ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ আশ্বিন ১৪২৬, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

রিকশা বন্ধে ধীরে চলো নীতি চাই

জাফর সোহেল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৭-১১ ৪:২৯:১৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৭-১১ ৪:২৯:১৩ পিএম
রিকশা বন্ধে ধীরে চলো নীতি চাই
রিকশা বন্ধের প্রতিবাদে প্ল্যাকার্ড হাতে একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধীর জিজ্ঞাসা
Walton E-plaza

জাফর সোহেল: গাবতলী থেকে আসাদগেট হয়ে আজিমপুর; সায়েন্সল্যাব থেকে শাহবাগ; কুড়িল থেকে রামপুরা ও খিলগাঁও হয়ে সায়েদাবাদ। রাজধানীর এই তিন সড়কে নগর কর্তৃপক্ষ রিকশা চলায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন, যা ৭ জুলাই রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে। তবে রিকশাওয়ালারা এ বিধিনিষেধ মানছেন না এবং মানবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। রোববার থেকেই তারা এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। সোমবার মঙ্গলবার আন্দোলনের তীব্রতা বেড়ে যায়। রোকেয়া সরণি ও প্রগতি সরণিতে লেগে যায় তীব্র যানজট। এতে রিকশা বন্ধের চেয়েও বেশি ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। তারা বাসেও চলাচল করতে পারেননি; কারণ রাস্তা বন্ধ করে রাখেন রিকশাওয়ালারা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক বাংলাদেশে আজকাল একটা বিচারক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। যে কোনো বিষয়ে মানুষ এখানে মতামত দিচ্ছেন এবং অনেক ঘটনায় এসব মতামতের ভিত্তিতে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তও প্রভাবিত হতে দেখা গেছে। কোনো বিষয়ে সবাই যদি একই ধরনের মতামত দিতে থাকেন তার প্রতিফলন দেখা যায়। আবার কখনো কখনো জনমত তৈরি হয়ে যায় এক রকম কিন্তু সরকার বা কর্তৃপক্ষ ইচ্ছে করে তা এড়িয়ে যান; যেন কিছুই হয়নি!

রিকশা বন্ধ করা নিয়ে কদিন ধরে একধরনের ঝড় চলছে ফেসবুকে; চলছে যুক্তি পাল্টা যুক্তি। বিশিষ্টজনরাও দেখলাম পারস্পরিক পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন। অর্থাৎ রিকশার বিষয়টি এখন এমন হয়েছে যে, সবাই এটা নিয়ে কথা বলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও শেষ পর্যন্ত এটা নিয়ে কথা বলেছেন এবং তিনি সারাদেশের সব সড়ক-মহাসড়কে রিকশার জন্য আলাদা লেন করার নির্দেশনা দিয়েছেন। যদিও তিনি কৌশলে রাজধানীতে রিকশা বন্ধের বিষয়টিতে তার মতামত এড়িয়ে গেছেন!

পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, আপনি কোন পক্ষে থাকবেন তা নিয়েও একটা দ্বিধায় ভুগতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে চিন্তা করলে কী ফল আসে দেখি। নিউ মার্কেট এলাকায় একটা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন একজনের সঙ্গে কথা হলো। তিনি বলছিলেন, ‘বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আমি রিকশার অভাব অনুভব করেছি। মুগদা থেকে নিউ মার্কেট যাবো। রিকশা ভিন্ন বিশেষ কোনো যান নেই। এত দিন রিকশায় গিয়েছি। আজ বিশ্বরোডে উঠতেই দেয়নি রিকশা। এখন কী উপায় হবে? সিএনজি অথবা মোটরসাইকেল ভাড়া করতে হবে। তাতে টাকা গুনতে হবে রিকশার চেয়ে ঢের বেশি। তার মানে ব্যক্তি মানুষের দৈনন্দিন খরচটা গেল বেড়ে!’

এখন প্রশ্ন হলো, এই বাড়তি খরচ রাষ্ট্র এই চাকরিজীবীকে চাপিয়ে দিতে পারে কি না? আমি বলব পারে না। রিকশা বন্ধ করতে পারে সরকার, সমস্যা নেই। কিন্তু একই খরচে যাতায়াতের বিকল্প ব্যবস্থাটাও সরকারকে করে দিতে হবে। এখানে কেবল একটা পথের কথা বলা হয়েছে। বাস্তবে এরকম অনেক চাকরিজীবীর গন্তব্যই বাধাগ্রস্ত হবে রিকশা উঠিয়ে দিলে। যাতায়াত ব্যয় বেড়ে যাবে। বিকল্প যানের ব্যবস্থা না করে সরকার হুট করে এটা চাপিয়ে দিতে পারে না।

একান্তই ব্যক্তিমানুষের এই ধরনের যুক্তি রাষ্ট্র অবহেলা করতে পারবে না। তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এবং লম্বা দূরত্বের সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধে ক্ষতিগ্রস্ত কারা হবেন তার একটি উদাহরণ ঐ চাকরিজীবী। একটু ভেবে দেখলে বোঝা যাবে এই তালিকায় যুক্ত হবেন অন্যসব চাকরিজীবী বিশেষ করে নারী চাকরিজীবী, স্কুলগামী শিক্ষার্থী ও অভিভাবক, গার্মেন্টসকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রিকশাচালক ও তাদের পরিবারসহ নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের এক বিশাল জনগোষ্ঠী। শহর ঢাকায় এখন যে দেড় কোটি লোকের বাস তাদের মধ্যে কতজন মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত আছেন? বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে সে সংখ্যা সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ হতে পারে। তার মানে নগরীর ৮০ শতাংশ মানুষের ক্ষতিকে ছোট করে দেখছে সরকার। বলা যায়, কলমের এক খোঁচায় কোটি মানুষের জীবন সংগ্রাম কঠিন করে তুলল এই নগরের কর্তৃপক্ষ।

খোলা চোখে সড়ক তিনটির কথা বলা হলেও আসলে এই ঘোষণার মাধ্যমে মূল ঢাকা শহরে রিকশা চলাচল একরকম বন্ধই হয়ে যাবে। কারণ, আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বা ভিআইপি নামে বেশকটি সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধ আছে। সেসব সড়ককে কিছু পয়েন্টে ক্রস করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেত মানুষ। এখন নতুন নিয়ম বাস্তবায়িত হলে এভাবে আর যাতায়াত সম্ভব হবে না; ঢাকার কোনো অফিসেই কেউ আর রিকশায় যেতে পারবে না। পশ্চিম ঢাকার অংশ থেকে আপনি মিরপুর রোডে উঠতে পারবেন না আর পূর্ব ঢাকার কোথাও থেকে বিশ্বরোডে উঠতে পারবেন না। মাঝখানে ফকিরেরপুল, কাকরাইল, শান্তিনগর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়- এসব এলাকায় রিকশা চললেও ছোট ছোট জায়গায় আবদ্ধ থাকতে হবে। এতে বেশি ক্ষতি হবে নারী যাত্রীদের। ঢাকায় নারীদের বড় একটি অংশ এখনো রিকশা নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। কারণ পর্যাপ্ত নিরাপদ এবং ঝক্কিঝামেলাহীন নারীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা এই নগরে এখনো গড়ে ওঠেনি। প্রাইভেট কার, উবার, পাঠাও- এসবও নারীর জন্য এখনো নিরাপদ নয় আবার অনেকের সামর্থেও কুলায় না। 

আবার শুধু রিকশাচালকদের কথা চিন্তা করলে এই সিদ্ধান্ত খুবই অমানবিক। ঢাকায় ৩ লাখ রিকশাচালক আছে, সাথে তাদের পরিবার মিলিয়ে অন্তত ১০ লাখ লোক দুটি প্যাডেলের ওপর নির্ভরশীল। রিকশা চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে গেলে এদের জীবনপ্রবাহও সংকুচিত হয়ে যাবে। না খেয়ে থাকতে হবে অনেককে। কারো কারো জন্যে হয়ত বিকল্প কাজের ব্যবস্থা হবে। কিন্তু যাদের হবে না তাদের কী হবে? রিকশা চালিয়ে জীবন নির্বাহ করার সুযোগ তো এই নগরই তাদের দিয়েছে। এখন হুট করে আয় রোজগারে বাধা দিলে তাদের পেট চলকেব কী করে; সন্তানের পড়াশোনা চলবে কী করে? কিছু মানুষ এসব আবেগে গা ভাসাতে নিষেধ করছেন। ভালো, অত আবেগী হওয়া যাবে না। কিন্তু এরা মানুষ তো, এদের কথাটুকু অন্তত ভাবনার জায়গায় নিতে হবে তো। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বন্ধু, যে এখন শিল্প উদ্যোক্তা, তার একটি স্ট্যটাস আমার ভালো লেগেছে। সে লিখেছে, ‘শহর থেকে রিকশা মুক্ত করার আগে সারা দেশ থেকে ক্ষুধা আর অভাব মুক্ত করা দরকার।’ এর পেছনে কারণ হিসেবে সে একটা বাস্তব ঘটনা তুলে ধরেছে। সেখানে দেখা যায়, তিন ব্যক্তিকে তার বাবা বাসায় ডেকে এনে খাওয়াচ্ছে; তারা সবাই প্রগতি সরণির রিকশা চালক। এদের মধ্যে দুজন বলেছেন তারা দুদিনে মাত্র দু বেলা খেতে পেরেছেন, তাও হাওলাত করে। কারণ তারা দিন এনে দিন খান। রিকশা বন্ধ করে দেয়ায় এবং আন্দোলন করতে গিয়ে তাদের কোন আয় নেই তিন দিন। এখন কিছু খেতে হলে ধার করে খেতে হবে। কিন্তু কতদিন এভাবে চলবে? বন্ধুটি লিখেছে, ‘রিকশা তুলে দিলে যানজট কমবে- তাই এর পক্ষে আমিও ছিলাম; কিন্তু এখন আমার উপলব্ধি হলো, মানুষকে খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে দেয়াটা আগে দরকার। যেখানে সারাদেশে বেকারত্ব চেপে বসে আছে বিশাল জনগোষ্ঠীর ওপর, সেখানে কর্মের সুযোগ এক মুহূর্তের জন্যেও বন্ধ করার পক্ষে আমি নেই।’ 

এই উপলব্ধিটা আমারও। হয়ত আরো অনেকেরই একইরকম চিন্তা হচ্ছে। কেউ প্রকাশ করছে, কেউ করছে না। আমার মনে হয়, নগর কর্তৃপক্ষকেও এ বিষয়টি চিন্তা করার দরকার আছে। বিকল্প কর্মের কোনো সুযোগ তৈরি না করে কর্মহীন করাটা যৌক্তিক হতে পারে না। এক মেয়র  রিকশাওয়ালাদের মোটা গলায় একরকম  ধমক দিয়ে বলেছেন- গ্রামে যাও, ধান কাটো! মাননীয় মেয়র, ধান কয়দিন কাটা যায়? সারা বছর কি জমিনে আপনি ধান পাকিয়ে রাখবেন?  অদ্ভুত চিন্তাভাবনা আমাদের জনপ্রতিনিধিদের! ঢাকা শহরে লোকে কাজ করতেই আসে এবং তারা এজন্য আসে যে, তার এলাকায় কোনো কর্ম নেই। এই সত্য আগে মানতে হবে আমাদের নীতি নির্ধারকদের। ৮০ হাজার গ্রামের কয়টিতে শিল্প-কারখানা বা অন্য কোন কর্মসংস্থানের জায়গা আছে? নেই। অতএব গরিবকে আরও গরিব বানানোর কৌশল থেকে সরে এসে, বেকারত্ব বৃদ্ধির ভুল চিন্তা পরিত্যাগ করে আগে তাদের জন্য খেয়ে পরে বেঁচে থাকার ব্যবস্থার প্রতি গুরুত্ব দেয়া দরকার।

হ্যাঁ, এটা ঠিক, আমাদের ভাবতে হবে একটি অধুনিক আর সুশৃঙ্খল নগর ব্যবস্থায় রিকশাকে স্থায়ী জায়গা দিতে পারি কি না। আমি বলব সেই অর্থে ঢাকার মতো বড় নগরে রিকশার জায়গা আসলে হওয়ার কথাও নয়। পৃথিবীর কোনো বড় নগরেই এ ধরনের পরিবহন নেই। রিকশা তো নেই-ই। গণপরিবহন হিসেবে রিকশা কেবল বাংলাদেশেই প্রতিষ্ঠিত এবং বহুল ব্যবহৃত। পৃথিবীর অন্য নগরগুলোতে ভালো গণপরিবহন ব্যবস্থা আছে। আমাদের দেশে আমরাও চাইলে রিকশা ছাড়া অন্য কী পরিবহনকে মানুষের যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করতে পারি তা চিন্তা করে দেখতে পারি। সে অনুযায়ী বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলে রিকশাকে পরিবহনের তালিকা থেকে বাদও দিতে পারি। কিন্তু তার জন্য সময়ের দরকার আছে। এই সময় যেমন নগর কর্তৃপক্ষ নিতে পারে তেমনি দিতে হবে রিকশা চালকদের আর তাদের ওপর নির্ভরশীল বিশাল জনগোষ্ঠীকেও।

নগরীর পরিবহন ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল করার জন্য রিকশা ওঠানোর প্রক্রিয়াটা ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। যেমন এখন যেই তিন সড়কে বন্ধের ঘোষণা দেয়া হলো সেখানে মানুষের জন্য বিকল্প পরিবহন আগেই ব্যবস্থা করে তারপর রিকশা বন্ধ করা যেতে পারে। বিকল্প পরিবহন হিসেবে যেমন পর্যাপ্ত সরকারি মালিকানায় বাস নামানো যায় তেমনি ব্যক্তি মানুষের জন্য গাড়ি ও মোটরসাইকেল সহজলভ্য করা যায়। কিছু জায়গায় মাইক্রোবাস ও সিএনজিকে লোকাল সার্ভিসের মতো চলতে দেয়া যায়। যেমনটা চলে হাতির ঝিলের রামপুরা থেকে কারওয়ান বাজার। সিটি কর্পোরেশন নিজ উদ্যোগে এসব জায়গায় নতুন পরিবহন ব্যবস্থা চালু করে মানুষকে রিকশা পরিহার করে এসব যানে চলা উৎসাহিত করতে পারে। এতে একসঙ্গে দুটো কাজ হবে। সাধারণ মানুষ বিকল্প পেয়ে নিজেরাই রিকশা ব্যবহার ছেড়ে দেবে আর রিকশা চালকরা নিজেদের কর্ম পরিবর্তনের জন্য সময় ও সুযোগ পাবে। যেমন কর্তৃপক্ষ চাইলে সংশ্লিষ্ট রুটের বর্তমান রিকশাচালকদের মধ্য থেকেই অনেককে সিএনজি অটো রিকশা চালানোর সুযোগ করে দিতে পারে আবার গণপরিবহন হিসেবে বাড়তি যে বাস চালু করা হবে সেখানে তাদের কর্মসংস্থান করে দিতে পারে।

এমন আরও অনেক ব্যবস্থাই করা যায়। আন্তরিকভাবে দেখলে নতুন নতুন বিকল্প সামনে চলে আসবে। কথা হলো, নগর কর্তৃপক্ষ বিষয়টা নিয়ে নতুন করে একটু চিন্তা করবে কি না। তারা রিকশাওয়ালা এবং রিকশাকেন্দ্রিক বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বার্থ বিবেচনা করবে কি না। সুন্দর আর সুশৃঙ্খল নগরী বাস্তবায়নের জন্য একটু সময় নেবে কি না। আমার মনে হয় এই চিন্তাটুকু নগর কর্তৃপক্ষর করা দরকার। কারণ, বহু বছরের অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা হুট করে সমাধান করা যায় না। ধীরে সুস্থে তা করতে হয়।

লেখক: সহকারী বার্তা সম্পাদক, আরটিভি


রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ জুলাই ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন