ঢাকা     সোমবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ১৩ ১৪২৭ ||  ১০ সফর ১৪৪২

৩৭০ ধারার বিলুপ্তি কাশ্মীরের জন্য কতটা আশীর্বাদ

হাসান মাহামুদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৪০, ৩ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
৩৭০ ধারার বিলুপ্তি কাশ্মীরের জন্য কতটা আশীর্বাদ

ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো সত্যিকার অর্থে অনেক কষ্টে অর্জিত। এর সাফল্যের জন্য জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং আঞ্চলিক প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন বলেও মনে করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তার মতে, দেশ ও রাজ্যের উন্নয়ন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এবং কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলো একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, দেশের উন্নয়নের যাত্রায় সমান ভাগীদার।

জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের প্রস্তাবিত কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। গত বছরের ৫ আগস্ট ছিল অঞ্চলগুলোর একটি ঐতিহাসিক দিন। এদিন ভারতের জাতীয় সংসদে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য পুনর্গঠন করে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করার বিল ঘোষিত হয়। দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ। এরই মধ্যে ( গত ৩১ অক্টোবর) এটি কার্যকর হয়েছে।

বিলটি ঘোষণার এক বছরের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে ভারতের গণ্ডি পেরিয়ে কূটনৈতিক মহলেও আলোচনা চলছে। জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন বিল, ২০১৯-এর মাধ্যমে একবছর আগেই সরাসরি কেন্দ্রের শাসনে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। এক বছরের ঘটনায় ধারাবাহিকতা পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন পদক্ষেপ থেকে এটি মোটামুটি স্পষ্ট- কেন্দ্রের পক্ষ থেকে উন্নয়নকেই দেওয়া হয় সেই অধ্যায়ের নতুন আঙ্গিক। রাজ্যের মানুষদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে সামাজিক ও আর্থিক সংস্কারের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

প্রথমদিকে স্থানীয়দের প্রতিরোধের মুখে বিলটি নিয়ে অনেক অপপ্রচার ছিল। কিন্তু অপপ্রচারের মধ্যেই স্থানীয় মানুষ পেতে শুরু করেন গোটা দেশের সাধারণ মানুষদের মতো অভিন্ন নাগরিক অধিকার। গত একবছরে অঞ্চলগুলোর উন্নয়নের কর্মসূচীগুলো থেকে একটি বিষয় বলা যায়- বরং ৩৭০ ধারাই ছিল কাশ্মীরের প্রকৃত উন্নয়নের পরিপন্থী।

ধারাটি লোপ পেতেই শুরু হয়েছে সার্বিক উন্নয়ন ও উপত্যকার শ্রীবৃদ্ধির জোয়ার। মানুষ সাক্ষী হতে পারছেন বিকাশের। রাষ্ট্রের শ্লোগান, সবার সাথে, সবার বিকাশ, সবার বিশ্বাস। তাই ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ কাশ্মীরও সেই এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত যাত্রার শরিক। আর বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহে সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে উন্নয়নের নিরিখে।

নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলছে। মহিলারা পাচ্ছেন মাথা উঁচু করে জীবনযাপনের অধিকার। প্রান্তিক মানুষ পাচ্ছেন নাগরিকত্বের মৌলিক অধিকার। আর অশান্ত কাশ্মীর উপত্যকার যুবকদের সামনে খুলেছে জীবিকার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর হাতছানি। যোগ্যতাসাপেক্ষে তারা করতে পারবেন সরকারি চাকরি। এখন ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতোই জম্মু ও কাশ্মীর কেন্দ্রশাসিত রাজ্যটিও পাচ্ছে নিজেদের আত্মনির্ভর করে তোলার সুবর্ণ সুযোগ। আর কেন্দ্রের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সরাসরি উন্নয়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে রাজ্যে।

জম্মু ও কাশ্মীর পৃথক রাজ্য থাকার সময় বহু মানুষ ছিলেন বঞ্চনার শিকার। বৈষম্য ছিল পদে পদে। পিছলে বর্গের মানুষ ছিলেন অমানবিক পরিস্থিতির শিকার। নাগরিক সুবিধা থেকে ছিলেন বঞ্চিত। ভারতের উন্নয়ন কর্মসূচির বহু সুবিধাই পৌঁছাতো না তাদের কাছে। বছরের পর বছর ধরে স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও ন্যূনতম সম্মানটুকুও জোটেনি প্রান্তিক মানুষদের। প্রতিবন্ধক হয়েছিল ৩৭০ ধারা। এর বিলোপ হতেই সকলের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আগে জম্মু ও কাশ্মীরে সম্পত্তির অধিকার থেকে মহিলারা ছিলেন একরকম বঞ্চিত। উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইন ছিল একপেশে। সেখানকার মহিলারা রাজ্যের বাইরে কাউকে বিয়ে করলে সমস্ত সম্পত্তির অধিকার হারাতেন। নারী স্বাধীনতা বলে কিছু ছিল না। ভিন রাজ্যে বিয়ে করলে নাগরিকত্ব খোয়াতে হতো কাশ্মীরি মহিলাদের। ৩৭০ ধারা বিলোপের ফলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছেন কাশ্মীরের মহিলারা। তাদের কালা কানুনের দাসত্ব থেকে মুক্তি ঘটেছে। নতুন কেন্দ্র শাসিত রাজ্যে তারা পাচ্ছেন পুরুষদের সমান মর্যাদা। ৩৭০ ধারা বিলুপ্তির পর মহিলাদের আর সম্পত্তির অধিকার নিয়ে ভাবতে হচ্ছে না। অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভিন রাজ্যে বিয়ে হলেও তাদের সম্পত্তি বেহাত হবে না।

আগে ৩৫-এ ধারা বলে জম্মু ও কাশ্মীরের সরকারই ঠিক করতো কারা এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা। সে অনুযায়ী দেওয়া হতো পিআরসি (পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট সার্টিফিকেট)। স্থায়ী বাসিন্দার এই প্রশংসাপত্র না থাকলে সরকারি কোনো সুবিধাই জুটতো না। সরকারি চাকরি থেকে জমি-বাড়ি কেনা-বেচা, সব কিছুতেই জরুরি ছিল পিআরসি। আর এই পিআরসি ছিলো সরকারের মর্জিনির্ভর।

পশ্চিম পাকিস্তানের শরণার্থীরা বহু বছর ধরে বঞ্চিত ছিলেন নাগরিকত্ব থেকে। তাদের পিআরসি দেওয়া হতো না। একই রকমভাবে ১৯৫৩ সাল থেকে কাশ্মীরে স্যানিটেশন কর্মীরা রাজ্যবাসীর স্বার্থে কাজ করে গেলেও তারা পাননি পিআরসি। বঞ্চিত করা হয় নাগরিকত্বের অধিকার থেকে। এই দুই সম্প্রদায়ের মানুষই চাকরি তো দূরঅস্ত, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার অধিকার থেকেও ছিলেন বঞ্চিত। কিন্তু ৩৭০ ধারা বিলোপ তাদের জীবনে নিয়ে এসেছে নতুন করে আশার আলো। তারাও নাগরিক হিসেবে সমস্ত সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখে। সব ধরনের বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে ভারত সরকার তাদেরও খুশি করতে পেরেছে।  

বহুদিন ধরে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত শরণার্থীসহ কাশ্মীরের বহু স্থায়ী বাসিন্দা নাগরিকত্ব বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন। তাদের দাবি মানা হচ্ছিল না। ৩৭০ ধারা বিলোপ করে সরকার তাঁদের ন্যায্য অধিকারকে সম্মান জানিয়েছে।

বিতর্কিত ৩৭০ ধারা বিলোপ হতেই অবসান ঘটতে চলেছে তাদের সব ধরনের বঞ্চনার। নাগরিকের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সকলের জন্য। শিক্ষা থেকে চাকরি, সবকিছুরই অধিকার পাবেন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে শরণার্থী হয়ে আসা কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দারা।  অতীতে সেটা তাদের কাছে ছিলো স্বপ্নমাত্র। সেই স্বপ্নকেই বাস্তব করেছে বর্তমান সরকার। এখন থেকে তারা শিক্ষা বা চাকরির ক্ষেত্রে সংরক্ষণের সুবিধাও পাবেন। অর্থাৎ এসসি বা এসটি সম্প্রদায়ের জন্য যেসব সুবিধা রয়েছে সেই সুবিধা থেকে তাদের বঞ্চনার যুগ শেষ হতে চলেছে। ভারতের অন্যান্য নাগরিকদের মতো তারাও পেতে চলেছেন সব ধরনের সুবিধা।

এক সময়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে শরণার্থী হয়ে আসা মানুষ এখন সম-অধিকার পাচ্ছেন উপত্যকার অন্য নাগরিকদের মতোই। কেন্দ্রশাসিত জম্মু কাশ্মীরে এখন তাদের সামনে খুলেছে সরকারি পরিকাঠামোয় শিক্ষার পাশাপাশি সরকারি চাকরির দরজা।

আসলে ৩৭০ ধারা বিলোপ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা শরণার্থীদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নয়নের নানা দিক খুলে দিয়েছে তাঁদের সামনে। এখন তারা প্রথমবারের মতো নিজেদের পুরোপুরি ভারতীয় ভাবতে পারছেন। সম অধিকারের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব পেয়ে তারা দীর্ঘদিনের হীনমন্যতা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। নিজেদের ঠিকানায় তাদের সামনে পৌঁছে গিয়েছে সমতার বার্তা। এখন তাদের নিজেদের নতুন করে বাঁচার পথ দেখিয়েছে। ভারতের প্রতিটি নাগরিকের মতো সমান অধিকার ও মর্যাদা কাজে লাগিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা শরণার্থী যুবকরাও পৌঁছাতে পারবেন উন্নয়নের শিখরে। নতুন প্রজন্মের কাছে এসেছে দাসত্বের শৃঙ্খলমুক্ত হয়ে নতুন করে নিজেকে তৈরি করার সুযোগ। এখন তারা ডানা মেলে উড়ে যেতে পারবেন নিজেদের তৈরি করার যজ্ঞে। সুযোগ এখন তাঁদের দখলে। স্বপ্নপূরণে ইচ্ছাডানারা পেয়েছে উড়বার আসমুদ্র হিমাচল বিস্তৃত আকাশ।

৩৭০ ধারা বিলোপের আগে জম্মু-কাশ্মীরে ভিন রাজ্যের বাসিন্দারা কেউ সম্পত্তি কিনতে পারতেন না।  বছরের পর বছর কাশ্মীরে স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও তাদের কোনো বাড়ি বা জমি কেনার অধিকার ছিল না। আইনি বেড়াজালে আটকে ছিল বহু দশক ধরে কাশ্মীরে বসবাসকারীদের সম্পত্তির অধিকার। এর বিরূপ প্রভাব পড়তো সমাজ জীবনে। বহুকাল ধরে এখানে বসবাস করেও তারা কিছুতেই একাত্ম হতে পারছিলেন না স্থানীয়দের সঙ্গে। তাই ভিন্ন রাজ্য থেকে এসে পূর্বতন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে তারা পেশাগত দিক থেকে প্রতিষ্ঠিত হলেও এখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের কথা ভাবতে পারতেন না। এটি কখনোই সমাজের উন্নয়নের পক্ষে ভালো নয়। রাজ্যের আর্থিক শ্রীবৃদ্ধির পক্ষেও ক্ষতিকারক। এখন নতুন করে কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দারা নিজস্ব বাড়ি-ঘরের স্বপ্ন দেখা শুরু করতে পারছেন।

এছাড়া ৩৭০ ধারা রক্ষাকবচের শক্তিতে কাশ্মীরের কঠোর ভূমি আইন রাজ্যের উন্নয়নের প্রতিবন্ধকা সৃষ্টি করেছিল। বিনিয়োগ আসছিলো না। দেশের অন্যান্য জায়গা থেকে পিছিয়ে পড়ছিল রাজ্যটি। দেশের উন্নয়নের মহাসড়কে শামিল হতে পারছিলেন না তারা। কারণ বিনিয়োগের পক্ষেও তো প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছিল ৩৭০ ধারা। ছিল না সকলের জন্য শিক্ষার অধিকার। এখন সেই আইনও প্রতিষ্ঠিত হবে। বিনা পয়সায় প্রান্তিক ও বঞ্চিত শিশুরাও পাবে বিনা পয়সায় গুণগত শিক্ষা। সঙ্গে থাকবে পুষ্টিকর খাবারের জন্য মিড-ডে মিল। এসসি বা এসটি সম্প্রদায় পাবে শিক্ষা ভাতাও। চাকরির ক্ষেত্রে সুবিধার কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।

৩৭০ ধারা বিলুপ্তি সবদিক থেকেই কাশ্মীরের উন্নয়নে নতুন দিশা দেখাচ্ছে। অবসান ঘটছে মানুষের অমানবিক বঞ্চনার। এই ধারায় আরো বেশি আলোকিত হয়ে উঠুক এখানকার মানুষ, এই হোক আগামীর প্রত্যাশ্যা।

লেখক: সংবাদকর্মী

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়