ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ আষাঢ় ১৪২৭, ০৯ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

করোনাকালে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের ভাবনা

গোপাল অধিকারী : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৬-০৫ ২:১০:৪৭ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৬-০৫ ২:১০:৪৭ এএম

আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের মানবিক পরিবেশ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির উদ্যোগে বিশ্বের শতাধিক দেশে দিবসটি পালিত হয়। বাংলাদেশেও বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশ সংগঠনের পক্ষ থেকে পরিবেশ দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। কিন্তু এ বছর করোনার কারণে দিবসটি সীমিত আকারে পালিত হবে সঙ্গত কারণেই।

প্রতিটি দিবস পালনের তাৎপর্য রয়েছে। এটি কোনো সাধারণ বিষয় নয়। একটি বিষয়বস্তু বা সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে সর্তকতা বা করণীয় জানতে বা জানাতে সেই বিষয়কে দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিবেশের প্রতি মানুষের সচেতনতা বাড়াতে, পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখতেই এই আয়োজন। কিন্তু প্রতিবছর দিবস পালন করার পরও আমরা কতটা সচেতন হচ্ছি? বাংলাদেশের পরিবেশ কি হুমকির মুখে নয়? কতটা পরিবেশ রক্ষায় আমরা কাজ করছি? সেই পরিসংখ্যানও ভেবে দেখা দরকার। দিবসটি পালন করছি এবং করতে হবে এ বিষয়ে আমি দ্বিমত পোষণ করছি না। কারণ নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে, জানতে হবে পরিবেশের গুরুত্ব সম্পর্কে। কীভাবে পরিবেশ দূষিত হয় এবং কীভাবে পরিবেশ সংরক্ষণ করা যায় এগুলো জানা জরুরি। কিন্তু আমরা যদি দিবসটি পালন করার পাশাপাশি পরিবেশ বাঁচাতে যথাযথ ব্যবস্থা না নেই তাহলে দিবসটি পালন সার্থক হবে না।

বায়ু দূষণের কারণে বিশ্বে প্রতিবছর ৭০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। পৃথিবীর ৯১ শতাংশ মানুষ এমন জায়গায় বসবাস করে যেখানে বায়ু দূষণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি। বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন দূষিত বায়ু সেবন করে। বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৭ নামক প্রতিবেদন এটি প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বায়ু দূষণের ক্রমমাত্রায় ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। প্রতিবেদনটি বলছে, গত ২৫ বছরে বায়ু দূষণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভারত ও বাংলাদেশে। যদিও চীন এ তালিকায় আগে প্রথম অবস্থানে ছিল। আমাদের দেশ বায়ু দূষণের বড় কারণ হচ্ছে, যাচ্ছেতাই ভাবে উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালনা করা। কলকারখানার কালো ধোঁয়া, নগরায়নের কাজ সময় মতো শেষ না হওয়া এবং যথেষ্ট সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে এমন উন্নয়ন কাজ পরিচালনার কারণে বাতাস ভয়াবহভাবে দূষিত হচ্ছে। বিশ্ব ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দূষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তার একটি বাংলাদেশ। বাংলাদেশে প্রতিবছর যত মানুষের মৃত্যু হয় তার ২৮ শতাংশই মারা যায় পরিবেশ দূষণজনিত অসুখ-বিসুখে। বিশ্বে এ ধরনের মৃত্যুর হার ১৬ শতাংশ।

২০১৫ সালের এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে বিশ্বব্যাংক বলেছে, শহরাঞ্চলে এই দূষণের মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। দূষণের কারণে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বায়ু, পানি ও শব্দ দূষণ যেন আজ স্বাভাবিক ঘটনা! এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে জীববৈচিত্রের ওপর। জলবায়ুর প্রতিকুল প্রভাবও পরিবেশের ওপর পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে বিভিন্ন প্রাণীর জটিল ও কঠিন রোগ দেখা দিচ্ছে। পরিবেশের ওপর জলবায়ুর প্রভাবের জন্য ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত, খাদ্যাভাবজনিত রোগসহ নানা জটিল ও অপরিচিত রোগ হয়। বেড়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। পরিবেশ ও জীবন একে অপরের পরিপূরক। পরিবেশ অনুকুলে থাকলে অব্যাহত থাকে জীবনচক্র। তবে মানুষের জীবনচক্রে গৃহপালিত প্রাণীর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। আবার প্রাণীদেরও বেঁচে থাকতে নির্ভর করতে হয় পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর। পরিবেশের বিপর্যয় মানে জীবনের বিপর্যয়। প্রাণীস্বাস্থ্য, প্রাণী উৎপাদন ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তন একটি আন্তঃসম্পর্কিত জটিল প্রক্রিয়া, যার ওপর অনেকাংশেই নির্ভর করে রোগের প্রাদুর্ভাব, উৎপাদন ব্যবস্থাসহ আরও অনেক কিছু। বৈরী জলবায়ুর করাল গ্রাস থেকে রেহাই পাচ্ছে না বাংলাদেশও। এর পাশাপাশি যোগ হয়েছে পরিবেশ দূষণ। দূষণের দোষে দূষিত হয়ে উঠছে চারপাশ। অতিবৃষ্টি, উচ্চ তাপমাত্রা এবং খরার ফলে মানুষের অজান্তেই পরিবেশে তৈরি হচ্ছে একের পর এক শক্তিশালী ভাইরাস।

গত এক যুগে দূষণ ও পরিবেশের বিচারে বাংলাদেশ পিছিয়েছে। জনবিস্ফোরণ, বনাঞ্চলের অভাব, শিল্প ও পরিবহন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকার কারণে দেশের পরিবেশ এক জটিল অবস্থায় পৌঁছেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে যে বহু বন্য প্রাণীর প্রজাতি হুমকির মুখে পড়েছে সেটি এখন অনেকটাই দৃশ্যমান। বাংলাদেশে ১৬০০ প্রাণীর কথা বলা হয়, যার অর্ধেক আজ বিপন্ন। এই ভয়াবহ পরিসংখ্যানের জন্য আপনি বা আমি দায়ী। বিজ্ঞানে পড়েছি, আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে সব নিয়েই আমাদের পরিবেশ। আর পরিবেশের স্বাভাবিক অবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাকে পরিবেশ দূষণ বলে। এর ফলে আমাদের জীবন-যাত্রা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ক’মাস আগেও আমরা কি কেউ ভেবেছি করোনা এভাবে আমাদের ঘরবন্দি করে ফেলবে? আমরা ভাবিনি। কিন্তু এখন আমাদের করোনার থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। করোনা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ঠিক একইভাবে পরিবেশকে যদি আমরা রক্ষা না করে দিনের পর দিন ব্যবহার করে ধ্বংস করি তাহলে এমন বা এর চেয়েও ভয়াবহ দুর্যোগে আমাদের পড়তে হবে। তখন হয়তো রক্ষা পাওয়ার আর কোনো উপায় থাকবে না। সম্প্রতি আম্পানের কথা সকলেরই মনে থাকার কথা। এই ভয়াবহ ঝড়ের তা-ব বা ক্ষতির হাত থেকে আমাদের রক্ষা করেছে সুন্দরবন। সুন্দরবনের এমন রক্ষা করার ইতিহাস আরও আছে। ক’জন মানুষ আছে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে আমাদের বাঁচাতে পারে এভাবে? তাই আসুন পরিবেশ দিবস থেকেই আমরা পরিবেশ রক্ষায় উদ্যোগ নেই। পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হই। সরকারকেও বলব, পরিবেশ রক্ষায় আরও সতর্ক হোন। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করুন। কারণ পরিবেশ বাঁচলে, বাঁচবে বাংলাদেশ।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

ঢাকা/তারা