ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

বিশ্বকাপ আমাদের এই আশ্চর্য সাকিব উপহার দিয়েছে

জাফর সোহেল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৭-১৪ ৩:৩৪:০৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৭-১৪ ৩:৩৪:০৭ পিএম

জাফর সোহেল: ২০১৯ বিশ্বকাপটা কাকে কী দিলো কিংবা উল্টোভাবে যদি বলি কে এখান থেকে কী নিতে পারল- বেলা শেষে হয়ত এই হিসাবটাই হবে বেশি করে। দলগুলো তাদের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ করবে। কেউ কেউ আফশোস করবে, কেউ কেউ বলবে- না, ঠিকই আছে। দিনশেষে ক্রিকেট কতখানি জিতল বা হারল- এই চিন্তা কেউ করবে না। আমার কাছে বিশ্বকাপের মতো বড় আয়োজন কেবল এইসব চাওয়া-পাওয়ার হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বকাপের সঙ্গে খেলাটার স্পিরিট আর মর্যাদার বিষয় জড়িত। খেলা তো অনেক হয়; অনেক সিরিজ হয়, টুর্নামেন্ট হয়- দ্বিপাক্ষিক, ত্রিদেশীয় কিংবা বহুপাক্ষিক। কিন্তু বিশ্বকাপ শুধুই খেলা নয়; এটি কেবল ২২ গজে দৌড়াদৌড়ি আর ডিম্বাকার মাঠের ৭ ঘণ্টার উত্তেজনা নয়। বিশ্বকাপ একটি চেতনা। মানুষে মানুষে বৈশ্বিক সম্পর্ক আর জানাশোনার একটা প্লাটফর্ম। আবার এটাও সত্য শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের সঠিক জায়গাটাও এই বৈশ্বিক মঞ্চ।

পৃথিবীর মানুষ একে অন্যকে নানাভাবে জানে, নানা উপায়ে বোঝে। ব্যবসা-বাণিজ্য, ভ্রমণ, অভিবাসন ইত্যাদি অনেক প্রক্রিয়ায় এক পৃথিবীর মানুষ জানে অপর পৃথিবীর মানুষকে। খেলা আরেকটি চমৎকার মাধ্যম অন্য দেশকে জানার, অন্য সংস্কৃতি বোঝার। অলিম্পিক গেমস এরকমই একটি জনপ্রিয় আর বিশাল যজ্ঞ, যার মাধ্যমে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি করে অপরাপর দেশ ও মানুষ সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়। পৃথিবীতে কেবল খেলা দিয়ে মানুষে মানুষে যোগাযোগের যে অপূর্ব আবিষ্কার প্রাচীন গ্রিসে হয়েছে তার তুলনা এখনো নেই। আমাদের সময়ে সবচেয়ে বেশি উন্মাদনা ছড়ায় যে আয়োজনটি, সেটি বিশ্বকাপ ফুটবল। ফুটবল বিশ্বকাপের আবেগ গায়ে লাগে না এমন কোনো দেশ নেই, এমন কোনো জাতি নেই।

সেই তুলনায় ক্রিকেট বিশ্বকাপ কমসংখ্যক দেশ ও জাতিকেই এক ছাতার নিচে আনে। তবু এই মহাযজ্ঞটির আবেদনও নিতান্ত কম নয়। পৃথিবীর সাতশ’ কোটি মানুষের মধ্যে অন্তত দুইশ’ কোটি মানুষ ক্রিকেট বিশ্বকাপের আবেগ গায়ে জড়ায়। তারা বিশ্বকাপ দেখে, বিশ্বকাপ উপভোগ করে; জয়ের উচ্ছ্বাসে ভাসে আবার পরাজয়ের বেদনায় মলীন হয়। এই প্রায় দুইশ’ কোটি মানুষের মধ্যে পারস্পরিক জানা ও বোঝার একটা দারুণ জায়গা হয়ে ওঠে বিশ্বকাপ ক্রিকেট। বছরের অন্য সময় যে দেশ সম্পর্কে হয়ত একটি কথাও কেউ বলবে না, বিশ্বকাপ আলোচনায় আনবে সেই দেশটিকে, সে দেশের মানুষকে; সে দেশের সংস্কৃতিকে। খেলতে নামার শুরুতে যার যার জাতীয় সংগীত বাজানো এবং গাওয়ানোর মধ্য দিয়েই বিশ্বকাপ এই বার্তা দেয় যে, এটি একটি আসর যা আপনাকে অন্যের কাছে তুলে ধরবে আর আপনি অন্যদের বিষয়ে জানবেন। তা কেবল জাতীয় সংগীতের মাধ্যমেই নয়, গ্যালারিতে আর পথে প্রান্তরে একে অন্যের সঙ্গে দেখা আর কথায়ও অনেক জানাজানি হবে।

আফগানিস্তানের কথাই ধরা যাক। ১৯৭৯ সালে রুশ দখলদারিত্ব শুরুর পর থেকে ৪০ বছর হয়ে গেল, এখনো দেশটি আছে একরকম যুদ্ধের ভেতরে। যুদ্ধ, বোমা, গুলি, রক্ত, লাশ, তালেবান, আলকায়েদা- এই শব্দগুলোই আমাদের কালে আফগানিস্তানকে জানার এবং বোঝার মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অথচ ইংল্যান্ডের মাটিতে এক ঝাঁক আফগান তরুণ কী দারুণভাবেই না তাদের দেশকে চেনালো, জানালো! বিশ্ব জানল আফগানিস্তান একটি দেশ যেটি কেবল বোমা আর গুলি নিয়েই খেলে না, ক্রিকেটটাও খেলে এবং বেশ ভালোভাবে। তাদের অনেক নাম আছে, বংশ আছে; খান আছে, শেনওয়ারি আছে, জাজাই আছে, আফগান আছে। কেবল খেলার হিসেব করলে রশিদ খান আর মোহাম্মদ নবীরা হয়ত এই বিশ্বকাপ থেকে কিছুই পায়নি কিন্তু দেখুন তো ভেবে একবার- আফগানরা কি কম কিছু পেয়েছে এই বিশ্ব আসর থেকে? আমার কাছে বিশ্বকাপ তো এটাই। খেলা ছাড়াও অনেক কিছু এখানে আছে। পাওয়ার আছে, জানার আছে, বোঝার আছে।

বাংলাদেশ এবং তার ক্রিকেটানুরাগীরা এভাবে চিন্তা করতে খুব একটা রাজি না, এটা আমি জানি। তারা চরমের ওপর কোনো চরম থাকলে সেই রকম বাস্তববাদী ক্রিকেট ভক্ত। অতএব জয় ভিন্ন অন্যকিছু, অন্য পাঁচালি শোনার বা বোঝার সময় তাদের নেই। ক্রিকেটীয় হিসাবে বাংলাদেশি সমর্থকদের মন খারাপ। কারণ, সেমিফাইনালের অতি সম্ভব স্বপ্নটুকুও ছুঁতে পারেনি টাইগাররা। কিছু মানুষ অবশ্য দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রাণ সাকিব আল হাসান বিশ্ব আসরেরও প্রাণ বা মধ্যমণি হতে পেরেছেন এই সুখে। তবে কয়েকটা টেলিভিশনের সাংবাদিকদের কল্যাণে আমাদের ইংল্যান্ড এবং ইউরোপ আমেরিকসহ অন্য দেশ থেকে সেখানে আসা প্রবাসী বাংলাদেশি ক্রিকেট ভক্তদের কিছু প্রতিক্রিয়া দেখে ভালো লাগল। তারা বিশ্বকাপকে যেমন আনন্দ উচ্ছ্বাস করার একটা উপলক্ষ হিসেবে নিয়েছেন তেমনি দেশকে নিয়ে গৌরব করার, অন্য দেশের মানুষের কাছে দেশের কথা বুক ফুলিয়ে জানানোর সুযোগ হিসেবেও নিয়েছেন। আমি মনে করি তাঁরাই ঠিক আছেন। খেলায় হারজিত থাকবে। তার বাইরেও খেলা থেকে আমরা অনেক কিছু নিতে পারি যা সবার কাছেই ইতিবাচক ঠেকবে।

এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশ সেমিফাইনালে খেলতে পারেনি এটা কোনো বড় ধরনের ব্যর্থতা নয়। আমি বলব- ব্যর্থতাই নয়। আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলেছি। বড় কিছু পেতে হলে ভাগ্য সহায় হতে হয়, তা আমরা পাইনি। নিউজিল্যান্ড আর ভারত ম্যাচ আমাদের হাতেই ছিল। ভাগ্য পাশে ছিল না বলেই জয় পাওয়া হয়নি। অস্ট্রেলিয়া ম্যাচটাও টাইট হয়েছে এবং বিশ্ব মিডিয়া তখন পর্যন্ত ঐ ম্যাচটাকেই বিশ্বকাপের সেরা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচ বলেছিল। আমি বাংলাদেশের ম্যাচ ছাড়াও অন্য ম্যাচগুলোতে ভাষ্যকারদের বলতে শুনেছি, বাংলাদেশ অসাধারণ খেলছে! আমার মনে হয় বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের এমন অনেক অর্জন আর স্বীকৃতি মিলেছে। এতে আমাদের সন্তুষ্ট থাকা চাই।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সাম্প্রতিক কয়েক বছর আমরা অনেক জয় পেয়েছি, কিন্তু এর বেশিরভাগ আমরা পেয়েছি ঘরের মাঠে। বাইরেও যে আমরা ভালো খেলতে পারি এবং সব বড় দলকেই সমানভাবে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারি তা এই বিশ্বকাপে আমরা দেখাতে পেরেছি। লোকে তা মেনেও নিয়েছে। সবার মুখে মুখেই এবার বাংলাদেশ ছিল। এর বাইরে আর কী চাই আমরা। বাস্তবতা হলো আমরা এখনো সাউথ আফ্রিকার চেয়ে ভালো দল হয়ে যাইনি। দেখুন তাদের কী অবস্থা! বিশ্বকাপে ভালো করতে পারেনি বলে তারা কি খারাপ দল হয়ে গেল? মোটেই না। শেষ লীগ ম্যাচেই কিন্তু অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে তারা। আর এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় অর্জন তো আমাদের সাকিব আল হাসান। বাংলাদেশ তার ক্রিকেট ইতিহাসে কবে এমন কাউকে পেয়েছে যে প্রতিদিন রান করছে, প্রতিদিন সেঞ্চুরি হাফ সেঞ্চুরি হাঁকাচ্ছে! একটা ম্যাচেও খারাপ না খেলাটা বাঙালি কোন ক্রিকেটারের মজ্জায় আছে? বিশ্বকাপ তো আমাদের এই আশ্চর্য সাকিব উপহার দিয়েছে! যার মজ্জাতে ঢুকে গেছে রান করা। সেঞ্চুরি করা যার নেশা হয়ে গেছে। এখন একজন সাকিব আছে মানে রান তোলার একটা মেশিন আছে মনে হবে।  কোনো এক সময় টেন্ডুলকার, গাঙ্গুলি আর সাঙ্গাকারাদের রান করা দেখে মনে হতো- ইস্! কবে আমাদের এমন কেউ হবে? এখন আমরা পেয়ে গেছি তাদের মতোই একজন। এই প্রাপ্তিটুকুকে আমাদের বড় করে দেখা উচিত।  বিশ্বকাপ আমাদের এটা দিয়েছে।

শুরুতে যে কথা বলছিলাম,  বিশ্বকাপ কেবল খেলা নয়, এটা একটা স্পিরিট। শেষ দিকে এসে বাংলাদেশের একটা বড় অংশের মানুষের আচরণটা ঠিক ঐ স্পিরিটের সঙ্গে যায় না। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নানা কারণে আমাদের দেশে ভারতবিরোধী মনোভাব পোষণ করেন এমন অনেক মানুষ আছেন। কিন্তু কেবল খেলা নিয়ে মানুষের মধ্যে এত পরিমাণে ভারতবিরোধী মনোভাব আগে কখনো দেখা যায়নি। এই সুযোগে সুবিধাবাদী আর সাম্প্রদায়িক লোকেরাও ভারতের মুণ্ডুপাত করেছে নগ্নভাবে। এটাকে চরম ভারতবিদ্বেষ বলে অনেকে আবার সমালোচনাও করছেন দেখলাম। পুরো বিষয়টাতে খুব অস্বস্তি লাগল! আসলে ক্রিকেটের স্পিরিটের সঙ্গে এসব কু-তর্ক কখনো যায় না। বলাই হয়- ক্রিকেট ভদ্রলোকের খেলা। এখানে অভদ্রতার জায়গা নেই। আপনি এই খেলার সমর্থক মানে আপনাকেও ভদ্র আচরণ করতে হবে। অন্তত খেলাটি প্রসঙ্গে যখন কথা বলবেন। অতএব যারা ভারত নিয়ে যুক্তহীন নোংরা ট্রল করেছেন ফেসবুকে তারাও ক্রিকেটের স্পিরিটের সঙ্গে নেই আবার যারা বিষয়টাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিতে চাইছেন তারাও নেই। দুই পক্ষই আসলে ভুল করছেন বলে অন্তত আমার কাছে মনে হচ্ছে। আমরা যারা ক্রিকেট ভালোবাসি তারা ভারত এবং পাকিস্তান দুই দেশের অনেক তারকাকে পছন্দ করি। এটা একান্তই ক্রিকেটীয় ব্যাপার। এর সঙ্গে অন্য রং মেশানো ঠিক নয়।

শেষে আবার ইংল্যান্ড এন্ড ওয়েলসে ফিরি। ক্রিকেটের মক্কা লর্ডস স্টেডিয়ামে আজ যে ইতিহাস লেখা হবে তা সম্পূর্ণ নতুন আলেখ্য হবে। এর কলাকুশলী নতুন, কারবারি নতুন, অক্ষরগুলোও নতুন করে লেখা হবে। আগে যে শব্দগুলো কখনোই খোদাই করা হয়নি সোনালি ট্রফিতে এবার সেগুলো বসবে। ঘোষিত হবে ক্রিকেটে নতুন সম্রাজ্যের নাম। সেটি কিউই পাখির দেশ নিউ জিল্যান্ড যেমন হতে পারে তেমনি জনক হয়েও রাজার আসনে কখনো যেতে না পারা ইংল্যান্ডও হতে পারে। এই যে নতুন কাণ্ডারী পাচ্ছে ক্রিকেট বিশ্ব  এটাও এই বিশ্বকাপের দারুণ উপহার বলব আমি। না হয় বড্ড একঘেয়েমি হয়ে যেত; পুরনোদের উৎপাত কত আর চোখে সয়, বলুন!

লেখক : সহকারী বার্তা সম্পাদক, আরটিভি


রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৪ জুলাই ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন