ঢাকা     সোমবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ১৩ ১৪২৭ ||  ১০ সফর ১৪৪২

কামানের গোলায় নিহত ১৩: সাক্ষী না আসায় পুলিশকে দুষছেন পিপি

মামুন খান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:০৬, ১৫ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
কামানের গোলায় নিহত ১৩: সাক্ষী না আসায় পুলিশকে দুষছেন পিপি

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালী জাতির জীবনে একটি কালো অধ্যায়। ওই দিন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। 

হৃদয় বিদারক এ হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচার শেষ হলেও একইদিন খুনিদের দিকবিদিক ছোড়া কামানের গোলায় মোহাম্মদপুরে শেরশাহ সুরী রোডে ১৩ জন নিহতের মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি। সাক্ষী না আসায় থমকে আছে মামলাটির বিচারকাজ। এজন্য পুলিশকে দুষছেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলী। তবে মুজিববর্ষেই সাক্ষী হাজির করে মামলাটির বিচার শেষ করার কথা জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।

ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে প্রায় ১৪ বছর আগে চার্জগঠন করে বিচার শুরু করেন আদালত। তবে এতদিনেও মামলার বিচার কাজ শেষ হয়নি। ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে মামলাটি এখন সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে আছে।

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ধার্য ছিল। কিন্তু ওই দিন কোনো সাক্ষী আদালতে হাজির না হওয়ায় আদালত ১৩ এপ্রিল সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ঠিক করেন। কিন্তু এরই মাঝে মহামারি করোনার কারণে আদালতের সাধারণ ছুটি চলায় আর কোনো কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়নি। সাধারণ ছুটি শেষে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্য করেছেন সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারক মাকছুদা পারভীন।

মামলা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলী সাইফুল ইসলাম হেলাল বলেন, দীর্ঘদিন মামলাটির বিচার বন্ধ ছিল। ২০০৯ সালের পর এ মামলার বিচারে গতি পায়। এরপর থেকে মামলাটির বিচার কার্যক্রম শেষ করতে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। সাক্ষী হাজিরের ক্ষেত্রে সব সময়ই যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করছে রাষ্ট্রপক্ষ। পুলিশ সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে পারছে না। সাক্ষীদের বিরুদ্ধে সমনের পর অজামিনযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে। তারপরও তারা হাজির হচ্ছেন না। সাক্ষীদের হাজিরের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকল স্থানে দফায় দফায় চিঠি দেয়া হয়েছে। বার বার সমন পাঠানোর পরও মামলার গুরুত্বপূর্ণ কিছু সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে আদালতে আসছেন না। এজন্য মামলাটির বিচার শেষ হচ্ছে না।

তিনি বলেন, তারপরও আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। করোনার কারণে কয়েকমাস আদালতের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এখন আবার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ হয়ে গেছে। কিছু পাবলিক সাক্ষী আছে। মুজিব বর্ষের গুরুত্ব দিয়ে এ বছরই যেন মামলাটির বিচার শেষ হয়ে যায় সেই চেষ্টা করে যাবো।

ঘটনার সময় ২৪ বছরের যুবক ছিলেন মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী। বর্তমানে অসুস্থ হয়ে তিনি বিছানায়। তিনি বলেন, মোহাম্মদপুরের শেরশাহ সুরী রোডের ৮ নম্বর বাড়িটি আমার ছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দিন সকাল সাড়ে ৫টায় বাসার ওপর কামানের গোলা এসে পড়ে। ওই সময় বাসার ভাড়াটিয়া ও গ্রামের লোকজন অবস্থান করছিল। কামানের গোলায় আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয় রিজিয়া বেগমসহ ১৩ জন সেখানে মারা যান এবং প্রায় ৪০ জন আহত হন। আহতদের তাৎক্ষণিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়।

মোহাম্মদ আলী বলেন, এ ঘটনায় মামলা করতে গেলে তৎকালীন মোহাম্মদপুর থানার ওসি রব দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির অজুহাতে মামলা না নিয়ে ফিরিয়ে দেন। আর নিহতদের লাশ কবর দিয়ে দিতে বলেন। একপর্যায়ে ১৫ আগস্ট যা কিছু হয়েছে এ ব্যাপারে কোনো মামলা করা যাবে না- এ সংক্রান্ত আইন পাস হয়। ফলে চেষ্টা করেও ওই সময় আর মামলা করা সম্ভব হয়নি। পরে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি ক্ষমতায় এলে ওই কালো আইন বাতিল হয়। এরপর ১৯৯৬ সালে স্বশরীরে মোহাম্মদপুর থানায় গিয়ে কামানের গোলায় ১৩ জনকে হত্যার মামলাটি করি। 

তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এ মামলাটি দীর্ঘ দিনেও শেষ না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে তাদেরও শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

এদিকে ওই ঘটনায় নিহত ও আহত হতদরিদ্র পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

তার স্ত্রী শাহনাজ আক্তার মেরিনা বলেন, মোহাম্মদ আলী শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অসুস্থ হয়ে তিনি এখন বিছানায়। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। দীর্ঘদিন তিনি মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি করেছেন। এ মামলাটি নিয়ে তিনি বহু লড়েছেন। কিন্তু বিনিময়ে তিনিসহ ভুক্তভোগী পরিবারগুলো কিছুই পায়নি। প্রধানমন্ত্রী চাইলেই এ পরিবারগুলো মানবেতর জীবনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে পারে।

আদালতের নথিপত্র সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সালে ১৯ মার্চ এ মামলার বাদীর প্রথম সাক্ষ্য গ্রহণ হয়। এরপর দীর্ঘদিন বাদীর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষ্য গ্রহণ হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষের ১৫তম সাক্ষী মো. রমিজ উদ্দিন ২০১৪ সালের ২৪ এপ্রিল আদালতে সাক্ষ্য দেন। এছাড়া ২০১৫ সালের ৭ মে আদালতে এ মামলায় বাদী অবশিষ্ট সাক্ষ্য দেন। আর বাদীর ওই পূর্ণাঙ্গ সাক্ষীর পর থেকে তিন বছর কোনো সাক্ষী হয়নি। দীর্ঘদিন পর ২০১৮ সালের ২৫ নভেম্বর মোহাম্মদপুর থানার তৎকালীন এসআই ডিস্ট্রিক ইন্টিলিজেন্স অফিসার তোফাজ্জল হোসেন এবং একই দিন পুলিশের এডিসি নুরুল ইসলাম আদালতে সাক্ষ্য দেন। এরপর গত বছরের ২২ জানুয়ারি পুলিশের এএসপি মুন্সী আতিকুল রহমান এ মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দেন। এরপর আর কোনো সাক্ষী আদালতে হাজির হননি।

প্রসঙ্গত, ৪৫ বছর আগের ওই হত্যার ঘটনায় মামলা হয় ১৯৯৬ সালে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণের সময় সেনা সদস্যরা কামানের গোলা ছুঁড়লে তা গিয়ে মোহাম্মদপুরের শেরশাহ সুরী রোডর ৮ ও ৯ এবং ১৯৬ ও ১৯৭ নম্বর বাড়ির (টিনশেড বস্তি) ওপর পড়ে। লে. কর্নেল মুহিউদ্দিন আহমেদের (আর্টিলারি) ছোড়া কামানের গোলার বিকট শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। মুহূর্তে ধুলায় মিশে যায় ওই বস্তি। ওই ঘটনায় নারী ও শিশুসহ ১৩ জন মারা যায়। প্রায় ৪০ জন আহতের মধ্যে কয়েকজন পুরুষ সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেন। নিহতরা হলেন- রিজিয়া বেগম ও তার ছয় মাসের মেয়ে নাসিমা, কাশেদা বেগম, ছাবেরা বেগম, সাফিয়া খাতুন, আনোয়ারা বেগম (প্রথম), ময়ফুল বিবি, আনোয়ারা বেগম (দ্বিতীয়), হাবিবুর রহমান, আবদুল্লাহ, রফিজল, সাহাব উদ্দিন আহম্মেদ ও আমিন উদ্দিন আহম্মেদ।

ওই ঘটনায় ৮ নম্বর বাড়ির মালিক মোহাম্মদ আলী বাদী হয়ে ১৯৯৬ সালের ২৯ নভেম্বর মোহাম্মদপুর থানায় এ মামলা দায়ের করেন। ২০০১ সালের এপ্রিলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এরপর ২০০৬ সালের ১ নভেম্বর এ মামলায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত।

১৭ আসামির মধ্যে ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যু-প্রাপ্ত পাঁচ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এরা হলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মুহিউদ্দিন আহমেদ, মেজর (অব.) বজলুল হুদা ও মেজর (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ। ওই পাঁচজন ছাড়া এ মামলায় প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে (প্রয়াত) গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল।  গত ১২ এপ্রিল ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদেরও ফাঁসি কার্যকর হয়।

এখনো পলাতক রয়েছেন - লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) শরিফুল হক ডালিম, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আবদুর রশিদ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) এসএইচএমবি নূর চৌধুরী ইবি, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) এএম রাশেদ চৌধুরী, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) আহমদ শরিফুল হোসেন ওরফে শরিফুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) মো. কিসমত হাসেম, ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসার, রিসালদার (অবসরপ্রাপ্ত) মোসলেম উদ্দিন ওরফে মোসলেহ উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী ও এলভি মো. আলী হোসেন মৃধা।

টিপু

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়