RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৬ জানুয়ারি ২০২১ ||  মাঘ ১২ ১৪২৭ ||  ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪২

‘সারাবিশ্বে কারিগর থেকে উৎপাদিত পণ্য পৌঁছে দিতে চাই’ 

মেসবাহ য়াযাদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:৪৯, ৪ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১১:০২, ৪ নভেম্বর ২০২০
‘সারাবিশ্বে কারিগর থেকে উৎপাদিত পণ্য পৌঁছে দিতে চাই’ 

তানিয়া ওয়াহাব। ঢাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা। গ্রামের বাড়ি ফেনীতে। শহীদ আনোয়ার গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি এবং এইচএসসি, লেদার টেকনোলজি থেকে বিএসসি (সম্মান) এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমডিএস করেন। পরে বিআইএম থেকে ‘সোশ্যাল কমপ্লাইনস্ অ্যান্ড ডিপ্লোমা’ করেন। লেদার টেকনোলজিতে ফাইনাল ইয়ারে পড়ার সময় প্রতিষ্ঠা করেন ‘কারিগর’। কয়েক বছর পর নিজস্ব একটা ব্র্যান্ড তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। প্রস্তুতি নিতে সময় লেগে যায় ১১ বছর।  এরপর কারিগর থেকে তৈরি হয় নতুন ব্র্যান্ড ‘ট্যান’। সম্প্রতি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন রাইজিংবিডির সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মেসবাহ য়াযাদ।

রাইজিংবিডি: কারিগর আর ট্যান-এর শুরুটা কীভাবে?
তানিয়া ওয়াহাব:
লেদার টেকনোলজিতে পড়াশোনার শেষদিকে ২০০৫ সালে কারিগর প্রতিষ্ঠা করি। প্রাথমিকভাবে চামড়াজাত বিভিন্ন পণ্য তৈরি এবং বাজারজাত শুরু করি। এর মধ্যে ছিল- বেল্ট, মানিব্যাগ, লেডিস ব্যাগ।  পরে এক সময় মনে হয়, একটা নির্দিষ্ট নামে (ব্র্যান্ড) পণ্য বাজারজাত না করলে কোম্পানির ইমেজ দাঁড়াবে না। সেই ভাবনার ফসল হিসেবে কারিগর থেকে উৎপাদিত পণ্য ট্যান নামে বাজারজাত শুরু করি ২০১৬ সালে। ততদিনে কারিগর-এর পণ্যের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয় দেশে-বিদেশের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজগুলোতে। এভাবেই কারিগর আর ট্যান-এর বেড়ে ওঠা, সফলতা, ব্যর্থতা, সীমাবদ্ধতা আর স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলা।

রাইজিংবিডি: কারিগর ও ট্যান-এর বর্তমান অবস্থা কী?
তানিয়া ওয়াহাব:
সবার সমর্থন আর ভালোবাসায় বেশ ব্যস্ততায় দিন কাটছে আমাদের। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজের সঙ্গে কাজ করছি। দেশের নাম করা অনেক প্রতিষ্ঠানে, তাদের চাহিদা অনুযায়ী করপোরেট গিফট সরবরাহ করছি।  কে ক্র্যাফটের তিনটি শোরুমে আলাদা করে আমাদের ট্যান ব্র্যান্ডের পণ্য বিক্রি হচ্ছে। হাজারীবাগে একটা শোরুম আছে। 

রাইজিংবিডি: পণ্য তৈরিতে কী ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়?
তানিয়া ওয়াহাব:
চামড়া দেশি বাজারে পর্যাপ্ত পাই। কেবল চামড়া হলেতো হয় না। পণ্য বানানোর জন্য চামড়ার সঙ্গে  বিভিন্ন ধরনের মেটেরিয়াল প্রয়োজন পড়ে। আমরা প্রায়ই সেসব মেটেরিয়াল সংকটে পড়ি। এসব মেটেরিয়াল বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হয়। এর বেশিরভাগই আসে চায়না থেকে। আমদানিজনিত বিভিন্ন সমস্যার কারণে- প্রয়োজনমত পাই না।  পেলেও অনেক সময় বেশি দাম দিয়ে কিনতে হয়। আমাদের উপায়ও থাকে না। সময় মতো  করপোরেটদের চাহিদামতো পণ্য সরবরাহ করতে হয়। কস্টিং অনেক বেড়ে যায়। 

রাইজিংবিডি: নিয়মিত আপনাদের কারখানায় কতজন কর্মী কাজ করেন?
তানিয়া ওয়াহাব:
করোনাকালীন কাজের চাপ একটু কম। বর্তমানে নিয়মিত কাজ করছেন ৪০ জন। কাজের চাপের ওপর নির্ভর করে এ সংখ্যা দুই থেকে তিনশও হয়।

রাইজিংবিডি: বর্তমানে ট্যান ব্র্যান্ডের কী কী পণ্য বানাচ্ছেন?
তানিয়া ওয়াহাব
: করপোরেট গিফট, মানিব্যাগ, কম্পিউটার ব্যাগ, অফিসিয়াল ব্যাগ, ফ্যাশনেবল লেডিস ব্যাগ, বেল্ট, ডায়েরি, জ্যাকেট, পেন্ট নিয়মিত করছি। এছাড়া করপোরেট হাউজের চাহিদা অনুযায়ী চামড়াজাত যেকোনো পণ্য আমরা তৈরি করে থাকি।

রাইজিংবিডি: বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজ বা খোলা বাজারে চামড়াজাত পণ্যের মানের সঙ্গে মিলিয়ে দাম চড়া বলে ক্রেতারা অনেক সময় অভিযোগ করেন। আপনাদের তৈরি পণ্যের মান এবং দাম কী রকম? আপনাদের পণ্যের ক্রেতা কারা?
তানিয়া ওয়াহাব:
এটা ঠিক যে, আপনি যদি ভালোমানের চামড়া দিয়ে পণ্য তৈরি করেন- তাহলে দাম একটু বেশিই পড়বে। অনেকে আবার ভালো মানের পণ্য না দিয়ে, ভালো মানের পণ্যের সমতূল্য দাম নেন। এটা ব্যবসায়িক অসততা। আমরা পণ্যের কোয়ালিটির ক্ষেত্রে কোনোভাবেই কম্প্রমাইজ করি না। সত্যি বলতে কি- আমাদের পণ্যের ক্রেতাদের মধ্যে বেশিরভাগই উচ্চ মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্ত।

রাইজিংবিডি: কোন কোন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছেন?
তানিয়া ওয়াহাব:
দেশি অনেকগুলো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমরা কাজ করছি। এর মধ‌্যে রয়েছে- বাটা, এপেক্স, আড়ং, কে ক্রাফট, বাংলাদেশ আমেরিকান ট্যোবাকো, গ্রামীণফোন, ওরিয়ন গ্রুপ, আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ, জর্ডান অ্যাম্বাসি, বাহরাইন অ্যাম্বাসি, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বিশ্বাস বিল্ডার্স, হেলথ কেয়ার ফার্মা, ইবনে সিনা ফার্মাসহ অনেক কোম্পানি।

রাইজিংবিডি: কাজ করতে গিয়ে কখনো বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন?
তানিয়া ওয়াহাব:
প্রথম প্রথম অনেকবার হয়েছে। পণ্য নেওয়ার পর পেমেন্ট নিয়ে ঘোরাতো কেউ কেউ।  চেক বাউন্স হতো।  আরও অনেক অভিজ্ঞতা আছে।

রাইজিংবিডি: সফলতা অর্জনের গল্প যদি বলেন-
তানিয়া ওয়াহাব
: ২০০৮ সালে প্রথম এসএমই ফাউন্ডেশন অ্যাওয়ার্ড, ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট প্রয়াত জিল্লুর রহমানের হাত থেকে বেস্ট এসএমই নারী উদ্যোক্তা অ্যাওয়ার্ড, ২০১৪ সালে ডিএইচএল- ডেইলি স্টার ওমেন ইন বিজনেস অ্যাওয়ার্ড, ২০১৫ সালে জাতীয় মহিলা পরিষদের সেরা নারী উদ্যোক্তা অ্যাওয়ার্ড, ২০১৮ সালে সিটি-আলো-কালার্স ম্যাগাজিন অ্যাওয়ার্ডসহ বেশ কয়েকটি অ্যাওয়ার্ড পাই। একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হয়ে ২০১১ সালে ভারত এবং ২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণের সুযোগ পাই। ২০১১ সালে আমেরিকা সরকারের আমন্ত্রণে প্রথমবার সেখানে যাই। হোয়াইট হাউজ ভিজিট করার বিরল সুযোগ পাই। ২০১৮ সালে যাই দ্বিতীয়বার। সে সময় ছয়টা এস্টেট ভিজিট করি। ২০১৬ সালে পাই অস্ট্রেলিয়ান সরকারের ফেলোশিপ এবং ২০১৮ সালে সরকারের আমন্ত্রণে অস্ট্রেলিয়া যাই। এ ছাড়াও সরকারি আমন্ত্রণে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছি। এর মধ্যে রয়েছ- জাপান, ইটালি, জার্মানি, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, দুবাই, চীন, থাইল্যান্ড ইত্যাদি।

রাইজিংবিডি: কোন কোন দেশে আপনার পণ্য রপ্তানি হয়?
তানিয়া ওয়াহাব:
কয়েকটি দেশে আমাদের উৎপাদিত পণ্য যায়। এটাকে ঠিক রপ্তানি বলতে চাই না। যেমন, জাপানের একটা কোম্পানি আমাদের কাছ থেকে পণ্য কিনে নেয়। সে পণ্যের মধ্যে আমাদের ট্যান-এর লোগো থাকে না। চুক্তি অনুযায়ী সেই কোম্পানির লোগো খোদাই করে দেই আমরা। তবে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে আমরা যৌথভাবে কাজ শুরু করেছি। ওখানকার শোরুমে আমাদের পণ্য পাওয়া যাবে। যার নাম হবে- ট্যান অস্ট্রেলিয়া (TAN AUSTRALIA)। ইটালি, আমেরিকা, ইংল্যান্ড আর কাতারেও আমাদের পণ্য গিফট আইটেম হিসেবে যায়।  আশার কথা হচ্ছে, গত কয়েক বছর ধরে অনলাইনের মাধ্যমে আমাদের উৎপাদিত প্রচুর পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।  

রাইজিংবিডি: নতুন উদ্যোক্তারা এই পেশায় আসতে চাইলে, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ-
তানিয়া ওয়াহাব:
আপনি কোন সেক্টরে কাজ করতে চান, প্রথমে সেটা বাছাই করে নেবেন। মনে করুন, আপনি চামড়াজাত গিফট আইটেম নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। তাহলে আপনাকে যা করতে হবে- জেনে নিতে হবে, এই সেক্টরে আর কারা কাজ করছেন। কী কী কাজ করছেন। অনলাইনে কে, কীভাবে কাজ করছেন। বিশ্ববাজারের হাল নাগাদ খোঁজ খবর রাখতে হবে। সর্বোপরি নিজের পণ্যের জন্য স্বতন্ত্রভাবে একটা ব্র্যান্ড তৈরি করা এবং তার ব্র্যান্ডিং করতে হবে।

রাইজিংবিডি: ট্যান থেকে নতুন কিছু কী আনার ভাবনা আছে?
তানিয়া ওয়াহাব:
ভাবনাতো অনেক কিছু আছে। তবে ইতোমধ্যে আমরা ট্যান ব্র্যাণ্ড থেকে এমন একটা কাজ করছি, যা বিশ্বে আর কেউ করেনি এখন পর্যন্ত। আমরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের উপযোগী করে নারীদের জন্য ‘টোটাল একটা সেট’ মিলিয়ে দিচ্ছি। একটা বুঝিয়ে বলি। একজন নারী চাইলে তার পছন্দমত লেডিস ব্যাগ, গলার হার, টিকলি, ব্লাউজ, জুতা, ব্রেসলেট, কানের দুল, নূপুর, আংটি- এসব আইটেম একই রঙ মিলিয়ে নিতে পারবেন আমাদের কাছ থেকে।

রাইজিংবিডি: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
তানিয়া ওয়াহাব:
ট্যান ব্র্যান্ড নিয়ে আরও ব্যাপক পরিসরে, ভালোভাবে, গুছিয়ে কাজ করতে চাই। একটা দেশের সঙ্গে (নাম বলতে চাচ্ছি না) জয়েন্ট ভ্যাঞ্চারে কাজের কথাবার্তা অনেক দূর এগিয়েছে। ওটা হয়ে গেলে ঢাকার আশেপাশে বড় একটা ফ্যাক্টরি করবো। সেখানে কয়েকশ মানুষ রাতদিন কাজ করবে। বিশ্বময় মানুষের হাতে পৌঁছে যাবে কারিগর থেকে উৎপাদিত পণ্য ট্যান। এই স্বপ্নটা খুব দেখি।

রাইজিংবিডি: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
তানিয়া ওয়াহাব:
আপনাকেও ধন্যবাদ। রাইজিংবিডির পাঠকদের জন্যও শুভেচ্ছা আর শুভকামনা।  

মেসবাহ/সাইফ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়