ঢাকা     শুক্রবার   ২০ মে ২০২২ ||  জ্যৈষ্ঠ ৬ ১৪২৯ ||  ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩

লাতিন, ইউরোপীয় ও বাংলা সাহিত্যের জাদুবাস্তববাদ: তুল্যপাঠ

মোজাফ্‌ফর হোসেন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৪৩, ৮ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ১৯:০৩, ৮ জানুয়ারি ২০২২
লাতিন, ইউরোপীয় ও বাংলা সাহিত্যের জাদুবাস্তববাদ: তুল্যপাঠ

জাদুবাস্তববাদ ও লাতিন সাহিত্য

শুরুতে জাদুবাস্তববাদের তিনটি মোড় ধরে আমরা কথা বলতে পারি। প্রথম পর্যায়ের সূচনা ১৯২০-এর দশকে জার্মানিতে। দ্বিতীয় পর্যায়ে, ১৯৫৫ সালের দিকে লাতিন আমেরিকায়, যাকে আমরা ‘বুম’ সাহিত্য বলে থাকি। হোর্হে লুইস বোর্হেস (আর্জেন্তিনা, ১৮৯৯-১৯৮৬), আলেহো কার্পেন্তিয়ের (কিউবা, ১৯০৪-১৯৮০), হুয়ান কার্লোস ওনেত্তি (উরুগুয়ে ১৯০৯-১৯৯৪), জর্জ আমাদো (ব্রাজিল ১৯১২-২০০১), হুলিও কোর্তাসার (আর্জেন্টিনা ১৯১৪-১৯৮৪), হুয়ান রুলফো (মেহিকো, ১৯১৭-১৯৮৬), গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস (কলম্বিয়া ১৯২৭-২০১৪), কার্লোস ফুয়েন্তেস (মেহিকো, ১৯২৮-২০১২), মারিও বার্গাস য়্যওসা (পেরু, ১৯৩৬) প্রভৃতি লেখকরা এ পর্যায়ে অবদান রেখেছেন। তৃতীয় পর্যায় বিংশ শতকের শেষ দিক থেকে একবিংশ শতক। 

জার্মান ইতিহাসবিদ, ফটোগ্রাফার এবং শিল্প-সমালোচক ফ্রানৎস রোহ ১৯২৫ সালে তাঁর একটি গ্রন্থের নাম দিলেন—ম্যাজিক রিয়েলিজম: পোস্ট এক্সপ্রেশনিজম; অর্থাৎ জাদুবাস্তববাদ: উত্তর অভিব্যক্তিবাদ। আলোচনাটি চিত্রকলাবিষয়ক। অভিব্যক্তিবাদের কারণে বস্তু বা বাস্তবতা অতিকাল্পনিক বিষয় হয়ে উঠছিল। চেনা বস্তু হয়ে উঠছিল অচেনা। দুটি বিশ্বযুদ্ধের যে ভয়াবহতা এবং জীবনের যে ভয়ঙ্কর পরিণতি অভিব্যক্তিবাদ তা থেকে মুক্তি চেয়েছিল। মানুষকে কল্পনা ও স্নিগ্ধতার প্রতি টেনে নেয়ার চেষ্টা করছিলেন শিল্পীরা। এই প্রয়াসের নাম দিলেন রোহ জাদুবাস্তববাদ। 

কিন্তু রোহের ধারণাটি সাহিত্যে এসে আর টেকে না। সাহিত্যে বাস্তবতাকে দূরে নয়, বরঞ্চ আরো নৈকট্যে আনার জন্য ন্যারেটিভ টেকনিক হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতে থাকে। ফলে জার্মান সাহিত্যে তৎকালে জাদুবাস্তববাদ শব্দটির ব্যবহার কমে যায়। শুরু হয় নতুন নাম—নিউ অবজেক্টিভিটি। তবে জাদুবাস্তববাদ টার্মটি জার্মানে অব্যবহৃত হলেও অন্যত্র বিকোশিত হতে থাকে। শব্দটি স্প্যানিশ সাহিত্যে আসে হোসে ওর্তেগার মাধ্যমে। তিনি তাঁর সম্পাদিত পত্রিকায় ১৯২৭ সালে রোহের প্রবন্ধটি স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ করেন। 

হোর্হে লুই বোর্হেস ১৯৪০-এর দশকে কাফকার সাহিত্যের বাস্তবতার নাম দেন ফ্যানটাসটিকো। কিন্তু নামটি জনপ্রিয়তা পায় না। ১৯৪৯ সালে আলেহো কার্পেন্তিয়ের উপন্যাস ‘দি কিংডম অব দিস ওয়ার্ল্ড’ প্রকাশিত হয়। সেই বইয়ের ভূমিকাতে তিনি প্রথম সাহিত্যের ন্যারেটিভ টেকনিক হিসেবে জাদুবাস্তবতাকে সংজ্ঞায়িত করেন। কার্পেন্তিয়ের বলেন: জাদুবাস্তবতার ধারণায় যে বাস্তবতা সেটি একমাত্র লাতিন আমেরিকাতেই আছে। ইউরোপে আঁদ্রে বিটন কর্তৃক উদ্ভাবিত যে সুররিয়ালিজম বা ফ্রানৎস রোহ কর্তৃক প্রস্তাবিত অভিব্যক্তিবাদ সেটি আসলে মস্তিষ্কসৃজিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইউরোপীয়দের অতিরিক্ত মস্তিষ্কচর্চাজনিত মস্তিষ্কবিকারের ফল। অর্থাৎ ইউরোপের জাদুবাস্তববাদ নির্মিত আর লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তববাদ যাপিত। এখানে মানুষ বিশ্বাস করে অশরীরী অস্তিত্বে। ইউরোপ যেটা নিয়ে ফ্যান্টাসি করে।  

ইউরোপীয় জাদুবাস্তববাদ

আঠারো ও উনিশ শতকের শিল্পবিপ্লব ও ডারউইনের বিবর্তনবাদ ইউরোপের শিল্পসাহিত্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ভিক্টোরীয় যুগে (১৮৩৭-১৯০১) তার প্রতিফলন আমরা পেয়ে যাই। চার্লস ডিকেন্স, জর্জ এলিয়ট, শার্লট ব্রন্টি, টমাস হার্ডি, উইলিয়াম ম্যাকপিস থ্যাকারে, এলিজাবেথ গ্যাসকেল, এমিলি ব্রন্টি, অ্যান ব্রন্টি, অস্কার ওয়াইল্ড, রবার্ট লুইস স্টিভেনসন, সামুয়েল বাটলার, হেনরি জেমস প্রমুখ লেখকের উপন্যাসের মাধ্যমে বাস্তববাদী সাহিত্যের ধারা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষ বৈজ্ঞানিক সত্যের সন্ধান করতে থাকে। ফলে আঞ্চলিক লোকায়ত বিশ্বাসের স্থানে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে বৈজ্ঞানিক সত্য। উপন্যাসে অলীক ও অবাস্তব ‘সত্যের’ কোনো স্থান হয় না। এর পরপরই গোটা ইউরোপে পুঁজির বিকাশ ও পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপীয় সাহিত্যকে আরো বেশি বাস্তবমুখী করে তোলে। এই কারণেই কার্পেন্তিয়ের জোর দিয়ে বলতে পারেন: ইউরোপে অভিব্যক্তিবাদ থেকে জাদুবাস্তববাদ পুরোটাই মস্তিষ্কসৃজিত। অর্থাৎ ইউরোপীয় জাদুবাস্তববাদ নির্মিত, যাপিত না। নির্মিত জাদুবাস্তব প্রায়শই ফ্যান্টাসিতে রূপ নেয়।

এমনকী শিল্পবিপ্লবের বহু আগে লাতিন ও ইউরোপের জাদুবাস্তবতার ঐতিহ্যের দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা দেখব, লাতিন উপন্যাসের জন্ম হয় সার্ভেন্তেসের স্যাটায়ারধর্মী ‘দন কিহোতে’ উপন্যাসের মাধ্যমে। উপন্যাসটি ১৬০৫ সালে প্রকাশিত। অন্যদিকে ইউরোপে উপন্যাসশিল্প নিয়ে আসেন আইরিশ লেখক জোনাথন সুইফট। তাঁর স্যাটায়ারধর্মী উপন্যাস ‘গ্যালিভার্স ট্রাভেলস’ লেখা হয় ১৭২৬ সালে। দুই মহাদেশের এই দুটি উৎসমূলে আমরা দেখতে পাই: ‘দন কিহোতে’ উপন্যাসের ভেতর জাদুবাস্তববাদের বীজ অঙ্কুরিত অবস্থায় আছে, অন্যদিকে ‘গ্যালিভার্স ট্রাভেলস’-এ আছে ফ্যান্টাসির বীজ। দুটি উপন্যাসের উদ্দেশ্য ও গন্তব্য এক হলেও প্রকাশভঙ্গীর ক্ষেত্রে এভাবেই তারা আলাদা যাত্রাপথ বেছে নেয়। এর পেছনেও সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট একটা বড় অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে।  

ইউরোপ ও আমেরিকায় বিশ শতকে এসে জাদুবাস্তববাদের তেমন বিকাশ ঘটেনি যতটা ঘটেছে ফ্যান্টাসি সাহিত্যের। এর জন্য শুধু সাহিত্যিক ঐতিহ্য ও সামাজিক বাস্তবতা না, পাশাপাশি শিল্পের বাজারও একটি বড়ো ভূমিকা পালন করেছে। ইউরোপ-আমেরিকার আধুনিক সাহিত্য বাজারমুখী। বিশ্বে ‘সহজাত’ জাদুবাস্তববাদের চেয়ে ‘নির্মিত’ ফ্যান্টাসির বাজার সবসময় ভালো। এই কারণে এলিস ইন ওয় ‘দ্য লর্ড অব রিংস’, ‘আ গেম অব থ্রনস’, ‘হ্যারি পটার’, ‘দ্য ক্রনিকলস অব নারনিয়া’র মতো অসংখ্য উপন্যাস এখানে লেখা হয়েছে, হচ্ছে। এমনকি ইউরোপ ভূতে বিশ্বাস না করলেও, ভৌতিক উপন্যাস চলচ্চিত্র সবচেয়ে বেশি সৃষ্টি হয় এই অঞ্চলেই।

ফ্যান্টাসি সাহিত্য থেকে সরে এসে ইউরোপের জাদুবাস্তবতা নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের স্মরণ করতে হবে রাশিয়ায় ১৮৩৬ সালে প্রকাশিত গোগলের ‘দ্য নোজ’ গল্পটির কথা। কাফকার ‘মেটামরফোসিস’ ১৯১৫ সালে জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হয়। জার্মান ভাষায় ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত হয় গুন্টার গ্রাসের ‘টিন ড্রাম’। ঐতিহ্যের এই ধারাবাহিকতায় ব্রিটেনে ১৯৮১ সালে প্রকাশিত হয় রুশদির “মিডনাইট’স চিলড্রেন” উপন্যাসটি। এই উপন্যাসগুলোর মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় জাদুবাস্তববাদের চরিত্র আমরা পেয়ে যাই। পরিষ্কারভাবেই গুন্টার গ্রাস কিংবা রুশদির জাদুবাস্তববাদ রুলফো কিংবা মার্কেসের জাদুবাস্তববাদ না। পার্থক্যটা মোটা দাগে এখানে এসে হয়ে যায়, লাতিন সাহিত্য জাদুবাস্তববাদ বিশ্বাসের জায়গা থেকে গ্রহণ করেছে, অন্যদিকে ইউরোপে সেটি হয়ে উঠেছে ‘লিটারারি টেকনিক’, অন্যভাবে সাহিত্যের আখ্যানরীতি। এই পার্থক্য শুধু সৃজনশীল সাহিত্যে না, জাদুবাস্তববাদের তাত্ত্বিক আলোচনাতেও চোখে পড়ে—দুই মহাদেশীয় তাত্ত্বিকরাও জাদুবাস্তববাদ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন অভিমত ব্যক্ত করে থাকেন। 

বাংলা সাহিত্য ও বাংলাদেশের জাদুবাস্তববাদ

ইউরোপের জাদুবাস্তববাদ নিয়ে কথা হচ্ছিল। সেখানকার জাদুবাস্তববাদ যদি নির্মিত বা মস্তিষ্কসৃজিত হয় তবে বাংলা সাহিত্যে সেটা অনেকাংশে অনুকৃত। একজন অবাঙালি কর্তৃক লিখিত ১৮৫২ সালে প্রকাশিত ‘ফুল মণি করুণার বিবরণ’ গ্রন্থটিতে উপন্যাসের কিছু লক্ষণ ছিল। ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত হয় প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’, এখানে সেই লক্ষণ আরো স্পষ্ট হয়। কিন্তু বাংলা ভাষায় আধুনিক উপন্যাসের ধারা প্রতিষ্ঠিত হয় ইউরোপীয় উপন্যাসের আদলে। বাংলা ভাষার প্রথম সার্থক উপন্যাস বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দুর্গেশনন্দিনী’, প্রকাশিত হয় ১৮৬৫ সালে। এরপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে জনপ্রিয় লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়—প্রত্যেকে বাস্তববাদী ধারার উপন্যাস রচনা করেন। অনেক পরে এসে বাংলা সাহিত্যে কেউ কেউ সচেতনভাবে জাদুবাস্তববাদের চর্চা শুরু করেন। বিশেষ করে ষাটের দশকে লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে বুম-জেনারেশনের মাধ্যমে বাংলা ভাষায় জাদুবাস্তববাদের বিষয়টি পরিচিতি লাভ করে। লাতিন সাহিত্যের প্রভাবের পাশাপাশি ইউরোপীয় তাত্ত্বিকদের মাধ্যমে জাদুবাস্তববাদ সম্পর্কে ধারণা গ্রহণ করেন বাংলা ভাষার লেখকেরা। ফলে লাতিন সাহিত্যের জাদুবাস্তববাদ ও জাদুবাস্তববাদের ইউরোপীয় ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয় ভারতীয় পুরাণ ও প্রাচীন সাহিত্যের ঐতিহ্য। এই কারণে বাংলাদেশের জাদুবাস্তববাদ সম্পূর্ণ মৌলিক বা ‘লোকাল’ না। বাংলা ভারতীয় ঐতিহ্যে রামায়ণ, মহাভারত, অষ্টপুরাণ, লোকবিশ্বাস, লোকায়ত ধর্ম, জাতকের গল্প—প্রভৃতির মধ্য জাদুবাস্তববাদের বীজ ছিল, কিন্তু সেটা আমরা চিহ্নিত করে আমাদের জাদুবাস্তববাদের মৌলিক স্বরের উন্মোচন ঘটাতে পারিনি।

‘দন কিহোতে’ উপন্যাসের ভেতর জাদুবাস্তববাদের বীজ অঙ্কুরিত অবস্থায় আছে, অন্যদিকে ‘গ্যালিভার্স ট্রাভেলস’-এ আছে ফ্যান্টাসির বীজ

আমাদের আধুনিক সাহিত্যে আমাদের পুরাণের চরিত্রগুলো নতুন রূপে উঠে আসেনি। আমাদের সংস্কৃতিতে ভূতে বিশ্বাসের বিষয়টি ছিল, অথচ আমাদের কথাসাহিত্যে অলৌকিক বিষয়আশয় তেমনভাবে আসেনি। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগোষ্ঠী জিনে বিশ্বাস করে, অথচ জিন আমাদের সাহিত্যে বলিষ্ঠ কোনো চরিত্র হয়ে ওঠেনি। বাংলা সংস্কৃতি ও লোকসাহিত্যে ভূত-পেত্নি-শাঁকচুন্নি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও আমাদের আমাদের আধুনিক সাহিত্যে তার অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। এসব কারণে বাংলাদেশের উপন্যাস এই ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ ধারণ করতে পারেনি। 

তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নিশ্চয় আছে। জাদুবাস্তববাদ সম্পর্কে ধারণা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই বাংলাদেশে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ও সৈয়দ শামসুল হকের গল্পে জাদুবাস্তবতার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। সৈয়দ শামসুল হক ১৯৬৩ সালে রচনা করেন ‘রক্তগোলাপ’। তবে তিনি লাতিন বা ইউরোপীয় জাদুবাস্তববাদ থেকে নয়, রূপকথা ও ময়মনসিংহ গীতিকা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এটা লেখেন। উপন্যাসটি আরম্ভ হয় এভাবে: ‘বছরের এ সময়ে বৃষ্টি হয় কেউ কখনো শোনেনি। এ হচ্ছে এমন একটা সময়, যখন আকাশটা প্রজাপতির পাখার মতো ফিনফিন করতে থাকে রোদ্দুরে, নীল রঙে; যখন উত্তর থেকে নতুন প্রেমের মতো গা-শির-শির-করা মিষ্টি বাতাস বয় কী বয় না তা বোঝাও যায় না; যখন লোকেরা খুব স্ফূর্তির মেজাজে থাকে আর বলাবলি করে, সংসারে বেঁচে থাকাটা কিছু মন্দ নয়; আর ছেলেমেয়েরা কাচের জিনিসপত্তর ভাঙলেও যখন মায়েরা কিছু বলে না; যখন হাট বসতে থাকে বিকালের অনেক আগে থেকেই আর ভাঙতে ভাঙতে অনেক রাত্তির হয়ে যায়, কারণ বছরের এরকম সময়ে অনেক রাত্তিরেও মানুষ একা হয়ে যায় না, ভয় করে না, নদীর খেয়া বন্ধ হয় না। এরকম দিনে বৃষ্টি হয় বলে কেউ কখনো শোনেনি।’ 

এই বৃষ্টির কারণে নৌকাডুবিতে মারা গেছে তেরোজন, ভেঙে পড়েছে মসজিদের ছাদ, ভেসে গেছে আরও অনেককিছু। অপ্রত্যাশিত বৃষ্টির দায় পড়ে ম্যাজিশিয়ান নাজিম পাশার ওপর। এই উপন্যাসে বাংলার লোকায়ত উপকরণ থাকলে এখানে আমরা মার্কেসীয় জাদুবাস্তবতার মতো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণের চিত্র পাই। যেমন: শো-ফেরত লোকেরা বলাবলি করছিল ম্যাজিশিয়ান দশ হাজার গোলাপ তৈরি করেছে। প্রকৃত অর্থে সে বানিয়েছে সাতশ’ ছিয়াশিটা গোলাপ। এখানে সৈয়দ হক ডিটেলিংয়ের দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। 

এর আগে শাহেদ আলী লেখেন ‘জিবরাইলের ডানা’ গল্পটি। প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে। এই গল্পে শিশুচরিত্র নবী ঘরের ফুটো চাল দিয়ে আকাশপথে ময়ূরের মতো পাখনাওয়ালা সুন্দর মানুষ উড়ে যেতে দেখে। মা বলেন ফেরেসতা। নবী ঘুড়ি দিয়ে খোদার আরশে টান দিতে চায়। এ পযায়ে ইসলামী এবং হিন্দুধর্মীয় ঐহিত্যের সঙ্গে ভারতীয় লোকগল্প, পুরাণ, রূপকথা, উপকথা যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের জন্য নতুন ধরনের জাদুবাস্তব গল্পের প্রবণতা ও লক্ষণ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীসময়ে লাতিন জাদুবাস্তববাদ জনপ্রিয় হয়ে উঠলে এবং জাদুবাস্তববাদের ইউরোপীয় তত্ত্ব পঠনপাঠন শুরু হলে আমাদের জাদুবাস্তববাদ অনুকৃতির দিকে চলে যায়।  

আলোচনার সুবিধার্তে জাদুবাস্তবতার লেখক হিসেবে বাংলাদেশের অন্যতম খ্যাতিমান লেখক শহীদুল জহিরের প্রসঙ্গ টানা যেতে পারে। শহীদুল জহির জাদুবাস্তবতা বা কুহকী বাস্তবতার লেখক কিনা সেই প্রশ্ন তোলা উচিত হবে না। কারণ স্পষ্টতই তাঁর লেখায় জাদুবাস্তবতার উপকরণ আছে। তিনি সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, তিনি সচেতনভাবে জাদুবাস্তবতার বিষয়টি তাঁর গল্প-উপন্যাসে এনেছেন এবং সেটি তিনি গাবরিয়েল গারসিয়া মার্কেস থেকে গ্রহণ করেছেন। তিনি বলছেন, ‘জাদুবাস্তবতার ব্যাপারটা তো আমি মার্কেসের কাছ থেকে পেয়েছি। এবং এটা আমি গ্রহণ করেছি দুটো কারণে। প্রথমত, চিন্তার বা কল্পনার গ্রহণযোগ্যতার যে পরিধি সেটা অনেক বিস্তৃত হতে পারে বলে আমি মনে করি।…দ্বিতীয়ত, আমি আসলে বর্ণনায় টাইমফ্রেমটাকে ভাঙতে চাচ্ছিলাম…।’ [সাক্ষাৎকার, আহমাদ মোস্তফা কামাল গৃহীত] 

কিন্তু শহীদুল জহিরকে পড়ার পর পাঠকের মনে স্বভাবতই প্রশ্ন চলে আসে- শহীদুল জহিরের জাদুবাস্তবতা কি মার্কেসীয় বা লাতিন সাহিত্যের জাদুবাস্তবতা? এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। হয়ত মোটাদাগে বলা যাবে, হ্যাঁ অথবা না। কিন্তু খতিয়ে দেখলে আমরা বুঝবো দুজনের জাদুবাস্তবতা এক নয়, আবার একও। অর্থাৎ বিষয়টি তর্ক ও তদন্তের।  

আমরা টেক্সট ধরেই এর একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি। ‘কাঠুরে ও দাঁড় কাক’ গল্পটি শুরু হয় এভাবে : ‘ঢাকা শহরের প্রবীণ অধিবাসীরা স্মরণ করতে পারে যে, বহু দিন পূর্বে ঢাকা শহর একবার কাকশূন্য হয়ে পড়ে।’ তুলনাটা এখান থেকেও করা যাবে। লক্ষ্য করুন, গল্পটি আরেকটু এগোলেই আমরা দেখবো গল্পের কথক কাঠুরে আকালু ও তার স্ত্রী টেপিকে নিয়ে যে গল্পটি ফাঁদেন সেটি যতটা না জাদুবাস্তব গল্প তার চেয়ে বেশি জনশ্রুতি হয়ে ওঠে। বা মিথিক ফ্যান্টাসিও বলতে পারি। কারণ বাস্তবতা-জ্ঞান থেকে এই গল্পের কোনো অর্থ-উদ্ধার করা যায় না। মার্কেসীয় জাদুবাস্তবতা হলে হয়ত সূচনাটা হতো এভাবে, ‘ঢাকা শহরের প্রবীণ অধিবাসীদের মনে আছে, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পূর্বে ঢাকা শহর একবার কাকশূন্য হয়ে পড়ে।’ অর্থাৎ আরো নির্দিষ্ট করে বলা। তাতে ঘটনাটি যে ঘটেছে সে বিষয়ে পাঠকের মনে আর কোনো প্রশ্ন থাকে না। জাদুবাস্তবতার কৌশল নিয়ে মার্কেস নিজে বলছেন : ‘যখন আপনি বলবেন, হাতি আকাশে উড়ছে, মানুষ আপনাকে বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আপনি যদি বলেন, ৪২৫টা হাতি আকাশে উড়ছে। লোকজন আপনাকে বিশ্বাস করলেও করতে পারে।’ [সাক্ষাৎকার : প্যারিস রিভিউ] অর্থাৎ, মার্কেস যেটা বোঝাতে চাচ্ছেন- অবাস্তব ঘটনাকে বিশ্বাসযোগ্য বা বাস্তব করে তুলতে হলে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার ভেতর চলে যেতে হবে। পাঠক তখন ধরে নেবে বিষয়টি সত্যিই ঘটছে বা ঘটেছে। 

উদাহরণ হিসেবে মার্কেসের ‘এ ভেরি ওল্ড ম্যান উইথ ইনরমাস উইংস’ গল্পটির কথা আমরা স্মরণ করতে পারি। মার্কেসীয় এই ডিটেল বা নির্দিষ্টকরণের অভাব আছে শহীদুল জহিরে। মার্কেস যেভাবে জাদু-উপকরণের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেন, শহীদুল জহির তা করেন না। সবসময় যে করেন না তাও না, তবে অধিকাংশ সময় তিনি পরিস্থিতির বর্ণনা করেই ছেড়ে দেন। তিনি নিজেই, ‘অথবা/হয়তো/কিংবা/বা’ ইত্যাদি শব্দের পৌনঃপুনিক ব্যবহার করে পাঠককে আরো অনিশ্চিত বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিয়েছেন। 

এই তুলনার ক্ষেত্রে আরও আমরা দেখবো, মার্কেসীয় জাদুবাস্তবতার বিষয়টি ভীষণভাবে সমাজমুখী। ব্যক্তির অভিজ্ঞতা সমাজের ভেতর সঞ্চারিত হয়। অন্যদিকে শহীদুল জহিরের জাদুবাস্তবতা সমাজের বা সমষ্টির অভিজ্ঞতা থেকে ব্যক্তির দিকে সঞ্চারিত হয়। তাঁর গল্পের দুর্বোধ্যতা বা সিদ্ধান্তহীনতা অনেক সময় মানুষের চেতনার জগতে প্রবেশ করে তাকে জাগিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত গল্পটি হয়ে ওঠে ননসেন্স স্টোরি। সেন্স একটা থাকলেও মার্কেসে যেমন সকলের পাঠে প্রায় একরকমভাবে ধরা দেয়, শহীদুল জহিরে সেটা ঘটে না। মার্কেসের গল্পের মতো শহীদুল জহিরের গল্পে নির্মিতি বা স্ট্রাকচার থাকে না বলে পাঠকভেদে ভিন্নভিন্ন অর্থ জেগে ওঠে। আবার একই পাঠক বিভিন্নপাঠে বিভিন্নরকম অর্থ উদ্ধার করেন। অর্থাৎ মার্কেসের গল্পে প্রতীক বা কুহকী বাস্তবতার অন্তরালে সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরার প্রচেষ্টাটি যেখানে জীবনমুখী সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যায়, সেখানে শহীদুল জহিরে এসে উল্টো দিকে মোড় নেয়। এখানে এসে তাঁর গল্পের রূপকথার প্রবণতা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেটি আমরা ‘ডুমুরখেকো মানুষ’ গল্পের আলোচনা করতে গিয়ে টের পাবো। তাই বলতে পারি, মার্কেস যে মুহূর্তে রূপকথার ভেতর থেকে বের হয়ে আসেন, শহীদুল জহির সেই মুহূর্তে রূপকথার ভেতর প্রবেশ করেন। এখানে রূপকথা এবং জাদুবাস্তবতার পার্থক্য হিসেবে এটুকু বলা প্রয়োজন : জাদুবাস্তবতায় বাস্তবতার সঙ্গে জাদু-উপকরণ মিলেমিশে যায়। কিন্তু রূপকথায় যা ঘটে সবকিছু প্রায় জাদুময়। গল্পের কাঠামো, সেটিং, টন, বিষয়বস্তু সবকিছু মিলে একটা অবাস্তব গ্রাউন্ড তৈরি করে। অর্থাৎ আমরা বলতে পারি, জাদুবাস্তবতা হলো fantastic elements with realistic details। ঠিক এর বিপরীত স্বভাবকে বলা যেতে পারে রূপকথা— realistic elements with fantasti details। এটা যুক্তি দিয়ে বাতিল করে দেয়া যায়। কিন্তু জাদুবাস্তবতাকে তুড়ি মেরে অস্বীকার করার উপায় থাকে না। কারণ বাস্তবতার ভেতর মানুষের মৌলিক বিশ্বাসের সঙ্গে ফ্যান্টাসি জগতের একধরনের মিলন এখানে ঘটে। 

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত কিছু সার্থক পরাবাস্তব গল্প লিখেছেন। কিন্তু শহীদুল জহিরের গল্পগুলোকে সম্পূর্ণ পরাবাস্তব গল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না

অনেক সমালোচক শহীদুল জহিরের গল্পকে সুরিয়ালিজম বা পরাবাস্তব গল্প হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। উল্লেখ্য, যে বাংলাদেশের সাহিত্যে জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত কিছু সার্থক পরাবাস্তব গল্প লিখেছেন। কিন্তু শহীদুল জহিরের গল্পগুলোকে সম্পূর্ণ পরাবাস্তব গল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। সুরিয়ালিজমে চেতন এবং অবচেতনের একটা বন্ধন গড়ে ওঠে। অন্যকথায়, স্বপ্নের সঙ্গে জাগতিক বিষয় যুক্ত হয়ে স্বপ্নবাস্তবতার সৃষ্টি করে। ফ্রয়েডের মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব থেকে জানা যায়, মানুষের মনের সিংহভাগই থাকে অবচেতন অংশে। এই অংশটি মানুষের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে সেখান থেকে নানা ভাবনা বা ভাবনার টুকরো টুকরো বিষয় মানুষের চেতনার জগতে চলে আসে। বিষয়টা ভীষণভাবে ব্যক্তিগত। শহীদুল জহিরের গল্পগুলো অবচেতন থেকে আসেনি। শহীদুল জহির নিজেও বলছেন যে, তিনি অনেক সময় নিয়ে গল্প লেখেন। অনেক সময় কাঠামোটা পূর্বপরিকল্পিত থাকে। অর্থাৎ তিনি লেখার সময় সচেতন থাকেন। এই সচেতনতা থেকে তিনি ‘চতুর্থমাত্রা’র মতো গল্প লিখেছেন ক্রিয়াপদের সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ কাল প্রয়োগ করে। আবার ‘ধুলোর দিনে ফেরা’র মতো গল্পহীন গল্প লিখেছেন। পরাবাস্তব গল্প এভাবে ভেবেচিন্তে আসে না। এটা একটা কবিতার মতো মুহূর্ত থেকে আসে।

আবার আমরা দেখি, শহীদুল জহিরের গল্পে নির্মিতির দিক থেকে স্বপ্নের বড় কোনো ভূমিকা নেই। [‘চতুর্থমাত্রা’ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম] এবং কাঠামোগতভাবে শহীদুল জহিরের গল্পগুলো ব্যক্তিগত তো নয়ই, কখনো কখনো পুরো মহল্লার। সুতরাং এসব বিবেচনায় তাঁর গল্প পরাবাস্তব নয়। তবে পরাবাস্তব গল্পের অনেক বৈশিষ্ট্য তাঁর গল্পে আছে। লিখতে লিখতে হয়ত তিনি কখনো কখনো ঘোরের ভেতর চলে গেছেন। যে কারণে পরাবাস্তবতার উপকরণ বা লক্ষণ তাঁর গল্পে আমরা খুঁজে পাই। যেমন স্বপ্নে ঘটে যাওয়া ঘটনার মতো তাঁর অনেক গল্পে ঘটনার ভেতর কোনো যৌক্তিক সংযোগ থাকে না। অযৌক্তিকতার বিষয়টি শহীদুল জহিরের গল্পে ভীষণভাবেই আছে। পরাবাস্তব গল্পের মতোই শহীদুল জহিরের অনেক গল্পে আখ্যান বা অবয়ব বলে কিছু নেই। সেটিং অর্থাৎ টাইম-স্পেস ভেঙে গেছে। এসব কারণে তাঁর গল্পে কোথাও কোথাও পরাবাস্তব প্রবণতা চোখে পড়ে।

আলোচ্য বিশ্লেষণের পর বলা চলে শহীদুল জহিরের গল্পে জাদুবাস্তবতা, পরাবাস্তবতা এবং রূপকথার বিষয় আছে। কিন্তু এমনভাবে এক ব্লেন্ডিংয়ের ভেতর দিয়ে যে তাকে আলাদা করা যায় না। [আসলে জাদুবাস্তবতা, পরাবাস্তবতা এবং রূপকথা নিজেরাই প্রবণতার দিক থেকে খুব কাছাকাছি—একই বৃক্ষের তিন শাখা যেন।] যে কারণে শহীদুল জহির তাঁর গুরু মার্কেস এবং ওয়ালীউল্লাহর চেয়ে দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছেন। তাঁর গল্পকে একক কোনো সাহিত্যতত্ত্বের আলোকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা যাচ্ছে না। তাঁর সাহিত্যে বিনির্মাণের বিষয়টি এখানে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে।

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়