ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৮ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

স্ট্যাপলিংসহ তিন কারণে টাকার স্থায়িত্ব নষ্ট হচ্ছে

মোস্তফা মোরশেদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-২৩ ১০:৫০:০৬ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-২৮ ৩:৩৪:৪৯ এএম

অর্থ অনর্থের মূল। বিতর্কের টপিক হিসেবে বাক্যটি মানানসই। তবে যার কাছে অর্থ নেই, সে বোঝে অর্থের কি গুরুত্ব! অর্থ যতই উপকারী হোক, এর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলোর অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কারণ দুর্বল অর্থনীতির দেশে ইনফরমাল সেক্টরের প্রভাব অনেক বেশি এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতাও কম। বিগত এক দশকের অধিক সময় ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি বৈশ্বিকভাবে ঈর্ষণীয় শক্তিশালী হলেও আমাদের অসচেতনতা ও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নির্দেশনার অভাবে টাকার ব্যবহারে যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক আচরণ লক্ষ্য করা যায় না। ত্রুটিপূর্ণ ব্যবহারের ফলে টাকার নোট ছিঁড়ে বা পুড়ে যাচ্ছে, কিংবা এর রং নষ্ট হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

তিনটি আলাদা বিষয়ে আলোকপাত করি যা আমাদের টাকার স্থায়িত্ব বিনষ্ট করছে। প্রথমত টাকার বান্ডিলে পিন লাগানো থাকায় খুব জরুরি প্রয়োজনে তাড়াহুড়া করে খুলতে গেলে নোট ছিঁড়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী শুধু ১০০০ টাকা মূল্যমানের নোটের প্যাকেটের বাম দিকের মাঝখান থেকে ১-১.৫ সেন্টিমিটারের মধ্যে একটি মাত্র স্ট্যাপলিং পিন ব্যবহার করার বিধান থাকলেও অন্যান্য নোটের বান্ডিলে মোটা পিন মারা হচ্ছে। তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এ কাজ করছে। পিন খুলতে গিয়ে ঐ বান্ডিলের অনেক নোট ছিঁড়েও যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত ব্যবহারকারী কর্তৃক টাকার উপর অপ্রাসঙ্গিক লেখালেখির ফলে দীর্ঘমেয়াদে টাকার স্থায়িত্ব নষ্ট হচ্ছে। মুদ্রা ব্যবহারকারীর ধরন দুই প্রকার। এক. মুদ্রা সরবরাহের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং দুই. মুদ্রার চাহিদার সঙ্গে সম্পৃক্ত সরাসরি ব্যবহারকারী। মুদ্রা সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত ব্যাংকাররা কারণে-অকারণে নোটের ওপর লাল, নীল, কালোসহ বিভিন্ন কালিতে লেখালেখি, সিল বা সই দিয়ে থাকেন। হিসাব গ্রহণে সুবিধার জন্য ব্যাংকাররা এ কাজ করে থাকলেও তা টাকার স্থায়িত্ব নষ্ট করছে। এছাড়া যারা মুদ্রার চাহিদার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত, তারা নিজেদের টাকার হিসাবের পাশাপাশি বন্ধুত্ব, প্রেম, ভালোবাসা, চাকরি চাই, হারানো সংবাদ, মোবাইল নম্বর ইত্যাদি নানাবিধ অপ্রাসঙ্গিক বিষয় টাকার উপর লিখে একে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহার অনুপযোগী করে তুলছেন। ‘প্রিয়তমা, তোমাকে না পেলে এ শীতে আমি আর গোছল করব না’– এ জাতীয় হাস্যকর লেখাও টাকার ওপর পাওয়া যায় যা আমাদের সামাজিক দৈন্যের পরিচয় বহন করে।

তৃতীয়ত মুদ্রার সরাসরি ব্যবহারকারীরা অনেক রকম শ্রেণি-পেশার হবার ফলে বিভিন্নভাবে টাকাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে রিকশাচালক, হকার, মাছ বিক্রেতা কিংবা শ্রমজীবী অন্যান্য মানুষ ঠিকমতো টাকার ব্যবহার করছেন না। ফলে নোটগুলো তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ঘর্মাক্ত হাতের স্পর্শ, লুঙ্গির ভাঁজ, বৃষ্টি, কিংবা হাতের মুঠোয় রাখার ফলে সহজেই টাকার স্থায়িত্ব হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে দেখা যাচ্ছে টাকার ওপর সংখ্যা লিখন, সিল, স্বাক্ষর প্রদান বা বারবার স্ট্যাপলিং ও অসচেতনভাবে ব্যবহার করার ফলে অপেক্ষাকৃত কম সময়ে নোটগুলো অপ্রচলনযোগ্য হয়ে যাচ্ছে যা আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্লিন নোট নীতি ও নোট ব্যবস্থাপনা কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

প্রসঙ্গত, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের মুদ্রার ওপর লেখালেখি বা স্ট্যাপলিংয়ের প্রচলন নেই। গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ১ হাজার টাকার নোট ছাড়া অন্য নোটের বান্ডিলে পিন মারার বিষয়টি বাতিল করা হয়। এখন থেকে এসব নোটের বান্ডিলে শুধু পলিমার টেক বা পলিমারযুক্ত পুরু কাগজের টেপ ব্যবহার করা যাবে। এছাড়া নতুন ও পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোট প্যাকেট করার সময় সিল, সই, সংখ্যা বা অন্য কোনো খেলালেখি না করে ব্যাংকের মুদ্রিত ফ্লাইলিফে ব্যাংক শাখার নাম, সিল, নোট গণনাকারী ও প্রতিনিধির স্বাক্ষর ও তারিখ আবশ্যিকভাবে দিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ, ১৯৭২ এর আলোকে আমাদের দেশে টাকার সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর অর্পিত। বাজারে নতুন টাকা আনা ও বাতিল নোটগুলো গুনে সেগুলো ধ্বংস করা এর কর্মপরিধির অংশ। ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়লে এসব টাকা পূর্বে পুড়ে বিনষ্ট করার বিধান থাকলেও এখন পরিবেশ দূষণ বিবেচনায় শ্রেডিং মেশিন দিয়ে অপ্রচলনযোগ্য টাকা কুচিকুচি করে কেটে ফেলা হয়। অর্থনীতির বিধি মতে পুরাতন সেসব নোটের সমপরিমাণ নতুন নোট ছাপাতে হয়। এতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক হিসাবে ১ টাকার একটি কয়েন তৈরিতে ৯৫ পয়সা, ২ টাকার কয়েনে ১ টাকা ২০ পয়সা এবং ৫ টাকার একটি কয়েন তৈরিতে খরচ পড়ে ১ টাকা ৯৫ পয়সা। স্বাভাবিকভাবেই, কয়েনের মান বেশি হলে তার তুলনামূলক খরচ কম হয়।

পক্ষান্তরে, ১ হাজার টাকার একটি নোট ছাপাতে প্রায় ৭ টাকা,  ৫০০ টাকার একটি নোট ছাপাতে ৬ টাকা, ১০০ টাকার নোট ছাপাতে সাড়ে ৪ টাকা, ৫০ ও ২০ টাকার একটি নোট ছাপাতে আড়াই টাকা, ১০ টাকার নোট ছাপাতে ২ টাকা ২০ পয়সা এবং ৫ টাকার নোট ছাপাতে আনুমানিক ২ টাকা খরচ হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন লিমিটেড (টাকশাল)-এর তথ্য মতে, প্রতিবছর ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ টাকা নষ্ট বা অপচয় হয়। টাকশাল গড়ে প্রতিবছর ২ থেকে ১০০০ টাকা মূল্যমানের ১০০ কোটি পিস নোট ছাপায়। প্রতিটি নোট ছাপাতে বর্তমানে গড়ে প্রায় সাড়ে তিন টাকার অধিক খরচ হয়। সে হিসেবে ১০০ কোটি পিস নোট ছাপাতে সরকারের খরচ কত সেটি বিবেচনা করা যেতেই পারে। আর টাকা তৈরির কাঁচামালের অধিকাংশ আমদানি করতে হয় বলে মুদ্রার অবমূল্যায়ন, কাঁচামালের দাম বাড়া ও অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতিবছরই উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে টাকার যোগানদাতা ও টাকা ব্যবহারকারীদের আরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

করোনাভাইরাসের প্রকোপের এই সময়ে টাকার ব্যবহার নিয়েও প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা। কারণ ভাইরাস সংক্রমণের অন্যান্য মাধ্যমের মধ্যে অন্যতম হলো, ব্যাংক নোট এবং কয়েন। থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, তুরস্কসহ অনেক দেশ মুদ্রার ব্যবহারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে। বিশেষ করে, সাবান বা ডিশ ওয়াশিং লিকুইড দিয়ে ধুয়ে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনে মানুষের মতো ব্যাংক নোটগুলোকেও কোয়ারেন্টাইন করে রাখা হয়েছিল। এই মহামারির সময়েই শুধু নয়, আর্থিক ক্ষতি বিবেচনায় আমাদের টাকার ব্যবহারে আরও অধিক সচেতন হতে হবে।

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক

**টাকায় স্ট্যাপলিং বড় ক্ষতির কারণ


ঢাকা/তারা