুমিল্লা থেকে আসা কবির হোসেন। এসেছেন ফাইল তুলতে। লাইনে অনেক লোক। তিনি দাঁড়াতে পারছেন না । বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি তার নেই। স্ত্রী লাইনে দাঁড়িয়েছেন। এই ফ্লোরে পর্যাপ্ত চেয়ার বসানোর জায়গা থাকলেও চেয়ার নেই। ডে-কেয়ারের পাশে একটামাত্র টয়লেট। তাতেও লাইন থাকে।

রোগীরা জানান, কেমো দিতে আসা রোগীদের স্বজনরা বলেন, ডে কেয়ারের দুই রুমের মাঝে চেয়ার বসানো থাকলে কেমো দিতে আসা রোগী বা সাথে আসা স্বজন বা ফাইল তুলতে আসা ব্যক্তি বা তাদের স্বজনরা একটু বসতে পারতো।

প্রশাসনিক ভবনের নিচ তলায় রেডিয়েশন অ্যান্ড অনকোলজি বিভাগ। সেখানেও খুব ভিড়। এখানে বসার জায়গা আরও সীমিত। এখানে দিনে বহু লোকের যাতায়াত থাকলেও তাদের জন্য কোনো টয়লেট নেই। সাইটো প্যাথলজি বিভাগ ও ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিভাগের সামনে পর্যাপ্ত বসার জায়গা নেই।

মেডিক্যাল অনকোলজি বিভাগের সামনে জায়গা কম। সে তুলনায় চেয়ার যা আছে ভালোই। কিন্তু রোগীদের তুলনায় জায়গা বা চেয়ার অনেক কম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সহযোগী অধ্যাপক বলেন, রোগীদের নিয়ে এখানকার প্রশাসনের কোনো চিন্তা নেই। এরা থাকে নিজেদের আরাম-আয়েশ নিয়ে। তাছাড়া, এখানে ধনী রোগীরা আসে না, তাই কোনো কিছু পরিবর্তনও হয় না।

এসব বিষয় জানতে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মুয়াররফ হোসেনের কক্ষে দুবার দুদিন গেলেও দেখা করা সম্ভব হয়নি। রুমের বাইরে দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, স্যার আজ আসবেন না। আসলেও দেখা করতে পারবেন না। খুব ব্যস্ত থাকবেন। এছাড়া, তাকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

এসব সমস্যা ছাড়াও আছে ওষুধ কোম্পানির লোকদের দৌরাত্ম্য। চিকিৎসকের কক্ষ থেকে রোগী বের হওয়া মাত্রই ছুটে এসে টিকিটের ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এছাড়াও রোগীদের ভুলিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য সক্রিয় রয়েছে দালাল চক্র। এদের সাথে হাসপাতালেরও কতিপয় অসাধু ব্যক্তি জড়িত।


ঢাকা/সাওন/মাহি

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়