ঢাকা     শুক্রবার   ২০ মে ২০২২ ||  জ্যৈষ্ঠ ৬ ১৪২৯ ||  ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩

ছোটগল্প : আগমনীর কান্না    

শ্যামল নাথ  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৪৮, ২৯ অক্টোবর ২০২১  
ছোটগল্প : আগমনীর কান্না    

অলঙ্করণ: অপূর্ব খন্দকার

ট্রেনে অসম্ভব ভিড়।
বাতাস স্নিগ্ধ, আকাশ নীল। সোনা ঝরা রোদ। মৃত্তিকার মনে দু’দণ্ড শান্তি নেই। অনেকদিন পর চোখে কাজল নেই। মন অস্থির। 
মৃত্তিকার দাদা জানতে চাইলো- ‘কিরে! কী হইছে তোর?’
‘তেমন কিছু না।’ গলা শুকিয়ে আসছে মৃত্তিকার, যেন নরম মাটি আজ মরুভূমি। সে জল চাইলো- ‘দাদা, জল হবে তোর ব্যাগে?’
‘না রে, হবে না।’

সামনেই মৃত্তিকার জন্মদিন। এরপর দুর্গাপূজা। 
দশমীর ভাসানের মতো তাকেও ভাসিয়ে দিতে চাইছে মা-বাবা। না না, খোঁজখবর নিয়েই ভাসাবে। কিন্তু সে নিজের মতো করে, নির্ভরতার আকাশ খুঁজে ভাসতে চাইছে। ডুবতেও হয়তো! ট্রেন চলছে। মন বলছে তুই তমালের কাছে যা।

ট্রেন রাজশাহীর দিকে গেলেও মন পড়ে আছে ঢাকায়। তমালের কাছে মৃত্তিকাকে একটু জেদী, একটু দুরন্ত, একটু অভিমানী মনে হয়। অন্যদিকে মৃত্তিকার কাছে তমাল সংযমী ও ভীষণ সহিষ্ণু।

গত কয়েকমাস হলো বিয়ের উৎপাত শুরু করেছে বাবা-মা। যেন বিয়েটা দ্রুত না হলে সকল অমঙ্গল ভর করবে মৃত্তিকার জীবনে। অথচ মৃত্তিকা তমালের কথা কিছুই বাসায় জানাতে পারে না। কারণ, তমাল উড়নচণ্ডী টাইপের; সুস্থির নয়- এই বলে ‘আমি চীন যাবো’, ‘এই বলে পোল্যান্ড’। মৃত্তিকা বলে, ‘‘তুমি স্থির হও। তুমি ‘তুমি’ হও। অন্যের পেছনে ঘুরে তোমার কি লাভ? তুমি যেসব কাজ করছো তোমার চে’ দশগুণ কম জানা লোকও আজ এস্টাব্লিশ হয়ে গেছে। কেবল তোমার গাধামীর জন্য তুমি কিছুই করতে পারছো না।’’
তমাল ভুল বুঝতে পারে। সে বদলাতে চায় পোশাকে, চিন্তায়-চেতনায় ও মননে। কিন্তু সময় বড়ই কম মৃত্তিকার হাতে। এবারও নিজের বিয়েটা ভাঙতে হবে মৃত্তিকার।

ঝনঝন করে ট্রেন চলছে। বাতাস বইছে। চুল উড়ছে। হঠাৎ মৃত্তিকার মোবাইলে কল আসে-‘হ্যাঁ, তমাল বল।’
ওপাশ থেকে তমাল বলে, ‘সাবধানে যেও।’
‘হ্যাঁ যাচ্ছিই তো, একবারেই যাচ্ছি।’ এই বলে ঝাঁজালো কণ্ঠস্বর ছড়ায় মৃত্তিকা বাতাসে। শান্ত বাতাসও যেন অশান্ত হয়ে ওঠে। তবু শরতের আকাশে তখনও নীলে ছেয়ে আছে। এ নীল  প্রেমের উদ্রেক না করে বিষের পেয়ালার কথা মনে করাচ্ছে। জানালা দিয়ে মৃত্তিকা তাকায়, চোখের জল এলেও সে চেপে রাখে। ট্রেন শহর পেরিয়ে গ্রামের দিগন্ত বিস্তৃত মাঠের দিকে এগুচ্ছে। জলে শাপলা-শালুক ভেসে ওঠা দেখে মৃত্তিকা। যেন শরতের প্রকৃতি শিউলি ছোপানো শাড়ি পরে আছে। কিন্তু মৃত্তিকা ইচ্ছে করেই এবার বাড়িতে যাওয়ার সময় ব্যাগে একটাও শাড়ি নেয়নি।

মনের মধ্যে শতাব্দীর ব্যবধান লুকিয়ে স্বার্থহীন প্রেম জলাঞ্জলি দেবে নাকি মাতৃ-পিতৃস্নেহের কাছে বুকটাকে পদ্মপাতার মতো স্থির করবে শান্ত জলে! সেসব ভাবতে ভাবতে ট্রেন এগোয়। সেইসঙ্গে চিন্তা বাড়ে। সৌরভ সবই লক্ষ্যে করে। কিছুই বলে না। বুঝতে পারে। মনে হয় শরতের ঠান্ডা বাতাসে অসহ্য, অসহনীয় গরম পড়ছে।

এই তো গত সপ্তাহে মায়ের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে তার। সে নিজে কিছু করতে চায়। তার পরিবার আর তাকে সময় দিতে চায় না- কেবল বিয়ে দিয়ে দিতে চায়। যেন বিয়েই একমাত্র যুক্তি, বিয়েই একমাত্র মুক্তি। মা বলে, ‘তোর বয়স হয়েছে, আর কতদিন বিয়ে ছাড়া থাকবি? নানান লোক নানান কথা বলে।’
‘বলুক মা, আমি নিজে কিছুদিন চাকরি করি তারপর না হয় ঝুলে যাবো। এখন আমাকে জোর করো না, আমার মনের বিরুদ্ধে এমন করো না মা।’ 
মৃত্তিকার মা প্রতিমা দেবী রেগে গিয়ে উচ্চকণ্ঠে বলে, ‘চাকরি-টাকরির এখন দরকার নাই। বিয়ের পরেও চাকরি করা যাবে।’
‘মা, আমি তো চাকরি করেছি গত দেড় বছর। এখন তো করোনা এলো, চাকরিটাও গেল। কত লোকের চাকরি গিয়েছে জানো? আমার তো একার না! একদিন সব শান্ত হবে, স্বাভাবিক হবে। তখন সব ঠিক হয়ে যাবে মা।’ 
‘শান্ত স্বাভাবিক বুঝি না, তোরে আগামী ছয় মাসের মধ্যে বিয়ে দিমু। চাকরি পাও বা না পাও।’

অধিকাংশ বাঙালি নারীর এই নিয়তি! মৃত্তিকার মাথায় যেন বাজ পড়ে। কারণ, তমালেরও চাকরি চলে গেছে করোনাকালে। দু’জনই বেকার। সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ভেঙে পড়ছে মাথায়। আবার সে ভাবছে ঢাকায় একা একা টিকে থাকাও কঠিন। এই শহর কাউকে আপন করে নেয় না। আবার যাকে নেয় সে সবই পায় জীবনে। সেই সব পাওয়ার জীবন কবে নামবে মৃত্তিকার জীবনে; সে বিষয়ে সে সন্দিহান নয়। সে আত্মবিশ্বাসী একদিন সব হবে। তবুও জীবনকে পোকার মতো মনে হয় মৃত্তিকার। অস্তনমিত সূর্যের একমাত্র আলো হয়ে সে বেঁচে থাকার প্রেরণা পায় কেবল নিজের কাছেই। মন অল্প খারাপ হলে, সে তমালকে ডেকে নিয়ে যায় চন্দ্রিমা উদ্যানে, সংসদ ভবনের দিকে। শত শত ছবি তোলে। তমাল বসে থাকে, মৃত্তিকা হেঁটে বেড়ায়। আজকাল তার অন্য মানুষের সঙ্গে কথা হয় না। সে প্রতিদিন বৃক্ষের কাছে যায়। কারণ, বৃক্ষকে তার সখা মনে হয়। কোনো মানুষকে নয়। কখনোও কৃষ্ণচূড়ার নিচে গিয়ে বসে। বসে অন্য গাছগুলোর দিকে তাকায়, দেখে গৌধূলির আমন্ত্রণ। দেখে গাছের পাতায় পাতায় রোদ কেমন করে পিছলে যায়। যেমন করে মানুষও পিছলে যায় বিশ্বাস-অবিশ্বাসে। আলোটা কেমন করে এখান থেকে ওখানে সরে যায়। সে ভাবে জীবন এমনই।

মৃত্তিকা শহরের নানান যন্ত্রণা বুকে ধারণ করে বেড়ে ওঠে। আবারও তার মন খারাপ হয়। মন বেশি খারাপ হলে সে একা একা যায়। সে সংসদ ভবনের পাশে যায়, নানান ফুল দেখে, বাতাসে কৃষ্ণচূড়া ফুলের নাচন দেখে। পাখির বসে থাকা দেখে। দিগন্ত ছুঁয়ে যাওয়া সবুজের হাতছানি দেখে। লেকের জলে পায়ের পাতা ভিজিয়ে বসে থাকে। সে কাঁদে না। কান্না এলে বৃষ্টির শব্দ শোনে। চোখের পাতায় স্বপ্ন বোনে, দুর্বা ঘাসে আলতা রাঙা পা বিছিয়ে বসে থাকে। মনের সাত রঙ মিশিয়ে তৈরি করে চোখের অনুভূতি। 

ট্রেন চলছে। অস্থির মন খানিক বাদেই কাশফুলের দোল খাওয়া দেখে শান্ত হয়। কাশফুল, বকুল ফুল, হাসনাহেনা, কদমফুল তার খুব প্রিয়। মন খারাপের দিস্তায় সাদা সাদা খাম যেন উড়ে যাচ্ছে। ডাকপিয়নেরা নেই সেখানে। সেখানে কেবল মেঘের ওপারে মেঘ। মনের ওপারে মন। লিখতে চাইলেও লেখা থাকে না কিছুই। আবার লেখা থাকে কেউ বলতে পারে না, বুঝতেও না। সে তমালের লেখা কবিতা মনে মনে আওড়ায়- ‘আবার জন্মালে চুকিয়ে দেবো সব লেনাদেনা/ এ জন্মের ঋণ, এ মুখটি ভীষণ চেনা...।
আবার হঠাৎ করেই রবিঠাকুরের ‘শরৎ বন্দনা’র কথা মনে পড়ে- ‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরির খেলা/ নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা।’ 

ঝক ঝক ঝক করে ট্রেন ছুটে চলছে। কিন্তু সময় যেন শেষ হচ্ছে না মৃত্তিকার। বাড়িতে গিয়ে একটু রেস্ট নিতে পারলেই মনে হয় মাথাটা ঠান্ডা হবে। মাথাটা এমনিতেই তার একশো ডিগ্রির উপর গরম হয়ে থাকে সব সময়। রগচটা মেয়ে সে। রগচটা মেয়েরা নাকি সৎ হয়- কেউ কেউ বলে। ওকে দেখলে বোঝা যায়। 

মৃত্তিকার বাবার ফোন আসে- ‘কিরে সোনা, কতদূর?’ মৃত্তিকার ডাক নাম স্বর্ণা। অনেকে আদর করে ‘সোনা’ বলে। ‘এই তো বাবা মির্জাপুর’। 
‘সাবধানে আসিস, কিছু খেয়ে নিস মা।’
‘ঠিক আছে বাবা।’ 

কান্নায় বুক ভেঙে এলেও মৃত্তিকা শক্ত প্রকৃতির মেয়ে। সে কখনোও কাউকে কিছু বুঝতে দেয় না। 
শরতের নীল, নির্জন, নির্মল আকাশে এখন রাজ্যের আশঙ্কা। মৃত্তিকার বাবা চৌবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন অসাধরণ শিক্ষক। কিন্তু কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার মুখের অসহায়ত্ব তার চোখে-মুখে। সেই মুখ দেখার ভার সহ্য করা যায় না। মৃত্তিকা এখনো ভাবছে সে পৃথিবীর বুকে কোন মানুষটিকে মুক্তি দেবে? সে কি তার জন্মদাতা পিতাকে না ভালোবাসার অতলস্পর্শী তমালকে।

ঢাকায় আসার পর কি নিদারুণ কষ্ট ও অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে সে গিয়েছে। শহর ছাড়তে বললে যেন জীবনকে ছেড়ে দেওয়ার মতো অবস্থা হয় তার। ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ে পড়া অবস্থায় কত যে টিউশনি সে করেছে। কত যে পায়ের জুতা ক্ষয় হয়েছে, কত পায়ের গোড়ালি। নিজের ইচ্ছায়, কিংবা অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্য। কত বাজে ব্যবহার, কত মানুষের অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে ঢাকায় টিকে থাকার কথা তার মনে পড়ছে। একবার তো তার বান্ধবী শ্রেয়া তাকে সামান্য কারণে এমন অপমান করেছে যে, সে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল। এরকম অপমান কত যে এই শহরের মানুষে তাকে দিয়েছে সে সব ভাবলে সে ভয় পায়।  কতবার ধর্ষক পুরুষের চোখ এড়িয়ে সে বেঁচে এসেছে। কতবার চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরেছে। কতবার কতদিন না খেয়ে থেকেছে। কতবার কতজন তাকে কথা দিয়ে রাখেনি- সেসব কথা মনে করতেই ঘেন্না ধরে তার। তবুও ঢাকাই তার কাছে আপন। কারণ, ঢাকা তাকে একটা ডিগ্রী দিয়েছে, একটা পরিচিতি দিয়েছে, একটা থাকার জায়গা দিয়েছে।

একবার তো চট্টগ্রামের বন্ধু সজল তাকে মিথ্যা ভালোবাসার ফাঁদে ফেলেছিল। সজল ঢাকায় আসতো মাঝেমাঝে। এলে তারা রেষ্টুরেন্টে খেতে যেতো। অধিকাংশ সময় মৃত্তিকাই বিল পরিশোধ করতো। সম্পর্কের ছয় মাস যেতে না যেতেই, অনুভূতির আদান প্রদান হতে না হতেই সজল একদিন মন না ছুঁয়ে শরীর ছোঁয়ার আবেদন করে বসলো। সজল ঢাকা এলে হোটেলে ওঠে। যথারীতি বাংলামোটরের এক হোটেলে উঠে সজল বিকেল বেলায় মৃত্তিকাকে ডেকেছিল। মৃত্তিকা দুপুরের খাওয়া খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে তখন। সে ঘুমের ঘোরে প্রথমে যেতে রাজি হলেও নিজেকে সামলে নিয়েছিল। সেদিন সজল বলেছিল, ‘প্রেম মানে কেবল গাছে বরই থাকবে, আর সে বরই আমি কেবল দেখে যাবো তা নয়। সেই বরই পেড়ে লবণ দিয়ে খাওয়ার নামই প্রেম।’ 

মৃত্তিকা বলেছিল, ‘আগে মানুষকে সম্মান করো, তারপর না হয় শরীর ছুঁয়ে দেখো। বরই পেড়ে খাবা মানে? আমি কি বস্তু, খাওয়ার জিনিস? কি বলো এসব তুমি? তুমি বন্ধু আছো বন্ধুই থাকো। আর কথা বাড়াইও না। আর কখনো আমার চোখের সামনে আসবে না।’ 

সম্পর্কটা আর এগোয়নি। তারপর যেন দেবদূতের মতো তমাল এলো তার জীবনে। একবার এই শহরকে মৃত্তিকার মহান মনে হয়, তো একবার নিকৃষ্ট মনে হয়। এক ফ্ল্যাটের খবর অন্য ফ্ল্যাটের লোক জানে না। সবাই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো- এগুলো মৃত্তিকাকে পীড়া দেয়। সে ভাবে শহরটা যদি গ্রামের মতো স্নিগ্ধ ও নরম অনুভূতির হতো! আবার সে ভাবে, তার বাবা-মা তো গ্রামে থাকেন কিন্তু তারাও তো তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তারাও যেন দ্বীপের মতো। আপন হয়েও আপন নয়।

ঢাকায় যখন প্রথম আসে মৃত্তিকা কি সাদাসিধে ছিল- পোশাকে, চলনে বলনে। এখন সে অনেক চালাক হয়েছে। এই শহর তাকে আধুনিক করেনি কেবল যান্ত্রিকও করেছে। এই শহরে সে জীবনের মানুষ খুঁজে পেয়েছে। তাই এই শহর ছেড়ে যাওয়া তার কাছে অসম্ভব। কিন্তু এই শহর তাকে ছাড়তেই হবে। না হলে সে খাবে কি? কে তাকে জায়গা দেবে? এসব চিন্তা তার পেছনে যেন ফেউয়ের মতো লেগে আছে। শহর ছাড়লে তমালের সঙ্গে মৃত্তিকার দেখা হবে না। বাড়িতে গেলে যোগাযোগ করতে সমস্যা হবে। ট্রেনের কামরায় বসে সে কেবল বিসর্জন চায়। দুর্গা মায়ের মতো বিসর্জন। কিন্তু এ বিসর্জন মৃত্যুর।

হঠাৎ মোবাইলে তমালের কল। অপর প্রান্ত থেকে তমাল ভীরু কণ্ঠে বলে, ‘একটা পত্রিকা অফিসে চাকরির অফার পেয়েছি। বাসায় বলতে পারো আমার কথা!’
বলেই তমাল ফোন কেটে দেয়। মৃত্তিকার চোখ দিয়ে টপটপ জল গড়িয়ে পড়ে। এ তো বিসর্জন নয়। আগমনীর কান্না। 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়