ঢাকা, বুধবার, ৫ ভাদ্র ১৪২৬, ২১ আগস্ট ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

সুন্দরবন থেকে হাত গুটিয়ে নিক স্বার্থান্ধ শিল্পোদ্যোক্তারা

আহমদ রফিক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৭-১৫ ৮:১৯:১৯ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৭-১৫ ৫:৩৫:০১ পিএম
সুন্দরবন থেকে হাত গুটিয়ে নিক স্বার্থান্ধ শিল্পোদ্যোক্তারা
Walton E-plaza

|| আহমদ রফিক ||

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ সীমান্তজুড়ে অসাধারণ একটি বনভূমি। এর আন্তর্জাতিক খ্যাতি শুধু বিরল সৌন্দর্যের প্রাণী রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা সুন্দরী বনের জন্যই নয়, জনপদের জন্য সুরক্ষার দেওয়াল হিসেবেও বিবেচিত সুন্দরবন। এর প্রাণী বৈচিত্র, উদ্ভিদ বৈচিত্র নিয়ে অনেক লেখালেখি স্বদেশে বিদেশে। বিরল চরিত্রের এমন বনভূমি দেশের সম্পদই নয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে গর্ব ও অহঙ্কারের। যেকোনো আত্মসচেতন রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য দেশের এমন সম্পদ সুরক্ষার যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেমন আপন স্বার্থে তেমনি আন্তর্জাতিক নিরিখে। কিন্তু প্রকৃতির আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচিত সুন্দরবন সুরক্ষা দূরে থাক উন্নয়নের খাতিরে তথা বিদ্যুৎ তৈরির প্রয়োজন মেটাতে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের যে পরিকল্পনা নেয়া হয় তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো আন্দোলন করে আসছে।

বছর কয়েক আগের কথা। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিরুদ্ধে সারাদেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। স্লোগান: ‘সুন্দরবন বাঁচাও’। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবেশ দূষণ বিপর্যয় নিয়ে বহু লেখালেখি, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন, আন্দোলন, স্থানীয় প্রতিরোধ ইত্যাদি মহাতুলকালাম লক্ষ্য করেছি আমরা। পরিস্থিতি এমন জটিল হয়ে দাঁড়ায় যে আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী মহল এদের পক্ষে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের সুধীমহলে তখন প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নেতিবাচক দিক বিশদ আলোচনা— লেখায়, বক্তৃতায় তার বিপুল প্রকাশ। অনেক উদাহরণ উঠে আসে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে, এর বিপজ্জনক দূষণ প্রকৃতি নিয়ে। ভারত এবং চীন যে নিজ দেশে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প কাটছাট করছে এবং নতুন তেমন প্রকল্পের অনুমোদন দিচ্ছে না, বিশেষ করে বনভূমির নিকটবর্তী এলাকায় সেসব উদাহরণ উঠে এসেছে। এ বিষয়ে আমারও ছিল একাধিক নিবন্ধ।

নান্দনিক প্রতিবাদ, বাস্তব আন্দোলন কোনো কিছুতেই প্রকল্প বাতিল হয়নি। সরকার ও পরিবেশবাদীদের মধ্যে সংঘাত অব্যাহত থেকেছে। এক পর্যায়ে এসে আন্দোলনরত পরিবেশবাদীদের ক্লান্ত তৎপরতায় কিছুমাত্রায় স্থবির হতে দেখা গেছে। ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে সুন্দরবন রক্ষায় রামপাল কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের জন্য সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও সরকারকে এ বিষয়ে পিছু হটতে দেখা যায়নি। বরং তাদের বরাবর বক্তব্য— রামপালের প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে। কাজেই এ প্রকল্প সুন্দরবনের পরিবেশ দূষিত করবে না। প্রাণী বৈচিত্র, উদ্ভিদ বৈচিত্র সবই অক্ষুন্ন থাকবে ইত্যাদি। এ বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা ছিল সরকারি প্রতিবেদনে। তবে এটা ঠিক যে, আন্দোলনের প্রভাবে বা ইউনেস্কোর চাপে বা বিশেষ কোনো কারণে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পে আকাঙ্ক্ষিত গতি সঞ্চার লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তবু প্রকল্প বাতিল করা হয়নি। এটাই বড় কথা।

দুই

বর্তমান সরকার উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এটা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেরও ঘোষণা। রামপাল নিয়ে ঘরে-বাইরে প্রতিবাদের মুখে সরকার যে বিব্রত সেটা তারা এ বিষয়ে মুখ না খুললেও বুঝতে অসুবিধা হয় না। সেজন্যই কি রামপাল প্রকল্পে ধীরগতি? আবার পরিস্থিতি অনুকূলে আনার চেষ্টাতেই কি সরকার দলীয় বহু বিত্তবান সদস্য সুন্দরবনের কাছাকাছি জমি কিনতে শুরু করে—

যাকে বলে বন কেটে বসত স্থাপনের অভিপ্রায়! সঙ্গে যতসব আধুনিক স্থাপনা। কেন জানি এ বিপজ্জনক পরিস্থিতি নিয়ে যেমন বনবিভাগ, তেমনি পরিবেশ সচেতন সুধী সমাজ প্রতিবাদের ঝড় তোলেনি। নির্বিঘ্নে চলছে বিকিকিনির এসব নীরব তৎপরতা। এগুলোই যে বর্তমানের সুচ ভবিষ্যতে কাল হয়ে দেখা দেবে পরিবেশবাদীরা কেন জানি তা সবার গোচরে আনার চেষ্টা করছেন না। প্রতিবাদের ঢেউ তোলায় জ্বালানি যোগ করছেন না। এখন মনে হয় সেসব ঘটনার নেতিবাচক আলামত প্রকাশ পেতে শুরু করেছে।

আমার যতদূর মনে পড়ে এসব ভূমি বেচাকেনা ছিল সুন্দরবনের অতীব নিকটেই; কয়েক মাইলের মধ্যে, এমনকি ক্ষেত্র বিশেষ কিছু কিছু জমি ছিল সুন্দরবনের অতি সন্নিকটে, বা বনের ভিতরে। ব্যক্তিগত ওইসব ভূমিই কি এখন সুন্দরবনবিরোধী প্রকল্প স্থাপনে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে চলেছে? প্রকল্প তৈরি হতে যাচ্ছে সুন্দরবনের জন্য পরিবেশ বিচারে সংকটাপন্ন এলাকায়।

উপমাটা রামায়ণের। হয়তো কারো কারো পছন্দ নাও হতে পারে। তবে লাগসই সন্দেহ নেই- ‘একা রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব দোসর’। একদিকে সুন্দরবনের ১৪ কিলোমিটার দূরত্বে বিপজ্জনক রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। সম্প্রতি তার সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে একটি তেল বিদ্যুৎ কেন্দ্র। যা সুন্দরবনের তথাকথিত সংরক্ষিত এলাকার সাড়ে চার কিলোমিটারের মধ্যে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পর্কে আত্মরক্ষামূলক তথ্য দিয়ে সরকারের পক্ষে বারবার বলা হচ্ছিল ‘আমরা সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরত্বে আছি। বন পরিবেশ নিয়ে আতঙ্কিত হবার কোনো কারণ নেই।’ এখন প্রস্তাবিত তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে তারা কী বলবেন? বলবেন কি, ভয় নেই আমরা ৪ কিলোমিটার দূরত্বে আছি, সুন্দরবনে প্রবেশ করিনি। না, এ প্রকল্প সরকারের নয়।

এ তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করছে ‘পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা’ নামে একটি বেসরকারি কোম্পানি। একটিমাত্র দৈনিকের প্রথম পাতায় মোটা হরফে শিরোনাম: ‘এবার সুন্দরবনের আরও কাছে বিদ্যুৎ প্রকল্প!’ প্রতিবেদকের মতে ‘এখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে সুন্দরবন আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।’

এখন এ বিষয়ে কী বলবেন সরকার? কী বলবেন পরিবেশ অধিদপ্তর? কী বলবেন তেলগ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটি? উল্লিখিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে ১০০ মেগাওয়াটের প্রস্তাবিত এ বিদ্যুৎকেন্দ্র সরকারের অনুমোদন পেয়েছিল ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জে নির্মাণের জন্য, ২০১২ সালে। ইতোমধ্যে ৭ বছর সময় কেটে গেছে, কিন্তু প্রকল্প নির্মাণে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

এতদিন পর হঠাৎ তাদের এমন দুর্মতি কেন হলো প্রকল্পটি সুন্দরবনের অতি নিকটে স্থানান্তরে? আর বাংলাদেশে তো এসব ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় সর্ষের মধ্যে ভূতের অস্তিত্ব। তা না হলে তারা নিয়ম বহির্ভূতভাবে সুন্দরবনের অতি সন্নিকটে মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রকল্পটি স্থাপনের জন্য স্থানীয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ‘প্রাথমিক সম্মতি’ পেয়ে যায় কীভাবে? এ বিষয়ে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য হচ্ছে— সুন্দরবনে এ প্রকল্প কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে কিনা তা আমরা খতিয়ে দেখব।

ভালো কথা, দেখুন এবং এ বিষয়ে প্রকৃত বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে তবেই ছাড়পত্র দানের সিদ্ধান্ত নিন। বিদ্যুৎ আমাদের প্রয়োজন তাই বলে তা সুন্দরবন ধ্বংসের বিনিময়ে নয়।

তবে আমাদের মূল প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে, ঘুরে ফিরে বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনে সুন্দরবন কেন? সুন্দরবন ছাড়া কি সারা বাংলাদেশে আর কোনো নিরাপদ এলাকা নেই। প্রথম নির্ধারিত স্থানে কেরানীগঞ্জের কি অপরাধ? আর কেনই বা কেরানীগঞ্জে থেকে অন্য কোথাও না গিয়ে সোজা সুন্দরবনে? এ প্রশ্নগুলোর যুক্তিসঙ্গত নিষ্পত্তি দরকার।

এ বিষয়ে তেল গ্যাস জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে সরকারের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানানো হয়েছে: ‘বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করে সুন্দরবন রক্ষা করুন।’ তাদের মতে সরকারের এ ধরনের নৈরাজ্যিক আচরণে ‘সুন্দরবন তার বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা হারাতে বসেছে।’ তাই সুন্দরবনের কাছে কোনো বিদ্যুৎ প্রকল্প, ক্ষতিকর প্রকল্প স্থাপন থেকে দূরে থাকার আহ্বান সংশ্লিষ্ট সবার উদ্দেশ্যে।

আমরাও বলি, এ প্রকল্প বাতিলের পক্ষে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো প্রতিবাদে সোচ্চার হোন। এ সম্পর্কে ২৩ জুন একটি দৈনিকের সম্পাদকীয়তে সুন্দরবনের এত কাছে এ বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের বিপক্ষে মত প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে: ‘আমরা মনে করি, অবিলম্বে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির ছাড়পত্র বাতিল করা উচিত। সুন্দরবনকে এভাবে আমরা ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারি না। একইসঙ্গে ওই অঞ্চলে যেসব শিল্প কারখানা গড়ে তোলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, সেগুলোও পর্যালোচনা করতে হবে।’

আসলে নীতি ও বাস্তবতার তুলনামূলক পর্যালোচনা ছাড়া কোনো প্রকল্পকেই অনুমোদন দেয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। সরকারকে এ সত্যটি মনে রাখতে হবে। জাতীয় স্বার্থ, পরিবেশ সংরক্ষণ সর্বাগ্রে বিবেচ্য বিষয়। অন্য কোনো স্বার্থ সেখানে স্থান পেতে পারে না।

লেখক: প্রাবন্ধিক, রবীন্দ্র গবেষক

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৫ জুলাই ২০১৯/তারা

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge