RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২১ জানুয়ারি ২০২১ ||  মাঘ ৭ ১৪২৭ ||  ০৬ জমাদিউস সানি ১৪৪২

নারীর করোনায় আক্রান্তের হার কম কেন?

শেখ আনোয়ার || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:০৯, ৩০ নভেম্বর ২০২০  
নারীর করোনায় আক্রান্তের হার কম কেন?

করোনাভাইরাস বিশ্বজুড়ে পুনরায় ছড়িয়ে পড়ছে। একে বলা হচ্ছে, দ্বিতীয় বা তৃতীয় সংক্রমণ। সভ্যতার ইতিহাসে এমন উদাহরণ খুব কমই রয়েছে, যেখানে একটি রোগ এতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে! বিশ্বে প্রতি দশজনের মধ্যে একজন এরই মধ্যে করোনাভাইরাস সংক্রমিত বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যানে বলা হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ভাইরাস সার্স বা অন্যান্য ফ্লু ভাইরাসের চেয়েও ক্ষতিকর। এবং এখনও এর ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি। তবে ইতোমধ্যেই এ সম্পর্কিত কিছু বিষয় আমরা জেনেছি। যেমন:

করোনায় মেয়েদের জটিলতা কম কেন?
পরিসংখ্যান বলছে করোনাভাইরাসের প্রভাব মেয়েদের ওপর তুলনামূলকভাবে কম। করোনা আক্রান্ত এবং মৃতের তালিকায় সংখ্যাধিক্য লক্ষ্য করা যায় ছেলেদের। জার্নাল অব আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, নিউ ইয়র্কের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫৭০০ জন করোনা রোগীর মধ্যে ৬০ শতাংশেরও বেশি পুরুষ। ওয়েস্টার্ন জার্নাল অব এমারজেন্সি মেডিসিন-এ প্রকাশিত প্রবন্ধে গবেষকরা জানান, চীনের উহানের হাসপাতালে যত করোনা রোগী ভর্তি ছিল তার মধ্যে ৫১-৬৬.৭ শতাংশ পুরুষ। ইতালিতে পুরুষ রোগীর সংখ্যা, মোট রোগীর ৫৮ শতাংশ। ৪৪৬০০ জন করোনা রোগীকে নিয়ে এক সমীক্ষা হয় চীনে। দেখা যায়, এদের মধ্যে ২.৮ শতাংশ পুরুষ মারা গেছেন। আর মহিলা মৃত্যুর হার ১.৭ শতাংশ। বাংলাদেশে মেয়েদের চেয়ে পুরুষ বেশি সংক্রমিত হচ্ছে। পুরুষদের জটিলতাও বেশি হচ্ছে বলে গবেষকরা স্বীকার করেন। গবেষকদের প্রশ্ন- মেয়েদের করোনায় আক্রান্তের হার এতো কম কেন?   

বাংলাদেশের মানুষ করোনায় ভাগ্যবান
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের মতো আমাদের দেশের মানুষ সেভাবে স্বাস্থ্য সচেতন নয়। বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ। রাস্তায় বেরুলে শারীরিক দূরত্ব মানা অসম্ভব। খবরে প্রকাশ, ‘ঢাকার অর্ধেক মানুষের করোনা হয়ে গেছে। করোনায় আক্রান্ত ৮২ শতাংশের কোনো উপসর্গ নেই। তারা দিব্যি রাস্তাঘাটে, হাট-বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং অফিস করছেন।’ অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে করোনায় সুস্থতার হার বেশি। করোনায় এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষ বড় ভাগ্যবান। সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হার দু’টোই বাংলাদেশে খুব কম। শনাক্তের দিক থেকে বাংলাদেশ পঞ্চদশ স্থানে এবং মৃতের সংখ্যায় রয়েছে ২৯তম অবস্থানে। পরিসংখ্যানে বাংলাদেশে শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৭৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতে ৩.২, পাকিস্তানে ২.১৪ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে ৫.৯৬, যুক্তরাজ্যে ১৪.৩৬, স্পেনে ১০ এবং ইতালিতে ১৪.১১ শতাংশ মৃত্যুবরণ করেছে। করোনায় এদেশে মৃত্যুবরণ করেছে ৭৭ শতাংশ পুরুষ এবং ২৩ শতাংশ নারী। আর করোনা সংক্রমিত হয়েছেন ৭১ শতাংশ পুরুষ এবং ২৯ শতাংশ নারী।
 
ছেলেরা কেন করোনায় বেশি ঘায়েল হয়?
গবেষকদের প্রশ্ন, হার্ড ইমিউনিটি বা করোনা প্রতিরোধ ক্ষমতা ছেলেদের কি কম? বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, শুধু করোনা নয়, করোনা গ্রুপের যে কোনও ভাইরাসের ক্ষেত্রেই ছেলেদের সংক্রমণ বেশি হয়। ২০০৩ সালে সার্স ও ২০১২ সালে মার্সের সময়ও ঘটেছে একই ঘটনা। বেশি মারা যায় পুরুষ। ২০১৬ সালের এক স্টাডি থেকে জানা যায়, মার্সে যত মহিলা মারা যায়, পুরুষ মারা যায় তার চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি। ফলে মার্সকে ডাকা হতো ‘ম্যান ফ্লু’ নামে। তখনই জানা যায়, যেসব ভাইরাস প্রধানত শ্বাসযন্ত্রকে আক্রমণ করে, সেসব ভাইরাসের প্রভাবে ছেলেরা ঘায়েল হয় বেশি। এমনকি ঋতু পরিবর্তনের সময় যে সাধারণ ফ্লু হয়, তাতেও ভোগেন বেশিরভাগ ছেলেরাই। অর্থাৎ এসব ভাইরাসের বিরুদ্ধে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কম।

নারী এবং পুরুষের হার্ড ইমিউনিটি তত্ত্ব
কেন মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কম? উত্তরে জন্ম হয়েছে নানান তত্ত্ব। কেউ বলছেন ক্রোমোজোমের কথা, কেউ এনেছেন রিসেপটর অর্থাৎ করোনাভাইরাসের মানব কোষে ঢুকতে যে বস্তুটির সাহায্য লাগে, তার প্রসঙ্গ। কেউ বলছেন যৌন হরমোনের কথা। সার্স ও মার্স নিয়ে গবেষণা করে ২০১৭ সালে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে যে প্রবন্ধ ছাপা হয়, তাতে জানা যায়, এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে ছেলেদের প্রতিরোধ কম থাকার কারণ সম্ভবত যৌন হরমোন। বিভিন্ন বয়সি নারী ও পুরুষ ইঁদুরের শরীরে সার্স ভাইরাস প্রবেশ করিয়ে গবেষকরা দেখেন, ছেলে ইঁদুরগুলো বেশি সংখ্যায় আক্রান্ত হয়েছে। এবার মেয়ে ইঁদুরদের স্ত্রী যৌন হরমোন বা ইস্ট্রোজেনের উৎস ডিম্বাশয় কেটে ফেলা হয় বা এমন ওষুধ দেওয়া হয় যাতে ইস্ট্রোজেন বেরুতে না পারে। এবার তাদের সার্স ভাইরাস ইনজেকশন দিয়ে দেখা যায়, যাদের ইস্ট্রোজেন রয়েছে তাদের চেয়ে এরা বেশি সংখ্যায় মারা যাচ্ছে। এই তথ্যের উপর ভিত্তি করে লস এঞ্জেলসের সেডার সিনাই মেডিকেল সেন্টার ও নিউ ইয়র্কের স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটির রেনেসা স্কুল অব মেডিসিনের বিজ্ঞানীরা অল্প কিছু করোনা রোগীর উপর স্ত্রী যৌন হরমোন প্রয়োগ করে আশাপ্রদ ফল পেয়ে যান। সবগুলো তত্ত্বের প্রত্যেকটির পক্ষেই প্রচুর সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। ক্রোমোজোম তত্ত্ব সম্পর্কে গবেষক ভিনা তানেজা জানিয়েছেন- নারী ও পুরুষের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার তারতম্যের মূলে এক্স ক্রোমোজোমের হাত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। নারী শরীরের কোষে থাকে দু’টো এক্স ক্রোমোজোম ও পুরুষ শরীরে একটি এক্স, একটি ওয়াই। এক্স ক্রোমোজোমের মধ্যে এমন কিছু জিন রয়েছে, যারা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। যদিও দ্বিতীয় এক্স ক্রোমোজোম চুপচাপই থাকে। তবে তার মধ্যে যেসব সুরক্ষা জিন রয়েছে, তাদের ১০ শতাংশ বেশ কার্যকর। তার ফলেই এই পার্থক্য হয়। কাজেই এদিক থেকে দেখলে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ মেয়েদের। তবে তার কতটা করোনাভাইরাস ঠেকাতে ও তার জটিলতা কমাতে কাজে লাগে তা জানতে গেলে আরও গবেষণা দরকার।

রিসেপটর তত্ত্ব সম্পর্কে বলা হচ্ছে করোনাভাইরাস লুকিয়ে থাকতে পারে ছেলেদের টেস্টিসে! মেয়েদের ডিম্বাশয়ে যদিও তার চিহ্ন মাত্র থাকে না। এর কারণ কী? এসিই-২ নামের রিসেপটরে ভর করে কোষের গভীরে ঢোকে করোনা। যেখানে যেখানে এই রিসেপটরের প্রাচুর্য, সেখানেই তার রাজত্ব। পুরো শ্বাসযন্ত্র জুড়ে বসে রয়েছে সে। রয়েছে পরিপাকতন্ত্রে। রয়েছে টেস্টিসেও। সে কারণেই মেয়েদের শরীর থেকে যেখানে গড়ে ৪ দিন লাগে ভাইরাসের বিদায় নিতে, সেখানে ছেলেদের সময় লাগে টানা ৬ দিন। তবে ভাইরাস টেস্টিসকে সংক্রমিত করে কি? নাকি রিসার্ভার হিসেবে ব্যবহার করে? তা জানতে এখন আরও অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হবে।

ধূমপান তত্ত্ব সম্পর্কে বলা হচ্ছে চীনে যখন ছেলেদের বেশি করোনা হচ্ছিলো, ধূমপানকে তুলোধুনো করে কাঠগড়ায় তুলেছিলেন বিজ্ঞানীরা। করোনা সংক্রমণ ও জটিলতার সঙ্গে ধূমপানের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, রিসেপটরের সূত্রের কথা উল্লেখ করার কারণ, চীনে ছেলেরাই বেশি ধূমপান করেন। পরে দেখা যায়, ধূমপান না করলেও ছেলেরা বেশি সংক্রমিত হচ্ছেন।

বাংলার নারী দেয় করোনা পাড়ি
বাংলার মেয়েদের সহজাত নিয়ম-নিষ্ঠার কথা তুলে ধরে বিশেষজ্ঞরা একটি বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন। তা হলো, নানা কারণেই আমাদের দেশে মেয়েদের ঠান্ডাজনিত ভাইরাস খুব একটা ভয়াবহ হতে পারে না। এর বড় কারণ বাংলাদেশের মেয়েদের লাইফস্টাইল এবং বসবাসের পরিবেশ। এতো বেশি বৈরী পরিবেশে এখানে মেয়েরা বেড়ে ওঠে যে, ঠান্ডাজনিত কোনো ভাইরাস তার শরীরে ঢুকে প্রাণঘাতি হয়ে ওঠার সুযোগ পায় না। তাছাড়া সারা বছরই মেয়েরা জ্বর-সর্দি-কাশির মতো সমস্যায় ভুগে ভুগে অভ্যস্ত হয়ে যায়। ফলে করোনাভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে মেয়েদের খুব বেশি কাবু করতে পারে না। মেয়েদের করোনা কম হওয়া বা কম জটিল হওয়ার মূলে কি তবে এই ক’টি কারণই রয়েছে? নাকি রয়েছে আরও অন্য কিছু? বিজ্ঞানীরা জানান, নিয়ম-কানুন মানার ব্যাপারে মেয়েদের যে সহজাত প্রবৃত্তি তা একটা বড় কারণ। বাংলাদেশে বয়স্ক নারীরা ঘরেই থাকেন। ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা এই জনগোষ্ঠী করোনায় নিরাপদ, যদি না তারা সংক্রমিত কারও সংস্পর্শে আসেন। বিভিন্ন সমীক্ষায় জানা যায়, করোনাভাইরাস ঠেকানোর নিয়মাবলি যখন জনসমক্ষে প্রচার করা হয়, তখন মেয়েরা যতখানি নিষ্ঠার সঙ্গে তা পালন করেছেন, ছেলেরা ততোটা করেননি। এই কারণেও মেয়েরা সংক্রমিত হয়েছেন কম। তবে এ নিয়ে বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ কড়া নাড়ছে। আসছে শীতে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়ার প্রবল আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ জন্য চিরায়ত কিছু অভ্যাস ও বদঅভ্যাস বদলে ফেলতে হবে। বাইরে বের হলে সবার মাস্ক পরা সরকার বাধ্যতামূলক করেছে। মাস্ক পরতেই হবে। মানুষের মুখের সামনে গিয়ে কথা বলা, ভিড়ের মধ্যে হাঁচি কাশি দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকতে হবে। করোনার ভয়ে বাংলাদেশের সব শ্রেণির মানুষ স্বাস্থ্য সচেতনতা শিখে গেছে। করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার নিয়ম ধরে রাখাই হবে এখন প্রধান কাজ। প্রত্যেকেই নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করলে করোনা ঠেকানো সহজ হবে। করোনায় আরো অধিক সচেতন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা/তারা

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়