ঢাকা     শুক্রবার   ০১ জুলাই ২০২২ ||  আষাঢ় ১৭ ১৪২৯ ||  ০১ জিলহজ ১৪৪৩

আম্ফানের দুই বছর: উপকূলের বহু মানুষ টিকে থাকার লড়াই করছে

রফিকুল ইসলাম মন্টু || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:১২, ২০ মে ২০২২   আপডেট: ১৫:২৪, ২০ মে ২০২২
আম্ফানের দুই বছর: উপকূলের বহু মানুষ টিকে থাকার লড়াই করছে

আম্ফানে ঘর হারিয়েছেন নুরুন্নাহার বেগম

‘আমাদের এখন কিছুই নাই। সন্তানদের নিয়ে কষ্টে জীবন কাটাচ্ছি। ঘন ঘন সাইক্লোন আমাদের নিঃস্ব করেছে। আগামী দিনগুলোতে কী হবে জানি না। জীবনকে আর এভাবে এগিয়ে নিতে পারছি না।’  কথাগুলো বলেন সাইক্লোন আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্থ নুরুন্নাহার বেগম। 

নুরুন্নাহার বেগমের বাড়ি বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিম উপকূলের সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাহুনিয়া গ্রামে। নুরুন্নাহারের বাড়ি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে আম্ফান। স্বামী এবং দুই সন্তান নিয়ে এই বাড়িতেই বসবাস করছিলেন তিনি। প্রায় দুই বছর পরিবারটি বসবাস করছে নৌকায়। তারা নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরে এবং রাতে নৌকায় ঘুমায়। ভূ-খণ্ডে এখন আর তাদের বাড়ি নেই।   

প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে ২০২০ সালের ২০ মে আম্ফান আঘাত করেছিল এই এলাকায়। এলাকাটি প্রায় ১৮ মাস ধরে লবণ পানির তলায় ছিল। কয়েক লক্ষ মানুষ জোয়ার-ভাটার সাথে বসবাস করেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২১ সালের ২৬ মে সাইক্লোন ইয়াস আঘাত করে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে। ফলে আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষগুলো আরো সংকটের মুখে পড়ে।   

আম্ফানে আমেনা বেগমের পাকা ঘরটিও হারিয়ে যায়

শুধু আম্ফান ও ইয়াস নয়, গত কয়েক বছর বাংলাদেশের এই এলাকাটি এক বা একাধিক বার সাইক্লোনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। ২০০৭ সালের সিডর, ২০০৯ সালে আইলা, ২০১৯ সালে ফনী, একই বছরে বুলবুল এই এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি করে। 

সাইক্লোনগুলো বাংলাদেশের পশ্চিম উপকূলের মানুষের জীবনজীবিকা হুমকির মুখে ফেলছে। বহু মানুষ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে গেছে। বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। কৃষি ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। বহু মানুষ আর কখনোই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছে না। নূরুন্নাহার বেগম তাদেরই একজন। 

নুরুন্নাহারের মতো আরো অনেকের সঙ্গে দেখা হয় সাইক্লোনে ক্ষতিগ্রস্থ বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন গ্রামে। এক সময় পরিবারগুলো ভালোভাবে জীবিকা নির্বাহ করতো। কিন্তু এখন তারা সাহায্য নিয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য লড়াই করছে। সুজা উদ্দিন গাজী বসবাস করছেন আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাহুনিয়া লঞ্চঘাটের নিকটে বেড়িবাঁধের উপরে। অথচ তার পরিবারের এক সময় ৭২ একর জমি ছিল। ঘন ঘন সাইক্লোনে সব জমি নদীতে হারিয়ে গেছে। 

একই ইউনিয়নের কল্যানপুর, ফুলতলা, হাওলাদার বাড়ি, সানা বাড়ি, ফকিরবাড়ি, মাদারবাড়িয়া, হরিশখালী, শ্যামনগর উপজেলার বন্যতলা, পদ্মপুকুর, গাবুরা এলাকাগুলোতে আম্ফানের ক্ষত স্পষ্ট। এর প্রভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষদের অনেকেই এখনো এলাকায় ফিরতে পারেনি। অনেকের পক্ষে আর কখনোই এলাকায় ফেরা সম্ভব হবে না। চিংড়ির খামার, কৃষি হারিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব। 

আম্ফানে সব হারানোর পরে করিমন নেছা এখন নিঃস্ব অসহায়

কুড়িকাহুনিয়ার পুতুল দাস ( ৪০) সাইক্লোনের আগে বাস করতেন বেড়িবাঁধের ভেতরে। এখন এই বাড়িটি চলে গেছে বেড়িবাঁধের বাইরে নদীর ভাঙনের মুখে। সুজাউদ্দিন হাওলাদার (৭২) এক সময় অনেক সম্পদের মালিক ছিলেন। এখন তিনি বসবাসে করেন বেড়িবাঁধের উপরে। আমেনা বেগম (৪৫) তার সব সম্পত্তি হারিয়েছেন সাইক্লোনের আঘাতে। এই এলাকায় ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের তালিকা দীর্ঘ।  

এসব এলাকা এখনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। অধিকাংশ এলাকার বেড়িবাঁধ নাজুক। ফলে সাইক্লোনের সিগন্যাল ঘোষণা করা হলে এখনও ওই এলাকার মানুষ আতঙ্কে থাকে। সর্বশেষ আশানির সিগন্যাল ঘোষণা হওয়ার পর মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। 

সাইক্লোন এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি নিয়ে সম্প্রতি গবেষণা করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লিডার্স। সমীক্ষা বলছে, ২০০৪ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১৬ বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাতক্ষীরা ও খুলনার উপকুলীয় এলাকায় প্রতিবছর পরিবার প্রতি গড়ে এক লক্ষ দুই হাজার ৪৮৯ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে একটি পরিবারে সর্বোচ্চ ৫০ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা এবং সর্বনিম্ন ৪৫ হাজার ২০০ টাকার ক্ষতি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ যে ১৯৭টি বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে তাতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় অঞ্চল।

সমীক্ষা বলছে, দেশের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলে জীবন-জীবিকা, সম্পদ, খাদ্য, পানি, বাসস্থান সহ অন্যান্য সংকট বেশি। এই সংকট থেকে উত্তোরণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অদূর ভবিষ্যতে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল জনশূন্য হয়ে পড়বে। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলকে দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করে ঝুঁকি মোকাবেলায় চলতি জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানিয়ে লিডার্স।  

দুই বছরেও বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিম উপকূল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারেনি। অনেক স্থানে বেড়িবাঁধ সংস্কার করে জোয়ারে লবণ পানি ঠেকাতে এক বছরের বেশি সময় লেগেছে। চিংড়ির খামার, ধান চাষ- কোথাও কোন কাজ নাই। সাইক্লোনে ক্ষতিগ্রস্থ বহু মানুষ কর্মহীন।

প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু দাউদ ঢালী বলেন, আমরা ক্ষতিগ্রস্থ এলাকাটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে চাই। কিন্তু পর্যাপ্ত বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে না। আম্ফানের পরে এই ইউনিয়নে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এর অধিকাংশই বেড়িবাঁধ সংস্কারের কাজে ব্যয় হয়েছে।’

আম্ফানে ক্ষতির পরে আনোয়ারা বেগমের ঠাঁই হয়েছে বেড়িবাঁধের পাশে

আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্থ অন্যান্য এলাকার অবস্থাও একই রকম। বেড়িবাঁধ সংস্কার ছাড়া বিশেষ কাজ হয়নি। অথচ আম্ফানে এই এলাকার প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে কিছু বরাদ্দ হলেও পরিবার ভিত্তিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কোন উদোগ নেওয়া হয়নি।    
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-এর নির্বাহী প্রকৌশলী জনাব শামীম হাসনাইন বলেন, আম্ফানের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। এজন্য যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন তা একবারে পাওয়া যায় না। বেড়িবাঁধের জন্য পর্যায়ক্রমে অর্থ বরাদ্দ হচ্ছে এবং আমরা কাজ করছি।

প্রতাপনগর ইউনিয়নের প্রবীণ বাসিন্দা আবদুস সামাদ বলেন, এই এলাকাটি এক সময় অর্থনৈতিকভাবে খুবই সমৃদ্ধ ছিল। অধিকাংশ মানুষ চিংড়ি চাষ এবং ধান আবাদের উপর নির্ভরশীল ছিল। এছাড়াও ছিল অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্য। কিন্তু আম্ফানের পরে এই এলাকার মানুষের উপার্জনের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। জীবিকার প্রয়োজনে বহু মানুষ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে যেতে অনেক সময় লাগবে। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবার-কেন্দ্রিক পুনর্বাসন প্রকল্পের উপর জোর দিতে হবে। 

ক্লাইমেট এন্ড সাসটেইনেবল ফিন্যান্স এনালিস্ট এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ-এর নির্বাহী পরিচালক এম. জাকির হোসেন খান বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরপশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের প্রতিটি দুর্বল সম্প্রদায়ের জন্য অবিলম্বে একটি সবুজ পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা নেওয়া দরকার। যা হতে হবে স্থানীয় সম্প্রদায়ের নেতৃত্বে। বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। ওই এলাকার দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য পুষ্টিকর খাবারের ভর্তুকি সরবরাহ করতে হবে। পরিবেশ-বান্ধব এবং প্রকৃতি-ভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কৃষিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রজনন স্বাস্থ্য সেবার দিকে নজর দিতে হবে। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলিকে নিকটতম নিরাপদ অঞ্চলে স্থানান্তর করা খুবই জরুরি। পাশাপাশি বেড়িবাঁধ টেকসই করতে হবে।’  
 

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়