ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ আষাঢ় ১৪২৭, ০৭ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

ওয়েব সিরিজে লাগামহীন অশ্লীলতা এবং আমাদের সংস্কৃতি

পারভেজ রানা : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৬-১৯ ২:২৪:১৪ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৬-২৪ ১:২৪:১৭ পিএম

‘অপুর সংসার’ দেখে পাশ্চাত্যের একজন পরিচালক সত্যজিৎ রায়কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোমরা এসব কীভাবে পারো- চোখের ভাষায় ভালোবাসা বুঝাতে? আমরা তো পারি না!’

বাংলাদেশে যে টিভি নাটকগুলো তৈরি হয়, এগুলোর একটা ভাষা দাঁড়িয়ে গেছে। আমাদের নাটকগুলোর অন্যান্য দেশে নিজস্ব একটা পরিচিতি তৈরি হয়েছে। বিটিভির তৈরি নাটক বিদেশে রপ্তানিও হয়েছে। খ. ম. হারুনের ‘মহাপ্রস্থান’ নাটকটির কথা বলা যায়। নাটকটি জাপানের একটি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে। 

প্রত্যেক দেশের সংস্কৃতি, কৃষ্টি আলাদা। ফলে সেই দেশে তৈরি ফিকশনগুলোতে তার প্রভাব পড়ে। আমাদের দেশে তৈরি ফিকশনগুলো আমাদের দর্শকের কথা মাথায় রেখে বানানো হয়। আন্তর্জাতিক বাজারের কথা বলে দেশে তৈরি ফিকশনগুলোতে অশ্লীলতা কাম্য নয়। রোমান্টিক নাটকের পরিচালক হিসেবে শিহাব শাহীনের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ‘ছুঁয়ে দিলে মন’ নামে তিনি একটি চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন। টিভি নাটকে যে মমকে আমরা কোমল মনের প্রেমিকার চরিত্রে বা মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ের চরিত্রে দেখি, ‘ছুঁয়ে দিলে মন’ সিনেমায় তাকে একই ধরনের চরিত্রে দেখা গেলেও পুরো সিনেমায় পরিচালক তার ক্লিভেজ দেখিয়েছেন। চলচ্চিত্রের দর্শক জানলেন, মমর ক্লিভেজ সুন্দর! টিপিক্যাল একটা ফরমুলা ছাড়া সেই সিনেমা হিট করানোর আর কোনো রাস্তা কি ছিলো না?

ব্যাপক পরিচিতি পাওয়ার জন্য পরিচালক অনেক কৌশল করেন। ‘আগস্ট ১৪’ করার আগে শিহাব শাহীন কতটুকু পরিচিত ছিলেন? এখন কি তার চেয়ে তিনি অনেক বেশি পরিচিতি পেয়েছেন? তাসনুভা তিশা অনেকদিন মিডিয়াতে আছেন, সমসাময়িক তানজিন তিশা স্টার হয়ে গেলেও তিনি পাত্তা পাচ্ছিলেন না। ‘আগস্ট ১৪’ করে তিনিও পরিচিতি পেলেন! এজন্য তাকে যে রাস্তায় হাঁটতে হয়েছে আজকে সে কারণেই প্রশ্ন উঠেছে। এই ঈদেই তাহসানের সঙ্গে তার ‘ভালোবাসার গল্প’তে তিনি যে অভিনয় করেছেন লেগে থাকলে তাকে হয়তো এভাবে পরিচিতি পেতে হতো না। 

ওয়েব সিরিজ ‘আগস্ট ১৪’ হতে পারতো অভিভাবক এবং কিশোর-কিশোরীদের জন্য একটি শিক্ষণীয় ফিকশন। এটি সেভাবেই তৈরি করা যেতো। না দেখিয়েও যে বলা যায়, বোঝানো যায়, সেটা শিহাব শাহীনও বোঝেন। অথচ সেখানে যে যৌনদৃশ্যগুলো দেখানো হয়েছে, সেগুলো না দেখালে এর কাহিনির কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হতো না। দৃশ্যগুলোকে কাহিনির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাটপিস হিসেবে মনে হয়েছে। দৃশ্যগুলো দর্শককে সচেতন করার বদলে অনিয়ন্ত্রিত যৌন সম্ভোগে উৎসাহী করবে। তাসনুভা তিশার আত্মসম্ভোগের (মাস্টারবেশন) দৃশ্যে অভিনয় খুবই বাস্তব। বাস্তবে ওটা না করে এক্সপ্রেশন দেওয়া সম্ভব ছিল না। অভিনয়ের জন্য তার ডেডিকেশন মাত্রাতিরিক্ত।

সুমন আনোয়ারের ‘সদর ঘাটের টাইগার’-এর কথাও বলা যায়। এখানে অহনার স্বামী এলাকার কমিশনার। রাত একটায় গুলিস্তানের একটি হোটেলে সম্ভোগ করতে গিয়ে খুন হন। পুলিশ তার বাড়িতে আসে, অহনাকে জিজ্ঞেস করে, তার স্বামী রাত একটায় কেন হোটেলে গেলো? অহনা পাড়ার মেয়ের ভাষায় উত্তর দেয়। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা, অহনার সামাজিক অবস্থান- সব মিলিয়ে কোনোভাবেই সেই সংলাপ চরিত্রের সঙ্গে যায় না। সুমন আনোয়ারের অন্য ব্যাখ্যা থাকতে পারে। যেখানে অহনাও অন্য পুরুষের সঙ্গে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে মিলিত হয়। অহনা ভালো অভিনেত্রী। এবার তারও নিশ্চয়ই পরিচিতি আরো বাড়বে। 

হিল্লোল এবং অর্ষার পাঁচ মিনিটের ক্লিপ অন্তর্জালে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হোটেলের ভিতরে হিল্লোলকে দেখা যায় অর্ষার সাথে সঙ্গমরত। সঙ্গম শেষে হিল্লোল কফি বানাতে যায়। হিল্লোলের পরনে অন্তর্বাস। কন্টিনিউটির ভুল! মজার ব্যাপার হলো, হিল্লোল-অর্ষা যখন সঙ্গম করছিল, আজাদ আবুল কালামকে তখন পর্দায় খুব উদ্বিগ্ন দেখায়। বাস্তবেও হয়তো তাই, ন্যুড ফিল্মে অভিনয় করার জন্য তিনি সত্যি সত্যিই হয়তো উদ্বিগ্ন ছিলেন তখন!

অনেকেই ওয়েব প্লাটফর্মকে ভিন্ন বলতে চাচ্ছেন। স্ট্রিমিং সাইটে টাকা পে করে দেখতে হয়, কিন্তু স্মার্ট টিভি এভেলেইবল হয়ে যাচ্ছে। আর অনলাইন মিডিয়াগুলোই সামনে মেইন স্ট্রিম মিডিয়া হবে। টিভিগুলো কোনঠাসা হয়ে যাবে। ড্রয়িংরুমে বসে অনলাইনেই নাটক দেখবেন। তখন যে হঠাৎ ১৮ প্লাস কনটেন্ট-এর থাম্বনেইল চলে আসবে না কে জানে? লজ্জায় নিজে উঠে যাবেন নাকি বাচ্চাকে তাড়িয়ে দেবেন সে সিদ্ধান্ত আপনার। 

লেখক: প্রকাশক ও নাট্যনির্মাতা

 

ঢাকা/তারা