ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

বিশ্বে বিরল, শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে প্রথম

মাছুম বিল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-২৩ ১২:৪৯:৫৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-২৩ ৩:২০:১৭ পিএম
শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া (বামে)

শ্রীলঙ্কা এখন গোতাবায়া রাজাপাকসে এবং তাঁর ভাই শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের হাতে। ২১ নভেম্বর শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোয় এক সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে বড় ভাই মাহিন্দা রাজাপাকসেকে শপথ পড়ান শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিজয়ী ছোটভাই গোতাবায়া রাজাপাকসে। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে দুই ভাইয়ের স্ত্রী, তাদের ছেলে এবং পুত্রবধূরা উপস্থিত ছিলেন। এমন ঘটনা শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে এই প্রথম ঘটল। শুধু তাই নয়, পৃথিবীতে এ ধরনের ঘটনা বিরল।

সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের হাতে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রীত্বের ভার তুলে দিয়েছেন নতুন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া।  ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্রটিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। দুই ভাই দেশটির শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হলেন। ২০ নভেম্বর রনিল বিক্রমাসিংহে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষাণা দেন। এর পরই মাহিন্দার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পট প্রস্তত হয়। দুই বারের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দার নাম ঘোষণা করেন গোতাবায়া। রাজাপাকসে ভাইদের পডুজানা পেরামুনা পার্টির কাছে বিক্রমাসিংহের দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি পরাজিত হলে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন বিক্রমাসিংহে।  পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী পদে দুই ভাইয়ের আরোহণ দেশটির রাজনীতিতে রাজাপাকসে পরিবারের শক্তিশালী পুনরুত্থানেরই ইঙ্গিত বহন করে।

২০১৫ সালের প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচনে সুস্পষ্টভাবে রাজাপাকসে সরকারকে পরাজিত করা হয়েছিল। ওই সরকারের ধ্বংসাবশেষ থেকে পুনরায় জেগে ওঠার জন্য মনোযোগী হয়ে ওঠেন তারা। নিজেদের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন সংখ্যালঘুরা সিংহভাগ ভোট দিয়েছেন রাজাপাকসের বিপক্ষে, সেখানে সিংহলী অধ্যুষিত আসনগুলোতে রাজাপাকসে ভাইদের মাধ্যমে তৈরি রাজনৈতিক ঘাঁটিগুলো তাদের ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছে। রাজাপাকসে শিবির নিজেদের নতুন একটি দল- দ্য শ্রীলঙ্কা পডুজানা পেরামুনা গড়ে তোলার ঝুঁকি নিয়েছে, যা বর্তমানে দ্য শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টির সঙ্গে মিশে গেছে। তারা সিংহলী আসনগুলোতে ঘাঁটি গড়ে তোলেন গ্রামীণ জনগণ ও নিন্মবিত্ত মানুষকে কাছে টেনে। দীর্ঘদিনের অবহেলিত, খরা ও ক্রমাবনতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মানুষের মাঝে যে অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠেছিল বিক্রমাসিংহ সরকারের বিরুদ্ধে তাই কাজে লাগিয়ে মানুষের পক্ষে কথা বলেছে রাজাপাকসে শিবির। নবনিযুক্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের বন্ড কেলেঙ্কারি প্রকাশ হয়ে পড়ার পর সংশোধনের অসাধ্য সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা দুর্নীতির ইস্যুকে কাজে লাগিয়েছে। ২০১৮ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও শক্তির পরীক্ষা দিয়েছে এবং আস্থা অর্জন করেছে তারা। তাদের নতুন গঠিত পার্টি দক্ষিণাঞ্চালীয় মানুষেরও আস্থা অর্জন করেছে।

গত চার বছরে সরকারকে আক্রমণ করার কোন সুযোগই তারা হাতছাড়া করেনি। একইসঙ্গে অবিরাম চেষ্টা করেছে নিজেদের  ঘাঁটি গড়ে তোলার। তীব্র বেকারত্বের মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, মানুষের গৃহঋণ বেড়ে যাওযা এবং তাদের এখনও গ্রামীণ জীবিকানির্ভর হওয়া, ইস্টার সানডের পর  ভয়ের পরিবেশ কাটিয়ে না ওঠা- এসব কারণে নিরাপত্তাহীনতার থাবা থেকে মুক্তির জন্য মানুষ শক্তিশালী নেতৃত্বের দিকে ঝুঁকে পড়েছে এবং পরিবর্তন চেয়েছে। যার ফল রাজাপাকসে পরিবারের পুনরুত্থান। ইস্টার সানডের হামলাকে তারা নিজেদের পক্ষে বড় ধরনের পুঁজি হিসেবে নিয়েছিল  এবং দাবি করেছিল, তারাই একমাত্র জাতীয় নিরপত্তার ক্ষেত্রে চ্যাম্পিয়ন। তবে, তামিল ও মুসলিম অধ্যুষিত উত্তর ও পূর্বাঞ্চল, কেন্দ্রীয় উঁচু ভূমি এলাকার ইউএনপি ও শক্ত তামিল ঘাঁটি এবং কলম্বোর আশপাশের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ও ইউএনপির শক্তঘাঁটির জনগণ সাজিথ প্রেমাদাসাকে ভোট দিয়েছেন। তার বিপরীতে বাকী সব এলকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ  ভোট দিয়েছেন গোতাবায়াকে। গোতাবায়া ৫২.২৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। ১৮ নভেম্বরের ভোটে ৮৩.৭ শতাংশ ভোট পড়েছে। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ও ক্ষমতাসীন মন্ত্রী সাজিথ প্রেমাদাসা পরাজয় মেনে নিয়ে রাজাপাকসেকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ৩৫জন প্রার্থীর মধ্যে গোতাবায়ার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী লিবারেল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির সাজিথ প্রেমদাসা পেয়েছেন ৪১.৯৯ শতাংশ ভোট। এপ্রিলে ইস্টার সানডের পরের দিন শ্রীলঙ্কার কয়েকটি র্গিজা ও হোটেলে একযোগে চালানো ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলায় ২৬৯ জন নিহত হওয়ার কয়েক মাস পর অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনের সময় গোতাবায়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

গোতাবায়া বলেছেন, নির্বাচনে  বিজয়ী হলে তিনি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করবেন। চীনের কাছে শ্রীলঙ্কার যে  ঋণ সেটি নিয়ে দুদেশের সম্পর্কে বেশ টানাপোড়েন চলছে। শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে এটি স্পর্শকাতর বিষয়। সে কারণে বিশ্লেষকদের মতে চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের কাজটি সহজ হবে না, বিশেষ করে যখন ভারতের সঙ্গেও একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। দশ বছর আগে গোতাবায়ে রাজাপাকসের ভাই মাহিন্দা শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। মাহিন্দা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গোতাবায়ে তাদের দল পিপলস ফ্রন্ট পার্টির প্রধান হিসেবে আছেন। ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ হওযার পর এটি ছিল শ্রীলঙ্কার তৃতীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এই নির্বাচন নিয়ে গোতাবায়ে শ্রীলঙ্কার নির্বাচিত হওয়ায় কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েছে ভারত। কারণ রাজাপাকসে ও তার পরিবারকে চীনের ঘনিষ্ঠ হিসেবেই মনে করা হয়। তাই গোতাবায়ের আমলে ভারতের তুলনায় চীনকেই শ্রীলঙ্কা বেশি গুরুত্ব দিবে বলে মনে করছে ভারত। চীন ও ভারত দুটিই শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে বড় ফ্যাক্ট। ভারত বৃহৎ ও শক্তিশালী প্রতিবেশী, সাংস্কৃতিক দিক দিয়েও অনেকটা কাছাকাছি । অন্যদিকে চীন তাদের উন্নয়ন সহযোগী। তাই চীনকে নব নির্বাচিত সরকার বেশি গুরুত্ব দিবে এটি ধরেই নেয়া যায়। অবশ্য বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক খুব একটা হেরফের হবে না বলে ধরে নেয়া যায়।

২০০৫ থেকে ২০১৫ সালের শাসনামলে সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোতাবায়া প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাদের সময়েই তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সামরিক পরাজয় ঘটার মধ্য দিয়ে বহু বছর ধরে চলা রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের অবসান হয়। উগ্রবাদীদের হামলায় ২৬৯ জন নিহত হওয়ার সাত মাস পর ১৮নভেম্বর অষ্টমবারের মতো শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ওই হামলার জেরে দেশটির পর্যটন শিল্প ও বিনিয়োগের স্থবিরতা নেমে এসেছে। ১৫ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে পড়েছে শ্রীলঙ্কা। এ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হননি। এটি একটি পজিটিভ দিক।

ভাইয়ের শপথ অনুষ্ঠানের পর তাকে অভিনন্দন জানিয়ে টুইট করেন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া। ২০০৫-২০১৫ সাল পর্যন্ত দুই দফায় প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন মাহিন্দা। রাজাপাকসে ভাইয়েরা মিলে সে সময় ২৬ বছর ধরে তামিলদের বিরুদ্ধে চলা দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটান। তাদের বিরুদ্ধে তামিলদের মানবাধিকার হরণের অভিযোগ আছে। তারা অবশ্য বলছেন যা কিছু করা হয়েছে জাতীর বৃহত্তর স্বার্থেই করা হয়েছে। তবে মানবাধিকার লংঘনের বিষয়টি তারা সেভাবে স্বীকার করছেন না। সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী  সিংহলী জনগোষ্ঠীর কাছে এ দুই ভাই বেশ জনপ্রিয়। ক্ষমতা হারানোর পর তারা একনিষ্ঠভাবে লেগে ছিলেন এবং রাজাপাকসে ভাইদের প্রতিটি সফলতাই  মূলত সিরিসেনা –বিক্রমাসিংহে সরকারের একেকটি ব্যর্থতা।  এখান থেকে বাংলাদেশী রাজনীতিকদেরও অনেক কিছু শেখার আছে।

লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক

 

ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন