Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     শনিবার   ২৪ জুলাই ২০২১ ||  শ্রাবণ ৯ ১৪২৮ ||  ১২ জিলহজ ১৪৪২

চলতি বাজেট: ঘুরে দাঁড়ানো শুধু সময়ের ব্যাপার

মোস্তফা মোরশেদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:২২, ৭ জুন ২০২১  
চলতি বাজেট: ঘুরে দাঁড়ানো শুধু সময়ের ব্যাপার

বাজেটের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আলোচনা করতে হলে বাজেট বক্তৃতা পড়তে হয়। খুব স্বল্প পরিসরে এর বিশ্লেষণ কষ্টসাধ্য। সাধারণ মানুষের কাছে এটি সহজে বোধগম্য নয়। তার উপর বাজেটে অনেক বিষয়ের অবতারণা থাকে, ফলে একটি বুঝতে গিয়ে আরেকটি এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। একজন সাধারণ নাগরিকের কাছে বাজেট মানে সরকারকে তার কী দিতে হবে এবং প্রকারান্তরে তার জন্য কী বরাদ্দ হলো- এ দুটির হিসাব। এ সব চাহিদার ভিন্নতা এবং মানুষের আয়ের বৈষম্য থাকায় বাজেট হয়ে ওঠে গাণিতিক দর্শনের এক জটিল হিসাব। তবু চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।

বাজেটের একটি বড় বিবেচ্য বিষয় হলো প্রবৃদ্ধি। করোনাসৃষ্ট অতিমারিতে পৃথিবীজুড়ে যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় হয়েছে আমাদের দেশেও তার ব্যতিক্রম নয়। এর প্রাদুর্ভাবের পূর্বে ৮ শতাংশের অধিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করার নজির থাকলেও গত ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৬.১ শতাংশ এবং আগামী অর্থবছরের জন্য এর প্রক্ষেপণ ৭.২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে মাথাপিছু জাতীয় আয় ২২২৭ ডলার যা ৩০ জুলাই ২০২২-এ ২৪৬২ ডলারে উন্নীত হবার লক্ষ্য রয়েছে।

প্রবৃদ্ধি কমে যাবার অর্থ হলো জাতীয় উৎপাদন কমে গিয়ে সামগ্রিক চাহিদা, দ্রব্য ও সেবার উৎপাদন ও কর্মসংস্থান কমে যাওয়া। একটি বিষয় লক্ষ্য করুন। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিগত সময়ে কত ধরনের মানুষের কর্মসংস্থান কমেছে। শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার হিসাব করলে দেখা যাবে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, উপকরণ, গৃহ শিক্ষকদের বেতন, স্কুলের টিফিন, খেলার সামগ্রী ইত্যাদির চাহিদাজনিত ব্যয় কমে গিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এসব দ্রব্য ও সেবার সঙ্গে সম্পর্কিত সবার আয় কমে গিয়েছে। এর পরবর্তী প্রভাব হিসেবে যাদের আয় কমেছে তাদের ভোগকৃত অন্যান্য দ্রব্য ও সেবার চাহিদা কমেছে। ফলে মাল্টিপ্লায়ার প্রভাবের মাধ্যমে অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয়ের উপর।

জাতীয় আয় কমে যাবার দ্বিতীয় প্রভাব হচ্ছে রাজস্ব সংগ্রহে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। প্রস্তাবিত বাজেটে এনবিআর থেকে কর বাবদ পাওয়া যাবে আয় ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা যা ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২৯ হাজার কোটি টাকা বেশি। এছাড়া করবহির্ভূত প্রাপ্তির পরিমাণ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে আগামী অর্থবছরে তা জিডিপির ১০.৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দুই ডিজিটের নিচে এবং যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। করোনাকালে তা আরও প্রায় ১ শতাংশ কমে গিয়েছে। হুট করে এখন আর বাড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ তাতে মানুষের উপর করের বোঝা আরো বাড়বে। যদিও অর্থনীতি ও মানুষের জীবন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তবে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে সব পরোক্ষ করের উপর চাপ কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ বাড়াতে হবে। ২০৪১ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ২৪ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি অর্থাৎ, এডিপিতে বরাদ্দ কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ। ফলশ্রুতিতে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ধীর গতির কারণে বাজেট ব্যয় সংকুচিত হয়েছে।

জিডিপির আকার ৩৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪০ কোটি টাকার বিপরীতে মোট বাজেট ব্যয় ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। সরকারের সম্প্রসারণমূলক নীতির কারণে তা ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ৬.২৮ শতাংশ বেশি। এবারের প্রেক্ষাপটে বাজেট ব্যয় ১৭.৫ শতাংশ যা আরও উন্নীত করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। যুতসই রাজস্ব নীতি প্রয়োগ করে সঠিকভাবে ব্যয় করতে পারলে বাজেট ব্যয় ২০ শতাংশ বাড়ানো যেতে পারে। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য এই  করোনাকালে এর চেয়ে আর ভালো কী সুযোগ আসতে পারে!

লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম রাজস্ব আদায় এবং আবশ্যিক উন্নয়ন ব্যয়ের কারণে বাজেট ব্যয়ে ঘাটতি দেখা দেয়। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের বাজেটে ঘাটতি মোটেও কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়। বিগত দিনগুলোতে আমরা মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়ে ঘাটতি বাজেট মোট জিডিপির ৫ শতাংশের নিচে রাখতে পেরেছি। তবে গত দু’বছরে তার সামান্য ব্যতিক্রম রয়েছে। বিগত অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ৬.১ শতাংশের বিপরীতে এবারের প্রক্ষেপণ ৬.২ শতাংশ। ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক উৎস হতে ১ লাখ ১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস হতে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা আসবে। অভ্যন্তরীণ উৎসের ব্যাংক ব্যবস্থা হতে ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য ব্যাংক-বহির্ভূত খাত হতে আসবে ৩৭ হাজার ১ কোটি টাকা। এ চলকগুলো সামগ্রিকভাবে সমষ্টিক অর্থনীতিতে তেমন কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে না।

আমাদের অর্থনীতিতে সম্প্রসারণমূলক নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে কিনা তা নিয়ে অর্থনীতিবিদগণের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। সম্প্রসারণমূলক নীতি প্রয়োগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাস্তবায়ন। শুধু কাগজে-কলমে বাজেটের ব্যয় বৃদ্ধি করে কার্যত কোনো লাভ নেই। তার উপর এসব ব্যয়ের dead-weight loss এর পরিমাণ অনেক বেশি ফলে একটি সহনীয় মাত্রার সম্প্রসারণমূলক নীতিই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য। সম্প্রসারণমূলক নীতির আওতায় গত অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বরাদ্দ ছিল ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা যা এবার ১ লাখ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। মোট জিডিপির হিসাবে তা ৩.১ শতাংশ। ব্যয় করার সক্ষমতা থাকলে তা আরও বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

গত অর্থবছরের তুলনায় প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা খাতের বরাদ্দ বেড়েছে ১ শতাংশের কম এবং গত বছরের মতো ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রয়েছে। শিক্ষা ও প্রযুক্তিখাতে বরাদ্দ মোট জিডিপির ২.৭৫ শতাংশ যা ‘উন্নত বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে ৬ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। করোনাকালে শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ক্ষতি হয়েছে তা থেকে উত্তরণে নতুন কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। বাজেটে এ নিয়ে বিশদ বর্ণনার সুযোগ ছিল না। তবে এসব কৌশল খুব দ্রুতই গ্রহণ করতে হবে।

করোনাকালীন অর্থনীতিতে চারটি বিষয়ে আলোকপাত করা যেতে পারে:
এক. আমাদের ইনফরমাল কর্মসংস্থান বিবেচনায় কার্যত কেতাবি ‘লকডাউন’ প্রয়োগের সুযোগ নেই। সরকার অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সে বিবেচনাতেই কাজ করছে।

দুই. দীর্ঘ সময়ের স্থবির অর্থনীতিতে শিল্প ও ম্যানুফেকচারিং খাত ক্ষতির সম্মুখীন। সে প্রেক্ষাপট বিবেচনায় শিল্পখাতে কর্পোরেট কর হ্রাস করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কর্পোরেট কর কমানোর যে দাবি ছিল সরকার তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিবেশী প্রায় সব দেশের চেয়ে আমাদের কর্পোরেট কর বেশি। স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে নন-লিস্টেড ও লিস্টেড কোম্পানির বিদ্যমান কর যথাক্রমে ৩২.৫ শতাংশ ও ২২ শতাংশ থেকে উভয়ক্ষেত্রেই ২.৫ শতাংশ কমানো হয়েছে। দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা আসলে import substitution policy এর নামান্তর। Export promotion না-কি import substitution কোন পলিসি বেশি কার্যকর তা প্রায় নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছে। সব দেশই তার তুলনামূলক সুবিধা (comparative advantage) বিবেচনায় রফতানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ করছে যার ব্যতিক্রম আমাদের বাজেটে দেখা গেল। 

দুটি কারণে এ উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। প্রথমত, কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় উদ্যোগ। দেশের উদীয়মান ইলেক্ট্রনিক, ওষুধ, সিমেন্ট শিল্প এর থেকে লাভবান হবার সুযোগ সৃষ্টি হবে। দ্বিতীয়ত, রফতানি আয় ২০১৯ সালে ৩৯৩৪ কোটি টাকার বিপরীতে ২০২০ সালে ৩৩৬১ কোটি টাকা হয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকোচনের ফলে রফতানি আয়ে একটি নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সে বাস্তবতায় দেশীয় শিল্পকে প্রাধান্য দেয়ার বিষয়টি যৌক্তিক। 

তিন. সমষ্টিক অর্থনীতির অন্যান্য সূচকের অবস্থান যে রকমই হোক বিগত সময়ে ঈর্ষনীয় প্রবৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি (৫.৩ শতাংশ) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে যা করোনাকালীন সময়ে ইতিবাচক প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। 

চার. করোনাকালীন যে ৯টি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে কৃষি একটি। গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবারের বাজেটে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, সেচ ও বীজে প্রণোদনা ও ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। গত বছরের ৮৫৯৯ কোটি টাকার বিপরীতে এবার ১০০৯৯ কোটি টাকার ভর্তুকি ও প্রণোদনার প্রস্তাব রয়েছে। যদিও কৃষিখাতে ভর্তুকি আরও বৃদ্ধি করার অবকাশ রয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই, কভিড-১৯ এর পুরো সময়ে আমাদের কৃষিখাত সচল ছিল যা অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে।

শুধু করোনার প্রভাবে দেশে দরিদ্র্য লোকের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে, যাদের ‘নব্য দরিদ্র্য’ নামে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া এডিপিও দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখবে। প্রস্তাবিত ২০২১-২২ অর্থবছরের এডিপিতে ২ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং স্বায়ত্বশাসিত সংস্থা বা করপোরেশনের জন্য প্রায় ১১ হাজার ৪৬৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত এডিপিতে মোট প্রকল্প সংখ্যা ১৪২৬টি যার মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ১৩০৮টি ও কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১১৮টি।

কোভিড-১৯ এর বিপর্যয়কে সাময়িক হিসেবে চিহ্নিত করলে আমাদের বাজেটের বিন্যাস যৌক্তিক। তবে রূপকল্প-২০৪১ এর আলোকে ‘উন্নত বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে আমাদের সামনে যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে সে দিকে লক্ষ্য নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। অন্তত চারটি বিষয় আমাদের সামনে রয়েছে। আগামী দিনে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জনমিতিক মুনাফা ভোগ, এলডিসি থেকে উত্তরণের পরবর্তী চ্যালেঞ্জসমূহ জয় এবং ২০৩১ এ উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর বিবেচনা করতে হবে। সরকার আশা করছে, এ বাজেট দিয়েই হবে সুদৃঢ় বাংলাদেশ বিনির্মাণের অভিযাত্রা।

মাননীয় অর্থমন্ত্রীর ভাষায় বলতে চাই, “বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। এমনিভাবে অর্জিত হবে ২০৩০, ৩১, ২০৪১ ও ২১০০ সালসহ সকল স্বপ্নের বাস্তবায়ন”। আমি বিশ্বাস করি, ঘুরে দাঁড়ানো শুধু সময়ের ব্যাপার। 

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়