ঢাকা     শুক্রবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ১০ ১৪২৭ ||  ০৭ সফর ১৪৪২

‘সবকিছু ঠিক থাকলে ডিসেম্বরে বাজারে আসবে করোনার ভ্যাকসিন’

ওয়াহিদ তাওসিফ মুছা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:৩৭, ৫ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
‘সবকিছু ঠিক থাকলে ডিসেম্বরে বাজারে আসবে করোনার ভ্যাকসিন’

বিশ্বজুড়ে মহামারি করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণের থাবায় প্রতিনিয়ত মৃত্যুর তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। প্রাণঘাতী এ ভাইরাস থেকে রেহাই পেতে একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে ভ্যাকসিন বা অন্যকোনো বিশেষ ওষুধ, যা সরাসরি কোভিডে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে কাজ করবে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা নিরন্তর গবেষণা করেও এখন পর্যন্ত কার্যকরী কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে সক্ষম হননি। তবুও থেমে নেই এ গবেষণা প্রক্রিয়া। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ ভাইরাস প্রতিরোধের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সে যাত্রায় থেমে নেই বাংলাদেশও।

দেশের অন্যতম বেসরকারি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেকের একটি গবেষক দল দাবি করছে, তারা প্রাণঘাতী এ ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে।

ভ্যাকসিনটির প্রাথমিক পর্যায়ের ট্রায়াল, অগ্রগতি, বাজারে আসতে কতদিন লাগতে পারে, সামনে কী কী কাজ হবে, আরও কয় ধাপ পেরোতে হবে, কার্যকারিতা কেমন হতে পারে- এ সংক্রান্ত সার্বিক বিষয় নিয়ে রাইজিংবিডির সঙ্গে কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানটির রিসার্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের প্রধান ড. আসিফ মাহমুদ। তার মুখোমুখি হয়েছিলেন রাইজিংবিডির স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রতিবেদক- ওয়াহিদ তাওসিফ মুছা।

রাইজিংবিডি: ভ্যাকসিন আবিষ্কারের প্রধান প্রতিবন্ধকতা কি ছিল?
ড. আসিফ মাহমুদ: আসলে, আমি দেশের বাইরে যখন গবেষণা করেছি, তখন আমাদের প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল বা রি-এজেন্ট প্রয়োজন হলে আজ অর্ডার করলে একদিন পরই সেগুলো ল্যাবে পাওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা একটি রিসার্চ প্রজেক্ট নিয়ে আজ কাজ শুরু করলে আমাদের প্রয়োজনীয় উপকরণ পেতেই বেশি সময় ব্যয় হয়৷ যেহেতু দেশের বাইরে থেকে এ সব রি-এজেন্ট আনা হয় সেহেতু এয়ারপোর্টে এসেও কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন চেইন- মেইনটেইন করে আমাদের হাতে প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল আসে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বা পরিকল্পনার পর ক্যামিক্যালই গবেষণার প্রথম ধাপ। সুতরাং এ কেমিক্যাল ইমপোর্ট করতে আমাদের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে।

রাইজিংবিডি: বিশ্বের বহু দেশ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষেধক আবিষ্কারের চেষ্টা করেও সফল হতে পারছে না৷ এর পেছনে কি কারণ রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
ড. আসিফ মাহমুদ: এ বিষয়টা আসলে নির্ভর করে তাদের টিম এবং প্রক্রিয়ার ওপর৷ যেহেতু একটি ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পেছনে নানান প্রক্রিয়া থাকে, সেহেতু এমনটা হতে পারে। হিউম্যান সার্চ অব-২ এর আওতায় যে ভ্যাকসিনগুলো রয়েছে এগুলোর কার্যকারিতায় নিশ্চিত হতে হলে আমাদের অবশ্যই মানবদেহে প্রয়োগ করে দেখতে হবে।  বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখনো ট্রায়ালে রয়েছে৷ মানবদেহের ওপর ফেজ-১, ফেজ-২ এবং ফেজ-৩ এ তিন প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করেই আমরা বলতে পারি, আমাদের ভ্যাকসিকন কতটা কার্যকরী। যেহেতু বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন ধাপে এখনো কাজ করে যাচ্ছে সেহেতু সফলতার বা ব্যর্থতার কথা এ মুহূর্তে বলা মুশকিল।

রাইজিংবিডি: হু (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) বলছে করোনার ভ্যাকসিন আসতে দীর্ঘদিন সময় লাগবে। সেক্ষেত্রে গ্লোব বায়োটেক কতদূর এগিয়ে বা সফলতা কেমন আশা করছেন?
ড. আসিফ মাহমুদ:  দেখুন, হু থেকে এমন নির্দেশনা এলেও পৃথিবীর অনেক দেশ কিন্তু ঘোষণা দিয়েছে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তারা বাজারজাত প্রক্রিয়া শুরু করবে। তাদের গবেষণার জায়গা থেকেই এটি আশার বাণী শোনাচ্ছেন। আমরা যদি আমেরিকার দিকে তাকাই তাদের ভ্যাকসিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান মর্ডানা মাত্র ৬৯ দিনে ভ্যাকসিন ডেভেলপ করেছে, এমনকি অ্যানিমেল ট্রায়াল ছাড়াই হিউম্যান ট্রায়ালে গিয়েছে। তাদের মতে, অক্টোবরেই তারা ভ্যাকসিন বাজারে নিয়ে আসতে সক্ষম। তাছাড়া আমরা যদি ড. গিলবার্টের টিমের দিকে তাকাই তবে দেখতে পাবো, তারা কিন্তু জানুয়ারিতে বাজারে আসার ঘোষণা দিয়েছে। এমনকি তারা এতটাই আত্মবিশ্বাসী যে ইতোমধ্যে প্রডাকশন শুরু করে দিয়েছে। এদিকে ভারত বায়োটেকনোলজি বলছে, তারা আগামী ২৭ জুলাই ফেজ-১ ট্রায়াল শেষ করবে এবং ১৫ আগস্টের মধ্যে বাজারে আসবে। আসলে আমরা যে ভাইরাসের ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছি, এ বিষয়ে আগের অনেক স্টাডি করা আছে। করোনার আগেই পৃথিবীতে ‘সার্চ’ এবং ‘মার্চ’ এর ওপর অনেক গবেষণা হয়েছে। সুতরাং বেসিক গবেষণা আগেই যেহেতু রয়েছে, সেহেতু আমরা বলতে পারি সবকিছু ঠিক থাকলে দ্রুত বাজারে আসা অসম্ভব কিছু নয়।

রাইজিংবিডি: একজন করোনা আক্রান্ত রোগীর কয়টি টিকা নিতে হবে এবং মাত্রা কি হবে?
ড. আসিফ মাহমুদ: ডোজ এবং মাত্রার বিষয়ে এখন কিছুই বলা যাচ্ছে না। প্রাথমিকভাবে আমরা এনিমেলের ওপর গবেষণার পর মাত্রা বাড়িয়ে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে দেখেছি। কিন্তু হিউম্যান বডিতে কতটুকু লাগবে এটা এ মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়, একজন রোগীর এন্টিবডি ডেভেলপ হতে কতটুকু মাত্রা লাগবে এবং নির্দিষ্ট মাত্রা দেওয়ার পর যদি লেভেল অনুযায়ী বুস্টার ডোজ প্রয়োজন হয়ে তা প্রয়োগ করতে হবে। মানবদেহে প্রয়োগের আগে নির্দিষ্ট মাত্রা নিয়ে বলা সম্ভব নয়। আমাদের এখনও একটা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বাকি রয়েছে। আমরা অ্যানিমেল (প্রাণী) মডেলে কাজ করেছি। এখন আমাদের হিউম্যান (মানবদেহে) মডেলে কাজ করতে হবে। হিউম্যান মডেলে কাজ করে ‘ডেজ ওয়ান’একটা স্টাডিজ আছে এবং ‘ডেজ টু’ একটা স্টাডিজ আছে। ‘ডেজ টু’ স্টাডির মধ্যে কয়েকবার ডোজটা দিতে হবে, দিলে অ্যান্টিবডি গ্রো (গড়ে উঠবে) হবে, যে অ্যান্টিবডি করোনাভাইরাস মেরে ফেলতে পারবে। অর্থাৎ সেটাকে নিউট্রিলাইট করতে পারবে। হিউম্যান মডেলের কাজ বাকি, এটা এখনও আমরা নির্ধারণ করতে পারিনি। এটা নির্ধারণ হবে এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পর।

রাইজিংবিডি: কবে নাগাদ বাজারজাত হবার সম্ভাবনা রয়েছে? মূল্য কেমন হতে পারে?
ড. আসিফ মাহমুদ: আমরা চাই ১৬ কোটি মানুষের কাছে আমাদের ভ্যাকসিন পৌঁছে দিতে। সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যেই মূল্য নির্ধারণ করা হবে। আর আমরা আশা করছি সামনের প্রক্রিয়াগুলো ঠিকভাবে এগিয়ে গেলে ডিসেম্বরে বাজারে আসতে পারবো।

রাইজিংবিডি: বাজারে আসার আগে কি কি প্রক্রিয়া রয়েছে?
ড. আসিফ মাহমুদ: আমরা মাত্র প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করেছি৷ ৬-৮ সপ্তাহের মধ্যে রেগুলেটেড এনিমল ট্রায়ালের পর সরাসরি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য আবেদন করবো। প্রাথমিক পর্যায়ের পর আমরা ৪ স্তর বিশিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই বাজারে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা মোট চারটি ক্যান্ডিডেট এবং তিনটি ডিফারেন্ট ডেলিভারি মেকানিজম নিয়ে কাজ করছি।‌ আমাদের বর্তমান ট্রায়ালে তিনটি টার্গেট। একটি ডেলিভারি মেকানিজম নিয়ে। আমরা আরও ব্যাপকভাবে এনিমেলের ওপর ট্রায়াল করব। সেখানে আরও নয়টি ক্যান্ডিডেটের ট্রায়াল হবে। সার্বিক ফলাফল পর্যালোচনা করে যে ক্যান্ডিডেটের রেজাল্ট বেশি সুইটেবল হবে, আমরা সেটা নিয়েই হিউম্যান ট্রায়ালে যাব।

রাইজিংবিডি: গবেষণা দলে কতজন কাজ করছেন? নেতৃত্বে কে রয়েছেন?
ড.আসিফ মাহমুদ: আমরা ১০-১২ জন কাজ করেছি। গবেষক দলের প্রধান ড. কাকন নাগ (গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের সিইও) ও ড. নাজনীন সুলতানা (গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের সিওও) । তাদের সুপারভিশনে (তত্ত্বাবধানে) আমরা বাকিরা কাজ করেছি। তারা দুজনই কানাডায় আটকা পড়েছেন।


এসএম

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়