ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ মাঘ ১৪২৬, ২১ জানুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

আদালত প্রাঙ্গণে অসহায় মায়ের আকুতি

মামুন খান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-০৮ ৯:১২:২৩ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-০৮ ১০:৫৬:২১ এএম

২০১৬ সালে ফুফাতো ভাইয়ের পাওনা টাকা আদায় করতে গিয়ে ঘাতকদের হাতে নিহত হন কাজল (৩৫)।

কাজল হত্যার ঘটনায় কাজলের মা সালমা বেগম তিন জনের নামে মামলা দায়ের করেন।

মামলার সুষ্ঠু বিচার ও ঘাতকদের সর্বোচ্চ শাস্তির আশায় বৃদ্ধ বয়সেও আদালতের বারান্দায়, আইনজীবীর চেম্বার ও সংবাদকর্মীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন সালমা বেগম।  

গত ৫ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার) পড়ন্ত বিকেলে সালমা বেগমের সাথে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। মামলাটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ এর বিচারক জেসমিন আরার আদালতে বিচারাধীন। ওই দিন মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ধার্য ছিল। সালমা বেগম ও তার দুই ছেলে রকি ও শাওন সাক্ষ্য দেন। তবে তা শেষ হয়নি। আদালত আগামী ৩১ ডিসেম্বর পরবর্তী শুনানির তারিখ ধার্য করেন।

সালমা বেগমের টলমল চোখ ছেলেকে সর্বত্র খুঁজে বেড়াচ্ছে। ছেলে সম্পর্কে কেউ জানতে চাইলে, তিনি স্থির থাকতে পারেন না। কান্নায় ভেঙে পড়েন। বুক চাপড়াতে থাকেন।

কান্না করে চিৎকার করে বলেন, ‘আমার ছেলের কী অপরাধ ছিল, কেন তাকে এভাবে মরতে হলো? কাজলের সাত বছরের সন্তানের মুখের দিকে তাকাতে পারি না। সে শুধু তার বাবাকে খুঁজে বেড়ায়। খুনীদের কাছে প্রাণ ভিক্ষা চেয়েও আমার ছেলে বাঁচতে পারেনি। আল্লাহ এর বিচার করবেন।’

এরপর তিনি আহাজারি করতে থাকেন। তার আহাজারিতে চারিদিকের পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে।

আদালতের কার্যক্রম দুপুরে শেষ হয়ে গেলেও তিনি বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। করুণ চোখে করে তাকিয়ে ছিলেন আদালতের ভবনগুলোর দিকে। তার বিশ্বাস এই ভবন থেকেই তিনি ন্যায় বিচার পাবেন।

সালমা বেগম বলেন, ২০০০ সালে আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে সংসারের হাল ধরে বড় ছেলে কাজল। অনেক কষ্টে কাজল তার দুই ভাই রকি ও শাওন এবং বোন সুমি আক্তারের দেখাশোনা করতো। দুবেলা দুমুঠো ভাতের জন্য ছেলে বলাকা গাড়ির কন্ডাক্টরের কাজ করতো। বড় ছেলে যখন জীবিত ছিল তখন অনেক ঝুট-ঝামেলা সামলে নিতে পেরেছিলাম। বেশ গুছিয়ে ফেলেছিলাম সব কিছুই। হঠাৎ একটি ঝড় এসে পরিবারের বড় ছেলেকে কেড়ে নিলো।

২০১৬ সালের শেষের দিকে কাজ শেষে কাজলের ফুপাতো ভাই বাবুল তাকে ডেকে নেয়। তার কিছু টাকা অন্যের কাছ থেকে আদায়ের জন্য যায় কিন্তু আর ফিরে আসেনি। ঘটনার নয়দিন পর একটা ডোবা থেকে পঁচাগলা লাশ উদ্ধার হয়। একথা বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন সালমা বেগম।

তিনি আরো বলেন, বড় ছেলে মারা যাওয়ার সময় তার চার বছরের মেয়ে মিমকে রেখে যায়। কাজলের মৃত্যুর পরপরই বউমা মিমকে নিয়ে বাপের বাড়ি গাজীপুরে চলে যায়।

এরপর থেকে বউমা ওর বাবার বাড়িতেই থাকে। মাঝে মধ্যে আমাদের বাসায় নাতিকে নিয়ে আসে। মিম সব সময় তার বাবার কথা বলে। বাবা-বাবা বলে কান্না করতো। 

এখন নাতির বয়স ৭ বছর। আমাকে মোবাইল করে বিস্কুট, অন্যান্য খাবার খেতে চায়। স্কুলে যাওয়ার জন্য টাকা চায়। মাঝে মধ্যে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিই। সব সময় টাকা-পয়সা দেওয়ার সামর্থ থাকেনা। ছেলেকে হারিয়ে পরিবার নিয়ে অনেক কষ্টে আছি।

সালমা বেগম বলেন, এখন সব চেয়ে দুঃচিন্তা হচ্ছে, মিমের মা যদি আরেকটা বিয়ে করে তাহলে কার কাছে থাকবে মেয়েটা? কী হবে মিমের? শুনছি ছেলের বউয়ের নাকি আরেকটা বিয়ে দিতে চায় তার বাবা-মা। ছেলের বউ আমাকে জানিয়েছে এভাবে আর কতদিন মা, আমারতো একটা ভবিষ্যৎ রয়েছে।

তিনি বলেন, আমার ছেলেকে যখন তারা মারছিল তখন সে জীবন ভিক্ষা চেয়েও পায়নি। আসামিরা আমার ছেলের মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করে মেরেছে। স্থানীয়দের মাধ্যমে জানতে পেরেছি ওই সময় নাকি ছেলে বারবার বলেছে আমার ছোট মেয়ে আছে আমাকে ছেড়ে দাও। তারপরেও পাষাণরা কষ্ট দিয়ে আমার ছেলেকে মেরে ফেললো। আমি একজন অসহায় মা, আমি আমার ছেলের ঘাতকদের ফাঁসি চাই।

নিহত কাজলের ছোট ভাই শাওন জানান, ভাই মারা যাওয়ার পর থেকে অনেক কষ্টে জীবন পার করছি। আমার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছে। একটি দোকানে মোবাইল ঠিক করার কাজ করি। মেজো ভাই ওয়ার্কশপে কাজ করে। সংসার কোন রকম চলছে। মা অসুস্থ। ঠিকমত ওষুধ কিনে দিতে পারিনা মাকে। ভাই আমাদের বাবার মত করে আগলে রাখতেন।

তিনি বলেন, ফুফাতো ভাইয়ের টাকা আদায় করা নিয়ে আমার ভাইকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। মা বাদী হয়ে তিন জনের নামে মামলা দায়ের করেন। কিছুদিন কারাগারে থাকার পরে তারা হাইকোর্ট থেকে জামিন পান। জামিন পেয়ে রীতিমত চাপ দিতে থাকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য। না হলে আমাদের মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এজন্য আগের স্থান ছেড়ে নতুন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়েছি। আসামিরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। আসামিদের ফাঁসি চাই।

মামলা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট আদালতে অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল কাদের পাটোয়ারী, মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে আছে। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে সাক্ষীদের আদালতে হাজির করে মামলাটির বিচার শেষ করা। আসামিদের যেন সর্বোচ্চ সাজা হয় এবং ভুক্তভোগী পরিবার যেন ন্যায়বিচার পায়।

কাজল নিহতের ঘটনায় তার মা সালমা বেগম মো. সুমন, তুহিন মিয়া ওরফে তুহিন এবং জসিমকে আসামি করে ২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারি যাত্রাবাড়ি থানায় মামলা দায়ের করেন।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, কাজল বলাকা পরিবহনের কন্ডাক্টর হিসেবে কাজ করতো। ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে কাজের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়। এরপর থেকে কাজল নিখোঁজ হন। ২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারি বেলা সাড়ে ১২টার দিকে যাত্রাবাড়ি থানাধীন মাতুয়াইল কাউন্সিলের দক্ষিণ পশ্চিম পাশে  ওয়াসার ময়লা পানি থেকে কাজলের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।

সালমা বেগম অভিযোগ করেন, জনৈক বিপ্লবের কাছে কাজলের ফুফাতো ভাই বাবুল ৫০ হাজার টাকা পেত। বাবুল কাজলকে বিপ্লবের কাছ থেকে টাকা তুলে দিতে বলে। কাজল বিপ্লবের কাছে টাকা চাইলে বিপ্লব এবং তার শ্যালক সুমনের সাথে কাজলের মনোমালিন্য শুরু হয়। ২৪ ডিসেম্বর দিবাগত রাত সাড়ে ১২ টার সময় কাজল বাসার ফেরার সময় ডেমরা মহাসড়কের কাছে পৌঁছালে আসামিরা তাকে ইট দিয়ে আঘাত করে গুরুতর জখম করে হত্যা করে। আসামিরা লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে ওয়াসার ময়লা লেকের কচুরী পানার নিচে লুকিয়ে রাখে।

মামলাটি তদন্ত করে যাত্রাবাড়ি থানার সাব-ইন্সপেক্টর প্রদীপ কুণ্ডু তিনজনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেন।

চার্জশিটে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, আসামিরা ভিকটিম কাজলকে ইট দিয়ে মারধর করে এবং লেকে ফেলে দেয়। কাজল সাঁতরিয়ে তীরে বা পাড়ে উঠতে পারেনি এবং নিস্তেজ হয়ে পানিতে ডুবে যায় এবং মারা যায়। ২০১৮ সালের ২৯ আগষ্ট আদালত তিন আসামির বিরুদ্ধে চার্জগঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।



ঢাকা/মামুন খান/জেনিস