Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৮ অক্টোবর ২০২১ ||  কার্তিক ১২ ১৪২৮ ||  ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

Risingbd Online Bangla News Portal

মৌলবাদের সঙ্গে আপোসের পরিণতি ভয়াবহ হবে: অনল রায়হান

আমিনুল ইসলাম শান্ত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:২৫, ১৪ ডিসেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৭:৩৬, ১৫ ডিসেম্বর ২০২০
মৌলবাদের সঙ্গে আপোসের পরিণতি ভয়াবহ হবে: অনল রায়হান

শহীদ বুদ্ধিজীবী জহির রায়হান। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক, ঔপন্যাসিক, গল্পকার। স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হিসেবে কলম এবং চলচ্চিত্রকে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু পরম কাঙ্ক্ষিত সেই স্বাধীনতা উদযাপন করতে পারেননি। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারির পর তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। ব্যক্তিগত জীবনে অভিনেত্রী সুমিতা দেবীর সঙ্গে প্রথম বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন জহির রায়হান। এ দম্পতির মেজ পুত্র অনল রায়হান। বাবার কর্ম ও চলমান রাজনীতি নিয়ে বুদ্ধিজীবী দিবসে রাইজিংবিডির সঙ্গে কথা বলেছেন এই শহীদ-সন্তান।  

রাইজিংবিডি: বিজয়ের মাসে কেমন বাংলাদেশ দেখছেন?

অনল রায়হান: প্রিয় স্বদেশভূমিকে ভালো দেখছি না! যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সেখান থেকে দেশ অনেক সরে এসেছে। এটি মোটেও কাঙ্ক্ষিত নয়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার বর্তমানে ক্ষমতায়। যুদ্ধাপরাধীদের বড় ধরনের বিচার হয়েছে। এখনো কিছু বাকি আছে। চৌধুরী মঈনুদ্দীন লন্ডনে আছেন। তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তির আওতায় আনা যায়নি। তবে প্রমাণ হয়েছে যুদ্ধাপরাধ ছিল। জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ যুদ্ধাপরাধ করেছে তা প্রমাণিত হয়েছে। আর এই বড় কাজটি সম্পন্ন হয়েছে বর্তমান সরকারের আমলে।

একইসঙ্গে দেখছি, ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ যেভাবে সাম্প্রদায়িকতার বীজ ছড়িয়েছিল, আজকের বাংলাদেশ তার চেয়েও ভয়াবহ। মৌলবাদী ভাবনার মানুষ বেড়েছে; মধ্য-উচ্চবিত্ত, শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে সেই ভাবনা ঢুকেছে। এটা ষাটের দশকে ছিল না। ষাটের দশকের মধ্যবিত্ত শ্রেণি আজকের তুলনায় অনেক বেশি প্রগতিশীল ছিল। সুফিয়া কামাল, জাহানারা ইমাম পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। কিন্তু তাঁরা সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। বাংলাদেশে আজকের ইসলাম কিন্তু সেই জায়গায় নেই। এটা ছড়িয়ে গেছে শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে- এটাই ভয়ের ব্যাপার! এসব দিক থেকে বিজয়ের মাসটা উদযাপন ছাড়া আর কিছু নয়। কারণ ৩০ লাখ শহীদের চেতনা বাস্তবায়নের জায়গা থেকে আমরা বহু দূর সরে এসেছি।

রাইজিংবিডি: ভাস্কর্য নিয়ে বিভিন্ন মত শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যেই বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হলো। আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন?

অনল রায়হান: বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। যারা এমন ঘটনা দেখে আঁৎকে উঠছেন কিংবা অস্বাভাবিক মনে করছেন, তারা হয় বাংলাদেশের মানুষের প্রবণতা ঠিকমতো ধরতে পারছেন না। অথবা তারা সুবিধাবাদী। কারণ কওমি মাদ্রাসা বা কওমির বাইরের মাদ্রাসার যে সংস্কৃতি, ওয়াজ মাহফিলকেন্দ্রিক যে সংস্কৃতি তার প্রসার আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগে ছিল গ্রাম, মফস্বল, শহর কিংবা বন্দরনগরে। মেট্রোপলিটন সিটি, সোশ্যাল মিডিয়ায় ওয়াজ মাহফিলের প্রচার এভাবে ছিল না। এগুলো কি আমরা দেখছি না? আমরা কি কানা-বোবা? মাদ্রাসা শিক্ষার শুরুতে সাম্প্রদায়িকতার বীজ ছড়ানোর কথা বলা হচ্ছে! দেশের মানুষ ভারতের বিষয়ে নেগেটিভ সাইকোলজি প্র্যাকটিস করছে- এগুলো আগে ছিল না। আর এটা তৈরি করেছে জামায়াতের মতো সংগঠনগুলো। ১৯৭৫ সালের পর ধীরে ধীরে সমাজের ভেতরে এসব ঢোকানো হয়েছে। এখন হিন্দুত্ব মানেই হচ্ছে মূর্তি। আর মূর্তি মানেই খারাপ। সেখান থেকেই ভাঙা হচ্ছে ভাস্কর্য।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙা মানে— সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতায় আঘাত করা। ভাস্কর্য ইসলামে নিষেধ— এজন্য ভাস্কর্য ভাঙা হচ্ছে এ বিষয় স্বীকার করছি না। বরং যারা এটা করছেন তারা উদারপন্থী ইসলামের অনুসারী নন। আর এই জায়গাটা বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। এরা সেই গ্রুপ যারা পাকিস্তানপন্থী, ১৯৭১ সালে রাজাকার ছিল। এরাই তারা, যারা জাতির পিতার ভাস্কর্য ভেঙে প্রমাণ করতে চাচ্ছে ইসলামে ভাস্কর্য নিষেধ। আসল কথা হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে মুক্তিযুদ্ধের মূলে কুঠারাঘাত করেছে তারা। বাংলাদেশে উগ্রপন্থী ইসলাম কোন পর্যায়ে গেছে তা যদি এখনো দেশের নাগরিক হয়ে কেউ উপলব্ধি করতে না পারেন, তবে বলবো, হয় তার বোঝার মতো জ্ঞান নেই, না হলে তিনি সুবিধাবাদী।

রাইজিংবিডি: এর আগে লালনের ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে। দাবির মুখে সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আপনি কি মনে করেন, এই ঘটনাগুলো থেকেই তারা সাহসী হয়ে উঠেছে?

অনল রায়হান: এসবের ধারাবাহিকতায় আজকে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসাম্প্রদায়িক মানুষ। ১৯৯৬ সালে তিনি সরকার প্রধান হওয়ার পর কিন্তু যুদ্ধাপরাধের বিচারে হাত দেননি। কারণ তিনি জানতেন ওই সময়ে এত বড় কাজে হাত দেওয়া যাবে না। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পরে তিনি এ কাজে হাত দেন। কারণ তিনি আরো শক্তি সঞ্চয় করে এসেছিলেন। সত্যি কথা হলো আওয়ামী লীগের মধ্যে পাকিস্তানপন্থী, জামায়াতপন্থী, শিবির করা লোকজন ঢুকে গেছে। আবার অনেক মানুষ আছেন তারা কোনো দল করেন না। কিন্তু মানুষ হিসেবে সাম্প্রদায়িক। এরাও আওয়ামী লীগে ঢুকেছেন। অনেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাগিরি করে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, তাজউদ্দীনের আদর্শ, আমার বাবার (জহির রায়হান) আদর্শ কিংবা রুমি, বদি, আজাদের মতো তরুণ মুক্তিযোদ্ধার যে ত্যাগ তার সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক নেই। তাজউদ্দীন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস কীভাবে প্রবাসী সরকারকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন? জহির রায়হান, আলতাফ মাহমুদ,  জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মতো বুদ্ধিজীবীরা ১৯৭১ সালে কী অবদান রেখেছেন? রুমি-আজাদ-বদির মতো তরুণ গেরিলা ফাইটাররা কীভাবে দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন তারা অনেকেই বিষয়গুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করে না। সেই সময়ের সঙ্গে এদের কোনো আদর্শিক সংযোগ নেই। এদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চার স্তম্ভের কোনো সম্পর্ক নেই। এদের অনেকেই এখন যুবলীগ-ছাত্রলীগের নেতা। এদের সঙ্গে বিএনপির নেতাদের আদর্শগত কোনো পার্থক্য নেই। ২৬ মার্চ, ১৪ ও ১৬ ডিসেম্বর এই নেতারা মুজিব কোট পরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলেন। আমি বিশ্বাস করি না, তারা এই চেতনা হৃদয়ে লালন করেন। স্বাভাবিকভাবেই এই মানসিকতার নেতারা সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে ভাস্কর্য সরানোকে সমর্থন করবেন।

দ্বিতীয়ত রয়েছে আন্তর্জাতিক চাপ। এটা তো আমি আপনি অস্বীকার করতে পারবো না। মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকার সিনেট, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের চাপ তো রয়েছেই! আপোস যদি চলতে থাকে তাহলে এটা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যদি কিছু হয়, তবে আর কোনো প্ল্যাটফর্ম দেশে থাকবে না। ষাট-সত্তরের দশকে বাম রাজনীতির একটি বড় প্ল্যাটফর্ম ছিল। তারাও এখন নেই। তাদের কোনো কার্যক্রম নেই। একজন প্রগতিশীল মানুষ হিসেবে এর বাইরে আমি কোথায় দাঁড়াব? বিএনপি, জাতীয় পার্টির প্রশ্নই আসে না। একমাত্র প্ল্যাটফর্ম আওয়ামী লীগ, কিন্তু সেটাও সুবিধাবাদীরা ঘিরে রেখেছে।  

রাইজিংবিডি: এর আগে বলেছিলেন, জহির রায়হানের লেখা ‘তৃষ্ণা’ গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র বানাবেন। কাজ কতটুকু হলো?

অনল রায়হান: এখনো নির্মাণ কাজ শুরু করতে পারিনি। কারণ এর মধ্যে চাকরির প্রেসারে ছিলাম। চলিত বছরের জুন-জুলাই মাসে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু কোভিড-১৯ এর কারণে শুটিং শুরু করতে পারিনি। গল্পের প্রয়োজনে আমার বর্ষাকাল লাগবে। আশা করছি, আগামী বছর জুন থেকে আগস্টের মধ্যে শুটিং শুরু করতে পারব। আমার ধারণা, ওই সময়ে করোনা পরিস্থিতি অনেক ভালো হবে।

ঢাকা/তারা

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়