RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     শুক্রবার   ২৭ নভেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ১৩ ১৪২৭ ||  ১০ রবিউস সানি ১৪৪২

মুখ ঢেকে যায় অপমানে

বিনয় দত্ত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:৫২, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
মুখ ঢেকে যায় অপমানে

১.

বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান কবি শঙ্খ ঘোষ। তাঁর একটি কবিতা আছে- ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’। অসাধারণ কবিতা! আমি যখন কবিতাটি পড়ছিলাম বারবার আমার মনে হচ্ছিল- মুখ ঢেকে যায় অপমানে। অথচ পঙ্‌ক্তিটি তিনি সেভাবে লেখেননি। কবিতা কবির সৃষ্টি, সেখানে হাতে দেয়া অন্যায়। আমি সে অন্যায় করব না। আমি শুধু বৈঠকী ঢঙে কিছু বাস্তবতার কথা বলব। কেন আমার মুখ অপমানে ঢেকে যাচ্ছে, কেনই-বা আমার শঙ্খ ঘোষের কবিতা পড়তে গিয়ে অপমানের কথা মাথায় এলো তাই বলব।

২০২০ সালের শুরুতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ‘বাংলাদেশে বিদেশিদের কর্মসংস্থান: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রকাশ করে। গবেষণার তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে ২১টি খাতে ৪৪টি দেশের প্রায় আড়াই লাখ বিদেশি নাগরিক কর্মরত আছেন। এর মধ্যে প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার বিদেশি ট্যুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে এসে ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া চাকরি করছেন অবৈধভাবে। ২০১৮ সালে কর্মরত বিদেশি কর্মীরা বাংলাদেশ থেকে ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা পাচার করেন। বৈধভাবে কর্মরতদের বেতন কম দেখিয়ে কর ফাঁকিও দেওয়া হয়। আর এই কাজে জেনে বা না বুঝে সহযোগিতা করে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে বছরে ১২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়।

এখানে বেশ কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়। প্রথমত, আমাদের দেশে দক্ষ জনশক্তি নেই দেখে আমরা বাইরে থেকে দক্ষ ও কর্মক্ষম জনশক্তি নিয়ে আসছি। এখন স্বভাবতই প্রশ্ন আসতে পারে- কেন আমাদের দেশে দক্ষ ও কর্মক্ষম জনশক্তি নেই বা তৈরি হচ্ছে না? দ্বিতীয় বিষয় হলো, কতজন বিদেশি কর্মী বৈধ বা অবৈধভাবে বাংলাদেশে কাজ করছেন তার সঠিক তালিকা কেন সরকারি প্রতিষ্ঠানে নেই? ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সংসদে জানান, দেশে বৈধভাবে ৮৫ হাজার ৪৮৬ জন বিদেশি কাজ করছেন। অথচ পর্যটন করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে আট লাখ পর্যটক ভিসা নিয়েছেন। মজার বিষয় হলো, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তথ্যের সঙ্গে টিআইবি’র তথ্যের মিল নেই।

গবেষণার তথ্যানুযায়ী, গার্মেন্ট খাতে সবচেয়ে বেশি বিদেশি কর্মী কাজ করেন। এ ছাড়াও সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, আন্তর্জাতিক এনজিও, হোটেল ও রেস্তোরাঁর মতো খাতে বিদেশি কর্মীরা কাজ করেন। আমার প্রশ্ন হলো, যেসব বিদেশি টুরিস্ট ভিসায় এসে অবৈধভাবে ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া চাকরি করছেন তাদের কেন চিহ্নিত করা যাচ্ছে না? এর উত্তর হলো, আমাদের আসলে এসব নিয়ে মাথা ব্যথা কম। দেশে কারা আসবে, কারা কাজ করবে তা নিয়ে আমাদের আগ্রহ কম। আমাদের আগ্রহ বরং নতুন প্রকল্পে।

তৃতীয় বিষয় হলো, একজন বিদেশি কর্মী তার সুবিধার্থে বেতন কম দেখানোর কথা বলতেই পারেন। বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান কেন একজন বিদেশির অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি হচ্ছে? তাহলে তার কাছে দেশের চেয়ে কি বিদেশি কর্মী বড়? যেসব প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কাজ করছে তাদের কেন চিহ্নিত করা যাচ্ছে না?

চতুর্থ বিষয় হলো, ধরে নিলাম একজন বিদেশি কর্মী বৈধ বা অবৈধ পথে টাকা পাচার করছেন, তাহলে গোয়েন্দা সংস্থা কি করছে? এই তথ্য তাদের কাছ থাকবে না! বিষয়টি তো একজন বা দুইজন ব্যক্তির অর্থপাচার নয়। প্রতি বছর এতো এতো টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে, গোয়েন্দা সংস্থা তা জানবে না?

সত্যি সেলুকাস! বিষয়গুলো যখন আমি জেনেছি তখন আমার অপমানে মুখ ঢেকে যাচ্ছিল!

২.

অর্থ পাচার আমাদের দেশে নতুন নয়। দেশি থেকে বিদেশি, ছোট থেকে বড়, অল্প ধনী থেকে টাইকুন সবাই দেশ থেকে অর্থ পাচার করছেন। একদিকে অবৈধ পথে অর্থ পাচার হচ্ছে, আরেকদিকে সাধারণ জনগণ দারিদ্র্য নিয়ে বসবাস করছেন। বিশ্বব্যাংক ‘প্রভার্টি অ্যান্ড শেয়ার প্রসপারিটি বা দারিদ্র্য ও সমৃদ্ধির অংশীদার-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে প্রকাশ করে। তাদের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ২ কোটি ৪১ লাখ মানুষ হতদরিদ্র। এই ২ কোটি ৪১ লাখ মানুষ দৈনিক ৬১ টাকা ৬০ পয়সাও আয় করতে পারেন না। তাদের আরো তথ্যমতে, অতিগরিব মানুষের সংখ্যা বেশি এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। আবার অতিধনী বৃদ্ধির হারের দিকে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম। ধনী বৃদ্ধির হারে তৃতীয়।

এই যে দেশে হুহু করে অতিধনী বাড়ছে, এর মূল কারণ কি? দেশে তো বিশাল অঙ্কের লটারী লেগে যায়নি যার কারণে তারা এতো দ্রুত সময়ের মধ্যে অতিধনী হতে পারছেন। এর পিছনে নিশ্চয় আছে। এর কারণ হলো, দেশে যে পরিমাণ দুর্নীতি বেড়েছে সেই টাকা যাচ্ছে একটা নিদিষ্ট শ্রণির মানুষের কাছে। তারাই দ্রুত সময়ের মধ্যে অতিধনী বনে যাচ্ছেন। এরাই দেশ থেকে টাকা পাচার করছেন। এরাই আবার দেশের বাইরে নাগরিকত্ব নিচ্ছেন বা দেশের বাইরে সেকেন্ড হোম গড়ে তুলছেন।

২০১৯ সালে সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড-২০১৮’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ বেড়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬২ কোটি সুইস ফ্রাঁ। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৫ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা।

এই ৫ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা কাদের? কেন তারা এতো টাকা দেশের বাইরে জমা করেছেন? প্রশ্নটা স্বভাবতই চলে আসে। দেশে দৃশ্যমান কোনো বড় চমক ঘটে যায়নি যে কারণে এতো দ্রুত টাকা আয় করা সম্ভব। যারা অবৈধপথে টাকা আয় করছেন তারা নিজেদের স্বার্থে সেই টাকা বিদেশে জমা করছেন। যখন দেখি দারিদ্র্যের বিপরীতে আমাদের দেশে অতিধনীরা দেশ থেকে ৫ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা অবৈধ পথে পাচার করে ফেলেছেন তখন সত্যিই মুখ ঢেকে যায় অপমানে।

এবার আরো একটি বিস্ময়কর তথ্য দেই। কানাডার ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০০৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে কানাডায় নাগরিকত্ব পেয়েছেন মোট ৩০ হাজার ৫৪৪ জন বাংলাদেশি। তাদের বড় অংশই নাগরিকত্ব পেয়েছেন বিজনেস বা বিনিয়োগ ক্যাটাগরিতে। অর্থাৎ সেই দেশের নাগিকত্ব নেওয়ার জন্য বাংলাদেশি ধনীরা তাদের দেশে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। এই কাজটি যে একবার করলেই হয় তা নয়। নির্দিষ্ট কিছু খাতে বিনিয়োগের মেয়াদ হতে হয় কমপক্ষে পাঁচ বছর। বিনিয়োগের আগে ওই ব্যক্তি আদৌ বিনিয়োগের ব্যাপারে যোগ্য কিনা, সেটা যাচাইয়ের জন্য পূর্ব অভিজ্ঞতা দেখাতে হয়।

২০১৬ সালে ৩ হাজার ২৩০ জন বাংলাদেশি কানাডার নাগরিকত্ব নিয়েছেন। তাদের অধিকাংশই বিনিয়োগ এবং স্কিলড ক্যাটাগরিতে নাগরিকত্ব পেয়েছেন। এ থেকেই উল্লেখিত পাঁচ বছরে কি পরিমাণ টাকা সেই দেশে বিনিয়োগ হয়েছে ধারণা করা যায়। এই টাকা কাদের? এই টাকা কি সৎ বা বৈধ পথে বাংলাদেশ থেকে কানাডা গিয়েছে? অবশ্যই নয়। এইসব জানার পর কি একজন বাংলাদেশি হিসেবে অপমান লাগে না?

আমি আরও অপমানিত হই যখন দেখি দেশীয় ধনীরা অবৈধপথে টাকা পাচার করে মালেশিয়ায় সেকেন্ড হোম গড়ে তোলেন। মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম গড়ে তুলতে বাংলাদেশি টাকায় তাদের জনপ্রতি কমপক্ষে ১২ কোটি টাকা খরচ করতে হয়েছে। আর বাংলাদেশ থেকে যেহেতু বৈধভাবে অর্থ নিয়ে মালয়েশিয়ায় বাড়ি কেনার সুযোগ নেই, সে হিসাবে যারা বাড়ি কিনেছেন, তারা মূলত টাকা পাচার করেছেন। মালয়েশিয়ায় দ্বিতীয় নিবাস গড়ার কর্মসূচি ‘মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম (এমএম২এইচ)’ প্রকল্পে অংশ নেয়া সব দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। ২০১৮ সালে পর্যন্ত এমএম২এইচ প্রকল্পে অংশ নিয়েছেন মোট ৪ হাজার ১৩৫ জন বাংলাদেশি। এরই মধ্যে মালয়েশিয়ায় বাড়ি কিনেছেন ২৫০ জন বাংলাদেশি।

সত্যিই অসাধারণ! এইসব জানার পর লজ্জায় অপমানে আমি মুষড়ে পড়ি। কষ্টে বুক ফেটে যায়। তখন মুখ ঢেকে যায় অপমানে।

৩.

যে দেশে অর্থ পাচার ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না, সেই দেশের অর্থনীতি সাময়িক সুবিধাজনক অবস্থায় থাকলেও বেশিদিন সেই অবস্থায় থাকবে না। অর্থনীতি দেশ সচল করে, দেশের মানুষকে সচল করে। যে দেশে প্রায় ২৭ লাখ মানুষ বেকার, সেই দেশে অর্থ পাচার মেনে নেয়া যায় না। দারিদ্র্য এখনো যে দেশ থেকে দূর হয়নি, সেই দেশে অর্থ পাচার কোনোভাবেই কাম্য নয়। এরপরও দেশ থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যায়। আর আমরা দেখি। এই বাস্তবতা যখন সামনে, তখন সত্যি মুখ ঢেকে যায় অপমানে। এই অপমান মাথায় নিয়েই আসুন আমরা শঙ্খ ঘোষের সেই বিখ্যাত কবিতাটা পড়ি।

‘একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি

তোমার জন্যে গলির কোণে

ভাবি আমার মুখ দেখাব

মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে।’

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক


ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়