ঢাকা     বুধবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ৮ ১৪২৭ ||  ০৫ সফর ১৪৪২

কর্নেল তাহেরের প্রাসঙ্গিকতা

আরিফ রহমান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:০২, ২০ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
কর্নেল তাহেরের প্রাসঙ্গিকতা

সেক্টর কমান্ডার অনেকেই ছিলেন! মুক্তিযোদ্ধাও অনেকে আছেন। কর্নেল তাহের আলাদা কেন? সোজা বাংলায় বললে- কর্নেল তাহের আলাদা হচ্ছেন বোধের জায়গায়!

তাহেরকে একদম সহ্য করতে পারেন না এমন কাউকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, আমার মনে হয় তিনিও স্বীকার করতে বাধ্য হবেন- কর্নেল তাহের বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা অনেক রাজনিতীকের আগে বুঝতে পেরেছিলেন।

ইতিহাস আজ আমাদের পক্ষে দেখে সবাই এই কথাটা বলেন যে, তারা জানতেন ‘যুদ্ধ একটা হবে’। কিন্তু তাহেরের জীবন আমরা যদি পাঠ করি তাহলে নিঃশঙ্কচিত্তে বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধে যদি আমরা পরাজিতও হতাম তবুও এটা পরিষ্কারভাবে দেখা যায় যে, তাহের জানতেন- তাহের প্রস্তুত ছিলেন!

তাহের ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন। তিনি যুক্তির স্বচ্ছ আলো দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন মুক্তিযুদ্ধ আসন্ন। একজন মানুষের পক্ষে ঠিক যতটুকু প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব তিনি নিয়েছিলেন। নিজের ভাই-বোনদের ট্রেনিং দিয়েছিলেন। অনান্য স্বাধীনতাকামী গ্রুপগুলোর সাথে যোগাযোগ রেখে চলছিলেন। অস্ত্র চালনা শিখতে পাকিস্তান আর্মিতে জয়েন করেছিলেন অফিসার হিসেবে!

তাঁর চিন্তা ছিল কাঁচের মতো স্বচ্ছ! ভাই-বোনদের অস্ত্র চালানোর ট্রেনিং দেওয়াটা শুনতে যত সহজ শোনায় তত সহজ নয়। আমার এই বয়সেও আমি সবার আগে চিন্তা করি, আমার ছোট বোনকে প্রটেক্ট করার কথা। কারণ আমার কাছে সে-ই প্রথম প্রায়োরিটি। কর্নেল তাহেরের কাছেও তার পরিবার প্রায়োরিটি ছিল, তাই নিজের স্বপ্নের সাথে পরিবারকে জুড়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর প্রথম প্রায়োরিটি ছিল দেশ। এবং দেশ বলতে তিনি মাটির চাইতে মানুষকে বেশি বুঝতেন। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও তাই মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন!

কোনো কল্পিত উগ্র-জাতিবাদি ধারণা নয়। দেশ মানে কাঁটাতারে ঘেরা ভূখণ্ড নয়, দেশ মানে মানুষ। মানুষ নিয়েই ছিল তাঁর কাজ। ১৯৬৮ সালে সোনার বাংলা নিয়ে তাঁর বাস্তবসম্মত ভাবনা দেখলে অবাক হতে হয়। কর্নেল তাহের লিখেছেন: ‘আমার সোনার বাংলা অনাহার, অশিক্ষা, শোষণ, রোগযন্ত্রণায় ভরা বিশৃঙ্খল গ্রামসমষ্টি নয়। এতে নেই শহরের উলঙ্গ জৌলুশ, পুঁতিগন্ধময় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, মনের সংকীর্ণতা। আমার সোনার বাংলা প্রকৃতির স্বাভাবিক স্বচ্ছতায় সমৃদ্ধ একটি সম্পূর্ণ প্রকাশ। এই বাংলার চিত্র সম্পূর্ণরূপে নদীভিত্তিক, নদীর সতেজ প্রবাহের স্বাভাবিকতায় সমৃদ্ধ। নদী আমাদের প্রাণ, ক্রমাগত অবহেলা ও বিরুদ্ধাচরণে সেই নদীর চঞ্চল প্রবাহ আজ স্তিমিত।’ 

আমার সোনার বাংলার নদী সতেজ, প্রাণবান। এর দু’পাশে বিস্তীর্ণ উঁচু বাঁধ। বাঁধের উপর দিয়ে চলে গেছে মসৃণ সোজা সড়ক, রেলপথ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ লাইন। বাঁধের উভয় পার্শ্বের বিক্ষিপ্ত গ্রামগুলো উঠে এসেছে বাঁধের উপর। গড়ে ওঠা এই জনপদ মানব সভ্যতার একটি অপূর্ব সৃষ্টি। নির্ধারিত দূরত্বে এক নকশায় অনেকগুলো বাড়ি নিয়ে গড়ে উঠেছে এক একটি জনপদ। বাড়ির সামনের ছোট্ট প্রাঙ্গণ সবুজ ঘাসে ঢাকা, চারিদিকে ফুল। পেছনে রয়েছে রকমারী সবজির সমারোহ। এখানে রয়েছে একটি খোলা মাঠ। বিকেল বেলা বুড়োরা মাঠের চারধারে বসে গল্প করেন। ছেলে-মেয়েরা মেতে ওঠে খেলাধুলায়। সকাল বেলা সোজা সড়ক থেকে বাসের হর্ন শোনা যায়। হইচই করে ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যায়।

এই জনপদে স্থাপিত হাসপাতালে কোনো দুর্গন্ধ নেই। লম্বা লাইনও নেই। সন্ধ্যার পর এই জনপদে নেমে আসে না অন্ধকারের বিভীষিকা। রাস্তায় জ্বলে ওঠে বিজলী বাতি। বয়স্করা যায় জনপদের মিলন কেন্দ্রে। পর্যালোচনা করে সারা দিনের কাজের, গ্রহণ করে আগামী দিনের কর্মসূচী। এখনে বসেই টেলিভিশনে তারা দেখে বিভিন্ন জনপদের অগ্রগতি। পায় নেতার নির্দেশ। গাঁয়ের উভয় পার্শ্বে বিস্তীর্ণ কৃষিক্ষেত্র। বর্ষায় স্লুইস গেইট দিয়ে বন্যার পানি ফসলের ক্ষেতগুলোকে করে প্নাবিত, আবৃত করে পলিমাটিতে। অতিবৃষ্টিতে জমে যাওয়া পানি চলে যায় নদীতে। স্বল্পকালীন স্বার্থে নদীর স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করার নেই কোনো অপচেষ্টা। জনপদগুলোর সাথে রয়েছে প্রকৃতির অপূর্ব সমঝোতা। এ যেন প্রকৃতিরই আর একটি প্রকাশ। এ বাংলায় শিল্প-কারখানা ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন জনপদে। যোগাযোগের জন্য রয়েছে একই সাথে নদী, সড়ক ও রেলপথ। বাঁধের উপরই নির্ধারিত দূরত্বে রয়েছে বিমান বন্দর। নদীর পাশে গড়ে ওঠা জনপদের মানুষ হাসে, গান গায়। এ মানুষ স্বাস্থ্য, শিক্ষায় সমৃদ্ধ, নতুন সংস্কৃতি ও সভ্যতার আলোকে আলোকিত। তারা সমগ্র পৃথিবীকে বাঁচার নতুন পথ দেখায়। তারা সমগ্র পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেয়।’

ফিদেলের স্বপ্নভূমি কিউবার দিকে যদি আজ তাকাই। একেবারেই অসম্ভব মনে হয় না তাহেরের ভাবনা।

২.

নিন্দুকেরা তাহেরকে বলেন অতিবিপ্লবী। তাহেরের স্বপ্ন তাদের কাছে কাল্পনিক, পরাবাস্তব, অবান্তর গল্প! অথচ তাঁর স্বপ্নে তো হাজার হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো ছিল না। মানুষ ছিল।

মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন দেখে কর্নেল তাহের শুয়ে থাকেননি এই প্রতীক্ষায় যে কেউ এসে স্বপ্ন পূরণ করে দেবে। একইভাবে সোনার বাংলার যে স্বচ্ছ স্বপ্ন দেখেছিলেন ১৯৬৮ সালে সেই পরিকল্পনা তিনি শুধু ডায়েরিতে লিখে রেখে যাননি আমাদের অনেকের মতো, বরং ঠিক স্বাধীনতার পরই এই স্বপ্নের রোডম্যাপ ধরে হেঁটেছেন। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের দায়িত্ব নিয়ে এক পা দিয়ে ঘুরে ঘুরে অফিসার আর সৈনিকদের এক করেছেন।

অফিসারের স্ত্রীদের জন্য যেমন সংগঠন ছিল, সৈনিকদের স্ত্রীদের জন্যও তেমন সংগঠন গড়েছেন সহধর্মিণী লুৎফা তাহের!

মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তযোদ্ধাদের ক্ষেতে নামিয়েছেন। ল্যাট্রিন বানিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন: ‘কৃষকের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে তার খাসী আর মুরগি খেয়ে গেরিলা যুদ্ধ হয় না। যদি কোনো কৃষকের গোয়ালে রাত কাটাও, সকালে গোবরটা পরিষ্কার কোরো। যে দিন অপারেশন না থাকে তোমার আশ্রয়দাতাকে একটা Latreen তৈরি করে দিও। তাদের সঙ্গে ধান কাটো, ক্ষেত নিড়াও।’

স্বাধীনতার পরেও তিনি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে কৃষিকাজ করেছেন। নিজে করেছেন এবং করিয়েছেন অফিসার সৈনিকদের দিয়ে। সেখান থেকে ড্রেজিং কর্পোরেশনে গিয়েও একই কায়দায় কাজ করেছেন সেখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিয়ে।

আজকে যখন আমরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাঠ করি, দেখতে পাই কোনো বড়োলোকের ছেলে তাঁর সহায় সম্পত্তি ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই গল্প। তাঁদের গল্পকে কোনোভাবেই খাটো করছি না, কিন্তু কৃষকের ইতিহাস কোথায়? যে কৃষক, শ্রমিকেরা মুক্তিযোদ্ধাদের ৭০ শতাংশ তাঁরা কোথায়?

তাঁদের কথা যিনি ভেবেছিলেন, তাঁকে আপনারা বলেন অবান্তর? আর অপরাপর বাম-ঘরনার বিপ্লবীদের মতো মনে মনে ভেবেই যদি বসে থাকতেন তাহের তবুও একটা কথা ছিল। পুরো জীবনটা তো মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত অফিসারদের ক্ষেতে নামিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেলেন। তবুও তাহেরের স্বপ্ন আপনাদের কাছে কাল্পনিক অলিক স্বপ্ন মনে হয়?

৩.

আপনার তাহেরকে অপছন্দ, কারণ তাহেরের আঘাত ছিল শ্রেণীতে! তাহের এলিটদের নিয়ে হইচই করলে বা আমাদের অনেক বিপ্লবীদের মতো প্রয়োগ না ভেবে কেবল তত্ত্ব কপচালে তাহেরকে আপনাদের ঠিক-ই ভালো লাগতো! মনে করিয়ে দিতে চাই কর্নেল তাহেরের বিচার করার জন্য জেলখানায় যে সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল তার চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয় কর্নেল ইউসুফ হায়দারকে। কর্নেল ইউসুফ ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকুরিরত ছিলেন। সেই আদালতে কর্নেল তাহেরের ওপর আনিত একটি অভিযোগ ছিল তিনি রাষ্ট্রের অনুগত নাগরিক নন। এর জবাবে তাহের বলেছিলেন: ‘একজন মানুষ যে তার মাতৃভূমির জন্য রক্ত দিয়েছে, নিজের একটি অঙ্গ হারিয়েছে... তার কাছে আর কি আনুগত্য চান আপনি?’

আজ তাহেরের ৪৪তম মৃত্যু দিবসে দেখতে পাই তাহের নিজের জাতির ভেতর প্রকাশিত। আজও আমেরিকায় আমরা কালোদের ওপর নিপীড়নে তাঁর শ্রেণী ভাবনার প্রাসঙ্গিকতা পাই। করোনার ভেতর হাসপাতালগুলোতে মানুষের হাহাকার দেখলে মনে হয় তাহেরের স্বপ্নের মতো প্রতিটি গ্রামে যদি একটা পরিষ্কার স্বাস্থ্যকর হাসপাতাল থাকতো, তাহলে শহরে হাসপাতালের সামনে মানুষকে মরে পড়ে থাকতে হতো না। কর্নেল তাহেরকে তাই এই মহামারিতেও দরকার। কর্নেল তাহেরের স্বপ্নের সোনার বাংলার গ্রামে গ্রামে গড়ে ওঠা হাসপাতালের সামনে কোনো লম্বা লাইন ছিল না!

আমার কাছে কর্নেল তাহের এ কারণে আজও প্রাসঙ্গিক। 


ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়