Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ২৫ জুলাই ২০২১ ||  শ্রাবণ ১০ ১৪২৮ ||  ১৩ জিলহজ ১৪৪২

যে কারণে খুন হন নীলা

মামুন খান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:০৪, ১৫ জুন ২০২১   আপডেট: ১৩:০৫, ১৫ জুন ২০২১
যে কারণে খুন হন নীলা

নীলা রায়

সাভারে দশম শ্রেণির ছাত্রী নীলা রায়কে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় মিজানুর রহমান চৌধুরীসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে সম্প্রতি ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) নির্মল কুমার দাস।

চার্জশিটভুক্ত অন্য দুই আসামি হলেন- মিজানের সহযোগী সেলিম পাহলান ও সাকিব হোসেন।  মামলায় মিজানুর রহমান কারাগারে রয়েছে।  অপর দুই আসামি হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছে।

মিজানুরের বাবা আব্দুর রহমান এবং মা নাজমুন্নাহার সিদ্দিকার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের অব্যাহতির আবেদন করেছে পুলিশ।

চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘২০২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ভাইকে নিয়ে ওষুধ আনতে যাচ্ছিল নীলা।  পথে তাদের গতিরোধ করে নীলাকে তাদের পরিত্যক্ত বাড়িতে নিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দেয়।  নীলা তা প্রত্যাখ্যান করে। বিষয়টি মিজানুর ফোনে সেলিম ও সাকিবকে জানায়।  তারা বলেন, যা করার আজ করে ফেল।  আর সুযোগ পাবি না।  এ কথা শুনে মিজানুর নীলাকে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে।’

চার্জশিটে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘নীলা সাভার মডেল থানাধীন ব্যাংক কলোনীস্থ এ্যাসেড স্কুলে ১০ শ্রেণিতে পড়াশোনা করতো। মিজানুর রহমান নীলাকে স্কুলে যাওয়া আসার পথে বিভিন্ন সময়ে উত্যক্ত করাসহ প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল।  প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় মিজানুর নীলাকে দেখে নিবে মর্মে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও প্রাণ নাশের হুমকি দিয়ে আসছিল। বিষয়টি নীলা পরিবারকে জানায়। নীলার পরিবার বিষয়টি মিজানুরের বাবা, মাকে জানায়।  মিজানুরকে তার বাবা, মা নীলার সাথে খারাপ আচরণ করতে নিষেধ করেন।  মিজানুর তাদের কথা না শোনায় তাকে ঘটনার দুই মাস আগে অন্যত্র বিয়ে দেন। মিজানুর নীলাকে বিয়ে করবে বলে সাকিব ও সেলিমদের সাথে এই বিষয়ে পরিকল্পনা করে সিদ্ধান্ত নেয়, নীলা মিজানুরকে বিয়ে করতে রাজি না হলে তাকে শেষ করে দিবে।  সাকিব মিজানুরকে একটা সুইজ গিয়ার চাকু এনে দেয়।  এটা সব সময় মিজানুরকে সাথে রাখতে বলে। চাকু সাথে রেখে মিজানুর সাকিব ও সেলিমের সহায়তায় সুযোগ খুঁজতে থাকে। তাদের নিয়ে মিজানুর নীলাকে উত্যক্ত করতে থাকে।’

তিনি বলেন, ‘গত বছর ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টার দিকে নীলা ও তার ভাই অলক ওষুধ কেনার জন্য বাসা থেকে বের হয়।  রিকশায় করে যাওয়ার পথে সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে সাভার থানাধীন দক্ষিণ পাড়াস্থ সাভার গার্লস স্কুলের পূর্ব পাশে গলি রাস্তার সংযোগ স্থলে পৌঁছামাত্র মিজানুর, সাকিব ও সেলিম রিকশা থামিয়ে নীলা ও অলককে রিকশা থেকে নামায়।  মিজানুর অলককে বলে, ‘নীলার সাথে তার কথা আছে। তুই একটু সরে দাঁড়া।’ তখন অলক একটু দূরে সরে গেলে মিজানুর নীলার হাত ধরে টেনে গলি রাস্তার মিজানুরের মালিকানাধীন বাউন্ডারি করা পরিত্যক্ত বাড়ির একটি টিনের ঘরে নিয়ে যায়।  এ সময় মিজানুর নীলাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। নীলা রাজি না হওয়ায় মিজানুর সেলিম ও সাকিবকে ফোন দিয়ে বিষয়টি জানায়। তখন সাকিব ও সেলিম বলে যা করার আজ করে ফেল। আর সুযোগ পাবি না। মিজানুর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী তার কাঁধে ঝুলানো ব্যাগের ভিতরে থাকা সাকিবের দেওয়া চাকু বের করে নীলাকে হত্যার উদ্দেশ্যে উপর্যুপরি আঘাত করে।  অলকসহ অন্যান্যরা মিজানুরকে আটকানোর চেষ্টা করলে তাদের ভয় দেখিয়ে সে দৌঁড়ে পালিয়ে যায়। অলকসহ অন্যান্যরা নীলাকে গুরুতর রক্তাক্ত জখম অবস্থায় নীলাকে ফ্লোরে পড়ে থাকতে দেখে এবং তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। অলক গেঞ্জি খুলে রক্ত বন্ধের চেষ্টা করে এবং লোকজনের সহায়তায় তাকে এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়।  রাত ৯টা ৮ মিনিটের দিকে নীলা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।’

এদিকে তদন্তের পর এবার আসামিদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক সাজার অপেক্ষায় নীলার পরিবার।

নীলার বাবা নারায়ণ রায় বলেন, ‘মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে।  চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। এখন প্রত্যাশা মামলার বিচার যেন দ্রুত শেষ হয়। আসামিদের যেন দৃষ্টান্তমূলক সাজা হয়। এভাবে যেন আর কোনো নীলাকে অকালে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে না হয়।’

মিজানুরের মাকে চার্জশিট থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়ে নারায়ণ রায় বলেন, ‘নীলাকে যখন মিজানুর উত্যক্ত করতো তখন থেকেই আমরা তার মাকে বিষয়টি জানিয়েছিলাম।  ছেলেকে শাসন করতে বলেছিলাম।  তিনি তা না করে বরং ইন্ধন দিয়েছেন।  তখন তিনি ছেলেকে শাসন করলে হয়তো এ ধরনের ঘটনা ঘটতো না। আমরা নীলাকে হারাতাম না।’

ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আনোয়ারুল কবীর বাবুল বলেন, ‘মামলাটির তদন্ত শেষে পুলিশ চার্জশিট দাখিল করেছে।  করোনার কারণে আদালতে কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।  আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জগঠন করে মামলার বিচার যেন দ্রুত শেষ হয় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সেই চেষ্টায় করবো।’

প্রসঙ্গত, গত বছর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে নীলা রায় ও তার ভাই অলক রায়ের পথরোধ করে বখাটে মিজানুর রহমান। পরে তার ভাইয়ের কাছ থেকে নীলাকে জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে তার নিজ পরিত্যক্ত বাড়ির একটি কক্ষে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যান।  পরে রাতে সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক নীলাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় নীলার বাবা নারায়ণ রায় ২১ সেপ্টেম্বর মিজানুর রহমান, তার বাবা আব্দুর রহমান ও মা নাজমুন্নাহার সিদ্দিকাসহ অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে সাভার থানায় হত্যা মামলা করেন।

/মামুন/এসবি/

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়