Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     শুক্রবার   ২৯ অক্টোবর ২০২১ ||  কার্তিক ১৩ ১৪২৮ ||  ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

Risingbd Online Bangla News Portal

‘কর্নেল তাহেরকে কাঁধে করে নিরাপদে সরিয়ে এনেছিলাম’

ইমাম মেহেদী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:৪৯, ৮ ডিসেম্বর ২০২০   আপডেট: ১১:২২, ৮ ডিসেম্বর ২০২০
‘কর্নেল তাহেরকে কাঁধে করে নিরাপদে সরিয়ে এনেছিলাম’

বীরপ্রতীক ক্যাপ্টেন এজাজুল হক খান। জন্ম ১৯৪৭ সালের ১০ অক্টোবর কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার গোয়ালগ্রামে। একাত্তরে সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে ঝাঁপিয়ে পড়েন দেশের মুক্তি সংগ্রামে। কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে তিনি একই সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। অদম্য সাহস এবং সেক্টর কমান্ডারকে বাঁচানোর জন্য স্বাধীনতার পর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এজাজুল হক খানকে ‘বীরপ্রতীক’ উপাধীতে ভূষিত করে। সেই আগুনঝরা দিনের কথা জানতে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ইমাম মেহেদী।

ইমাম মেহেদী: আপনার শৈশব কেটেছে গ্রামে। সেখান থেকে আপনি ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন। সত্তর সালের নির্বাচনের পর সেনাবাহিনীর ভেতরের অবস্থা কেমন ছিল?

এজাজুল হক: আমরা যারা বাঙালি ছিলাম, তারা বুঝে গিয়েছিলাম শেখ মুজিব দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন। কারণ নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। এবং এটাও বিশ্বাস করতাম যে, এবার আমরা আলাদা হয়ে যাবো। কারণ পাকিস্তানি অফিসার এবং সৈনিকদের মনোভাব তো আমাদের মাঝে আলোচনা হতো, আমরা বুঝতাম। তারা আমাদের ভালো চোখে দেখতো না। আর নির্বাচনে জয়ের পর আমরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলাম। আমরা শেখ মুজিবকেই প্রধানমন্ত্রী মনে করতাম।

ইমাম মেহেদী: একাত্তরে আপনি কীভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন?

এজাজুল হক: এখানে বলে রাখি। আমি তখন ঢাকায় কর্মরত ছিলাম। ১০ জানুয়ারি আমি ছুটি নিলাম। ছুটি কাটিয়ে আবার চাকরিতে যোগ দেই। এরই মধ্যে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন। তখন দেশের পরিস্থিতি উত্তাল। আমরা যারা বাঙালি তারাও ভেতরে ভেতরে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু খুব কৌশলে ঊর্ধ্বতন পাকিস্তানি অফিসাররা আমাদের বাঙালিদের ছুটি দেওয়া শুরু করলো। ওই সময় বাঙালি অফিসারদের সরিয়ে পাকিস্তানি অফিসারদের পদায়ন কার হচ্ছিলো। ২৫ মার্চ দুপুরের আগেই আমাকে গ্রেপ্তার করে নিরস্ত্র করা হলো। আমার মতো যারা বাঙালি অফিসার ছিলেন তাদেরও একই অবস্থা হলো। ওই সময় আমাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছিল। আমাদের ভয় দেখানো হচ্ছিল। পরিস্থিতি দেখেশুনে মনে হলো- বিদ্রোহ করার অভিযোগে আমাদের গুলি করে হত্যা করা হতে পারে। ওই রাতে আমাকে যারা গ্রেপ্তার করেছিল তারাই রাতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে। আমার কোম্পানির অফিসাররাই শেখ সাহেবকে এ্যারেস্ট করে। রাত প্রায় একটার সময় কর্নেল জেড এ খানের নেতৃত্বে পাকিস্তানি  সেনাবাহিনীর একটা দল ৩২ নম্বর ধানমন্ডিতে পৌঁছে গিয়েছিল।

আমি ভাবলাম আমাকে হয়তো বাঁচিয়ে রাখবে না। কারণ আমিও তাদের হাতে বন্দি। তারপর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবো না শর্তে  ১২ জুলাই ঢাকায় শেরেবাংলা নগরে তিন কমান্ডো বাহিনীতে যোগদান করি। পরে আমি খুব কৌশলে ৩০ জুলাই ছুটি নিয়ে ঢাকা ত্যাগ করি এবং ভারতের শিকারপুর চলে যাই। সেখানে গিয়ে কোম্পানি কমান্ডার ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীরের কাছে রিপোর্ট করি। তারপর সেখান থেকে আমাকে একটা টিম দেওয়া হয় অস্ত্রসহ বাংলাদেশে প্রবেশ করার জন্য। যেহেতু আমি ৬৫ সাল থেকেই সেনাবাহিনীর চাকরি করি। তখন আমি সিনিয়র এবং পুরো অস্ত্র চালনা এবং প্রশিক্ষণে পারদর্শী। তারপর দলবল নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করি।

ইমাম মেহেদী: এরপর কী হলো?

এজাজুল হক: একাত্তরের আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে নদীর ওপাড়ে রামনগরে আমার নেতৃত্বে একটা যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে বুহ লোক নিহত, আহত হয়। আল্লাহর রহমতে সাকসেসফুল অপারেশন ছিল ওটা। কুষ্টিয়ার মধ্যে অন্যতম বড় একটা যুদ্ধ ছিল, কিন্তু সেই যুদ্ধের সেভাবে রেকর্ড নেই। এই যুদ্ধের রিপোর্ট ক্যাম্প কমান্ডারের কাছে তখন পেশ করা হয়নি। যে কারণে রামনগর যুদ্ধের রেকর্ড নাই। ওই যুদ্ধে পরাজিত হয়ে আক্রোশে গোয়ালগ্রাম আক্রমণ করে পাকসেনারা।

মুক্তিযোদ্ধারা গোয়ালগ্রামে আশ্রয় নিয়েছিল। রাজাকাররা পাকসেনাদের কাছে সেই সংবাদ পৌঁছে দিয়েছিল। পাকসেনারা আসছে জানতে পেরে গ্রামের মানুষ যে যার মতো পালাতে চেষ্টা করে প্রাণ বাঁচাতে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। একে রাতের অন্ধকার, তার ওপর চারদিকে পানি। ফলে কেউ পালিয়ে যেতে পারেনি। পাকসেনারা জেনেশুনেই প্রস্তুতি নিয়ে আক্রমণ করেছিল যাতে গ্রাম থেকে কেউ বের হয়ে যেতে না পারে। অনেক লোক মারা গিয়েছিল। 

এরপর আমি ভারত চলে যাই। ভারত থেকে কমান্ডো বাহিনীর সৈনিক হিসেবে আমাকে পোস্টিং করে কর্নেল তাহেরের নিকট ১১ নম্বর সেক্টরে। কারণ তাহেরের কমান্ডো বাহিনী ছিল। তারপর ময়মনসিংহের কামালপুর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। এই যুদ্ধে কর্নেল তাহের পাকিস্তানি বাহিনীর বোমার আঘাতে গুরুতর আহত হয়। তিনি পায়ে আঘাত পান। তাকে নিরাপদে রেখে আমি আমার গ্রুপ নিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করি। আমি কাঁধে করে সেদিন সেক্টর কমান্ডারকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলাম।  

ইমাম মেহেদী: দেশ স্বাধীন হলে কী করলেন?

এজাজুল হক: ১১ জানুয়ারি গ্রামে ফিরে আসি। আগেই লোকমুখে জানতে পেরেছিলাম ৬ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও স্বাধীনতাবিরোধীরা আমার গ্রামে ফরাজী বাড়িতে আক্রমণ করেছে। সেখানে নারী, পুরুষ, শিশু, মক্তিযোদ্ধাসহ ১৬ জনকে তারা হত্যা করেছে। পরে পুনরায় সেনাবাহিনীতে যুক্ত হই। আমি দেশের জন্য কী করেছি তার চেয়ে বড় কথা, আমরা একটি বাংলাদেশ পেয়েছি, পরিচয় পেয়েছি। আগামীর বাংলাদেশ বিশ্বের মাঝে একটি সুন্দর দেশ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে সেটি দেখতে চাই।

ঢাকা/তারা

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়