RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ২৫ নভেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ১১ ১৪২৭ ||  ০৮ রবিউস সানি ১৪৪২

গভীর সমুদ্রে ইলিশরাজ্যে আতঙ্ক

রফিকুল ইসলাম মন্টু || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:২৯, ১৩ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৪:৩৪, ১৩ অক্টোবর ২০২০
গভীর সমুদ্রে ইলিশরাজ্যে আতঙ্ক

ইঞ্জিন রুমে ঘণ্টা বাজছে। ট্রলারের গতি কমানোর সংকেত পেয়ে খলিলুর রহমান প্রস্তুত হলেন। খুব ধীরে কমতে শুরু করলো ট্রলারের গতি। এবার জাল ফেলতে হবে। সবার চোখ কেবিনের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা মাঝির দিকে। মাঝির চোখ চারদিকের নোনাজলে। গভীর মনোযোগে দেখছেন তিনি সমুদ্রের কোথায় গভীরতা বেশি? কোথায় ডুবোচর? পানির রঙ কেমন? কোন দিকে জাল ফেললে ইলিশ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি?

অনেক সময় ইলিশ পাওয়া-না পাওয়া এই মাঝির ওপরই নির্ভর করে। ইলিশ ধরার কৌশল যে ভালো জানবে, তার জালে ইলিশ একটু বেশিই উঠবে। আড়তদারও দক্ষ মাঝি দেখে বেশি দাদন দেয়। এ কারণে এই জগতে ‘মাঝি’র পদটি গুরুত্বপূর্ণ। মাঝি হলেন ট্রলারের নেতা, তার নেতৃত্বেই ট্রলার চলে।

জানা গেল, এখানে ডুবোচরের সমস্যা আছে, অন্য ট্রলারেরও জাল পাতা। ফলে মাঝি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত ঝুঁকি নিলেন তিনি। মোকতার হোসেনের ‘আঁচলের পতাকা’ ফেলা দিয়ে শুরু হলো জাল ফেলার কাজ। জাল ডুবে যাচ্ছে ইটের ভারে। পানির ওপরে ভেসে থাকছে ফ্লুট আর পঞ্চ। ফ্লুটের সঙ্গে আরও একটি লম্বা দড়ির ফ্লুট এবং কনটেইনার ফেলা হলো। এগুলো জাল মেলে রাখে বলে নাম দেওয়া হয়েছে ‘মেলন’। এদিকে সূর্য প্রায় মাথার ওপরে চলে এসেছে। প্রত্যেকের ঘাম শরীর বেয়ে নেমে যাচ্ছে ট্রলারের পাটাতনে। এই কষ্ট তখনই সার্থক হবে যখন ইলিশ বিক্রির টাকা পকেটে আসবে।

ইলিশের ট্রলারের সবচেয়ে ছোট পদ ‘বাবুর্চি’। এখান থেকেই অধিকাংশ জেলের এই পেশায় হাত পাকানো শুরু। বাবুর্চি মানে শুধু ট্রলারের সবার খাবারের আয়োজন করা নয়, তাকে আরো অনেক কাজ করতে হয়। ইঞ্জিনের দায়িত্ব অবধারিতভাবে তার ওপর বর্তায়। অন্যান্য কাজেও হাত লাগাতে হয়। ইলিশের জাল তোলা কিংবা ফেলার সময় তাকেও সাহায্য করতে হয়। মূল কথা, ট্রলারের প্রত্যেককে দায়িত্ব পালন করতে হয়; এক মুহূর্তের বিরাম নেই। কারণ জাল ফেললেই ইলিশের দেখা মিলবে এমন নয়; নেপথ্যে অনেক গল্প থাকে।

জাল ফেলে তৈয়ব মাঝি চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে আছেন। তার চিন্তার কারণ জাল যদি ঢেউয়ের উপরে উঠে যায় তাহলেই সমস্যা। জাল যাতে ঢেউয়ের নাগাল না পায় সেভাবেই জাল ফেলা হয়েছে অতি সতর্কতায়। তারপরও সমস্যা হয়ে গেলে কিছু করণীয় থাকবে না। মাঝি একবার জালের দিকে তাকাচ্ছেন, আরেকবার ঢেউ দেখছেন। সমুদ্রের প্রবণতা হলো, যেখানে ডুবোচর থাকে সেখানে ঢেউয়ের তীব্রতা বেশি। কিন্তু জাল স্রোতের তোড়ে সেদিকেই যাচ্ছে। সম্ভবত আর রক্ষা নেই। ঢেউয়ের সঙ্গে জাল মিশে গেলে জালের ক্ষতি হয়। জাল ওঠানো এবং জাল ফেলার যে ছন্দের কথা আগে বলেছিলাম, সেই ছন্দ আর থাকে না। ঢেউয়ের তোড়ে জাল ছিঁড়ে যায়। আবার পেঁচিয়ে গেলে সেই জাল গুছিয়ে নিতে অনেক সময় লাগে। জালের শেষ মাথার পতাকার দিকে তাকিয়ে মাঝি মোটামুটি নিশ্চিত- সর্বনাশ যা হবার হয়ে গেছে। সুতরাং ইঞ্জিন রুমে ঘণ্টা বেজে ওঠে। খলিলুর রহমান দ্রুত ইঞ্জিনের পাওয়ার বাড়িয়ে দিলেন। যেতে হবে জালের শেষ মাথায়, পতাকার কাছে। সেখান থেকেই জাল তোলা শুরু হবে। কারণ ইলিশের আশা বাদ দিয়ে জাল কতটা অক্ষত অবস্থায় উঠিয়ে আনা যায় সেই চেষ্টা করতে হবে।

ট্রলার চলছে উত্তাল ঢেউয়ের দিকে। এটা খুব বিপজ্জনক সময়। ঢেউ অতিক্রম করে আমাদের যেতে হবে আরও অনেক দূরে। বিপদে না পড়লে এই ঢেউ অতিক্রম করে না কোনো ট্রলার। মাঝির মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারি, আমরাও বিপদে পড়েছি। ইলিশ ধরার ট্রলার সমুদ্রে নামাতে মোট খরচের মধ্যে জাল কেনায় বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়। মাঝি চাইছেন  জাল যতটা বাঁচানো যায়। ট্রলার এগিয়ে চলে। আমরা পড়ি দেওয়ার চেষ্টা করি সেই উত্তাল ঢেউ। ঢেউয়ের তোড়ে ট্রলারটি প্রায় ডুবে যাওয়ার অবস্থা। ঢেউয়ের সঙ্গে ট্রলার একবার অনেক উপরে উঠে যাচ্ছে যেন তার আকাশ ছোঁয়ার ইচ্ছে। কিন্তু পরমুহূর্তেই ট্রলার নেমে যাচ্ছে অনেক নিচে। এভাবেই চলল অনেকক্ষণ। দক্ষ মাঝি না হলে এই অবস্থায় ট্রলার ডুবে যাওয়ার ভয় থাকে। আমি সাধারণত ট্রলারে উঠলে এই দুলুনি অসম্ভব উপভোগ করি। ট্রলারে উঠব অথচ ট্রলার দুলবে না- কী করে হয়! অথচ ঢেউয়ের এই উচ্চতা দেখে আমিও কিছুটা ঘাবড়ে গেলাম। ভয় হলো এই ভেবে, এখানে ট্রলার ডুবলে কী হবে! সমুদ্রে যেসব ট্রলার ডোবে, সেগুলোর কেসস্টাডি থেকে জেনেছি, ট্রলার ডুবে গেলে জেলেরা ট্রলার ধরেই বাঁচার চেষ্টা করে। ট্রলার উপুর হয়ে গেলে ভেসে থাকে। কিন্তু ঢেউয়ের ঝাপটায় ট্রলার ধরে থাকাটা খুব কঠিন! আমরা অনেক সময় জানতে চাই- ট্রলারে জীবন রক্ষাকারী বয়া, লাইফ জ্যাকেট ইত্যাদি ছিল কিনা? আসলে ট্রলার ডুবে গেলে এগুলো খোঁজ করার কিংবা এগুলোর সাহায্য নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করার কোনো সুযোগ থাকে না। ঢেউ বা বাতাসের প্রবল ধাক্কায় কে কোথায় ছিটকে যায়, খবর থাকে না।

অবশেষে আমরা জালের পতাকার কাছে পৌঁছলাম। জেলেরা দ্রুত হাতে জাল টেনে তুলতে লাগলেন। দেখা গেল জালের অনেক জায়গা পেঁচিয়ে গেছে, অনেক জায়গায় ছেঁড়া। মাঝি যে আশঙ্কা করেছিল তাই হয়েছে। অথচ কিচ্ছু করার নেই। এবার ঘাটে ফিরে অন্তত একদিন বসে থাকতে হবে। জাল গুছিয়ে মেরামত করে আবার নামতে হবে। জাল টানা চলছে। আমরা যে ক’জন অকর্মা ট্রলারে বসে জাল টানা দেখছি তারাও হাঁপিয়ে উঠেছি রোদের তাপে। একইসঙ্গে কিছুটা ভয়ও আমাদের গ্রাস করেছে।

সমুদ্রে জাল ফেলতে এসে এত ভয়! মাত্র এটুকু সময়ে ইলিশ ধরা দেখতে এসে বেশ কয়েকটি ঘটনার মুখোমুখি হলাম। জাল ফেলতে গিয়ে বারবারই চিন্তিত হতে দেখেছি তৈয়ব মাঝিকে। মহাসমুদ্রেও যেন জাল ফেলার জায়গা খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি। জাল ফেলার ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হলো, অন্য ট্রলারের জালের সঙ্গে জাল বেঁধে যাওয়া। এটা আগে বোঝা যায় না। হয়তো কাছাকাছি কোনো ট্রলার বা জাল নেই। কিন্তু জাল ফেলার পর স্রোতের তোড়ে এক ট্রলারের জালের সঙ্গে আরেক ট্রলারের জাল আটকে যায়। তখন দেখা দেয় বিপত্তি। এই ঘটনা আগের রাতে ঘটেছে। এমন হলে দুই ট্রলারই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইলিশরাজ্যের এসব সমস্যার কথা আমি আগেও জেলেদের মুখে শুনেছি। এবার দেখে গেলাম। মনে পড়ছে, আমাকে ঢালচরে একবার নূরুদ্দিন মাঝি বলেছিলেন, সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে অনেক ধরনের সমস্যায় পড়ছেন তারা। জলবায়ু পরিবর্তন কিনা তারা জানেন না, তবে পরিবর্তন ঘটছে। আগে এত ডুবোচর কিংবা তুফানের মুখে তারা পড়েননি। এখন তো প্রায়ই ঝুঁকি নিতে হয়। আমাকে জেলেরা একবার বলেছিলেন, রাতে সমুদ্রে মাছ ধরার জন্য সিগন্যাল বাতির ব্যবস্থা করলে ভালোভাবে ইলিশ ধরা সম্ভব। কারণ রাতে অনেক সময় অন্য ট্রলারের জাল দেখা যায় না, ডুবোচর আন্দাজ করাও কষ্টসাধ্য। 

তুফানের বিপজ্জনক অবস্থা থেকে জাল তুলে এনেছেন তৈয়ব মাঝির ট্রলারের জেলেরা। কিন্তু জাল আর পুরোটা অক্ষত রাখা গেল না। অনেক বিপদ পেরিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এতক্ষণ ধরে তো বাবুর্চি খলিলের দেখা পেলাম না। কোথায় গেল সে? ভাজা ইলিশের প্লেট যখন ট্রলারের কেবিনের ওপরে আমাদের সামনে চলে এলো; তখনই বুঝতে পারলাম- খলিল বসে ছিলেন না। শুধু ইলিশ ভাজা নয়, খলিল সবার জন্য ভাতও রেঁধেছেন। ওদিকে দুপুরের খাবার সময় হয়েছে। অধিক খাটুনিতে সবার ক্ষুধা একটু বেশিই লেগেছিল। কেউ কেউ সমুদ্র থেকে বালতি ভরে পানি তুলে গোসলের কাজ সেরে নিলেন।  

এবার আমাদের তীরে ফেরার পালা। উপরে তপ্ত রোদ আর নিচে নোনাজলের ওপরে ভেসে ট্রলার ছুটে চলল ঢালচরের উদ্দেশ্যে।

ঢাকা/তারা

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়