ঢাকা     শুক্রবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ১০ ১৪২৭ ||  ০৭ সফর ১৪৪২

‘স্পোর্টসে নারীদের সবচেয়ে বড় বাধা ড্রেস-আপ’

ইয়াসিন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৬:৪৫, ১০ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
‘স্পোর্টসে নারীদের সবচেয়ে বড় বাধা ড্রেস-আপ’

অলংকরণ : সিজার

এসএ গেমসে ভারোত্তলনে স্বর্ণপদক জয়ের মঞ্চে দাড়িয়ে জাতীয় পতাকাকে তার স‌্যালুট ও অঝোরে কান্নার ছবি ছড়িয়ে গিয়েছিল দেশ থেকে দেশান্তরে। ২০১৬ এসএ গেমসের পর ২০১৯ সালেও তার গলায় উঠে শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার। বলা হচ্ছে মাবিয়া আক্তার সীমান্তর কথা।

‘গ্রেটেস্ট শো অব আর্থ’- অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মাবিয়া। মহারণের আগে প্রস্তুতিতে বাধ সাধলো মহামারি করোনা। শেষবার জিমে গিয়েছিলেন ১৭ মার্চ। প্রায় চার মাস হতে চলল কোনো কার্যক্রম নেই। দীর্ঘ সময় চার দেয়ালে কাটিয়ে তার উপলব্ধি, ক‌্যারিয়ার দুই বছর পিছিয়ে গিয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর শূন‌্য থেকে সব শুরু করতে হবে।

রাইজিংবিডি’র সাক্ষাৎকারে মাবিয়া আক্তার সীমান্ত আরো কথা বললেন নিজের সফর নিয়ে, কঠিন সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা, জানালেন নিজের লক্ষ‌্য, পরিকল্পনা, কষ্ট ও ক্ষোভের কথা। আজ পড়ুন প্রথম পর্ব। মুঠোফোনে তাঁর কথা শুনেছেন ইয়াসিন হাসান।  

রাইজিংবিডি: দীর্ঘ ক‌্যারিয়ারে এতোটা সময় অনুশীলন ছাড়া কাটিয়েছেন কখনো?

মাবিয়া আক্তার সীমান্ত: না, এতোটা সময় কখনোই বাইরে থাকা হয়নি। কোনো ইভেন্ট হলেও দুই বা তিনদিন আমরা অনুশীলন না করে থাকতাম। প্রায় চার মাস হচ্ছে। প্রকৃতির উপর আমাদের কোনো হাত নেই। আমার দশ বছরের ক‌্যারিয়ারে এতোটা সময় অনুশীলন ছাড়া কখনো কাটাইনি। এটা আমার জন‌্য অনেক বড় একটি ধাক্কা। আমি তো মনে করি আমার পারফরম‌্যান্স, ট্রেনিং একেবারে শূন‌্যে নেমেছে। আমাকে আবার শূন‌্য থেকে সব শুরু করতে হবে। ক‌্যারিয়ারে দুই বছর পিছিয়ে গেলাম।

রাইজিংবিডি: ধরুন আগামী সপ্তাহেই ফেরার সুযোগ হলো। আপনার মূল চ‌্যালেঞ্জ কী হবে তখন?

মাবিয়া আক্তার সীমান্ত: যদি কোনো গেমস থাকে তাহলে অনেক বড় চ‌্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। সর্বপ্রথম যে চ‌্যালেঞ্জ থাকবে, নিজেকে আবার জায়গামতো দাড় করানো। এটা সবচেয়ে বড় চ‌্যালেঞ্জ। ম‌্যাচ, প্রতিযোগিতা সবই চলবে। এটাই তো স্পোর্টস। কিন্তু সর্বপ্রথম নিজেকে আগের জায়গায় প্রমাণিত করত হবে। এটা কতদিন সময় লাগবে সেটা বলতে পারছি না। যতটা কম সময়ে ফেরা যায় ততটাই আমাদের জন‌্য ভালো।

রাইজিংবিডি: শুরুতেই কি অনেক ওজন নিয়ে কাজ করবেন নাকি ধীরে ধীরে ওজন বাড়াবেন?

মাবিয়া আক্তার সীমান্ত: আমরা শিক্ষানবিশ অবস্থায় যেভাবে শুরু করেছিলাম, একদম নতুন অবস্থায়…ওখান থেকেই আবার শুরু করতে হবে। সেভাবেই ধারাবাহিক এগিয়ে যেতে হবে। আগের মতো ওয়েট ক‌্যারি করা মোটেও সম্ভব না।

রাইজিংবিডি: ২০১৬ এসএ গেমসে আপনার স্বর্ণজয় এবং মঞ্চে জাতীয় সঙ্গীত চলার সময় আপনার কান্নার ছবি জাতীয় ছবিতে পরিণত হয়েছিল। ফেসবুক প্রোফাইলে আপনার স‌্যালুট দেওয়া ছবি, কভার ফোটোতে আপনি। গণমাধ‌্যমের শিরোনামে আপনি। সেই দিনগুলির কথা মনে আছে?

মাবিয়া আক্তার সীমান্ত: এসএ গেমসের আগেও আমার সাফল‌্য ছিল। এছাড়া অন‌্য প্রতিযোগীতায় আমার স্বর্ণপদকও ছিল। কিন্তু বড় মঞ্চে বাংলাদেশকে তুলে ধরা, নিজেকে পরিচিতি দেওয়া সবকিছু ২০১৬ এসএ গেমসে হয়েছে। এর আগে ওতো বড়ভাবে পরিচিতি পাইনি। এজন‌্য ওই দিনটির কথা অনেক মনে আছে। আমার জীবনের স্মরণীয় দিন হয়ে আছে। মানুষের ভালোবাসা সেদিনই বুঝেছিলাম। আমি কল্পনাও করতে পারিনি ভারত্তোলনের মতো ইভেন্টের প্রতি মানুষ এতোটা ভালোবাসা দেখাবেন। আমি তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞ।

রাইজিংবিডি: ২০১৬ এসএ গেমসের পর ২০১৯ এসএ গেমসেও একই পুরস্কার পেলেন। যদি দুই পদকের ভেতরে পার্থক‌্য খুঁজতে বলা হয় তাহলে কী বলবেন?

মাবিয়া আক্তার সীমান্ত: ২০১৬ এসএ গেমসকে আমি বেশি গুরুত্ব দেব। ওইটা আমাকে পরিচিতি দিয়েছে, মানুষ আমাকে চিনেছে। ২০১৯ সালের অর্জনকে আমি ফেলে দেব না। ২০১৯ সালে আমি নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছি যে, আমার স্বর্ণপদক অপ্রত‌্যাশিত কিছু ছিল না। হয়তো অনেকেই মনে করেছিল একবার ঝলক দেখিয়েছি, প্রত‌্যাশা মিটিয়েছি আর পারবে না। আমি দ্বিতীয়বার একই স্বর্ণপদক পেয়ে প্রমাণ করেছি ইচ্ছে থাকলে দ্বিতীয়বারও পারা যায়। আমি বলবো প্রথমবার পরিচিতির জন‌্য গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়বার দায়িত্ব এবং প্রমাণের জন‌্য। জীবনে চলতে হলে দুইটারই প্রয়োজন হয়। পরবর্তী আসরে যদি আবার স্বর্ণ জিতি তখন আমি বলতে পারবো আমি-ই সেরা।  

রাইজিংবিডি: খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে কিভাবে?

মাবিয়া আক্তার সীমান্ত: শুরুতে আমি জানতাম-ই না যে, খেলাধুলার জগতটা এত বিশাল। ভারোত্তোলন যে একটা খেলা আমার ধারণা ছিল না। হ্যান্ডবল, ভলিবল এসব খেলা নিয়েও আমার ধারণা ছিল না। আসলে আমার গণ্ডিটা খুব ছোট ছিল। আমি বাসার সামনে ছেলেদের মতো মার্বেল, ডাংগুলি এসব খেলে সময় পার করতাম। এই যে এত সব খেলা হচ্ছে টিভিতে, এসব দেখার সময় আমি তখন পেতাম না।

রাইজিংবিডি: আপনি যখন শুরু করেছেন তখন ক্রিকেট, ফুটবল রমরমা। সেসব না করে ভারত্তোলন কেন?

মাবিয়া আক্তার সীমান্ত: আসলে খেলাধুলা আমার পছন্দই ছিল না। আমার মামা গোলাম ফারুক আহমেদ সরকার ছিলেন বক্সার। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ খেলেছেন। উনি আমাকে খেলাধুলার সঙ্গে পরিচিত করেন। উনি আমাকে একদিন ভারোত্তোলনের জিমনেসিয়ামে নিয়ে যান। সেদিন আমাকে খেলাটা দেখতে বললেন। আমিও সেদিন খেলাটা দেখে চলে আসি। পরে তিনি আমাকে বলেন, ‘তুমি এখন থেকে ওইখানে নিয়মিত যাবে। আর গিয়ে এই খেলাটা শিখবে।’

রাইজিংবিডি: এরপর…

মাবিয়া আক্তার সীমান্ত: শুরুতে আমার কাছে এই খেলাটা অনেক বিরক্তিকর লাগতে শুরু করে। আমি যখন ওয়েট লিফটিং করতাম। এটা উপরের থেকে ফেললে, নিচে পড়ে অনেক জোরে আওয়াজ করতো। এটা আমার কাছে খুব বিরক্ত লাগতো। আমি তখন ভেবেছিলাম মামাকে বলবো, আমি এটা শিখতে চাই না। তবে উনাকে ভয় পেতাম। তাই সামনাসামনি কখনো বলতে পারিনি। মামার ভয়ে, নিজের সঙ্গে জোর জবরদস্তি করে এটা শিখে ফেলি।

রাইজিংবিডি: এভাবেই খুব সহজে পথ চলা শুরু হয়ে যায় নাকি কঠিন সময় কাটাতে হয়েছিল?

মাবিয়া আক্তার সীমান্ত: এখন যেভাবে বলি, ক্যারিয়ারটা অনেক স্বাভাবিক ছিল। আসলে বিষয়টা তেমন ছিল না। সে সময় আমার যারা সিনিয়র ছিলেন, তারা অনেক জনপ্রিয় ছিলেন। অনেক ভালো করছিলেন। কিন্তু তারা আমাকে কেন জানি মেনে নিতে পারতেন না। ওই সময় আমি সিনিয়রদের কাছ থেকে যে আচরণের শিকার হয়েছি, আমি কখনো আশা করিনি। আমি জানি না কেন, কিন্তু আমি শিকার হয়েছি। তবে আমি বলবো, এক্ষেত্রে আমি অনেক জেদী ছিলাম।

রাইজিংবিডি: চলার পথে আর কোনো বড় বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে?

মাবিয়া আক্তার সীমান্ত: নারীদের জন্য স্পোর্টসে যদি কোনো বড় বাধার কথা বলেন, তবে সেটি হলো ড্রেস আপ। ছেলেদের মতো মেয়েরাও একই রকম ড্রেস পরে সবার সামনে দাঁড়াবে; এটা একটা বাধা। এটা এখনো আমরা মানতে পারিনি, আর মানতে পারবো কি না জানিও না! এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। এছাড়া সমাজ, পরিবার তো থাকেই। আমাদের প্রতিনিয়ত শুনতে হয়, কেন মেয়েরা ঘর থেকে বের হবে, এভাবে খেলবে?

রাইজিংবিডি: যদি কেউ ভারত্তোলনে আসতে চায়, তাহলে আপনার পরামর্শ কী হবে?

মাবিয়া আক্তার সীমান্ত: ভারোত্তোলনে যদি কেউ আসতে চান, তাহলে তাকে অবশ্যই এই খেলাটাকে ভালোবেসে আসতে হবে। নিজেকে নিজে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। তাঁর নিজের মধ্যে এই তাড়না থাকতে হবে যে, আমি ভারোত্তোলনেই থাকবো। যারা আছে তারা চলে যাবে, কিংবা অনেকে ঝরে পড়বে তবে আমি থাকবো। আর এমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে যদি কেউ আসেন, আমি মনে করি সে সফল হবে। আমি তো এভাবেই হয়েছি।

 

ঢাকা/ইয়াসিন

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়