ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ৩০ জুন ২০২২ ||  আষাঢ় ১৬ ১৪২৯ ||  ২৯ জিলক্বদ ১৪৪৩

মালদ্বীপে সুদিন ফিরছে বাংলাদেশিদের

কূটনৈতিক প্রতিবেদক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:৩১, ২১ মে ২০২২   আপডেট: ২২:৪৫, ২১ মে ২০২২
মালদ্বীপে সুদিন ফিরছে বাংলাদেশিদের

ফাইল ছবি

এশিয়ার পর্যটন নির্ভর দেশ মালদ্বীপের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এক তৃতীয়াংশই নিয়ন্ত্রণ করছেন বাংলাদেশি অভিবাসীরা। সহজ অভিবাসন ও কাজের অবারিত সুযোগ থাকায় কর্মসংস্থানের জন্য এই দ্বীপরাষ্ট্রকে বেছে নিয়েছে বাংলাদেশিরা। 

মাত্র পাঁচ লাখ জনসংখ্যার দ্বীপ দেশ মালদ্বীপে এক লাখেরও বেশি বাংলাদেশির বসবাস। বর্তমানে দেশটিতে ৫০ হাজারের বেশি অবৈধ বাংলাদেশি কর্মী চরম হতাশার মধ্যে পালিয়ে পালিয়ে কাজ করছে। এসব অনিবন্ধিত কর্মীদের বৈধকরন সুযোগ গ্রহন করে ওয়ার্ক পারমিট নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে মালদ্বীপ সরকার।

এ বিষয়ে মালেতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস আজ শনিবার (২১ মে) এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, দেশটির ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট মিনিস্টার-এর আওতায় বৈধকরণ প্রক্রিয়ার বর্তমানে চালু রয়েছে। আনডকুমেন্টেড বাংলাদেশি কর্মীদের মালদ্বীপ সরকারের বৈধকরণ সুযোগ গ্রহণ করে বৈধ ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিট সংগ্রহ করার অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস।

দূতাবাস জানিয়েছে, বৈধকরণ প্রক্রিয়ার সুযোগে যদি কেউ বৈধ ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিট সংগ্রহ না করে, তবে তার বিরুদ্ধে মালদ্বীপের আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বৈধকরণের জন্য বর্তমানে বাংলাদেশি শ্রমিকরা যেখানে কাজ করছেন সেই মালিককে ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট মিনিস্ট্রিতে আবেদন করতে হবে।

এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বা সাহায্যের জন্য দেশটির ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট মিনিস্টার বাংলাদেশ হাইকমিশনে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মালদ্বীপ সফরকালে দেশটি প্রেসিডেন্টের সাথে দ্বিপাক্ষিক ফলপ্রসু আলোচনায় বাংলাদেশি অবৈধ কর্মীদের বৈধকরণের বিষয়টিও স্থান পায়। তবে পরবর্তীতে দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশন কর্তৃপক্ষ এসব অবৈধ বাংলাদেশি কর্মীদের বৈধকরণের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।

বৈধতার সুযোগ পেলে এসব বাংলাদেশির বেতনও বৃদ্ধি পেত। মালদ্বীপে কাজ করা বাংলাদেশিদের অভিযোগ, দেশটিতে পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ তৈরি হলেও বাংলাদেশ সরকার শ্রমবাজার সম্প্রসারণে যথেষ্ট তৎপর নয়। এছাড়া বাংলাদেশি কর্মীদের মজুরি বাড়াতেও যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারেনি বাংলাদেশ হাইকমিশন।

দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে মালদ্বীপে আরও বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশির কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মালদ্বীপ অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি দেশ। সে হিসেবে কর্মীরা যে বেতন পান তা অত্যন্ত কম। বাংলাদেশিরা গড়ে বেতন পান ২৫০ থেকে ৩০০ ডলার। পাশাপাশি থাকা ও খাওয়ার জন্য সামান্য ভাতা। এ কারণে একটি ঘরে অনেককে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে।

জানা গেছে, অবৈধভাবে যারা দেশটিতে আগে গেছে তারা নানা বিপদের মুখে পড়ছেন। অনেকের কাজ জুটছে না। অনেকে কাজ পেলেও নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না। আবার গ্রেপ্তার আতঙ্কেও থাকতে হয়। তবে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে অবৈধ কর্মীদের বৈধ হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে মালদ্বীপ। এতে বৈধ হওয়ার অপেক্ষায় আছেন প্রায় ৫০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী।

গত বছরের শুরুর দিকে মালদ্বীপের অভিবাসন বিভাগ জানায়, দেশটিতে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬০৭ জন বিদেশি কর্মী কাজ করেন। এর মধ্যে ৬৩ হাজার কর্মীই অবৈধ। নতুন করে আরো কর্মী ঢুকতে থাকায় ৪ লাখ জনসংখ্যার দেশটিতে ২ লাখের বেশি বিদেশি নাগরিকের অবস্থান করার শঙ্কা তৈরি হয়। এ অবস্থায় গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশটির অভিবাসন বিভাগ এক বছরের জন্য বাংলাদেশ থেকে অদক্ষ কর্মী নেয়া বন্ধ করে দেয়।

মালদ্বীপের বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, দেশটিতে প্রায় ১ লাখ বাংলাদেশি কাজ করছেন, যার মধ্যে ৫০ হাজারই অবৈধভাবে রয়েছেন। গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অবৈধ কর্মীদের বৈধ হওয়ার জন্য আবেদন করতে বলেছে মালদ্বীপ। ইতোমধ্যে কয়েক হাজার শ্রমিক আবেদনও করেছেন। মালদ্বীপের বাংলাদেশ হাইকমিশনের সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত বৈধ হতে কত কর্মী আবেদন করেছেন, তার হিসাব হাইকমিশনের কাছে নেই। এর কারণ অবৈধ কর্মীদের সরাসরি মালদ্বীপ সরকারের কাছে আবেদন করতে হয়।

এদিকে বৈধ হওয়ার চলমান প্রক্রিয়ার মধ্যেই অনেকে আউটপাস (ভ্রমণের বৈধ অনুমতিপত্র) নিয়ে দেশে ফিরে আসছেন। তাদের কেউ সেখানে গ্রেপ্তার হয়েছেন আবার কেউ চাকরি না পেয়ে দেশে ফিরে আসছেন। মূলত যারা বৈধ হওয়ার জন্য এখনো আবেদন করেননি, তাদেরই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক এবং মালদ্বীপের বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে আউটপাস নিয়ে মালদ্বীপ থেকে ফিরে আসেন ৫৯৬ জন কর্মী। ২০১৭ সালে ৯৩১ জন এবং ২০১৮ সালে ফিরে আসেন ১ হাজার ৩২০ জন। গত বছর প্রায় ২ হাজার ৭০০ কর্মী আউটপাস নিয়েছেন। এর মধ্যে গত বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) আউটপাস নিয়েছেন প্রায় ১ হাজার জন। আর শেষ ছয় মাসে (গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর) আউটপাস নিয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৭০০ কর্মী।

ভুক্তভোগী প্রবাসীরা জানান, দালালের প্রলোভনে পড়ে অনেকেই ‘ফ্রি ভিসার’ নামে মালদ্বীপে গিয়ে সঠিকভাবে কোনো কাজ পান না। কেউ কেউ এক বছরের ভিসা নিয়ে আসার পর আর নবায়ন করতে না পারায় অবৈধ হয়ে যান। আবার কেউ কেউ ট্যুরিস্ট ভিসায় গিয়ে পালিয়ে থেকে যায়। দালালদের প্রলোভনে পড়ে কেউ যাতে অবৈধভাবে মালদ্বীপে না যায় সে ব্যাপারে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে বিভিন্ন সময়ে সতর্ক করা হয়েছে।

জানা গেছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটিও মালদ্বীপে অভিবাসী কর্মীদের সমস্যাকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ কারণে গত ৫ জানুয়ারি ও সর্বশেষ ১৪ ফেব্রুয়ারি কমিটির বৈঠকে মালদ্বীপ ইস্যু নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়। এতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন, প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, সংসদীয় কমিটির সভাপতি মুহাম্মদ ফারুক খান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (দক্ষিণ এশিয়া) ফাইয়াজ মুরশিদ কাজীসহ কমিটির সদস্যরা আলোচনায় অংশ নেন।

বৈঠকে বলা হয়, বাংলাদেশ চায় তাদেরকে সেখানে বৈধভাবে থাকার সুযোগ তৈরি করতে। পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের জন্য মালদ্বীপ সরকারের সঙ্গে নিয়মিতভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে করে অবৈধ কর্মীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের সেখানে বৈধ করার মাধ্যমে মালদ্বীপে নতুন করে কর্মসংস্থানের বিষয়ে যে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে তা গতি লাভ করতে পারে।

ঢাকা/হাসান/সনি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়