ঢাকা, বুধবার, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ক্রিকেট খেলার চেয়েও বেশি কিছু || শচীন টেন্ডুলকার

কে এম এ রাকিব : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৭-১৩ ২:৩০:২৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৭-১৩ ৯:০৪:৪৪ পিএম
শচীন টেন্ডুলকার

দশ বছর বয়সে ক্রিকেটের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। ভারত ১৯৮৩ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ জেতে; মনে আছে আমার চারপাশের সবাই সেই জয় কী উন্মাদনার সঙ্গে উদযাপন করছিলো! তখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ জয়লাভের গুরুত্ব আমার কাছে বিশেষ কিছু ছিলো না। সত্যি বলতে, তখন পর্যন্ত আমি ক্রিকেটের ব্যাট পর্যন্ত একবারও ধরে দেখিনি। মনে পড়ে, সবাই কি বুনো আনন্দে মেতে ছিলো! আমি ও আমার বন্ধুরাও সেই আনন্দোৎসবে শামিল হয়েছিলাম। এমন বাধভাঙা উচ্ছ্বাসের দেখা পাওয়া বিরল ঘটনা।  এই খেলা লোককে কতটা আনন্দ দিতে পারে তা আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। মনে হয়েছে, ক্রিকেট আসলে খেলার চেয়েও বেশি কিছু।

১১ বছর বয়সে আমি স্কুলে ক্রিকেট খেলা শুরু করি। ব্যাট হাতে নিলাম আর রান করতে শুরু করলাম- শুরুর দিকে ব্যাপারটা এমন ঘটেনি। সত্যি বলতে, খেলাটার প্রতি ভালোবাসা তৈরি হতে প্রায় বছরখানেক লেগে গিয়েছিলো। কিন্তু বছর না যেতেই আমি খেলায় ভালো করতে শুরু করলাম। যখন উন্নতি করতে লাগলাম, রামাকান্ত আচরেকার নামের কোচের অধীনে শিখতে শুরু করলাম। রামাকান্ত আমার দক্ষতা বাড়াতে চাপ দিয়েছেন। মাঝেমধ্যে প্রশিক্ষণের সময় তিনি স্ট্যাম্পের উপর এক রুপির একটা কয়েন রাখতেন। প্রশিক্ষণ চলাকালীন যে বোলার আমাকে বোল্ড করতে পারবে তাকেই কয়েনটা দেয়া হবে। তবে আমি অপরাজিত থাকতে পারলে কয়েনটা আমার। এক রুপির কয়েনকে খুব বিশাল কিছু না মনে হতে পারে, কিন্তু ওই কয়েনটাই আমার ভেতরে তখন জেদ ধরিয়ে দিতো। আচরেকারের অধীনে ট্রেনিং সেশন থেকে আমি ১৩টা কয়েন জিতেছিলাম। আজ পর্যন্ত গর্বের সঙ্গে আমি সেগুলো রেখে দিয়েছি।

উন্নতির সাথে সাথে, স্কুল ক্রিকেটে আমার পারফর্মেন্স অনেকের নজরে পড়তে লাগলো। প্রত্যাশা বাড়তে থাকলো। সত্যি বলতে, ব্যপারটা আমার খুব ভালো লাগছিলো। চাপ না, আমি বরং প্রশংসা হিসেবেই এগুলো নিতাম। বুঝে গিয়েছিলাম, আমি যদি যথেষ্ট ভালো না হতাম, লোকে আমার থেকে অতো প্রত্যাশা করতো না। অল্প বয়স থেকেই প্রতিনিয়ত লোকের প্রত্যাশা আমার সাথে ছিলো যা আমাকে সতর্ক রাখতো। আমাকে উন্নতি করতে সাহায্য করতো।

১৬ বছর বয়সে, সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়ার হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার সৌভাগ্য লাভ করি আমি। উদ্বোধনী ম্যাচে, আমরা প্রধান প্রতিপক্ষ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে করাচি খেলতে নামি। আমি ছিলাম ভীত, দিশাহীন। কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। প্রতিপক্ষের দর্শক আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছিলো। তাদের একমাত্র চাওয়া ছিল যাতে আমি ব্যর্থ হই। প্রথমদিকে হয়েছিও। সেদিন পাকিস্তানের বিপক্ষে আমি এমন মাত্রায় ক্রিকেট দেখেছি যার মুখোমুখি আগে কখনও হইনি। আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়, এমনকি দ্বিগুনের বেশি বয়স্ক বোলারকে খেলতে হয়েছে। মাঠে নেমে কাঁপতে কাঁপতে খেলেছি, আউট হওয়ার আগে করেছি মাত্র ১৫ রান। ড্রেসিং রুমের দিকে হাঁটতে হাঁটতে নিজের যোগ্যতা নিয়েই সংশয় তৈরি হলো। হয়তো যেমন ক্ষুদে মাস্টার আমাকে ভাবা হতো আমি তেমন নই। হয়তো সফল ক্রিকেটার হওয়াটা আমার জন্যে না।

মন খারাপ করে যখন ড্রেসিংরুমে বসে ছিলাম, আমি টিম ম্যানেজার চান্দু বোর্দে এবং দলের জ্যেষ্ঠ সদস্য রবি শাস্ত্রীর সঙ্গে কথা বললাম। সেদিন আমার জন্য তাদের উপদেশ ছিলো অবিশ্বাস্য রকম সহজ কিন্তু অমূল্য- ধীরে চলো।

নিজেকে প্রমাণে এতটাই মনোনিবিষ্ট ছিলাম যে, আমি আমার সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ নিতে মনোযোগ দিতে ব্যর্থ হলাম। আপনি প্রত্যাশার চাপে জর্জরিত হলে, ( আর কোটি কোটি দর্শকের কথা না-ই বা উল্লেখ করলাম) সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো মনোযোগ ধরে রাখা, নিজের মন নিয়ন্ত্রণ করতে পারা। যেকোনো ক্রিকেটারের জন্যই একটা চ্যালেঞ্জ হলো পরবর্তী বলটিতে মনোযোগ দেয়া, শেষ বলে না।

পাকিস্তানের সঙ্গে পরের ইনিংসে আমার ব্যাট করার সুযোগ হয়েছে। নিজেকে বলেছি, আমি অন্তত আধঘণ্টা ক্রিজে থাকবো। আমি সেটাই করেছি। যত বেশি আমি ব্যাট করেছি তত আয়েশের মনে হয়েছে। আমার বয়স আর অনভিজ্ঞতা বিষয়ে সন্দেহকে ঝেড়ে ফেলে খেলায় মনোযোগ দিয়েছি। ৫৩ রান করে আউট হয়েছিলাম সেদিন, কিন্তু প্রতিটি রান মনে হয়েছে মূল্যবান। ম্যাচ শেষে হোটেল রুমে গিয়ে নিজে নিজে উদযাপন করেছি। আমি এতোই উচ্ছ্বসিত ছিলাম যে, রুমজুড়ে আমি আনন্দে ধেইধেই করে নেচেছিলাম! ওই পরিস্থিতিতে ভালো খেলতে পেরে খুব নির্ভার লেগেছিল। সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর ব্যাপারে যে সন্দেহ ছিলো নিজেকে নিয়ে তা এরপর মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে গেলো। সেল্ফ ডাউট অতিক্রম করাটা অনেক খেলোয়াড়ের জন্য কঠিন কাজ। অল্প বয়সে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়াটা সম্ভবত আমার ক্যারিয়ারের পরবর্তী দিনগুলোর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সাহায্য  করেছে।

ক্যারিয়ারজুড়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অনেক স্মরণীয় ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা আছে। মনে হয়েছে কি অদ্ভুত এক প্রতিদ্বন্দ্বিতা! ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশেই ক্রিকেট নিতান্ত খেলাধুলার চেয়ে বড় কিছু। এক দেশের বিরুদ্ধে অন্য দেশের খেলা কোটি কোটি মানুষের গৌরবের বিষয়। প্রত্যেকটা বল জাতির মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠে। এমনি এক  স্মরণীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিলো ২০০৩ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে। আমরা কোয়ার্টার ফাইনালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলেছি, এটাকে মনে হয়েছিলো শিরোপার জন্যে লড়াই। ম্যাচটা নিয়ে প্রত্যেকেই উত্তেজিত ছিলো। প্রত্যাশার পারদ ছিলো অনেক উঁচুতে। সেদিন স্টেডিয়ামে আমাদের চেষ্টার কথা আমি কখনও ভুলবো না। এটা অনেকটা মানবজাতি ভারত আর পাকিস্তান দুই সমর্থকগোষ্ঠিতে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার মতো। যদিও আমরা টুর্নামেন্ট জিততে পারি নি, ওইদিনের ম্যাচটা আমরা জিতেছিলাম- অধিকাংশ ভারতীয়র কাছে ওটাই হলো আসল কথা।

আমি এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা উল্লেখ করলাম এ কারণে যে, ক্রিকেট আমেরিকান খেলা না হলেও, অনেক দিক দিয়ে আমেরিকানরা খেলাধুলার ব্যাপারে যা যা পছন্দ করে তা-ই তুলে ধরে; রণকৌশল, আবেগ আর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

আমেরিকা ভ্রমণ এবং আরও অনেকের সঙ্গে এই অসাধারণ খেলাটির পরিচয় করিয়ে দিতে পেরে আমি আনন্দিত। আমি বিশেষ আগ্রহ নিয়ে ম্যাচগুলোর জন্য অপেক্ষা করছি এই কারণে যে, ভক্তরা ক্রিকেটের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ কিছু ক্রিকেটারের খেলা আনন্দের সঙ্গে দেখার সুযোগ পাবে। চমকপ্রদ সব চরিত্র ও অসামান্য ব্যক্তিত্বদের খেলা ক্রিকেট। আর সেসবের নমুনা ম্যাচগুলোতে পাওয়া যাবে। আমার বন্ধুদের অনেকেই ভারত থেকে এসে আমেরিকায় স্থায়ী হয়েছে। প্রথম দিকে তাদের ধারণাও ছিলো না- বেসবল আর বাস্কেটবল কীভাবে খেলা হয়? এক পর্যায়ে তারা তাদের বন্ধুদের সঙ্গে স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে গিয়েছে। সময়ের সাথে সাথে খেলা দুটিকে বুঝেছে এবং উপভোগ করতে শিখেছে। আমার আশা আমেরিকার ক্রিকেট ভক্তরাও ওই ম্যাচগুলোতে তাদের বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে এসে খেলাটা উপভোগ করতে সাহায্য করবে। আমেরিকা খুবই বৈচিত্র্যময় এবং ক্রিড়ামোদী একটি দেশ। আমার বিশ্বাস সময়ের সাথে সাথে ক্রিকেটকেও দেশটি অন্যান্য আন্তর্জাতিক খেলার মতো আপন করে নেবে।

 

পাদটীকা:

২০১৬ সালে আমেরিকায় ক্রিকেট জনপ্রিয়করণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে তারকা খেলোয়াড় শচীন টেন্ডুলকার আমেরিকা ভ্রমণ করেন। বেশ কিছু ম্যাচ সেখানে খেলেন। সেসময় ‘প্লেয়ার্স ট্রিবিউন’ খেলোয়াড়দের সঙ্গে ভক্তদের  পরিচয় করিয়ে দিতে বিভিন্ন লেখা প্রকাশ করে। এটি শচীনের নিজের জবানীতে বলা বিরল লেখাগুলোর একটি। লেখাটিতে কিংবদন্তী এই ব্যাটসম্যান ভারত-পাকিস্তান চিরদ্বৈরথের পাশাপাশি বলেছেন তাঁর জীবনের কিছু অজানা কথা। বলেছেন ক্রিকেট দর্শন নিয়ে। লেখাটি প্লেয়ার্স ট্রিবিউনে প্রকাশিত হয় ৬ নভেম্বর ২০১৫ সালে। ভাষান্তর করেছেন কে এম এ রাকিব।

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ জুলাই ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন