RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২২ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ৭ ১৪২৭ ||  ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

‘উপস্থাপিকা হিসেবে কোহলির সাক্ষাৎকার নিতে চাই’

ইয়াসিন হাসান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০১:৩৩, ৮ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
‘উপস্থাপিকা হিসেবে কোহলির সাক্ষাৎকার নিতে চাই’

‘আকাশজুড়ে নীলের ছায়া/রোদ মাখানো নিজের মায়া/হরিণী চোখের নীল যেন/সবুজ ঘাসের কিরণমালা।’

মিরপুরের সবুজ গালিচায় মাইক্রোফোন হাতে কণ্ঠের জাদুতে অনস্ক্রিনে ক্রিকেটপ্রেমী‌দের বিনোদনের কঠিন দায়িত্ব সামলে আসছেন নীল হু‌রে জাহান।

ক্রিকেট এখন লাল-সবুজের সবচে‌য়ে বড় ব্র্যান্ড। ফ‌লে ক্রিকেট মাঠের সঙ্গে জড়িতরাও হয়ে ওঠেন দর্শকের খুব কাছের। আর মেধা, প্রজ্ঞা, কৌশল ও উপস্থিত বুদ্ধিতে নীলের নাম চলে এসেছে প্রিয়দের তালিকায়। 

বিনোদনের অলি-গলি পেরিয়ে ক্রীড়াঙ্গনের সরু রাস্তায় চলা শুরু করেছেন লাস্যময়ী এ উপস্থাপিকা। সব সেক্টরে এ প্লাস পাওয়া নীল উঠতে চান ক্রিকেট উপস্থাপনার হাইওয়েতেও। প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় যতটা সাবলীল, তেমনিভাবে প্রশংসিত হচ্ছেন নিজস্ব স্টাইল এবং মেকওভারের কারণে।

রাই‌জিং‌বি‌ডি’র এই সাক্ষাৎকা‌রে উঠে এসে‌ছে নী‌লের উপস্থাপনা ভাবনা, তারু‌ণ্যের স্বপ্নসহ বি‌ভিন্ন বিষয়। কথোপকথনে ছিলেন রাইজিংবিডি’র সিনিয়র প্রতিবেদক ইয়াসিন হাসান।

রাইজিংবিডি: শুরুর গল্পটা জানতে চাই?
নীল হু‌রে জাহান:
শুরুটা হয়েছে জিটিভিতে। জিটিভিতে স্পোর্টস প্রেজেন্টার হিসেবে শুরু। প্রায় দেড় বছর আগে। আমার প্রথম শো ছিল বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার সিরিজ। বাংলাদেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ খেলতে গিয়েছিল।

কিভাবে অফার পেলেন? অফারের পর প্রতিক্রিয়া? কাছের মানুষের পরামর্শ
নীল:
আমি তখন বাংলাভিশনে নিয়মিত কাজ করি। এনটিভিতে একটা শো করি। কাজ চলছিল নিজস্ব গতিতে। হঠাৎ আমাকে ফেসবুকে একজন নক করেছিলেন, জিটিভি থেকে। স্পোর্টস প্রেজেন্টার হিসেবে সেখানে নতুন কাউকে নেবে। উনারা দেখা করতে বলেছিলেন। তারপর গিয়েছিলাম, কথা বলেছি প্রযোজকের সাথে। তারপরই ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে ওই শো’য়ের জন্য ডাকলো। ওইটা লাইভ শো ছিল। সেটা করেছি। এভাবেই শুরু হয়ে যায় ক্রিকেট উপস্থাপিকার জার্নি।

প্রথম উপস্থাপনার কোনো মজার স্মৃতি কিংবা দুস্মৃতি?
নীল:
আমার সাথে প্রথম উপস্থাপনার দিন ফারুক ভাই (জাতীয় দলের প্রাক্তন অধিনায়ক ফারুক আহমেদ) ছিলেন। প্রথম শো হিসেবে দ্যাট ওয়াজ ভেরি গুড। তবে মনে রাখার মতো কোনো স্মৃতি নেই। নেই কোনো দুঃস্মৃতিও। সচরাচর যেটা হয়, জিটিভিতে সবাই হাইলাইটগুলো দিয়ে জার্নি শুরু করে। কিন্তু আমার প্রথম শো ছিল লাইভ। আমি একটু দ্বিধায় ছিলাম। স্পোর্টস শো কখনো আগে করিনি। প্রথমবার করছি সেটাও লাইভ। যদি ভুল হয়…কিন্তু ফারুক ভাইয়া আমাকে বললেন, তুমি ভালো করো, তুমি পেরে যাবে। আর প্রযোজক ছিল। প্রথম শো হিসেবে মোটামুটি ভালোই ছিল।

প্রথম শো যেহেতু, সবাইকে বলেও ছিলাম যে, আমি লাইভে আসছি। সবাই যারা দেখেছে, সবাই বলছে- খুব ভালো হয়েছে, মনে হয় নি যে প্রথম বার করছো। জিটিভির টিমটা আসলে খুব ভালো। প্রযোজক, দলের বাকিরা সবাই খুব যত্ন করে কাজটা করেন। একসাথে স্টাডি করা হয়। ফলে কোনো সমস্যা হয় না।

শুধু উপস্থাপনা ও ক্রীড়া উপস্থাপনার মধ্যে পার্থক্য কতোটুক?
নীল:
ক্রীড়া উপস্থাপনা একেবারে ভিন্ন। এখানে মৌলিক বিষয়টাই পার্থক্য। টিভির পর্দায় সবাই খেলা দেখছে। কিন্তু উপস্থাপককে দর্শকদের সামনে ইনসাইড স্টোরি নিয়ে আসতে হয়। খেলাটায় কোথায় পরিবর্তন হলো, কে কখন ভালো করলো, কেন ভালো করলো, সাফল্যর রহস্য সেগুলো একজন উপস্থাপক বের করে আনে। সেজন্য খেলটা বুঝতে হয়। এছাড়া শুধু উপস্থাপনাও চ্যালেঞ্জিং। আপনার সামনে কি আসতে যাচ্ছে তা আপনি জানেন না। হয়তো স্ক্রিপ্ট থাকে কিন্তু আপনার নিজের বুদ্ধিমত্তার ওপর একটি শো নির্ভর করে। আপনি স্মার্ট তো আপনার শোও স্মার্ট।  

মাইক হাতে মূল চ্যালেঞ্জ কি থাকে?
নীল:
চ্যালেঞ্জ বলতে, আসলে স্পোর্টস শো’য়ের ক্ষেত্রে শুরু হওয়ার এক মিনিট আগ পর্যন্ত খুব চ্যালেঞ্জ কাজ করে। সবসময়ে ভয়ে থাকি। মনে হয় যে, কি হবে। কিন্তু যখন দেখা যায় যে, কথা শুরু হয়। তখন আসলে শোয়ের মধ্যেই থাকি। সামনে একজন গেস্ট থাকেন। ক্রিকেটার হোক বা অ্যানালিস্ট হোক। দেখা যায়, তাঁর সাথে কথা বলতে গিয়ে শো’য়ের মধ্যে ঢুকে যাই। সে সময়টা আসলে উপভোগ করি। সে সময়টা আসলে চ্যালেঞ্জটা আর মাথায় থাকে না। তখন মনে হয়, যে খেলাটা নিয়ে কথা বলছি, সেটা নিয়ে আর কি বলা যায়, কি আলোচনা করা যায়। ওভাবেই এগিয়ে যাই।

এ পেশার গ্রহণযোগ্যতা আছে অবশ্যই। কিন্তু আয় কিরকম হয়?
নীল:
এটা একদমই বিভিন্ন ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভর করে। প্রথমত যেটা বলব, একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। অনেকে আছেন, যারা প্রচুর শো করেন। অনেকে আছেন, যারা শো একটু কম করেন। এটার উপর নির্ভর করে। ফেস ভ্যালুর একটা ব্যাপার থাকে। দেখা যাচ্ছে একই কাজ একজন করে যেটা পাচ্ছে, সেটা অন্যজনের ক্ষেত্রে বেশি হচ্ছে। আবার সিরিজ অনুযায়ী হয়ে থাকে। এক একটা সিরিজে কতটা ম্যাচ সেগুলোর ওপর নির্ভর করে। ৮০ থেকে ১ লাখ কিংবা কম-বেশি হতে পারে।

কখনো ক্রিকেট খেলেছেন?
নীল:
হ্যাঁ, ছোটবেলায় মজা করে ক্রিকেট খেলেছি। সিরিয়াস ক্রিকেট খেলা হয়নি কখনো। আমরা শোয়ের মাঝে ব্যাট-বল নিয়ে টুকটাক খেলি। গেস্টরা যারা থাকেন খালেদ ভাই, ফাহিম ভাই বা আমাদের প্রোডিউসার একজন হয়ত বল করেন, আরেকজন ব্যাটিং করেন। একটু-আধটু মজা করে খেলা হয়।

অবসরে ক্রিকেট নিয়ে কতোটা ভাবেন?
নীল:
অবসর পাওয়া হয় কম। যখন আসলে শো শুরু হয়, তখন ক্রিকেট নিয়ে ভাবা হয় বেশি। অবসরে হয়ত সামনে কোন সিরিজটা আসবে, ওইটা নিয়ে এক্সাইটেড থাকি। ভাবি যে কবে কাজ শুরু হবে…
 


কিন্তু ক্রিকেট উপস্থাপনার জন্য তো পড়াশোনা গুরুত্বপূর্ণ…
নীল:
ক্রিকেটের ক্ষেত্রে আসলে পড়াশুনাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অন্য অনুষ্ঠানগুলো যেমন হয় যে, একই সাবজেক্ট একবার আপনি গো থ্রু করলে হয়ে যায়। ওইটা নিয়ে বেশি ভাবতে হয় না। তবে খেলার ব্যাপারটা এরকম যে, এখন খেলা এক রকম, পরে খেলা আরেক রকম। ফলে ভালো করে জানতে হয় এবং খেলাটা প্রতিটা বলে কেমন হচ্ছে, একজন খেলোয়াড় আজ যেমন সে কালকে ওইরকম খেলছে না। ফলে স্টাডিটা একটু বেশি করতে হয়।

যেহেতু ক্রিকেট উপস্থাপনায় আগ্রহ আছে, ক্রিকেটের ওপর উচ্চতর কোনো ডিগ্রি নেওয়ার ইচ্ছে আছে?
নীল:
পড়াশুনা করে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার ব্যাপার আছে কি না আমি জানি না। মানে সেরকম কোনো ডিগ্রি কেউ দেয় কিনা আমি সঠিক জানি না।

ইংরেজি ভাষার দক্ষতা কতোটা প্রয়োজন?
নীল:
ভাষা আপনার জন্য বাধা হতে পারে, আবার এটা আপনাকে সুবিধাও দিতে পারে। আন্তর্জাতিক শো করতে হলে অবশ্যই ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা থাকতে হবে। সেটা না থাকলে সমস্যা। থাকলে খুবই ভালো।

এখানে নীল নিজেকে দশে কতো দেবে?
নীল:
সেক্ষেত্রে আমি নিজেকে খুব বেশি দিবো না। আমি নিজেকে ৬-৭ দিবো।

আন্তর্জাতিক শো করার ইচ্ছে আছে?
নীল: ইচ্ছেটা তো আছে। আমাদের যেটা হয়, আমরা টেলিভিশনে শো করি। বেশ প্রায় অনেকগুলো চ্যানেলে আমাদের কাজ করা হয়। পাশাপাশি আমাদের কর্পোরেট ইভেন্টও করা হয় বাইরে নিয়মিত। বাইরের ইভেন্টের জন্য সেরকম অফার এসেছিল। কিন্তু কোনো কারণে করা হয়নি। ইচ্ছা তো আছে, দেখা যাক সামনে কি হয়।

উপস্থাপনার জন্য কোনটা সবথেকে বেশি প্রয়োজন, বিউটি অর ব্রেন?
নীল: দুইটাই দরকার আসলে। বিউটি ব্যাপারটাই আসলে স্মার্টনেস। আপনাকে প্রেজেন্টেবল হতে হবে। তাতেই হবে। আপনি যে কাজটা করতে যাচ্ছেন সেটা নিয়ে অবশ্যই আপনাকে ধারনা থাকতে হবে। সেটাই আপনার ব্রেন। দরকার দুটোই। স্ক্রিপ্টের বাইরেও আপনাকে জানতে হবে। সেটা আপনার উপস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। 

আপনাদের পেশাটা খুব ব্যয়বহুলও বটে। এক পোশাক পরে দ্বিতীয়দিন অনস্ক্রিনে আসা যায় না
নীল: হ্যাঁ, এটা আসলে শুধু ক্রিকেট উপস্থাপনার ক্ষেত্রে হয় সেটা না। দেখা যায় যে, উপস্থাপকদের একটা ব্যাপার থাকে। কেন আমি জানি না, তবে তাঁরা রিপিট করে একটু কম। করতে হয় আসলে। আমাদের যেহেতু পেশাটাই এটা। এক্ষেত্রে দেখা যায়, আমাদের কিছু স্পন্সর থাকে।

এ অঙ্গনে আপনার আইডল কেউ আছে কিংবা কাউকে অনুকরণ করেন?
নীল:  হ্যাঁ, আমাদের সিনিয়ররা যারা, আমি তাদের শো মোটামুটি দেখেছি বা দেখি। ঠিক আইডল বলবো না, আমি সবারটা দেখি, যারটা ভালো লাগে, ভালো করে, তাদের গুলো একটু বেশি দেখি। অনুকরণ ঠিক না, তবে অনুসরন কিছুটা বলা যায়।

কিছুদিন আগে আমাদের বিপিএলে যিনি আসলেন, আঞ্জুম চোপড়া। আমার কাছে উনার অ্যাটিটিউড, যে প্রশ্নগুলো উনি করেন, খুব মুগ্ধ হয়েছি। আমি ওইটা একটু অনুকরণ করার চেষ্টা করেছি। এছাড়া আমার আগে মারিয়া নূর, শ্রাবণ্য তৌহিদা উনারা করতেন। উনাদেরটাও দেখা হয়। আজরা আপু করতেন। আসলে যার যে জিনিসটা ভালো লাগে, ওইটা মাথায় রাখি আর কি।

যদি কখনো ধারাভাষ্যের সুযোগ আসে
নীল: লুফে নেবো বলবো না। কারণ, আমার কাছে মনে হয় এটা আরও জানতে হবে। ধারাভাষ্যকার যারা তাদেরকে আসলে অনেকটা সময় ধরে এক জায়গায় বসে পইপই করে প্রত্যেক বল বুঝিয়ে বলতে হয়। এ কাজটা আসলে আমরা যেটা করি তার চেয়েও কঠিন। জিটিভিতে যেটা হতো র‌্যাবিটহোল থেকে ওয়ার্ল্ড কাপের সময় আমাদের কমেন্ট্রি কর্ণার ছিলো। ওখানে যেমন, যারা বিভিন্ন কমেন্টেটর, যারা টেলিভিশন বা রেডিওতে কমেন্ট্রি করেন, তাঁরা অনেকে আসতেন। এসময় আমরা প্রায় যেতাম। তখন আমি তাদের সাথে বসে কথা বলেছি, ২-১ মিনিট কমেন্ট্রি করেছি মজা করে। কাজটা ইন্টারেস্টিং কিন্তু আমার মনে হয় যে, এটা এখন আমি করবো কিনা জানি না। সামনে হয়ত, কিন্তু নিশ্চিত নই।

লিখালিখিতে আপনার হাত আছে? শেষ বই মেলায় একটি বই বের করেছেন। অতিথি লেখক হিসেবে ক্রিকেট নিয়ে লিখালিখি করার ইচ্ছে আছে, যেমন ফিচার, মতামত কিংবা ক্রীড়াঙ্গনের তারকার সাক্ষাৎকার
নীল: হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি লিখতে মোটামুটি পছন্দ করি। যদিও আমার প্রফেশনালি হিসেবে লিখতে ভালো লাগে না, নিজের খেয়াল খুশি মতো লিখি। কিন্তু হ্যাঁ, যদি এরকম হয় যে ফিচারের মতো কিছু লেখার সুযোগ আসে, অবশ্যই আমি লিখার চেষ্টা করবো।

কোন বিদেশী ক্রিকেটারকে গেস্ট হিসেবে পেলে খুব খুশি হবেন?
নীল: আন্তর্জাতিক কোনো তারকার কথা বললে অবশ্যই বিরাট কোহলি। তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার খুব ইচ্ছে আছে।

প্রিয় ক্রিকেটার দেশে এবং দেশের বাইরে?
নীল: দেশের প্রিয় ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। বাইরে বিরাট কোহলি।

নিজেকে ৫ বছর পর কোথায় দেখতে চান?
নীল: আপাতত নিজেকে পাঁচ বছর পর দেখতে চাই যে, বেঁচে আছি। পাঁচ বছর আসলে…এই এপ্রিলের ৯ তারিখ আমার জন্মদিন, পঁচিশ বছর হয়ে যাবে। এই সময়টা খুব কঠিন। নিজের অনেক পরিবর্তন হয়। পড়াশুনা শেষ হবে। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করছি। আরও দুটো সেমিস্টার বাকি আছে। সামনে অনেক কিছু পরিবর্তন হবে। আমি আসলে এখন জানি না কি হবে। উপস্থাপনার ক্যারিয়ার থাকবে অবশ্যই। সেই বিশ্বাস আছে।

 

ঢাকা/ইয়াসিন

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়