ঢাকা, রবিবার, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৭ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

নিপীড়িত শিশু থেকে ইয়োগা গুরু

ইকবাল মাহমুদ ইকু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-২১ ৮:১২:৪৩ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১০-২১ ৮:২৫:১৪ এএম

অনেক সময় ব্যর্থতা আমাদের জীবন এমন এক দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়, তখন অনাগত ভবিষ্যত ধূসর, কঠিন মনে হয়। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ হতাশা থেকে ভুল পদক্ষেপ নেয়। জীবনের প্রতি উৎসাহ হারিয়ে অনেককে তখন আত্মহত্যার চেষ্টা করতেও দেখা যায়।

উল্টো দিকে এমন কিছু মানুষ আছেন যারা ব্যর্থ আর হতাশায় পূর্ণ জীবনকে একটু একটু করে বদলে দেবার চেষ্টা করেন। তারা থেমে না থেকে ঘুরে দাঁড়ান। এমন মানসিক শক্তির অধিকারী শুধু নিজের জীবন পরিবর্তন করেন না, তারা অন্যদের জন্য উদাহরণ তৈরি করেন। ঠিক এমনই এক উদাহরণ নাতাশা নোলের।

নাতাশা তখন একদম ছোট, মাত্র তিন বছর বয়সে সে মা’কে হারায়। মাত্র সাত বছর বয়সেই তাকে দেখতে হয়েছিল জীবনের ঘৃণ্য রূপ। গৃহকর্মী দ্বারা সে ধর্ষণের শিকার হয়। এখানেই শেষ নয়, পনেরো বছর বয়স পর্যন্ত চাচা এবং চাচাতো ভাইদের দ্বারা নিয়মিত ধর্ষিতা হতে থাকে নাতাশা। জীবনের এই নির্মম রূপ দেখার পর আমরা কে কতটা শক্ত থাকতে পারতাম জানা নেই, তবে নাতাশা হার মানেনি। শত অনাচার সহ্য করে সে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছে প্রতিনিয়ত।

হ্যাঁ, জীবনের প্রতি তার ঘৃণা এসেছিল, মনের মধ্যে জমা হয়েছিল ক্ষোভ। তারপরও সে নিজেকে সপে দেয়নি ভাগ্যের হাতে। একটু একটু করে গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে। সেই প্রচেষ্টার ফল নাতাশা আজ ইয়োগা স্টার, একজন মোটিভেশনাল স্পিকার, একজন ফটোগ্রাফার, একজন ব্লগার এবং একজন ড্যান্সার। সোশ্যাল মিডিয়ায় বর্তমান সময়ের অন্যতম আকর্ষণ এখন নাতাশা। 

নাতাশা নয়েল ভারতের মুম্বাই শহরের বাসিন্দা। ‘ইয়োগা গুরু’ হয়ে ওঠার আগের জীবনটা তার দুর্বিষহ ছিল। তিন বছর বয়সেই সে দেখেছে মা নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে আত্মহত্যা করছেন!  এই মৃত্যুর জন্য নিজেকেই দায়ী করত সে। তার বারবার মনে হয়েছে চাইলেই সে মা’কে বাঁচাতে পারত। নাতাশা বলেন, ‘আমি চোখ বন্ধ করলে এখনো দেখতে পাই আগুনের মধ্য দিয়ে আমার মা চিৎকার করছেন বাঁচার জন্য! অথচ কেউ এগিয়ে যায়নি। এমনকি আমিও না।’

এই শোক বুঝে ওঠার আগেই ঘটে আরেকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।  গৃহকর্মী দ্বারা ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর সেই ধর্ষকের মা তাকে বলেছিল তার ছেলের হাত ধরে পালিয়ে যেতে। কারণ সমাজ এরপর তাকে মেনে নেবে না। অথচ ওই বয়সে একটি ছোট্ট মেয়ের পুতুল খেলে দিন কাটানোর কথা। কিন্তু নাতাশা নিজেই সমাজের পুতুল হয়ে গেলেন। তবে নাতাশা অন্য আর দশটা সাধারণ মেয়ে ছিল না। চরম হতাশাজনক সেইসব দিনের কথা স্মরণ করে নাতাশা বলেন, ‘আমরা যখন কোনো ধরনের প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাই, তখন আমাদের মনে হতে থাকে, পুরো পৃথিবী আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান করছে! তখন আমার অবস্থাও এমন হয়েছিল যে, আয়নায় আমি নিজের দিকে তাকাতে পর্যন্ত পারতাম না! কেউ যদি আমাকে সত্যিকারের ভালোবাসতো, তবে আমি সেই সত্যিকারের ভালোবাসাও মেনে নিতে পারতাম না।’

জীবনের এমন পরিস্থিতিতে নাতাশা নৃত্যের প্রতি আকৃষ্ট হন। আগ্রহ এতটাই ছিল যে, একবার কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় পড়ে গিয়ে ব্যথা পাওয়ার পরেও ডাক্তারের পরিপূর্ণ বিশ্রামের আদেশ অমান্য করে তিনি নাচের ক্লাসে চলে গিয়েছিলেন। সেই সময় নাতাশা ভাবত, সে হয়ত অনেক কিছু অর্জন করে ফেলতে পারবে, যত বাধা আসুক না কেন! কিন্তু পায়ে আঘাত নিয়ে নাচের ক্লাসে যোগ দেয়ায় তার মেনিস্কাস এবং করনিয়াল মাসল ছিঁড়ে যায়। হাঁটুতে পানি জমতে শুরু করে। এই সমস্যার কারণে নাতাশাকে পরবর্তী সময়ে নাচ ছেড়ে দিতে হয়েছিল।

এই প্রতিকূল পরিস্থিতি নাতাশার মনোবল ভাঙতে পারেনি। নতুন ভাবে নিজেকে তখনো প্রকাশ করার অনেক বাকি ছিল তার। ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে তিনি ইয়োগা করতে শুরু করেন। পনেরো বছর বয়স থেকেই নাতাশার ওজন অনেক বেড়ে যাচ্ছিল। নিজেকে নতুন করে ফিরে পাওয়ার জন্য সব ধরনের জাঙ্ক ফুড পরিত্যাগ করেন তিনি এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও ইয়োগার মধ্যেই নিজেকে আবদ্ধ করেন। 

ইয়োগা গুরু হওয়ার পেছনে নাতাশার শ্রম অনেক দীর্ঘ! এজন্য তাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। বর্তমানে তিনি অন্যদেরকে ইয়োগা শেখান। জীবন ঘিরে নাতাশার মধ্যে এই ইতিবাচক মনোভাব তার ভিডিওর মাধ্যমে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেন। এমনকি সোশ্যাল মিডিয়াতে তার ভিডিও দেখে হাজার হাজার মানুষ অনুপ্রাণিত হয় এবং জীবনকে নতুন ভাবে ফিরে পায়।

নাতাশা সবাইকে শেখান কীভাবে চরম প্রতিকূল পরিবেশ থেকে বের হয়ে আসতে হয়। কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে হয় এবং আশেপাশের মানুষের কটূ দৃষ্টি এবং মন্তব্য উপেক্ষা করে জীবনকে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে হয়। নাতাশা বলেন, ‘কিছু করার আগে সমাজ কী বলবে সেদিকে তোমার লক্ষ্য না করলেও চলবে। কারণ বেলা শেষে তোমাকেই নিজের দেখাশোনা করতে হবে এবং নিজেকে ভালোবাসতে হবে। নিজেকে ভালোবাসতে পারলেই কেবল তুমিও অন্যদের থেকে ভালোবাসা আশা করতে পারো। তুমি চাইলে অনলাইনে অনেক থেরাপি আছে সেগুলোতে অংশগ্রহণ করতে পারো। নিজের যত্নের ব্যাপারে কখনও দোটানায় ভুগবে না!’

বর্তমান সময়ে নাতাশা অনুকরণীয় নারী! সম্প্রতি বিবিসি এ বছরের আলোচিত ১০০ নারীর যে তালিকা প্রকাশ করেছে, তার মধ্যে ঠাঁই পেয়েছেন নিপীড়িত শিশু থেকে ইয়োগা গুরু হয়ে ওঠা নাতাশা নয়েল।


ঢাকা/ফিরোজ/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন