ঢাকা, রবিবার, ২১ আষাঢ় ১৪২৭, ০৫ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

করোনায় তৈরি হবে সামাজিক পুঁজির সংকট 

শেখ আনোয়ার : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-২৭ ১:৩৩:৪৩ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৬-২৪ ১:২৬:০৮ পিএম

করোনাভাইরাস সৃষ্ট পরিস্থিতিতে স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য সব শিকেয় উঠেছে। বিক্রি-বাট্টা নেই। কল-কারখানার গেইট বন্ধ। উৎপাদন শূন্য। দিনমজুর কাজ হারিয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দোরগোড়ায়। অজানা আতঙ্কের মহামারি ও মহামন্দা যেনো আমাদের দরজায় এসে কড়া নাড়ছে। ভেঙে যাচ্ছে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মেরুদ-। ঝরছে তাজা প্রাণ। কবে নাগাদ পরিস্থিতি সামলানো সম্ভব হবে তার নিশ্চয়তা নেই। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা পূর্বাভাসে সতর্ক করে বলেছে, ‘আর্থিক সংকটের মুখে পড়বে বিশ্ব।’ চলতি বছর বিশ্ব বাণিজ্যের তিন ভাগ কিংবা তারও বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে। ফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিশ্বের সাধারণ মানুষ।

করোনায় জনস্বাস্থ্য সঙ্কটের ফলে সৃষ্ট সম্ভাব্য ভয়াবহ আর্থিক মন্দার পাশাপাশি আরও একটা ঘটনা প্রায় অনিবার্য। তা হচ্ছে সোশ্যাল ক্যাপিটাল বা সামাজিক পুঁজির বিপুল ক্ষয়। পুঁজি বলতে সাদামাটাভাবে আমরা বুঝে থাকি, বাজার থেকে লাভের প্রত্যাশায় বিনিয়োগকৃত রিসোর্স বা সম্পদ। আর সামাজিক পুঁজি হলো সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তি ও বর্গের মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের নেটওয়ার্ক। যার যথাযথ কার্যকারিতা একটা গোটা সমাজের আর্থিক সুস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক পুঁজি, সমাজের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। যেমন স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা। যা অনেকটা স্ক্রু ড্রাইভারের মতো। মানে যা সবসময় সমাজের প্রয়োজন।

আর সামাজিক সম্পর্কের নানা রূপ বা ধরন থাকতে পারে। যেমন, ‘আমরা কী জানি’ প্রশ্নের মতো বা তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ‘আমরা কাকে চিনি’ এই প্রশ্ন। অনেক ক্ষেত্রেই একজন ‘কী জানে’ তার ভিত্তিতে নয়, সে ‘কাকে চেনে’ সে কারণে চাকরি, পদোন্নতি, প্রতিষ্ঠা পায়। এমনকি হাসপাতালে চিকিৎসা সুবিধা থেকে শুরু করে প্রাপ্ত নানা প্রাতিষ্ঠানিক সেবার মান-পরিমাণ ‘কাকে চিনি’র উপর বাস্তবে অনেকটাই নির্ভর করে। অন্যদের চেনা ও বুঝতে পারা এবং সম্পর্কের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জীবন ও সমাজে গুণগত পার্থক্য করে দেয়। এটি কেবল আত্মপরিচয় নির্ধারণ নয়, আমাদের জীবনের নিরাপত্তা ও আনন্দের উৎস। বিশ্বের বিরোধ ও সংঘাত ক্রমাগতভাবে কমাতে পারে এই সামাজিক পুঁজি। এক্ষেত্রে ইতিবাচক নতুন নতুন সামাজিক বন্ধন, সেতু ও সংযোগ নির্মাণে ক্রমাগতভাবে সফল হতে হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, সামাজিক পুঁজি, শ্রম এবং মূলধনের মতোই। যা  দেশের অর্থনৈতিক  প্রবৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অথচ মহামারির কারণে অর্থনৈতিক মন্দার ফলে যদি সামাজিক পুঁজির ক্ষয় ঘটে, তা অর্থনীতির ওপর মন্দার কুপ্রভাবকে আরও প্রকট এবং সুদূরপ্রসারী করে তুলতে বাধ্য করে।

গবেষকদের মতে, সামাজিক পুঁজির প্রধান স্তম্ভ দু’টো। এক, মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস; এবং দুই, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা। যে সমাজে এই দু’ধরনের বিশ্বাসের মাত্রা যতো বেশি, সামাজিক পুঁজির নিরিখে সেই সমাজের অবস্থা ততো উন্নত। খেয়াল করলে দেখা যায়, করোনার মতো মহামারি বিশ্বে সামাজিক পুঁজির এই দু’টো স্তম্ভকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। কেনো? কারণটা সবার কাছে স্পষ্ট। করোনার তীব্র সংক্রমণ থেকে বাঁচতে বিশ্বের সবাই নিজেদের সমাজ থেকে যতদূর সম্ভব বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ডিজিটাল মাধ্যম ছাড়া প্রায় সব রকম যোগাযোগ বন্ধ। অচেনা মানুষদের সঙ্গে মেলামেশা, আন্তরিকতার তো প্রশ্নই ওঠে না। এদিকে আবার অনেক মানুষের অন্তরজুড়ে হিপোক্রেসি। মিথ্যা বলার প্রবনতা এতটাই যে, রোগের ধরন গোপন করে স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে যাচ্ছে এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রান্ত করছে। অর্থাৎ এরা নিজেরাই জট পাকচ্ছে। তারপর ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখে ‘সরকার কিছুই করছে না!’ গুজব ছড়িয়ে, বুঝে না বুঝে, বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে জনমনে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। ফলে সমাজে তৈরি হচ্ছে গভীর সন্দেহ, অবিশ্বাসের এক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। এভাবে নষ্ট হচ্ছে সামাজিক পুঁজি। অথচ উন্নত বিশ্ব যেটা পারেনি, উন্নয়নশীল মধ্যম আয়ের দেশ বাংলাদেশের মানুষ করোনায় সেটা করে দেখাচ্ছে। মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী বলেই এই মহামারি কালে নানান ক্ষেত্রে দ্রুত সুফল পাচ্ছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। তারপরও, এ সময়ে আমরা যদি মনে করি যে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই করোনা সঙ্কটের মোকাবিলায় যথেষ্ট ভূমিকা পালন করছে না। যথা, সরকারের তরফ থেকে যথেষ্ট টেস্ট হচ্ছে না, তবে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর উপরও তীব্র ক্ষোভ জমা হতে থাকে সমাজ-মনে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কারণগুলোর জন্যই ক্ষয় হতে শুরু করে সামাজিক পুঁজির।

সামাজিক পুঁজির ক্ষয় অনুসন্ধানে গবেষকরা স্প্যানিশ ফ্লু’র সঙ্গে করোনার সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন। স্প্যানিশ ফ্ল ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সামাজিক পুঁজির ওপর কতটা প্রভাব ফেলেছিলো? সম্প্রতি ইতালি থেকে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। স্প্যানিশ ফ্লু শুরু হয়েছিলো ১৯১৮ সালের জানুয়ারি মাসে ইউরোপে। প্রায় দু’বছর ধরে চলা এই মারণ ইনফ্লুয়েঞ্জায় গোটা বিশ্বে আক্রান্ত হয়েছিলো প্রায় ৫০ কোটি মানুষ। মৃতের সংখ্যাই ছিলো পাঁচ কোটি। গোটা পৃথিবী এই মারণব্যাধিকে সামাল দিতে হিমশিম খেয়েছিলো। কারণ স্প্যানিশ ফ্লু’র জন্য দায়ী ভাইরাস এইচ১এন১। যার কোনো ভ্যাকসিন বা ওষুধ তখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। সেকালেও স্প্যানিশ ফ্লু’র মহামারির দাপট কমাতে বর্তমানের মতো, বিভিন্ন দেশে কোয়ারেন্টাইন, লকডাউন, মাস্কের ব্যবহার করা হয়েছিলো। কিন্তু দিন শেষে সেগুলো ব্যর্থ হয়ে যায়। বেড়ে যায় ভয়াবহ মৃত্যুর হার। অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রজন্ম বেশি আক্রান্ত হওয়ার ফলে এই মহামারিতে বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আক্রান্ত দেশগুলোর সামাজিক কাঠামো। এখনকার মতো তখনো জনস্বাস্থ্য বিধি, সরকার ও মিডিয়ার তরফ থেকে লাগাতার প্রচার চলছিলো। সামাজিক মেলামেশা বন্ধ রাখার অনুরোধের পাশাপাশি তখনো চলছিলো গুজব। বলা হচ্ছিল- এই ব্যাধি আসলে শত্রুপক্ষের ছড়ানো জৈবিক অস্ত্র। সব মিলিয়ে সমাজে তৈরি হয়েছিলো অবিশ্বাস আর সন্দেহের বাতাবরণ।

এই স্প্যানিশ ফ্ল মহামারির ফলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সামাজিক পুঁজির কতোটা ক্ষয় হয়েছিলো? ইতালির যে গবেষণাপত্রের কথা উল্লেখ করলাম, তাতে ব্যবহার করা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘জেনারেল সোশ্যাল সার্ভে’র তথ্য। সেই তথ্যভান্ডারে রয়েছে এই জরিপে অংশগ্রহণকারী মানুষদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং সামাজিক মনোভাব সম্পর্কিত তথ্য। যেমন, এক সমীক্ষায় তাদের প্রশ্ন করা হয়, তারা কি মনে করেন, সমাজে অন্যান্য মানুষদের বিশ্বাস করা যায়? তাদের কি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি যথেষ্ট আস্থা রয়েছে? তাদের পূর্বপুরুষরা কবে, কোন দেশ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হিসেবে এসেছিলেন? এসব নানান তথ্যের পাশাপাশি গ্রাফচিত্র অঙ্কন করা হয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে গবেষকরা তৈরি করেন মানুষের গড় সামাজিক পারস্পরিক বিশ্বাস এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থার সূচক। স্প্যানিশ ফ্লু’র আগে এবং পরে, উভয় সময়কালের জন্যই তৈরি হয় সূচক। সেই সূচকে মার্কিন নাগরিকদের ভাগ করে নেওয়া হয়- তাদের অভিবাসনের দেশের নিরিখে। গবেষণায় দেখা যায়, স্প্যানিশ ফ্লু’তে আক্রান্ত হয়ে ইউরোপের যে দেশে যতো বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিলো, সেদেশের মানুষদের পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থাতেও ততো বেশি ফাটল ধরেছিলো।

সময়ই বলে দেবে করোনাভাইরাসের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামাজিক পুঁজির ক্ষয় কতটা হবে? তবে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে এই মহামারির পরে একটা ক্ষতবিক্ষত সমাজের মুখোমুখি দাঁড়ানোর জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকা জরুরি। সত্যিই যদি করোনার ফলে সামাজিক পুঁজির বিপুল ক্ষয় হয়, তাহলে আসন্ন অর্থনৈতিক সঙ্কটের আসল গভীরতা, ব্যাপ্তি এবং মেয়াদ এখনকার অনুমানের চেয়েও অত্যন্ত বেশি হতে পারে। তাই সাধু সাবধান! প্রস্তুত হতে হবে এখন থেকেই।

লেখক: ইভ্যালুয়েশন এন্ড ডকুমেন্টেশন অফিসার, বিআইবিএম

 

ঢাকা/তারা