ঢাকা     সোমবার   ০৩ অক্টোবর ২০২২ ||  আশ্বিন ১৮ ১৪২৯ ||  ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪১৪

রতনের নেতৃত্বে টাঙ্গাইলে বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণ: র‌্যাব

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:০৬, ৮ আগস্ট ২০২২   আপডেট: ১৩:২০, ৮ আগস্ট ২০২২
রতনের নেতৃত্বে টাঙ্গাইলে বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণ: র‌্যাব

ডাকাত চক্রের ১০ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। ছবি: র‌্যাব

টাঙ্গাইলের মহাসড়কে চলন্ত বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনায় ডাকাতির মূল পরিকল্পনাকারী রতন হোসেনসহ ডাকাত চক্রের ১০ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এ ঘটনায় ১৩ ডাকাত অংশ নেয় বলে জানিয়েছেন র‌্যাব কর্মকর্তারা।

সোমবার (৮ আগস্ট) সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল-মঈন এসব তথ্য জানান।

আরও পড়ুন: বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণ: ভয়াবহতার বর্ণনা দিলেন যাত্রীরা

তিনি বলেন, রোববার (৭ আগস্ট) গভীর রাত পর্যন্ত ঢাকা, গাজীপুর ও সিরাজগঞ্জে অভিযান পরিচালনা করে সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী মো. রতন হোসেন, মো. আলাউদ্দিন, মো. সোহাগ মন্ডল, খন্দকার মো. হাসমত আলী ওরফে দীপু, মো. বাবু হোসেনওরফে জুলহাস, মো. জীবন, মো. আব্দুল মান্নান, মো. নাঈম সরকার, রাসেল তালুকদার, মো. আসলাম তালুকদার ওরফে রায়হানকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত রতন মিয়া ওই বাস ডাকাতির ৩ দিন আগে তার সহযোগী ডাকাত রাজা মিয়াকে বাস ডাকাতির প্রস্তাব দিলে রাজা মিয়া দলের অন্যান্য ডাকাতদের সংঘটিত করার কথা বলে। পরবর্তীতে রতন, মান্নান, জীবন, দীপু, আউয়াল ও নুরনবীকে ডাকাতির পরিকল্পনার কথা জানায় এবং ডাকাত মান্নান তার সহযোগী সোহাগ, আসলাম, রাসেল, নাঈম ও আলাউদ্দিনকে নিয়ে ডাকাতিতে যোগ দেয়। ডাকাতিতে রতনের নেতৃত্বে মোট ১৩ জন ডাকাত অংশ নেয়। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী রতনের নেতৃত্বে গত ২ আগস্ট, দুপুরে গাজীপুরের জিরানী বাজার এলাকায় সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী বাসে ডাকাতির পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। মূল পরিকল্পনাকারী রতন ডাকাতির কাজে প্রস্তুতির আর্থিক খরচ বহন করে। চক্রের সদস্যদের ছোট ছোট দলে বিভক্ত করে প্রত্যেকের কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, রতন ডাকাত ২ আগস্ট রাতে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা মোড়ের একটি দোকান থেকে ডাকাতি কাজে ব্যবহৃত ৪টি চাকু, ২টি ধারালো কাঁচি ও ১টি ক্ষুর সংগ্রহ করে।

তিনি জানান, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ডাকাতির রাতে ডাকাত রাজাসহ চক্রের অন্যান্য সদস্যরা সিরাজগঞ্জ রোড মোড় এলাকায় ঘোরাঘুরি করতে থাকে। রাত আনুমানিক ১টার দিকে কুষ্টিয়া থেকে নারায়ণগঞ্জগামী ঈগল এক্সপ্রেস পরিবহনের একটি বাস সিরাজগঞ্জ রোড মোড় এলাকায় পৌঁছলে ডাকাত রাজা বাসটিকে থামার সংকেত দেয় এবং যাত্রীবেশে প্রথমে রতন, রাজা, মান্নান ও নুরনবী ঈগল এক্সপ্রেস পরিবহন বাসটিতে উঠে। পরবর্তীতে আরও দুই দফায় ডাকাতচক্রের অন্য সদস্যরা বাসটিতে যাত্রীবেশে ওঠে। বাসটিতে ২৪ জন সাধারণ যাত্রী থাকায় ডাকাত চক্রের অধিকাংশ সদস্য বাসের পেছনের দিকে বসে। বাসটি যখন বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু এলাকা অতিক্রম করে তখন রতন ডাকাত দলের সদস্যদের চাকু ও ধারালো কাঁচি দেন। আউয়াল ধূমপানের কথা বলে বাসের গেটের কাছে যায় এবং অন্যান্যদের ইশারা দিলে রাজা, রতন, মান্নান ও নূরনবী ড্রাইভিং সিটের কাছে গিয়ে ড্রাইভারকে মারধর করে এবং রতন বাসের ড্রাইভিং সিটে বসে বাসের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ডাকাত দলের বাকি সদস্যরা বাসের চালক ও সুপারভাইজার, হেলপারসহ অন্যান্য সাধারণ যাত্রীদের হাত মুখ বেঁধে সিট কভার দিয়ে মুখ ঢেকে দেয় এবং যাত্রীদের সাথে থাকা নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে এবং শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটায়। পরবর্তীতে টাঙ্গাইলের হাটুভাঙ্গা মোড় হয়ে মধুপুরে যাওয়ার পথে মধুপুরের রক্তিপড়া এলাকায় রতন গাড়ি চালানোর সময় লুট হয় মালামাল। পরে মালামাল নিয়ে ডাকাত দলের সদস্যদের মধ্যে বাক-বিতন্ডার কারণে রতন পেছনের দিকে তাকালে বাসটি রাস্তার পাশের বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা লেগে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একপাশে হেলে পড়ে। তখন ডাকাতদলের সবাই লুটকৃত মালামালসহ বাস থেকে নেমে পালিয়ে যায়।

আরও পড়ুন: বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনায় প্রধান আসামি গ্রেপ্তার

র‌্যাব জানায়, পরবর্তীতে বাসে করে ডাকাত চক্রের সদস্যরা টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকায় যায় এবং অটোরিকশাযোগে মধুপুরের কুড়ালিয়া এলাকায় রতনের নিকটাত্মীয়ের ফাঁকা বাড়িতে গিয়ে লুন্ঠিত মালামাল নিজেদের মধ্যে বন্টন করে। পরে রতন গাজীপুরের বোর্ড বাজার এলাকায় আত্মগোপন করে। গ্রেপ্তারকৃত মান্নান, আলাউদ্দিন ও বাবু পৃথকভাবে আশুলিয়ার জিরানী বাজার এলাকায় আত্মগোপন করে। ডাকাত আসলাম, নাঈম, রাসেল প্রথমে নিজের এলাকায় ও পরবর্তীতে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ এলাকায় আত্মগোপন করে। ডাকাত জীবন কোনাবাড়ীতে আত্মগোপন করে। ডাকাত দীপু প্রথমে টাঙ্গাইলের পিরোজপুর গ্রামে ও পরবর্তীতে গাজীপুরের কালিয়াকৈর এলাকায় আত্মগোপন করে। সোহাগ প্রথমে জিরানী বাজার ও পরবর্তীতে জামালপুর জেলায় এবং পুনরায় জিরানী বাজারে আত্মগোপন করে।

 র‌্যাব জানায়, রতন হোসেন ডাকাতির মূল পরিকল্পনাকারী। সে পেশায় গাড়ির হেলপার। তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই ডাকাতির অভিযোগ ছিল। রতন ২০১৮ সালে নূরনবী, জীবন ও অন্যান্য কয়েকজনকে নিয়ে রোড ব্লক করে সাভার পরিবহনের একটি বাস ডাকাতি করে। বাস ডাকাতির ঘটনায় রতন গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় দেড় বছর কারাভোগের পর জামিনে বের হয়ে ২০২০ সালে। পুনরায় নূরনবী, জীবন ও আউয়ালকে নিয়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটি অটোরিকশা ছিনতাই করে। তখন ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনতা জীবনকে ধাওয়া করে ধরে ফেলে। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে রতন প্রায় ১ বছর কারাভোগ করে। কারাভোগের পর জামিনে বের হয়ে সে তার সিন্ডিকেট নিয়ে সাভার, গাজীপুর বা সিরাজগঞ্জ এলাকায় মহাসড়কে আরও বেশ কয়েকটি ডাকাতি করে। 

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জীবন পেশায় গাড়ির হেলপার। টাঙ্গাইলে ডাকাতিতে সে যাত্রীদের মালামাল লুটের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। সে ২০১৮ ও ২০২০ সালে দুটি ডাকাতির মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করে।  মান্নান গাজীপুরের একটি গার্মেন্টে চাকরি করত। সে ২০১৯ সালে আশুলিয়া থানায় একটি চুরির মামলায় কারাভোগ করেছে বলে জানা গেছে। তার নেতৃত্বে ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন গার্মেন্টসে চাকরিরত আলাউদ্দিন, সোহাগ, বাবু, দীপু, রাসেল, রায়হান, নাঈম উক্ত ডাকাতিতে অংশ নেয়।

র‌্যাব আরও জানায়, সাম্প্রতি মহাসড়কে আন্তঃজেলা ডাকাত চক্রের বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেটকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় র‌্যাব। ২০২১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রংপুর জেলার পীরগঞ্জ এলাকায় হানিফ পরিবহনের চালক হত্যাসহ বাস ডাকাতির ঘটনায় আন্তঃজেলা বাস ডাকাত চক্রের হোতাসহ ৬ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এছাড়াও গত ৪ জুন (২০২২) ডাকাতির প্রস্তুতিকালীন আন্তঃজেলা ডাকাতচক্র ‘ঠান্ডা-শামীম বাহিনী’র ডাকাত সর্দারসহ ১১ জন এবং ১২ জুন আশুলিয়ায় হানিফ পরিবহন ও গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে স্টার লাইন পরিবহনের বাসে ডাকাতিসহ বিভিন্ন সময়ে দূরপাল্লার বাসে ডাকাতির সাথে জড়িত ডাকাত চক্রের ১০ সদস্যকে দেশি ও বিদেশি অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে আইনের হাতে সোপর্দ করেছে র‌্যাব। 

সবশেষ ২ আগস্ট রাতে কুষ্টিয়া থেকে নারায়ণগঞ্জগামী ঈগল এক্সপ্রেস পরিবহনের একটি বাস টাঙ্গাইল অতিক্রম করার সময় ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।  এ ঘটনায় এক যাত্রী বাদি হয়ে মধুপুর থানায় অজ্ঞাত ১০/১২ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন।

আরও পড়ুন: বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণ: রাজার ভাগে ২ মোবাইল ও ৩০০ টাকা

/মাকসুদ/সাইফ/

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়