ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ কার্তিক ১৪২৬, ১৪ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

র‌্যাগিং সংক্রামক রোগ

রিয়াজুল হক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-১৪ ২:৪৬:৫৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১০-১৪ ২:৫৩:৫৫ পিএম

দেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। আসন সংখ্যা সীমিত হবার কারণে অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী ছাড়া ভর্তি হবার আদৌ কোনো সুযোগ থাকে না। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সুযোগ পায়, তাদের পেছনের শিক্ষাজীবন যদি আমরা একটু ঘেঁটে দেখি তাহলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী এসএসসি, এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে, পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি পেয়েছে। এই অর্জন এমনি এমনি আসে না। সেই প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত ঐ সকল শিক্ষার্থীরা দিনরাত এক করে পড়ালেখা করেছে। পড়ালেখা করার জন্য অনেকেই আত্মীয়-স্বজনের বাসায় কম যেত, আড্ডাবাজিতে থাকত না, এমনকি খেলাধুলাও কম করত কিংবা করত না।

বাবা মায়েরা আসলে কী চান? তাদের সন্তান মন দিয়ে লেখাপড়া করবে। যে সন্তান পড়ালেখায় মনোযোগী হয়, তারা কিন্তু বাবা-মায়ের খুব আদরের হয়, বড় ভাই-বোন থাকলে তারাও একটু বেশি আদর করে, আত্মীয়-স্বজন আলাদা চোখে দেখে। প্রতিবেশী চাচা-চাচীরা তাদের সন্তানদের কাছে পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের উদাহরণ হিসেবে দাঁড় করায়। স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের কথা আলাদা করে বলার কিছু নেই। শিক্ষকদের আলাদা নজরে থাকে। অনেক আদর করে শ্রেণীকক্ষে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর জিজ্ঞেস করে। অর্থাৎ মেধাবী শিক্ষার্থীরা সবারই খুবই প্রিয় থাকে।

অনেকের আর্থিক অস্বচ্ছলতা থাকতে পারে কিন্তু স্কুল কলেজের মেধাবী শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই অন্যরকম একটা ভালোবাসার বলয়ের মধ্যে বেড়ে ওঠে। লেখাপড়া থাকে তাদের ধ্যান-জ্ঞান। আর যারা সেটা ধরে রাখতে পারে, তারাই উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে মেধাবী সন্তান দিনরাত পরিশ্রম করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়, তারা যদি ক্যাম্পাসে এসে র‌্যাগিং-এর নামে কারো দুর্ব্যবহারের শিকার হয়, তবে সেটা সত্যিই কষ্টের। এই শিক্ষার্থীরা তুই তোকারি শুনেও অভ্যস্ত না। খবরে দেখলাম, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শারীরিকভাবেও নাজেহাল করা হয়। এগুলো অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক কাজ।

বলা হয়ে থাকে, র‌্যাগিং-এর মাধ্যমে নতুনদের সাথে সিনিয়ররা পরিচিত হয়, আদব কায়দা শেখানো হয়। পরিচিত হতে  কিংবা আদব কায়দা শেখাতে হলে দুর্ব্যবহার করতে হবে, শারীরিকভাবে নাজেহাল করতে হবে- এটা কেমন কথা? একজন শিক্ষার্থী যখন ক্লাস সিক্সে ভর্তি হয়, তখন তো সিনিয়রদের সঙ্গে পরিচিত হতে র‌্যাগিং লাগে না। ক্রিকেট, ফুটবল, ডিবেট, বার্ষিক কালচারাল প্রোগ্রাম, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, বার্ষিক প্রতিযোগিতা ইত্যাদি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একজন আরেকজনের সাথে পরিচিত হয়ে যায়। এরপর অনেকের সাথে ভালো সম্পর্কও হয়ে যায়। শুধু দুর্ব্যবহারের কারণেই পরিচিত কয়েকজনকে দেখেছি অত্যাধিক হতাশায় ডুবে গেছে। বাসায় কারো সাথে কথা বলত না। এত কষ্ট করে সুযোগ পাবার পর, বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার চিন্তাও মাথায় চলে আসে। লেখাপড়া করতে পারে না। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী প্রথম সেমিস্টারের কোর্স রিটেক নিয়েছে। আর প্রথমদিকে একবার সিজিপিএ নেমে গেলে, সেই সিজিপিএ পরে আর রিকভার করা যায় না। প্রাইমারি থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, লেখাপড়ার প্রতি যে উদ্দীপনা ছিল, নিমেষেই সব শেষ হয়ে যায়। এরপর অনেকেই স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়। অনেককে বলতে শুনেছি, সিনিয়রদের সাথে পরিচয় থাকলে চাকরি পেতে সুবিধা হবে। প্রশ্ন হচ্ছে- এক বছর, দুই বছরের সিনিয়র কিভাবে চাকরি পেতে সাহায্য করবে? চাকরির বাজারে সেইতো সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী।

র‌্যা‌গিং অনেকটা সংক্রামক রোগের মতো। একজন এর শিকার হলে, পরবর্তীতে সে চায় অন্যের উপর সেটা প্রয়োগ করে কিছুটা ঝাল মেটাতে। ভর্তি হওয়ার পর যারা র‌্যাগিং-এর শিকার হচ্ছে, সাধারণত পরের বছর তারাই আবার এটা করছে। অনেকেই আবার এসব থেকে বের হয়ে আসে। র‌্যাগিং মূলত একটা প্রতিশোধ পরায়ণমূলক কালচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেককেই বলতে শুনেছি, এই বছর র‌্যাগ খেলাম, সামনের বছর র‌্যাগ দেব। বিষয়টা এরকম যে, নিজের ঘরে চুরি হলে, অন্যের ঘরেও চুরি করতে হবে। যদি নতুন শিক্ষার্থীরা র‌্যাগিং-এর শিকার না হতো, তাহলে পরের বছর তারা এক বছর জুনিয়রদের র‌্যাগ দেবার সুযোগ পেত না।

পরিচিত হওয়ার জন্য বিভিন্ন মাধ্যম থাকতে পারে। সেটা শিক্ষা সফর, কালচারাল প্রোগ্রাম অ্যারেঞ্জ, বিভিন্ন ইভেন্ট আয়োজন ইত্যাদি বিভিন্নভাবে হতে পারে। যে র‌্যাগিং আমরা দেখছি, অবশ্যই সেটা ভালো কোন কিছু নয়। এই রাগিং বন্ধ হওয়া উচিত।

লেখক: কলামিস্ট



ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন