ঢাকা, শুক্রবার, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

মার্কিন নির্বাচন ২০২০: ট্রাম্প নাকি অন্য কেউ?

অলোক আচার্য : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-৩০ ২:২৪:২৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-৩০ ৫:১৭:৩৪ পিএম

৪৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দামামা বেজে উঠেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। প্রথম মেয়াদে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় আসা বর্তমান ক্ষমতায় থাকা ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার দৌড়ে যাত্রা শুরু করেছেন। আমেরিকা তার সময়ে কতটা ‘গ্রেট’ হয়েছে তার বিচার করবে জনগণ। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য ফ্লোরিডায় সমর্থকদের উল্লাসধ্বনির মধ্যে দিয়ে তিনি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করেন। ফ্লোরিডা হলো ২০১৬ সালের নির্বাচনের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান প্রার্থীর অন্যতম প্রধান লড়াইয়ের ক্ষেত্র। অল্প ভোটে হিলারিকে হারিয়ে ডেমোক্র্যাটদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই অঙ্গরাজ্যটিতে ট্রাম্প জয় পান। যদিও ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই নির্বাচনে রাশিয়ার সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ ওঠে।

ট্রাম্পের মার্কিন মসনদের ক্ষমতায় আসা বেশ নাটকীয়। কারণ সেই সময় ট্রাম্পের বিরোধী দলের প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন বেশ শক্ত অবস্থানে ছিলেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত জরিপেও এগিয়ে ছিলেন হিলারি। ফলে যখন নির্বাচনে ট্রাম্প বিজয়ী হয় তখন অভিযোগ ওঠে রাশিয়ার সঙ্গে তিনি যোগাযোগ রক্ষা করে নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছেন। রাশিয়াও বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। এ নিয়ে জল ঘোলাও কম হয়নি। বহুবার এ প্রসঙ্গে ট্রাম্প সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন। প্রতিবারই কৌশলে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন তিনি। রাশিয়ার সঙ্গে প্রথম দিককার সেই সুসম্পর্কও এখন নেই। না থাকাটাই স্বাভাবিক। দুদেশের সম্পর্ক সেই আগে থেকেই খুব ভালো তা বলা যায় না। দুই দেশই বিশ্বের শক্তিশালী পরাশক্তি। দুই দেশেরই মিত্রপক্ষে শক্তিশালী দেশ রয়েছে। ফলে বিভিন্ন বিষয় নিয়েই মতভিন্নতা দেখা যায়। গণমাধ্যমের সঙ্গেও সম্পর্ক সুখের নয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের। সাংবাদিকদের সঙ্গে বারবার বিতর্কে জড়িয়েছেন।

মার্কিন মুলুকের নির্বাচন নিয়ে এত সমালোচনা এর আগে সম্ভবত কোন নির্বাচনে হয়নি। জলবায়ু ফান্ডে অর্থায়ন, অভিবাসী ইস্যু প্রভৃতি বিষয় নিয়ে একের পর এক সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন তিনি। নারী কেলেঙ্কারী নিয়েও গত বছরের পুরোটা সময় মিডিয়ায় বিভিন্ন রকম খবর প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি যখন তিনি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন সেই সময় নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা লেখিকা ও কলামিষ্ট ই. জেন ক্যারল ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনেছিলেন। দুই দশক আগে একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে তাকে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ করেছেন। ট্রাম্প অবশ্য বিষয়টিকে বিরোধী শিবিরের কাজ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। এর আগেও এ ধরনের যৌন হয়রানির অভিযোগ এসেছে তার বিরুদ্ধে। তবে এটা সরাসরি ধর্ষণের অভিযোগ। এই অভিযোগে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেয়া বা দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে বহুবার। কিন্তু ট্রাম্প আছেন তার মতো।

বিশ্ব পরাশক্তির সঙ্গে কখনো সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে, আবার পরমুহূর্তেই দেখা গেছে সমালোচনায় বিদ্ধ হচ্ছেন ট্রাম্প। গত বছরের পুরোটা সময়জুড়ে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ লেগে ছিল এ পরাশক্তির। শুল্ক এবং পাল্টা শুল্ক আরোপের ভেতর দিয়েই গেছে বছরের পুরোটা সময়। এতে যে কোনো পক্ষেরই মঙ্গল হয়নি তা নিয়ে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক ছিলেন এবং সাবধানও করেছেন। বরং বিশ্বের এই বড় দুই পরাশক্তির বাণিজ্য যুদ্ধে পরোক্ষভাবে বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা তৈরি হয়েছে। এবারো কি ট্রাম্প রিপাবলিকানদের হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের সমর্থনে আবারো ক্ষমতায় বসতে পারবেন?

জরিপ সংস্থা গ্যালাপ বলছে, দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে কখনোই ট্রাম্পের সমর্থন ৪৬ শতাংশের ওপরে ওঠেনি। গত মাসে এ সমর্থন নেমে ৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অপর এক জরিপ প্রতিষ্ঠানের রেটিংয়েও মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতি জনসাধারণের আস্থা কখনোই ৪৮ শতাংশের ওপরে ওঠেনি। ফক্স নিউজের জনমত জরিপ ২০২০-এর  নির্বাচনে প্রার্থিতা ঘোষণা করা সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের চেয়েও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ১০ পয়েন্ট কম দেখা গেছে। তবে জরিপ যে সবসময় কাজে আসে না তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ বিগত মার্কিন নির্বাচন।

গত নির্বাচনেও ট্রাম্পের অবস্থান অনেক জরিপে নরবড়ে ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সব জরিপ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ক্ষমতায় আসেন ট্রাম্প। অনেকের চোখ কপালে উঠে যায়। এদিকে গত বার হিলারির পর এবার রিপাবলিকানের বিপরীতে কে প্রার্থী হবেন তার ওপর নির্ভর করছে সামনের রাজনীতি। কারণ সেসময় হিলারি ক্লিনটন ছিলেন তুমুল জনপ্রিয়। এবার যে হিলারি প্রার্থী হবেন না জানিয়ে দিয়েছেন। ডেমোক্র্যাট দলের সামনের সারির প্রার্থী হিসেবে চিহ্নিত বাইডেন প্রেসিডেন্ট পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন। ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থীদের মধ্যে বাইডেনই সবচেয়ে অভিজ্ঞ। সাম্প্রতিক সময়ে জনমত জরিপেও প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে আগ্রহী ২০ ডেমোক্র্যাটের মধ্যেও সবচেয়ে এগিয়ে আছেন তিনি। যদিও তিনি ১৯৮৮ ও ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য লড়ে সাফল্যের দেখা পাননি। তবে সেসব হিসেব অতীত।

একেবারে সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ইরান মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করায় পরিস্থিতি বেশ গরম হয়ে ওঠে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী এই ঘটনায় ইরানে পাল্টা আক্রমণের নির্দেশ দিয়েও শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে গেছেন ট্রাম্প। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ১৫০ মানুষের প্রাণহানী হবে জেনে তিনি এ হামলা থেকে সরে আসেন। মার্কিন চালকবিহীন বিমান আরকিউ-৪-এ ‘গ্লোবাল হক’ ভূপাতিত করার মধ্য দিয়ে আমেরিকার বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেছে বলে মার্কিন সামরিক বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন। কেবল আর্থিক ক্ষতির কারণেই নয় বরং এটি মার্কিন কর্মকর্তাদের অবাক করে দিয়েছে। কারণ এই ধরনের চালকবিহীন বিমান তৈরিই করা হয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র ফাঁকি দেয়ার জন্য। এই ঘটনার উত্তেজনা আকাশপথেও পৌঁছেছে। মার্কিন বিমান সংস্থাগুলোকে ইরানের জলসীমার ওপর দিয়ে তাদের আকাশসীমায় বিমান চলাচল না করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।  ফলে ট্রাম্প বেশ জটিল পরিস্থিতিতে আছেন।

অন্যদিকে চীনের সঙ্গে তার বৈরিতায় রাশিয়ার সঙ্গে মিত্রতা বেড়েছে চীনের। ভেনিজুয়েলা নিয়ে চিন-রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র এখন বিপরীত অবস্থানে। মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণকে কেন্দ্র করে সেদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ দিন শাট ডাউন পার করেছে। অবৈধ অভিবাসী ইস্যুটি এখনও আলোচিত বিষয়। এসব অমিমাংসিত বিষয় কবে সুরাহা হবে তা কেউ বলতে পারছে না। অথচ ২০২০ সালের মার্কিন নির্বাচনের দেরি নেই। নির্বাচনে কে জয়ী হবেন তা এখনই স্পষ্ট করে বলার সময় আসেনি। তবে জনগণকে নিজের দিকে টানতে ট্রাম্প কী কৌশল নেবেন সেটাই এখন দেখার বিষয়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট



ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন