ঢাকা     শনিবার   ২৯ জানুয়ারি ২০২২ ||  মাঘ ১৫ ১৪২৮ ||  ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

৬ ছাত্র হত্যা: দোষীদের সর্বোচ্চ সাজার অপেক্ষায় পরিবার

মামুন খান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:১৭, ১ ডিসেম্বর ২০২১  
৬ ছাত্র হত্যা: দোষীদের সর্বোচ্চ সাজার অপেক্ষায় পরিবার

ফাইল ছবি

১০ বছর আগে সাভারের আমিন বাজারে ছয় ছাত্রকে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার সেই আলোচিত মামলার রায়ের দিন বৃহস্পতিবার (২ ডিসেম্বর) ধার্য রয়েছে।

ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ইসমত জাহান ৫৭ আসামির এ রায় ঘোষণা করবেন। রায়ে আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা প্রত্যাশা করছেন ভূক্তভোগী পরিবার। 

রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, অভিযোগে প্রমাণে তারা সক্ষম হয়েছেন। আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা হবে এমনটাই আশা তাদের। তবে আসামিপক্ষ বলছে, রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। কাজেই তারা খালাস পাবেন।

২০১১ সালের ১৭ জুলাই শবে বরাতের রাতে সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রামের কেবলার চরে ডাকাত সন্দেহে ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। 

নিহতরা হলেন— ধানমন্ডির ম্যাপললিফের এ লেভেলের ছাত্র শামস রহিম, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক শ্রেণির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ইব্রাহিম খলিল, বাঙলা কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তৌহিদুর রহমান পলাশ, তেজগাঁও কলেজের ব্যবস্থাপনা প্রথম বর্ষের ছাত্র টিপু সুলতান, মিরপুরের বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সিতাব জাবীর মুনিব এবং বাঙলা কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র কামরুজ্জামান কান্ত।

টিপু সুলতানের বাবা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশীদ বলেন, ‘যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে তাদের সকলের ফাঁসি চাই। রক্তের বিনিময়ে রক্ত চাই। আর অন্য কোনো কথা নেই এখানে। আমি একজন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা, থানা কমান্ডার এবং সরকারি অবসরপ্রাপ্ত অফিসার। আমার ছেলে ওইদিন বিরিয়ানি খাওয়ার জন্য ওখানে যায়। পর্বত সিনেমা হলের ওখানে বিরিয়ানি পায়নি। এরপর তারা গাবতলির পুরাতন ব্রিজের নিচে যায়। ওই সময় ওদের কাছ থেকে ঘড়ি টাকা সব কিছু কেড়ে নেয়। ওরা বাঁধা দিলে ওদের পিটিয়ে হত্যা করে। ওদের লাশগুলো কেবলার চরে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু সাংবাদিকদের কারণে সেখানে নিয়ে যেতে পারেনি। কেবলার চরে নিয়ে ওদের গুম করতে চাইছিলো। সেটা আর করতে পারিনি। অভিযুক্তদের ফাঁসির প্রত্যাশা করছি।’

টিপু সুলতানের মা কাজী নাজমা সুলতানা বলেন, ‘যারা আমার নির্দোষ ছেলেসহ ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করেছে, তাদের সকলের ফাঁসি হোক। যে সন্তান হারায় সে জানে তার দিনগুলো কেমন কাটে। মামলায় যারা ফাঁসির উপযুক্ত তাদের সকলের ফাঁসি চাই। আমরা ছয়টি পরিবার এই আশায় আছি।’

কামরুজ্জামান কান্তর বাবা আব্দুল কাদের সুরুজ বলেন, ‘যারা প্রকৃত অপরাধী তাদের যেন ফাঁসি হয়। নিষ্পাষ যদি কেউ থেকে থাকে তারা যেন ভূক্তভোগী না হয়। এতে আমার মৃত ছেলের আত্মা কষ্ট পাবে। প্রকৃত দোষীদের সাজা হোক এটাই আমাদের চাওয়া।’

পলাশের ভাই সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘ সময় হয়ে গেছে মামলাটা। অবশেষে রায়ের পর্যায়ে এসেছে। নির্মমভাবে যারা ওদের হত্যা করেছে তাদের ফাঁসি ছাড়া অন্য কিছু চায় না।’

সংশ্লিষ্ট আদালতে অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর আনন্দ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘রায়ে সকল আসামির সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করি। মামলায় ৯২ জন সাক্ষীর মধ্যে ৫৬ জন সাক্ষ্য নিয়েছেন আদালতে। সাক্ষীদের জবানবন্দি, অন্যান্য আলামত আসামিদের বিরুদ্ধে প্রমাণ করতে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সক্ষম হয়েছে। সকল প্রমান আসামিদের বিরুদ্ধে গেছে। কাজেই আশা করবো আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা হবে।’

তিনি বলেন, ‘ওই ছয় কলেজ ছাত্র আসামিদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। দুঃখজনক বিষয় আসামিদের সেই সময় মন গলেনি। তারা তাদের পুলিশে দিতে পারতো। আইন কেন হাতে তুলে নিবে? শিক্ষার্থীদের মধ্যে একজন বেঁচে যাওয়ায় তাকে ডাকাতির মামলায় আসামি করা হয়। সেই মামলা থেকে ওই ছাত্র অব্যাহতি পায়।’

বাদী পক্ষের আইনজীবী ফারুক আহাম্মদ বলেন, ‘পুলিশ মামলাটি ভিন্নখাতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো। পরে র‌্যাব তদন্ত করে চার্জশিট দিয়েছে। ছয় জন মেধাবী ছাত্রকে মাইকিং করে পিটিয়ে হত্যা করেছে। বিষয়টি খুব মর্মান্তিক। সকল আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করেন তিনি।

এদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী শিউলি আক্তা বলেন, ‘ন্যায় বিচার প্রত্যাশা করছি। আশা করি আসামিরা ন্যায় বিচার পাবে। ন্যায়বিচার হলে সকল আসামি খালাস পাবেন।’

গত ২২ নভেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায়ের এ তারিখ ঠিক করেন।

ওইদিন ৪১ আসামির জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হয়। ১৬ আসামি পলাতক রয়েছেন। এরআগে মামলাটিতে ৫৪ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন।

ওই ঘটনায় নিহতদের বন্ধু আল-আমিন গুরুতর আহত হলেও বেঁচে যান। ঘটনার পর ডাকাতির অভিযোগে আল-আমিনসহ নিহতদের বিরুদ্ধে সাভার মডেল থানায় ডাকাতি মামলা করেন স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী আবদুল মালেক। ওই সময় পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা গ্রামবাসীকে আসামি করে সাভার মডেল থানায় আরেকটি মামলা করে।

পুলিশ, সিআইডির হাত ঘুরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্তভার র‌্যাবকে দেওয়া হয়। তদন্ত শেষে ২০১৩ সালের ৭ জানুয়ারি র‌্যাবের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরীফ উদ্দিন আহমেদ ৬০ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।

মামলার আসামিরা হলেন— ডাকাতি মামলার বাদী আব্দুল মালেক, সাঈদ মেম্বার, আব্দুর রশিদ, ইসমাইল হোসেন রেফু, নিহর ওরফে জমশের আলী, মীর হোসেন, মজিবর রহমান, কবির হোসেন, আনোয়ার হোসেন, রজুর আলী সোহাগ, আলম, রানা, আ. হালিম, আসলাম মিয়া, শাহীন আহমেদ, ফরিদ খান, রাজীব হোসেন, হাতকাটা রহিম, মো. ওয়াসিম, সেলিম মোল্লা, সানোয়ার হোসেন, শামসুল হক ওরফে শামচু মেম্বার, রাশেদ, সাইফুল, সাত্তার, সেলিম, মনির, ছাব্বির আহম্মেদ, আলমগীর, আনোয়ার হোসেন আনু, মোবারক হোসেন, অখিল খন্দকার, বশির, রুবেল, নূর ইসলাম, আনিস, সালেহ আহমেদ, শাহাদাত হোসেন রুবেল, টুটুল, অখিল, মাসুদ, নিজামউদ্দিন, মোখলেছ, কালাম, আফজাল, বাদশা মিয়া, তোতন, সাইফুল, রহিম, শাহজাহান, সুলতান, সোহাগ, লেমন, সায়মন, এনায়েত, হয়দার, খালেদ, ইমান আলী, দুলাল ও আলম।

মামলার বিচারকালে ৩ জন আসামি মারা যায়। বর্তমানে আসামির সংখ্যা ৫৭ জন।

ঢাকা/মামুন/সনি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়