RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     শনিবার   ০৫ ডিসেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ২১ ১৪২৭ ||  ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২

শারদীয় উৎসব এবং প্রাসঙ্গিক ভাবনা

গোপাল অধিকারী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:১২, ১৯ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৬:১৫, ১৯ অক্টোবর ২০২০
শারদীয় উৎসব এবং প্রাসঙ্গিক ভাবনা

ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাঙালির দুর্গাপূজার সূচনা রাজশাহীর তাহিরপুরে। রাজা কংসনারায়ণের উদ্যোগে ১৫৮০ সালে যে পূজার সূচনা এই বঙ্গে হয়েছিল, তা ছড়িয়ে পড়েছে এই মহাদেশে। মহালয়ায় দেবীপক্ষের শুরু। তারপর পঞ্চমীতে দেবীকে মন্দিরে স্থাপন। ষষ্ঠীতে দেবী বোধন থেকে দশমীতে বিসর্জন পর্যন্ত চলে পূজার রকমারি আয়োজন। পূজা ঘিরে অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর মেলা। ব্যতিক্রমও রয়েছে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গস্থ মিশনসমূহে মহাঅষ্টমী তিথিতে হয়ে থাকে কুমারী পূজা। এদিন কুমারীকে দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। স্বামী বিবেকানন্দ সর্বপ্রথম কুমারীকে মাতৃজ্ঞানে পূজা দিয়েছিলেন বলে এ রীতির প্রচলন হয়।

প্রচলন অনুযায়ী পূজা হলেও এবছর পূজা হবে ব্যতিক্রম। করোনাভাইরাসের কারণে স্বাস্থ্যবিধিসহ নানারকম বিধি-নিষেধ নিয়ে অনুষ্ঠিত হবে শারদীয় উৎসব। আমার মনে হচ্ছে, এ বছরের পূজা সর্ম্পূণ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে অনুষ্ঠিত হবে। তবে এবার উৎসব হবে, আনন্দ হবে না- এমনটাই অভিমত অনেকের। স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, হবে না জমায়েত, করা যাবে না দশমী শোভাযাত্রা। করোনার কারণে এ নিয়মগুলো আমাদের মানতে হবে। তবে, পূজা কমানোর বক্তব্যের আমি তীব্রবিরোধী। কারণ কোনো কিছু সৃষ্টি করে তা রক্ষা করাই ধর্ম। সৃষ্টি না করলে ধর্ম কেমন করে হবে?

প্রকৃতিসৃষ্ট করোনা নিয়ে আমি খুব একটা বিচলিত নই। আমাকে তারচেয়ে বেশি বিচলিত করেছে বিভিন্নস্থানে পূজার অবকাঠামো। মা একই ও অভিন্ন। কিন্তু বিভিন্ন স্থানের অবকাঠামো পূজার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। কিন্তু যাদের সাধ আছে সাধ্য নেই, তাদের জন্য পূজা কি নিরানন্দ? পূজা নিয়ে অনেক কথা রয়েছে। যেমন বর্তমানে শারদীয় উৎসবে তিনদিনের সরকারি ছুটির দাবিতে আন্দোলন চলছে। পূর্বে এই দাবিতে জনসম্পৃক্ততা কম থাকলেও বর্তমানে ছুটির দাবিতে মানববন্ধন, স্মারকলিপিসহ বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করছে হিন্দু মহাজোটসহ বিভিন্ন সংগঠন। সারাদেশে একযোগে মানববন্ধন করেছে সংগঠনটি। ছুটি শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের, না সবার হবে এ নিয়ে আমি অবশ্য পরিষ্কার নই। যদি সবার জন্য হয় তবে আমার বিশ্বাস দাবির বিপক্ষে কেউ থাকবে না। কারণ ছুটি কে না চায়? আবার রাষ্ট্রের কথা যদি চিন্তা করা যায় তাহলে কিন্তু সবার ছুটি জোর দাবি করা যায় না। কারণ রাষ্ট্রের একদিনের ছুটিতে অনেক আয়-ব্যয় তথা কর্মকাণ্ড জড়িত। তবে শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের যদি ছুটি দেওয়া যায় তাহলে রাষ্ট্রেরও ক্ষতি হলো না উৎসবও হলো- সরকার এভাবে ভাবতে পারে।

বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগের ২৮ (১) নং অনুচ্ছেদে স্পষ্ট লেখা আছে কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না। আমি সংবিধান বিশেষজ্ঞ বা সরকারি নীতি নির্ধারক মহলের কেউ নই, তাই দাবিটা কতটা যৌক্তিত তা নিয়ে বলতে চাই না। তবে আমার মনে হয়, শারদীয় উৎসবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি করার বিষয়ে ভাবা দরকার। যেহেতু সনাতন সম্প্রদায়ের এটিই সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসব যেন সকলে আনন্দপূর্ণভাবে পালন করতে পারে সরকারের সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া দরকার।

অনেক মন্দিরের সীমানা প্রাচীর নেই। ফলে আয়োজক কমিটি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। এমন অনেক মন্দির কমিটি আছে যারা কোনোরকম আলো জ্বালিয়ে পূজা করেন। বিশেষ করে দলিত জনগোষ্ঠী এই উৎসব পালন করে একেবারেই নিভৃতে। পূজা এলেই তাদের মনে আনন্দের চেয়ে মনে হয় বেদনা বাড়ে। একটি বছর পর দেবী আসবে, পূজা করবে কিনা, করলে কেমন করে করবে- এ নিয়ে তারা দ্বিধায় ভোগে। সরকার বিভিন্নভাবে দলিতদের উন্নয়নে কাজ করছে। কাজ করছে সকল ধর্মের অনুষ্ঠান উৎসবমুখর ও প্রাণের ছোঁয়ায় রাঙিয়ে দিতে। সরকারের সেই ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে শারদীয় উৎসবে যদি প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয় তাহলে মন্দ হয় না। আমরা জানি সরকার এই উৎসবকে কেন্দ্র করে একটি বরাদ্দ দেয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেই বরাদ্দ মূর্তি বানানোর ব্যয়ও বহন করে না। তাই আমি মনে করি, সারাদেশে কতটি মন্দির রয়েছে যাদের অর্থবল নেই তাদের জরিপ করুন। জরিপ করে ব্যবস্থা নিন।

পত্রিকা মারফত জেনেছি, বাগেরহাট জেলার হাকিমপুর শিকদার বাড়িতে করা হয় জমকালো চোখ ধাঁধানো আয়োজন। ২০১৯ সালে এই মণ্ডপে ৮০১টি প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে। প্রতিমার সংখ্যার দিক দিয়ে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় পূজামণ্ডপ বলে দাবি করেন পূজার আয়োজক ব্যবসায়ী লিটন শিকদার। বিশ্বের বড় পূজামণ্ডপ বাংলাদেশে এটা আমাদের গর্ব। ঠিক একইভাবে গর্বের জায়গা হতে পারে অসহায় মন্দিরে সরকারের শারদীয় উৎসবের প্রণোদনা। 

ভাবনা রয়েছে নিরাপত্তা নিয়েও। পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্যমতে ২০১৯ সালে ১৩ মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুর হয়েছে। এ বছর যেন এমন কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেদিকে নজর দিতে হবে। বিশেষ করে মন্দিরে দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তাবাহিনীকে আধুনিক ও কৌশলী হতে হবে। জনসমাগম ও নির্জন দুই স্থানেই নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।

বর্তমান সরকার অসাম্প্রদায়িক। সরকার অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে বদ্ধপরিকর। দেশের সবগুলো মণ্ডপ যদি আর্থিকসংকট কাটিয়ে পূর্ণ নিরাপত্তায় পূজা উদযাপন করতে পারে তাহলেই এই উৎসব যথার্থ হবে। এ জন্য সরকারের পাশাপাশি সাধারণেরও কর্তব্য রয়েছে। নইলে আমরা মুখে যতোই বলি ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ এ কথা শুধু মুখের কথাই বিবেচ্য হবে। 

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ঢাকা/তারা

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়