RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ২৫ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ১০ ১৪২৭ ||  ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

লাগামহীন পেঁয়াজের বাজার, দায় কার

ইবনুল কাইয়ুম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:৪৮, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০  
লাগামহীন পেঁয়াজের বাজার, দায় কার

আবহমান কাল থেকেই বাঙালির রান্নায় মশলা হিসেবে পেঁয়াজ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। রান্নায় পেঁয়াজ অপরিহার্য না হলেও এর ব্যবহারে আমরা এতটাই অভ্যস্ত যে, তরকারিতে পেঁয়াজের অনুপস্থিতি আমাদের রসনা যেন পুরোপুরি মেটায় না।

২০১৯ সালের মাঝামাঝি, ভারত রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় লাগামহীনভাবে বাড়তে শুরু করে পেঁয়াজের দাম। ৩০ টাকার পেঁয়াজ ৩০০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছিল। দিশেহারা হয়ে পড়েছিল সাধারণ মানুষ। অনেক পরিবার সেসময় পেঁয়াজ খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছিল। 

ভারতীয় পেঁয়াজের প্রতি আমাদের নির্ভরশীলতা আছে। কোনো কারণে তারা রপ্তানি বন্ধ করে দিলে আমাদের দেশের বাজারে প্রভাব পড়ে। যে কারণে প্রতিবছরই পেঁয়াজের দাম বাড়ে, তবে গত বছরের মতো ভয়াবহভাবে দাম আর কখনও বাড়েনি। চাহিদার তুলনায় আমাদের কম উৎপাদনই এই ভোগান্তির মূল কারণ। এটা খতিয়ে দেখা দরকার।

একই ঘটনার অশনি সংকেত যেনো এবারও পাওয়া যাচ্ছে। এ বছরও সেপ্টেম্বর মাসে লাফ দিয়ে বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে পেঁয়াজের দাম। গত ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে আগাম ঘোষণা ছাড়াই আচমকা পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে ভারত। ব্যবসায়ীদের পোয়া বারো থেকে আঠারোতে গিয়ে ঠেকেছে রাতারাতি। পরের দিন সকাল থেকেই ঢাকার খুচরা বাজারে ৩৫ টাকার ভারতীয় পেঁয়াজ হয়েছে ৮০ টাকা, ডায়মন্ড জাতের পেঁয়াজ ৪৫ থেকে ১০০ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজ ৫০ থেকে বেড়ে ১২০ টাকা।

কোথাও দামের পার্থক্য থাকলেও, মূল কথা হলো দাম বেড়ে যাওয়া। শুধু ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। এই প্রবণতা ঠেকাতে বা পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার আগাম কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হয়েছে এবার দাম বাড়বে না। গত বছরের মতো হবে কি-না তা নিয়ে এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে শঙ্কা।

মূল্য বৃদ্ধি ঠেকাতে দেশের বিভিন্ন বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালাচ্ছে। জরিমানা করছে। এতে অসাধু ব্যবসায়ীরা কিছুটা দমবে। তবে খুচরা বাজারে মূল্য বৃদ্ধির পিছনে ক্রেতাদেরও কিছুটা ভূমিকা রয়েছে। যখনই কোনো জিনিসের মূল্য বৃদ্ধির উপক্রম হয়, তখন ক্রেতারা এক কেজির স্থানে দশ কেজি করে কেনা শুরু করে। এতে স্বাভাবিকভাবেই চাহিদার তুলনায় যোগান কমে যায়। তাই দামও বাড়ে। 

এদিকে, পূর্ব ঘোষণা ছাড়া ভারত রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম যেমন বেড়েছে, তেমনি ক্ষতির মুখে পড়েছে আমদানিকারকরাও। এলসির বিপরীতে যেসব পেঁয়াজের চালান দেশে প্রবেশের কথা ছিলো, সেগুলোও বন্ধ রয়েছে। প্রচুর পেঁয়াজ বোঝাই ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে সীমান্তের ওপারে। বেনাপোল, ভোমরা, হিলি, সোনামসজিদসহ বিভিন্ন স্থল বন্দর দিয়ে পেঁয়াজের প্রচুর চালান দেশে প্রবেশের অপেক্ষায় আছে। ট্রাকে থাকা সেসব পেঁয়াজ পচে যাওয়ার শঙ্কায় আছেন আমদানিকারকরা। তাদের এ ক্ষতির দায়ভারে কে নেবে?

গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দিন সচিবালয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক সভায় বলেছিলেন, ‘যে পরিমাণ পেঁয়াজ মজুত ও আমদানির পর্যায়ে রয়েছে, তাতে সহসাই দাম কমে আসবে। দেশে নতুন পেঁয়াজ ওঠে ডিসেম্বর মাসে, ভারতে নভেম্বর মাসে। নতুন পেঁয়াজ উঠলেই এই সঙ্কট কেটে যাবে।’

এখন কথা হলো, এই অল্প সময়ের মধ্যে কারা বাজার অস্থির করে তোলে? তাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয় না? এছাড়া একবার চরম ভোগান্তির পর কেনো এ ব্যাপারে টেকসই বন্দোবস্ত নেওয়া হলো না? এক্ষেত্রে দূরদর্শিতার অভাব নাকি পরিকল্পনার- এ দায় কার?

গত বছর ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে চাহিদা মেটাতে সরকার মিশর, তুরস্ক এবং মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি করেছিল। টিসিবির মাধ্যমে তা ট্রাকসেল করা হয়। শুরুতে কেজিপ্রতি ৪৫ টাকায় বিক্রি হলেও পরে তা নেমে আসে ৩০ টাকায়। এতে অনেকটা স্বস্তি মেলে। তাতে সরকারকে বিরাট অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয়েছে।

তবে এভাবে বারবার ভর্তুকি দিয়ে কী সমস্যার সমাধান মিলবে? বরং নিজেদের উৎপাদন বাড়িয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়াটা কি বাঞ্ছনীয় নয়? প্রতি বছর চাহিদার তুলনায় উৎপাদন যা হচ্ছে, তার সমীক্ষা করে ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে কাজ করা দরকার। কৃষকদের ভর্তুকি দিয়ে উৎপাদন বাড়িয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে। গত বছর পেঁয়াজের মূল্য যখন মধ্য গগণে উত্তাপ ছড়াচ্ছে, তখন আগাম পেঁয়াজ বাজারে তুলে কৃষকরাই দাম কমানোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

তাছাড়া শুধু উৎপাদন বাড়ালেই চলবে না, সেই সঙ্গে সংরক্ষণও করতে হবে যথাযথভাবে। কারণ, পেঁয়াজ পচনশীল। উৎপাদনের ৩০ ভাগ পেঁয়াজ পচে যায়। এটাও এক ধরনের ঘাটতি। এছাড়া সরকার যেমন ধান-চাল সংগ্রহ করে, তেমনি পেঁয়াজও সংগ্রহ করতে পারে। দেশি পেঁয়াজ ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকলে মানুষ ভারতীয় বা অন্যান্য দেশের পেঁয়াজ ছুঁয়েও দেখবে না। সংশ্লিষ্টদের এটা নিয়ে ভাবতে হবে। আজকের ঘামাচি যেনো আগামীর বিষ ফোঁড়া হয়ে না ওঠে।

লেখক : সাংবাদিক

ঢাকা/তারা

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়