ঢাকা, শনিবার, ২১ চৈত্র ১৪২৬, ০৪ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করুন; এখনই

মোঃ রাকিবুল ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-১৯ ৮:২৩:৫৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-১৯ ৮:২৩:৫৩ পিএম

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন নিয়ে লিখতে গেলে আমার মির্জা গালিবের একটি গজলের কথা মনে পড়ে: ‘জাব তাক কহি উঠ গাই, কিউ কিসি কা গিলা কারে কোয়ি’। অর্থাৎ সব আশাই যখন শেষ, কেন আর কারো নামে মিছে অনুযোগ?

পৃথিবীজুড়ে করোনা ভাইরাসের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে গেছে। উন্নত দেশগুলো করোনার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে। এমতাবস্থায় আমাদের নির্বাচন কমিশন উট পাখির নীতি মেনে চলছে বলে মনে হচ্ছে। পৃথিবীজুড়ে যেখানে জনসমাগম নিষিদ্ধ; ইতালি, গ্রিস আমেরিকার মতো দেশ করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে, জনগণকে বাসায় থাকার পরামর্শ দিচ্ছে, সেই সময় নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন স্থগিত করার বিষয়ে সরকারের নির্দেশনার দিকে তাকিয়ে থাকা নির্বাচন কমিশনের দেউলিয়াত্বই প্রকাশ করে। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনসহ ঢাকা-১০ এবং আরো পাঁচটি আসনে উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। করোনাভাইরাসের প্রস্তুতির জন্য সরকার যেখানে জনগণকে উৎসাহিত করছে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার জন্য, সেই মুহূর্তে মিডিয়া মারফত দেখা যাচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনকে এ নিয়ে কোনো জোরালো নির্দেশনা দিতে দেখা যায়নি। আরো ভয়ের বিষয় হচ্ছে, এই সমস্ত প্রার্থী দলে দলে তাদের সমর্থকদের নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেছেন যেটা এই মুহূর্তে করোনাভাইরাস ছড়ানোর জন্য যথেষ্ট সহায়ক।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাসকে বহু আগেই প্যানডেমিক অর্থাৎ বিশ্ব মহামারি হিসেবে ঘোষণা করেছে। সরকার জনগণকে উৎসাহিত করছে প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের না হতে এবং এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সরকার ইতিমধ্যে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকারের এই পদক্ষেপকে যথেষ্ট সাধুবাদ জানাই। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ঘুম কি ভাঙবে? গতকাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন পেছানোর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এই পরিস্থিতিতেই প্রার্থীরা সমর্থকদের নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন, জনসমাগম ঘটাচ্ছেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন, কোলাকুলি করছেন। একটা বারও কি নির্বাচন কমিশন ভেবে দেখেছে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এর ফলে! ধরে নেই এই পরিস্থিতিতে যদি নির্বাচন কমিশন নির্বাচন আয়োজন করে, সে ক্ষেত্রে আতঙ্কিত জনগণ কতটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে? তার চেয়েও বড় কথা বিগত নির্বাচনগুলোতে এমনিতেই ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল কম। এহেন পরিস্থিতিতে নির্বাচন আয়োজন কতটা বিবেচনাপ্রসূত?

এ সময় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ভোটাররা ভোট গ্রহণের দিন ভোটকেন্দ্রে ভিড় জমাবে। এটা এই মুহূর্তে আত্মহত্যার শামিল। আবার ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) ব্যবহৃত হবে বলে কিছু ক্ষেত্রে একই জায়গায় অসংখ্য মানুষের হাতের স্পর্শ পড়ার আশঙ্কা আছে। এত বড় পরিসরে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত পরিবেশে নির্বাচন পরিচালনা করা সম্ভব নয়। আবার করোনা প্রতিরোধে সরকারের গৃহীত যে নীতি অর্থাৎ এই মুহূর্তে জনসমাবেশ ও জনমানুষের মিলন থেকে বিরত রাখা, সেই নীতিবিরুদ্ধ কাজ হচ্ছে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠান।  নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রায়ই নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘন করতে দেখা যায়। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন যদি জনসমাবেশ এড়িয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর জন্য প্রার্থীদের নির্দেশনা দেয় সে ক্ষেত্রে সেটা কতটা ফলপ্রসূ হবে, নির্বাচনী প্রার্থীরা সেটা কতটা মেনে চলবেন সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ থাকে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে, সেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে জনগণের স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে নির্বাচন কমিশনের উচিত এই মুহূর্তে সকল ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠান কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা।

একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে বাংলাদেশের জনগণ আরও দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করে। নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান। কেন নির্বাচন কমিশনকে সরকারের মুখাপেক্ষী হতে হবে সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য? আমাদের প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য কমিশনারগণ তো পৃথিবীর বাইরের কেউ নন। তারা সকলেই বৈশ্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত বলেই আমার বিশ্বাস। তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে এত গড়িমসি কেন? যে চারটি উপাদান নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয় তার মধ্যে জনগণ একটি। অর্থাৎ জনগণ রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য উপাদান। মহামারিতে দেশের কোন অঞ্চল যদি জনশূন্য হয়ে যায় তবে নির্বাচন দিয়ে কী করবেন? জনহীন ভূমি তো আর রাষ্ট্র গঠন করতে পারে না। তাই রাষ্ট্রকাঠামোতে জনগণের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। কিন্তু কেন যেন আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিবেচনায় জনগণের গুরুত্ব অনেক পরে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড তাই প্রমাণ করে চলেছে। এই মুহূর্তে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জনগণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সকল ধরনের নির্বাচনী কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হোক।

করোনার প্রাদুর্ভাব রোধে জনস্বাস্থ্য নিরাপদ রেখে নির্বাচনী প্রচারণা পরিচালনা সংক্রান্ত শুধুমাত্র একটি নির্দেশনা জারি করে সংস্থাটি দায় এড়াতে চাচ্ছে। নির্বাচনকালীন শুধু বিদেশফেরত ভোটারদেরকে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রাখার নির্দেশনা জারি করে দায়সারা দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই জনগণের নিকট জবাবদিহি করতে হবে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সঠিক সময়ে জনগণের স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যর্থতার জন্য জনগণ যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন কি দায় এড়াতে পারবে? তাই এই মুহূর্তে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনসহ অন্যান্য নির্বাচন স্থগিত করে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করবে বলে আমার বিশ্বাস। নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য কর্তাব্যক্তিরা জনগণের কথা চিন্তা করে হলেও সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করুক এ প্রত্যাশা করছি।

লেখক: প্রভাষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

ঢাকা/তারা