ঢাকা     মঙ্গলবার   ০৫ জুলাই ২০২২ ||  আষাঢ় ২১ ১৪২৯ ||  ০৫ জিলহজ ১৪৪৩

ভ্রমণপিপাসু নারীদের অনুপ্রেরণা মারজীয়া

সাইফ বরকতুল্লাহ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:৩৮, ১৮ নভেম্বর ২০২১   আপডেট: ০৯:৪৭, ১৮ নভেম্বর ২০২১
ভ্রমণপিপাসু নারীদের অনুপ্রেরণা মারজীয়া

লেডি ট্রাভেলারস এর ব্যবস্থাপনায় ভুটান ভ্রমণে নারীরা। ছবি:এলটিবি

মারজীয়া মেহজাবীন। জন্ম ও বেড়ে ওঠা নারায়ণগঞ্জে। সিদ্ধিরগঞ্জ রেবতী মোহন পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেছেন। ২০১৫ সালে শান্ত–মারিয়াম ইউনিভার্সিটি থেকে ফ্যাশন ডিজাইনে স্নাতক হয়েছেন। তিনি ভ্রমণপিপাসু নারীদের নিরাপদে, স্বাচ্ছন্দ্যে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরিয়ে আনার সুযোগ করে দিয়েছেন। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেছেন নারী ভ্রমণপিপাসুদের সংস্থা লেডি ট্রাভেলারস বাংলাদেশ (এলটিবি)। এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকও তিনি। এলটিবি চার বছরে ৩০০টি ট্যুর পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে ৩০টি ট্যুর ছিল দেশের বাইরে। এসব বিষয় নিয়ে সম্প্রতি কথা হয় তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাইফ বরকতুল্লাহ। 

সাইফ: ভ্রমণ নিয়ে কাজ করার পেছনের গল্পটা যদি বলেন-
মারজীয়া মেহজাবীন:
আমার নিজের প্রয়োজন থেকেই ভ্রমণ নিয়ে কাজ করেছি। আমি নিজেই উপলব্ধি করি, এমন কিছু আমাদের দেশে সত্যিই প্রয়োজন। আমার মনে হয় আমি জন্ম থেকেই ভ্রমণপ্রেমী। ছোটবেলার স্মৃতিতেও জমা আছে প্রচুর ঘুরে বেড়ানোর বিষয়। বড় হয়ে দেখি, ঘুরে বেড়ানো এতটা সহজ নয়, বরং খুবই কঠিন। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য।

লেডি ট্রাভেলারস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মারজীয়া মেহজাবীন। ছবি:এলটিবি

সাইফ: নারীদের জন্য আলাদা একটি ভ্রমণপ্রতিষ্ঠান গড়লেন-আইডিয়াটি কীভাবে পেলেন?  
মারজীয়া মেহজাবীন:
আমার বিয়ের পর দেখলাম, কলেজের যে বন্ধুরা ছিল, তাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই। তখন আমি চিন্তা করলাম আমি কী করতে পারি, কীভাবে নিরাপদে ঘুরে বেড়াতে পারি, কীভাবে সুন্দরভাবে কোথাও যেতে পারি। তখন আমি ফেসবুকে প্রথমে একটি পোস্ট করি নারীদের একটি গ্রুপে। সেখানে লিখি-‘আমি নারীদের জন্য ভ্রমণের একটি গ্রুপ করতে চাই। যেখানে আমার একসঙ্গে ঘুরে বেড়াব। একসঙ্গে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাব। ছেলেরা যেভাবে গ্রুপ করে ঘোরে, আমরাও সেভাবে গ্রুপ করে ঘুরব।’ এই স্ট্যাটাসের পর তখন প্রচুর সাড়া পেলাম। প্রথম দিন এক হাজারের মতো নারী আমাদের গ্রুপে জয়েন করেছিলেন। এখন এই গ্রুপের সদস্যের সংখ্যা প্রায় এক লাখ। এভাবেই পথ চলা শুরু হলো।

সাইফ: আপনি যখন শুরু করলেন, তখন কী ভেবেছেন এটা বাণিজ্যিকভাবে দাঁড়াবে?
মারজীয়া মেহজাবীন:
আমি যখন এটা শুরু করি, তখন কারও কোনো ধারণাই ছিল না যে এটা একটি বাণিজ্যিক বিষয় হতে পারে। এটা দিয়ে ব্যবসা করা যেতে পারে। আমি প্রথমে অনেকেই বলতেই সাহস পাইনি, আমি কী করছি। আমার মা-বোন কাউকে জানাইনি। শুধু স্বামী জানতেন। এক সময় তিনি আমাকে বলেন, এখান থেকে তো কোনো টাকা আসছে না। তাহলে এটা করছ কেন? তারচেয়ে ভালো তুমি কোথাও চাকরি করো। এ কথা শুনে আমি আস্তে আস্তে এটাকে কনভার্ট করলাম একটা বিজনেস সেক্টরে। তখন পুরো জিনিসটাই হয়ে গেল অন্যরকম।

সাইফ: শুধু নারীদের ভ্রমণ-নিশ্চয়ই ব্যতিক্রমি একটি উদ্যোগ?
মারজীয়া মেহজাবীন:
হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। আমাদের প্রতিষ্ঠানটি নারী ভ্রমণকারীদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান। তবে ব্যতিক্রম চিন্তা প্রথম থেকেই ছিলো, শুধু নারীদের ভ্রমণ নয়, তাদের নিরাপত্তার দিকটাও চিন্তা ছিল। নারীদের সেবার মাধ্যমে সমাজসেবায় ভূমিকাও রাখতে চাই।

নিরাপদে ভ্রমণে নারীরা। ছবি:মারজীয়া 

সাইফ: আপনারা কী শুধু দেশের ভেতরে কাজ করছেন?
মারজীয়া মেহজাবীন:
আমরা বিভিন্ন দেশে নারীদের ভ্রমণ নিয়ে কাজ করছি। এখন পর্যন্ত ভ্রমণকৃত দেশের সংখ্যা ১৩টি।

সাইফ: আপনার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোন কোন জায়গায় ট্রিপ হয়?
মারজীয়া মেহজাবীন:
দেশের মধ্যে আমাদের অনেক জায়গায় ট্রিপ হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- চট্টগ্রাম পার্বত্য এলাকা, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, সেন্টমার্টিন, কুয়াকাটা, সুন্দরবন, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ আরও অসংখ্য দর্শনীয় স্থানে।

সাইফ: মাসে কতটি ট্রিপ করতে পারেন?
মারজীয়া মেহজাবীন:
মাসে সর্বনিম্ন ৮টি থেকে সর্বোচ্চ ১৩টি পর্যন্ত ট্রিপ আমরা করিয়ে থাকি।

সাইফ: আপনার প্রতিষ্ঠানের (লেডি ট্রাভেলারস বাংলাদেশ) পরিধি বেড়েছে। কীভাবে পরিচালনা করছেন?
মারজীয়া মেহজাবীন:
ঢাকার উত্তরায় অফিস আমাদের। ছয় জন নারী কর্মী নিয়ে আমার এই প্রতিষ্ঠানে কাজ চলছে। এছাড়া দেশ ও বিদেশে অসংখ্য ট্র্যাভেল এজেন্সীর সাথে ব্যবসায়ীক সম্পর্ক রয়েছে। যে কারণে কাজ করতে সুবিধা হচ্ছে। 

সাইফ: করোনার পর এখন তো পর্যটন এলাকা উন্মুক্ত। সবাই ঘুরতে যাচ্ছেন। এ পরিস্থিতি কেমন সাড়া পাচ্ছেন? 
মারজীয়া মেহজাবীন:
করোনার সময় আমাদের কাজ চালু ছিল। কারণ এটা তো অনলাইন বেস গ্রুপ। আমি গ্রুপের সদস্যদের জন্য অনলাইনে কাজ করেছি। গ্রুপে প্রমোশন অফার ঘোষণা করাসহ অনেক কাজ করেছি। আমাদের অনেক কিছু চিন্তা করে পোস্ট দিতে হয়। কারণ, এটা মেয়েদের গ্রুপ। এখানে অনেক কিছু মেনে কাজ করতে হয়। আমরা করোনার মধ্যেও কাজ করেছি ঘরে বসে। আমরা কোনো কিছু থামিয়ে রাখিনি, কাজগুলো এগিয়ে নিয়েছি।

ভ্রমণে নারীরা। ছবি:মারজীয়া 

সাইফ: আপনার গ্রুপে সমাজের কোন শ্রেণির নারীরা সেবা নিতে আসেন? 
মারজীয়া মেহজাবীন:
আমার গ্রুপে প্রথম দিকে আসতেন করপোরেট নারী বা যারা পড়াশোনা করছেন তারা। এক পর্যায়ে যাদের বয়স ৪০ বছরের বেশি তারাও আসতে শুরু করেন। এখন ৪০ শতাংশের বেশি আসেন যারা অবসরে গেছেন বা ব্যস্তজীবন থেকে দূরে আছেন এমন নারীরা। যাদের স্বামী–সন্তান সময় দিতে পারছেন না, তারা এখন বেশি আসছেন। গৃহিণীরাও প্রচুর আসছেন। এখন সব পেশার মানুষই আসছেন। আমাদের রেসপন্স খুবই ভালো। এমনকি ফ্যামিলি থেকেও আমরা বেশ ভালো সাড়া পাচ্ছি। স্বামী, স্ত্রী ও বাচ্চাসহ একটি যৌথ গ্রুপে আনন্দ পান না। তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আলাদা করে ভ্রমণে যেতে চান। বিদেশের ভ্রমণে আমরা ফ্যামিলি নিচ্ছি; আর দেশের মধ্যের ভ্রমণ শুধুই নারীদের জন্য।

সাইফ: আমি জানি, আপনি প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে কাজ করছেন, আপনার এ কাজের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা কী কী?
মারজীয়া মেহজাবীন:
ভ্রমণে নারীদের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। পাশাপাশি ফ্যামিলি থেকেও নিরাপত্তার জন্য চাপ আসে। ঘুরতে পারবে না, কাদের সঙ্গে যাচ্ছ? যেতে পারবে না। একা একা কীভাবে ঘুরবে? এমন নানা প্রশ্ন আসে পরিবার থেকে।

সাইফ: আপনার এই কাজে পরিবার থেকে কেমন সাপোর্ট পাচ্ছেন?
মারজীয়া মেহজাবীন:
শুরুর দিকে নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে আমার তেমন কোনো প্রেরণা ছিল না।  আমি বিশ্বাস করি, আপনি মন থেকে যদি ভালো কিছু করেন, তাহলে অনেকেই আপনাকে প্রেরণা দেবেন। এখন ভালো করার পর প্রেরণা পাই আমার পরিবার থেকে। এখন সারা বাংলাদেশের যত নারী আছেন, সবাই আমার প্রেরণা। প্রেরণা কখনো একজনের হয় না। এখন পুরো পৃথিবীটাই আমার প্রেরণা।

লেডি ট্রাভেলারস এর ব্যবস্থাপনায় ভ্রমণে নারীরা। ছবি: সংগৃহীত

সাইফ: আপনি কেন ভ্রমণ করেন? 
মারজীয়া মেহজাবীন:
ভ্রমণ মনের প্রশান্তি এনে দেয়। ক্লান্তি দূর করে। আমাদের দেশের নারীদের ওপর যে ধকল যায়, তাতে ভ্রমণ ওষুধের মতো কাজ করে।

সাইফ: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
মারজীয়া মেহজাবীন:
ভবিষ্যতে আমাদের প্রজেক্ট আরও অনেক বড় করে দেশের বাইরের প্রবাসী নারীদের জন্যেও কিছু করার ইচ্ছে রয়েছে। পাশাপাশি দেশের নারীদের ভ্রমণে সার্বিক সহায়তা করা এবং তাদের নিরাপদ একটি জীবনে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য। সবকিছু ছাপিয়ে ভ্রমণ একটি মানসিক রোগ নিরাময়ের ওষুধ হিসেবে যেমন কাজ করে, তেমনি দেশের প্রতিটি নারীর ডিপ্রেশন দূর করার বলিষ্ঠ সহায়তা হিসেবে লেডি ট্রাভেলারস বাংলাদেশ অবদান রাখবে আজীবন- এই হলো আমার স্বপ্ন।

পড়ুন: মেঘ ঝরে ঝরে জল উড়ে উড়ে

/এসবি/

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়