ঢাকা     শুক্রবার   ০১ জুলাই ২০২২ ||  আষাঢ় ১৭ ১৪২৯ ||  ০১ জিলহজ ১৪৪৩

রাতের কারওয়ান বাজার: উল্টো নিয়মের জীবন

খায়রুল বাশার আশিক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:২৬, ৬ মে ২০২২   আপডেট: ১২:২৭, ৬ মে ২০২২
রাতের কারওয়ান বাজার: উল্টো নিয়মের জীবন

সমগ্র রাজধানী দিনে ব্যস্ত থাকলেও রাতে নিঝুম, কিন্তু কারওয়ান বাজারের চিত্র ঠিক তার উল্টো। সন্ধ্যার পর সরগরম হতে শুরু করে বাজার। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে শ্রমিকদের ব্যস্ততা। রাত ১২টার পর অন্য রূপ পায় কারওয়ান বাজার। তখন দূর-দূরান্ত থেকে ট্রাক এসে পৌঁছায়। ট্রাক থেকে মালামাল নামানো, রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে নেওয়া কিংবা ফের পাইকারের ট্রাকে তুলে দেওয়াই এখানকার শ্রমিকদের মূল কাজ। কাজগুলো সেরে সকালে তারা বিশ্রামে যায়। দিনের বেলা তাদের কোনো কাজ থাকে না। উল্টো নিয়মে চলাই যেন তাদের জীবনের নিয়তি। 

রাত ৮টার দিকেও কারওয়ান বাজার যেন কাকডাকা ভোর। ঘুমের আড়ষ্টতা ভেঙে জাগতে শুরু করেন শ্রমিকরা। রাত ৯টা পর্যন্ত কিছুটা খোশ মেজাজেই থাকেন তারা। প্রতিরাতে কারওয়ান বাজারে কাজ করেন প্রায় কয়েক হাজার শ্রমিক। সরেজমিনে দেখা যায়, পণ্য বোঝাই ট্রাক কারওয়ান বাজারে পৌঁছানোমাত্র সেদিকে ছুটে যান শ্রমিকেরা। কেউ ট্রাক থেকে দ্রুত হাতে পণ্য নামাচ্ছেন, কেউ মাথার ওপর টুকরি ভর্তি পণ্য নিয়ে ছুটছেন আড়তে, বোঝা নামিয়েই দ্রুত পায়ে ফিরছেন ট্রাকের কাছে, কেউ ভ্যান গাড়িতে পণ্য সাজাতে ব্যস্ত, কেউ শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ঠেলে সরাচ্ছেন ভারী ভ্যান, কেউ-বা আবার আড়তের পণ্যগুলো আকার-আকৃতি ও মান অনুযায়ী আলাদা করতে ব্যস্ত। এদের মধ্যেই একদল আছেন, নষ্ট পণ্য বাছাই করেন। ময়লা পরিষ্কারের জন্যও রয়েছে আলাদা শ্রমিক। 

পেটের দায়ে রাতকে দিন ভেবেই পরিশ্রম করেন এই নৈশ শ্রমিকেরা। এজন্য তারা পান সর্ব্বোচ্চ ৫০০-৭০০ টাকা। এই টাকাতেই চলে তাদের সংসার। সংসার বলতে অধিকাংশ শ্রমিক স্ত্রী-সন্তান গ্রামে রেখে আসেন। কারণ একটাই এই সামান্য টাকায় ঢাকায় থাকা-খাওয়া প্রায় অসম্ভব। আর তারা থাকেন সাধারণত যে মালিকের আড়তে কাজ, সেখানেই। বাজারে প্রতিটি আড়ত-ঘরের ওপরে সাধারণত শ্রমিকদের ঘুমানোর স্থান আলাদা করে রাখা হয়। অনেকে সেখানে জায়গা না পেলে মেঝেতেই পাটি, কাঁথা, বস্তা বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। 

দুপুরের খাবারের পর অনেকেই আড্ডায় মেতে ওঠেন। গোল হয়ে বসেন তাস খেলতে। এভাবেই নেমে আসে সন্ধ্যা। এবার তারা কাজের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। অনেকে গোসলপর্ব সেরে নেন। গোসলের জন্য বাজারেই ব্যবস্থা আছে। মোটরের মাধ্যমে পানি তুলে রাখা হয় একটি চৌবাচ্চায়। জনপ্রতি গোসলের জন্য গুনতে হয় পাঁচ টাকা। এখানেই কাপড় কাচার জন্য কিনতে পাওয়া যায় অর্ধেক কাটা কাপড় ধোয়ার সাবান। 

কারওয়ান বাজারের শ্রমিকদের খাবার মেলে খোলা রেস্তোরাঁয়৷ ৩০-৫০ টাকায় একেকজন শ্রমিক পেটপুরে খেতে পারেন৷ রাতভর খাবার দোকান খোলা থাকে। ভোরে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তারা সেরে নেন সকালের নাস্তা।  

এ বাজারে আছে অসংখ্য টুকরি শ্রমিক। যাদের বলা হয় ‘মিনতি’। বিভিন্ন পণ্যের ক্রেতারা মিনতিদের ভাড়া করেন। তাদের ভাড়া পণ্যের পরিমাণ ও দূরত্ব ভেদে নির্ধারিত হয়। সাধারণত ৫০ টাকা থেকে শুরু করে ২০০ টাকা হয় এদের মজুরি। এরা অবশ্য দিনেও কাজ করেন। টুকরি শ্রমিকদের জীবন সংগ্রাম চলে কারওয়ান বাজারকে ঘিরেই। কাজ শেষে বাঁশের ওই গোল টুকরিই হয় তাদের বিছানা। ক্লান্ত দেহ কুণ্ডুলি পাকিয়ে টুকরিতে শুয়ে থাকেন তারা। 

এমন একজন মিনতি শ্রমিক কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার মো. হারুন মিয়া (৫০)। তিনি জানান, যারা নিতান্ত গরিব পরিবারের সদস্য তারাই এই কষ্টের কাজে আসে। তার মতো এখানে প্রায় ৩০০ মিনতি শ্রমিক আছে। এদের মধ্যে অনেকের টুকরিও নেই। যাদের নেই, তারা প্রতি রাতের জন্য ১০-১৫ টাকায় টুকরি ভাড়া নিয়ে কাজ করেন।
সূত্র বলছে, কারওয়ান বাজারে কমবেশি তিন হাজার শ্রমিক রাতে কাজ করেন। তাদেরই একজন সাইদুর রহমান (৩০)। তিনি বলেন, ‘এখানকার শ্রমিকরা রাতের কাজেই অভ্যস্ত। তবে, রাত জেগে কাজ করতে করতে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন কষ্টের শেষ থাকে না। পরিবারগুলো বিপাকে পড়ে।’ 

আরেক শ্রমিক বজলুর রশিদ (৫৫) বলেন, ‘এখানে শ্রমিকদের মধ্যে কোনো সর্দার নেই। নেই কোনো চাঁদাবাজি। শ্রমিকদের মধ্যে ভালো সর্ম্পক রয়েছে। বিপদে-আপদে সবাই সবার পাশে থাকে। এ কারণেই এত পরিশ্রমের পরেও আমরা হাসতে পারি। পরিবার ছেড়ে দূরে থাকলেও আমরা বেঁচে থাকতে পারি।’ 

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়