ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ৯ ১৪২৭ ||  ০৬ সফর ১৪৪২

‘লক্ষ‌্য পূরণ হলে বলবো, আমি-ই নম্বর ওয়ান’

ইয়াসিন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৫:১৭, ৪ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
‘লক্ষ‌্য পূরণ হলে বলবো, আমি-ই নম্বর ওয়ান’

তিনি স্বপ্ন দেখেন, ক্ষ‌্যাপাটে স্বপ্ন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়াযজ্ঞ অলিম্পিকে উড়াবেন লাল-সবুজের পতাকা। তাঁর স্বপ্ন মোটেও বাড়াবাড়ি নয়। এর জন্য প্রতিনিয়ত নিজেকে গড়ছেন। প্রস্তুত হচ্ছেন বড় মঞ্চের জন‌্য। বলা হচ্ছে তীরন্দাজ রোমান সানার কথা।

বিশ্ব আর্চারির ২০১৯ সালের বর্ষসেরা ব্রেক থ্রু অ্যাথলেট নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে সরাসরি সুযোগ পেয়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়াযজ্ঞ অলিম্পিকে। নামের পাশে আছে একাধিক অর্জন। নিশ্চিত সবার উপরেই থাকবে আর্চারি বিশ্বকাপের ব্রোঞ্জ পদক।

এছাড়া ২০১৪ সালে প্রথম এশিয়ান আর্চারি গ্রাঁ প্রি এবং ২০১৭ সালে কিরগিজস্তানে আন্তর্জাতিক আর্চারি টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের রোমান জিতেছিলেন স্বর্ণ। আর গেল ডিসেম্বরে দক্ষিণ এশিয়ান (এসএ) গেমসে ব্যক্তিগত ও দলীয় ইভেন্ট মিলিয়ে রোমান জেতেন তিনটি স্বর্ণ পদক। সব মিলিয়ে তাঁর হাত ধরে আর্চারিতে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে।

রাইজিংবিডি’র সাক্ষাৎকারে রোমান সানা কথা বললেন নিজের সফর নিয়ে, জানালেন নিজের লক্ষ‌্য। মুঠোফোনে তাঁর কথা শুনেছেন ইয়াসিন হাসান।

রাইজিংবিডি: আপনি তো আর্চারিতে অনেক স্বর্ণ পেয়েছেন। প্রথম স্বর্ণ জয়ের কথা মনে আছে?
রোমান সানা: হ‌্যাঁ, অবশ‌্যই। ২০১৪ সালে এশিয়া কাপে। প্রথমে টুর্নামেন্টের নাম ছিল গ্রামপিক। পরে এশিয়া এক্সপ্রেস ওয়ান রাখা হয়েছিল। ওখানেই প্রথম স্বর্ণ পাই। ওই মুহূর্ত ব্যাখ্যা করার মতো না। আমি ভাষায় প্রকাশ করতেও পারব না। প্রথম স্বর্ণ যে কারোর জন‌্য স্মরণীয় হয়ে থাকে। আমার ক্ষেত্রে ব‌্যতিক্রম কিছু না।

রাইজিংবিডি: বিশ্বকাপ আর্চারিতে ভালো করায় টোকিও অলিম্পিকে সরাসরি সুযোগ পেয়েছেন। যদি অলিম্পিকে স্বর্ণ পেয়ে যান…
রোমান সানা: (ওপারে হাসির রোল) আল্লাহ পাক ভালো জানেন। নিজের ভবিষ‌্যৎ সম্পর্কে কেউই তো কিছু বলতে পারেন না। তবে আমি আমার সাধ‌্যমতো চেষ্টা করবো। স্বপ্ন অবশ‌্যই দেখি অলিম্পিক জেতার। বাকিটুকু নিজের ভাগ‌্য এবং সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা।

রাইজিংবিডি: অসম্ভব না তো অবশ‌্যই?
রোমান সানা: প্রথমবার অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করে পদক পাওয়ার চিন্তা করা বোকামি। ওই মঞ্চে ওই ধরণের পারফরম‌্যান্স করার মতো যোগ‌্যতা এখনও আমার হয়নি। আমাকে ওই যোগ‌্যতা অর্জন করতে হবে। যদি ওই যোগ‌্যতা অর্জন করতে পারি তাহলে অবশ‌্যই আমি আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে পারব আমি অলিম্পিকেও পদক পাবো।

আরেকটি বিষয় বলতে চাই, যতই কিংবদন্তি দেখেন না কেন, তারা কিন্তু কেউই অলিম্পিকে প্রথম অংশগ্রণ করে পদক পায়নি। ২০০৬ সালে উসাইন বোল্ট কিন্তু ষষ্ঠ হয়েছিলেন। এরপর চায়না অলিম্পিকে স্বর্ণ পান। লন্ডন এবং রিও অলিম্পিকেও স্বর্ণ পান। আমার ক্ষেত্রেও এতোটা প্রত‌্যাশা করা ঠিক না। হ‌্যাঁ, সব কিছুরই একটা সম্ভাবনা থাকে। যদি সৃষ্টিকর্তার আর্শীবাদ থাকে অবশ‌্যই আমি পারবো।

রাইজিংবিডি: গত বছর এসএ গেমসে বাংলাদেশ আর্চারিতে দশটি পদক পেয়েছে। আপনি ছিলেন নেতৃত্বে। তিনটি স্বর্ণ আপনি জিতেছেন। আপনার কি মনে হয় ২০১৬ সালে যদি খেলতে পারতেন তাহলে এ সাফল‌্য অনেক আগেই চলে আসত?
রোমান সানা: ২০১৯ সালে আমরা অভাবনীয় পারফরম‌্যান্স করেছি এটা সত‌্য। কিন্তু চার বছর আগে কি হতো সেটা নিয়ে আসলে বেশি বলা যায় না। আমি ফর্মে ছিলাম কিন্তু ইনজুরিতে ছিলাম। ডানহাতের একটা হাড়ে সমস‌্যা হয়েছিল। এজন‌্য খেলতে পারিনি। চার বছর পর সুযোগ পেয়ে ভালো করেছি। তিনটা স্বর্ণ এসেছে। এটা বড় প্রাপ্তি। দশটা স্বর্ণ জিতে আমরা ইতিহাস সৃষ্টি করেছি।

রাইজিংবিডি: দীর্ঘদিন লকডাউনে আছেন। এর আগে ফিটনেস নিয়ে কাজ করেছেন। এখন কি করছেন। সময় কাটছে কিভাবে?
রোমান সানা: ফেডারেশন থেকে যার যার বাসায় ধনুক পাঠিয়ে দিয়েছে কুরিয়ার সার্ভিসে। বাসায় এখন ধনুক নিয়ে চর্চা করছি। শক্তি এবং শারীরিক কার্যক্রম ধরে রাখার জন‌্য ধনুক নিয়ে যে কসরত গুলো আছে সেগুলো চালিয়ে যাচ্ছি। তীর ছোড়া বাদে শুধুমাত্র ধনুক দিয়ে যা করা যায় সেগুলো করে যাচ্ছি।

রাইজিংবিডি: দীর্ঘদিন পর নিজের সেরা সঙ্গীকে পেয়েছেন। নিশ্চয়ই হাতে নিয়ে দারুণ অনুভব করেছেন?
রোমান সানা: প্রথম যেদিন হাতে পেলাম সেদিন মনে হচ্ছিল আমি শিক্ষানবিস কেউ! প্রথম শুরুর যে অনুভূতি সেরকম অনুভব হচ্ছিল (হাসি)। এখন আবার ভালো লাগছে। শেষ কয়েকদিন তো রাত দিন ধনুক নিয়েই আছি।

রাইজিংবিডি: শক্তির কথা বললেন শুরুতেই। এখন ধনুক নিয়ে অনুশীলন কেমন হচ্ছে?
রোমান সানা: আমাদের খেলাটা হচ্ছে অন‌্যরকম। আপনি সারা বছর অনুশীলন করলেন কিন্তু যদি এক বা দুই মাস বন্ধ রাখলেন তাহলে অনেক ক্ষতি হয়। একটা প্রক্রিয়া আছে। ক্রিকেট বা ফুটবলে বেসিক জিনিসটা ধরে রাখলে হয়। কিন্তু আমাদের অনুশীলন না করলে শক্তির ঘাটতি দেখা দেয়। ওই শক্তি ফিরিয়ে আনতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। আবার নিজেদের যে স্কোর আছে সেখানে ফিরে আসতে সময় লেগে যায়। এখন যেহেতু ধনুক পেয়েছি, শক্তি নিয়েই কাজ হচ্ছে। মাঠে ফিরে গেলে যেখানে ফর্মে ফিরতে দুই মাস সময় লাগতো, ধনুক হাতে পাওয়ায় এখন একমাস সময় লাগবে।

রাইজিংবিডি: গুলি ছাড়া বন্দুকের কোনো দাম নেই। ঠিক তেমনই তীর ছাড়া ধনুকও একেবারে নিষ্প্রভ। ঘরে অনুশীলনের ধরণ একেবারেই আলাদা হচ্ছে না?
রোমান সানা: মাঠে আমাদের সাত ঘণ্টা অনুশীলন করা হতো। বাসায় সেই সুযোগ নেই। কারণ তীর ছোড়া বাদে বিরক্ত লাগে। সবাই মিলে মাঠে তীর ছোড়ার আনন্দ আছে। এজন‌্য মাঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলন করলে কষ্ট কম হয়। একা একা বাসায় অনুশীলন যতই করেন আনন্দ পাওয়া যায় না। ওখানে মন বসানো আর ঘরে মন বসানোর পার্থক‌্য আছে।

রাইজিংবিডি: ঘরে কতক্ষণ অনুশীলন করছেন?
রোমান সানা: সকালে দেড় ঘণ্টা, বিকেলে এক ঘণ্টা।

রাইজিংবিডি: অনলাইন ক্লাসে বসা হচ্ছে?
রোমান সানা: অনলাইনে প্রায় প্রতিদিনই আমাদের একটা সেশন চলছে। আমাদের খেলোয়াড় সংখ‌্যায় প্রায় ২৫ জন। গ্রুপ ভাগ করে চলে অনুশীলন। কোনো গ্রুপকে সকাল সাড়ে আটটায়। কোনো গ্রুপকে নয়টায়, সাড়ে নয়টায়। এভাবে প্রতিদিনই চলছে কাজ। শনিবার আমার, রুবেল, সাকিব ও তামিমের গ্রুপের সেশন আছে একটা। কোচ থাকবেন। অন্তত ত্রিশ মিনিটের একটা সেশন হবে। এর আগেও আমরা এভাবে কাজ করেছি। এছাড়া হোয়াটসঅ‌্যাপে একটা গ্রুপ আছে। সেখানে প্রত‌্যেককে একটা দিক নির্দেশনা দিয়ে দেওয়া আছে। সেভাবে প্রত‌্যেকেই কাজ করছে।

রাইজিংবিডি: আর্চারি বিশ্বকাপে তৃতীয় হয়েছিলেন। বিশ্বের ছয় নাম্বার তারকা ইতালির মাউরো নেসপোলিকে হারিয়ে জিতেছিলেন ব্রোঞ্জ। তারকাদের সঙ্গে লড়াইয়ে নিজের ভাবনা কি কাজ করে, স্নায়ু চাপ থাকে কিনা?
রোমান সানা: ছোট ম‌্যাচ হোক বা বড় ম‌্যাচ হোক আমার ভাবনা সব সময় একই থাকে। তা হলো, এখানে আমি জিততে এসেছি আমাকে জিততে হবে। সেই ম‌্যাচের কথা বললেন সেখানে নামার আগে আমি চিন্তা করেছিলাম নেসেপোলি পারলে আমি কেন পারব না? আমার প্রতিপক্ষ আমার থেকে ভালো হতে পারে কিন্তু ম‌্যাচে তো আমরা একই জায়গা থেকে শুরু করি। নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করি। আমি হেরে গেলেও কখনো মনোবল হারাই না। ওখান থেকে শেখার চেষ্টা করি। কোথায় পয়েন্ট হারাই সেদিকে মনোযোগী হই।

রাইজিংবিডি: ২০১৯ সালের বর্ষসেরা ব্রেক থ্রু অ্যাথলেট নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের অন‌্যতম সেরা সাফল‌্য নয় কি সেটা?
রোমান সানা: বলা যেতে পারে। বাংলাদেশের জন‌্য সেরা সাফল‌্য হবে কিনা জানি না। তবে আমার জন‌্য অনেক বড় প্রাপ্তি। দীর্ঘ নয় বছরের কঠোর পরিশ্রমের ফল বলবো।

রাইজিংবিডি: আপনি কি বিশ্বাস করেন আপনি আর্চারিতে বাংলাদেশের ‘সাকিব আল হাসান’?
রোমান সানা: (হাসি) জানিনা…. (হাসি)। তবে আমাকে যারা চেনেন তারা বলতে পারবেন ভালো। আমি মনে করি এখনও আমার অনেক কিছু অর্জন করার বাকি আছে। আমার একটা লক্ষ‌্য আছে। আমি তখন বলতে পারবো আমি বাংলাদেশের এক নম্বর আর্চার। সেই লক্ষ‌্য পূরণ হলে আমি কথা দিচ্ছি সবার সামনে এসে বলবো, আমি-ই নম্বর ওয়ান।

রাইজিংবিডি: যদি কেউ আর্চারিতে আসতে চায়, আপনার পরামর্শ কি?
রোমান সানা: আমরা তো অনেক কঠিন পথ পেরিয়ে এসেছি। তবে এখন তো অনেক সুযোগ সুবিধা। কয়েকটা জেলাতেই আর্চারি আছে। আমাদের বিকেএসপিতে আর্চারি। অনেক বড় ক্লাবে আর্চারির ভালো সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এছাড়া আনসার, বিজিপি, আর্মি, এয়ারফোর্স সব জায়গাতেই এখন আর্চারির সুযোগ-সুবিধা আছে। আমি বিশ্বাস করি ৬৪ জেলার অর্ধেকের বেশি মানুষ আর্চারির সম্পর্কে জানেন। যদি কেউ আসতে চায় অবশ‌্যই ওয়েলকাম। এখানে ভবিষ‌্যৎ আছে।

 

ঢাকা/ইয়াসিন

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়