Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০৯ ডিসেম্বর ২০২১ ||  অগ্রহায়ণ ২৫ ১৪২৮ ||  ০৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

এ দেশের শিক্ষকেরা কদমবুসি নিয়েই বেঁচে থাকেন

ফারুক সুমন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:০২, ৫ অক্টোবর ২০২১   আপডেট: ১২:০৬, ৫ অক্টোবর ২০২১
এ দেশের শিক্ষকেরা কদমবুসি নিয়েই বেঁচে থাকেন

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যারের মুখ থেকে শোনা বাস্তব ঘটনা দিয়ে লেখাটি শুরু করছি। ১৫ মার্চ ২০১৯। অন্যসময়ের তুলনায় এ দিন স্যারের সঙ্গে বেশিসময় ধরে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। ‘বাংলাভাষা শিক্ষক পর্ষদ’-এর দশকপূর্তি অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে এসেছিলেন। জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) মিলনায়তনে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পর্ষদের সক্রিয় সদস্য হিসেবে অনুষ্ঠানের যাবতীয় আমন্ত্রণপত্র বিতরণের দায়িত্ব পড়ে আমার ওপর। অবশ্য পর্ষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. আয়েশা বেগম ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমন্ত্রণপত্র স্যারকে পাঠিয়েছিলেন। ফলে আমাকে আর যেতে হয়নি। সেদিন বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভাষা-সংগ্রামী সাবির আহমেদ চৌধুরী, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সুচরিতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী এবং পিএসসির চেয়ারম্যান কবি মোহাম্মদ সাদিক।

অনুষ্ঠানের দিন সকালে আনিসুজ্জামান স্যারকে নিয়ে আসার জন্য কল দিলাম। স্যার বললেন, ‘কষ্ট করে তোমাকে আসতে হবে না সুমন। আমি নিজেই চলে আসবো। তুমি ১০টার কিছু আগে নায়েমের গেইটে থেকো।’ আমি গেইটে অপেক্ষায় ছিলাম। ১০টার আগেই স্যার এসেছেন। তাঁকে নির্ধারিত কক্ষে নিয়ে এলাম। তখনো অনুষ্ঠান শুরু হয়নি। হাত-মুখ ধুয়ে চেয়ারে বসেছেন। টিস্যুতে মুখ মুছতে মুছতে স্যার বললেন, ‘তোমার প্রবন্ধগ্রন্থের কয়েকটা প্রবন্ধ পড়েছি। সুমিষ্ট গদ্য তোমার। শামসুর রাহমান এবং আল মাহমুদকে নিয়ে লেখা বিতর্কমূলক প্রবন্ধটি উপভোগ্য ছিল।’ ঐমুহূর্তে স্যারের এমন মন্তব্যে আমি ভীষণরকম প্রণোদিত হয়েছি।

স্যার, আপনার অনুমতি পেলে অন্য একটি প্রসঙ্গে কথা বলতে চাই। ‘বলো।’ স্যার, আপনি তো জানেন, শিক্ষদের বেতনকাঠামো নিয়ে সংকট চলছে। তাছাড়া প্রান্তিক পর্যায়ে শিক্ষকদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। বেতনকাঠামো মোটেও সময়োপযোগী নয়। স্যার বললেন, ‘হ্যাঁ জানি। কিন্তু এই সংকট এতো সহজে দূর হবে বলে মনে হয় না। বিগত একশ বছরের ইতিহাস দেখলে বোঝা যাবে। এখানে শিক্ষক সম্প্রদায় কেবল কথিত ‘সম্মান’ সম্বল করে বেঁচে আছেন। তবে পরিস্থিতি এমন থাকবে না। সার্বিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষাখাতে নজর দেওয়ার বিকল্প নাই।’ 

জ্বি স্যার। শোনা যাচ্ছে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হবে। এটা করলে ভালো হবে। স্যার বললেন, ‘আজ হোক কাল হোক জাতীয়করণ হবে। সেভাবেই সরকার এগুচ্ছে। শোনো তোমাকে একটা গল্প বলি- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক অধ্যাপক রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছেন। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অনুষ্ঠানে এসেছে। অনুষ্ঠান শেষে গেটের বাইরে বেরুতেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। বাধ্য হয়ে অধ্যাপক গেটের পাশে ছাউনিতে দাঁড়িয়ে থাকলেন। অপেক্ষা করছেন। বৃষ্টি কমলে তবেই যাবেন। কিছুক্ষণ পর গ্যারেজ থেকে একটি দামি প্রাইভেট কার বের হয়ে অধ্যাপকের গা ঘেঁষে দাঁড়ালো। গাড়ির দরজা খুলে একজন নেমে এসে স্যারের পা ছুঁয়ে সালাম করলেন। স্যার বললেন, আমি কিন্তু আপনাকে ভালোভাবে চিনতে পারিনি বাবা! ছাত্রটি ব্যস্ত হয়ে বললো, স্যার আমি আপনার অমুক ব্যাচের ছাত্র, আমার নাম এই। আমি অমুক সচিবালয়ে অমুক দায়িত্বে আছি। স্যার বললেন, আচ্ছা খুব ভালো। খুশি হলাম। ছাত্র বললো, স্যার দাঁড়িয়ে আছেন যে? কারো অপেক্ষায় আছেন? স্যার বললেন, হ্যাঁ, বৃষ্টি কমার অপেক্ষায়। ছাত্র একটু অবাকের ভঙ্গিতে বললেন, বলেন কী স্যার! আপনার প্রাইভেট গাড়ি নাই? স্যার শুধু বললেন- নাই। ছাত্র বললো, স্যার আমার ব্যক্তিগত আরও একটা গাড়ি আছে। আপনি অনুমতি দিলে আপনাকে নামিয়ে দিয়ে আসবে। শিক্ষক বললেন, তা লাগবে না। এ দেশের শিক্ষকরা ‘কদমবুসি নিয়েই বেঁচে থাকে।’

সেদিন স্যারের মুখ থেকে এমন গল্প শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। এই গল্পটি স্যারের নিজের গল্প নয়তো! জিজ্ঞেস করার সাহস পাইনি। সন্দেহ নেই, উপর্যুক্ত গল্পে এ দেশের শিক্ষকের আর্থিক প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। 

আজ শিক্ষক দিবস। অন্য অনেক পেশার মতো এ দেশে শিক্ষকতা পেশা নিয়েও রয়েছে হতাশার গল্প। যদিও সম্মান কিংবা জ্ঞান বিতরণের বিবেচনায় কেউ কেউ শিক্ষকতাকে পেশা না বলে ‘ব্রত’ শব্দটি উপযুক্ত মনে করেন। আদতে এ দেশে শিক্ষকতা পেশাকে সবচেয়ে সম্মানের পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও শিক্ষকই সবচেয়ে বেশি বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হন। পত্রিকায় হরহামেশাই শিক্ষকবঞ্চনা ও লাঞ্ছনার সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরিসংখ্যান দেখলে আন্দাজ করা যাবে যে, প্রাথমিক পর্যায় থেকে উচ্চতর শিক্ষা পর্যায় পর্যন্ত কী ভয়াবহ বৈষম্য। সরকারি বেতন কাঠামো সম্পর্কে কমবেশি আমরা জানি। কিন্তু বেসরকারি পর্যায়ে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোর অবস্থা হতাশাজাগানিয়া। এম. এ. পাস একজন শিক্ষকের বেতনের চেয়ে একজন এইট পাস ড্রাইভার কিংবা গার্মেন্টসকর্মীর বেতন প্রায় দ্বিগুণ। এমন অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যাবে, কেবল অনুপযুক্ত বেতন কাঠামোর জন্য শিক্ষক তার পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন। ব্যতিক্রম বাদে বেসরকারি শিক্ষকদের প্রায় সবাই আর্থিকভাবে বৈষম্যের শিকার। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষ যার-যার সুবিধামতো বেতন কাঠামো বানিয়ে শিক্ষকদের নিয়োগ দিচ্ছেন। অনেকেই উপায়ান্তর না পেয়ে বাধ্য হয়ে এই বেতনে চাকরিও করছেন। একশ্রেণির পুঁজিপতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে শিক্ষা বেচাকেনার বাজার বসিয়েছে। শিক্ষা এখন পণ্য। সামান্য বেতনে জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন বিবেচনায় কোনো কোনো শিক্ষক বেছে নিয়েছেন প্রাইভেট ও কোচিং-বাণিজ্য। এভাবে শিক্ষাখাতে শিক্ষক আর শিক্ষক থাকছেন না। একসময় তিনিও টাকার লোভে দস্তুরমতো ব্যবসায়ী বনে যান। অতিমাত্রায় বাণিজ্যিক মনোভাব তৈরি হওয়ায় শিক্ষক কিংবা প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে জ্ঞানবিতরণের চেয়ে অর্থ উপার্জন মুখ্য হয়ে ওঠে। শিক্ষার গুণগত মান বজায় থাকছে না। 

সম্প্রতি বাংলাদেশের শিক্ষার মান-সংক্রান্ত এক জরিপের ফল প্রকাশের পর বেশ হৈ-চৈ শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্কেলের মানদণ্ডে আমাদের শিক্ষার মান ২ দশমিক ৮। অথচ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের মান ২০ দশমিক ৮। আবার পাকিস্তানের শিক্ষার মান ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। তার মানে, আমরা শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। এই নিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষকদের অদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু গোড়ায় গলদ রেখে শিক্ষার মান নিয়ে চেঁচামেচি করা কতটুকু সমীচীন? 

সন্দেহ নেই, সমাজে একজন শিক্ষক সম্মানের আবরণে আচ্ছাদিত থাকেন। লোকে এখনও শিক্ষকের প্রসঙ্গ এলে আবেগে গদগদ হয়ে যান। বিনয়ে বিগলিত হয়ে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। কিন্তু আমাদের ভাবতে হবে, একজন শিক্ষকেরও সংসার আছে, পরিবার আছে। তাঁকেও খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে হয়। কেবল সম্মানের বুলিতে মন ভরলেও পেট ভরবে না। আমরা হয়তো আর্থিক অসামঞ্জস্যতার এই ব্যাপারটি আমলে নিচ্ছি না। কিন্তু একজন শিক্ষকের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বর্তমানে শিক্ষার মান অবনমনের নেপথ্যে শিক্ষকের আর্থিক অভাব-অনটন একটা বড় ধরনের প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। হতাশা ও বঞ্চনা নিয়ে আর যা-ই হোক যথাযথ জ্ঞানবিতরণ সম্ভব নয় বলে মনে করি।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক দিক থেকে বর্তমানে অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় অগ্রসরমান। তবে শিক্ষার গুণগত মান ক্রমশ নিম্নগামী কেন? এটা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে উপনীত হয়েও আমরা মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে পেরেছি কি? যেহেতু এই ক্ষেত্রে শিক্ষকসম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। সেহেতু শিক্ষদের সামাজিক মর্যাদার পাশাপাশি আর্থিক মর্যাদাও সমুন্নত রাখতে হবে। তাহলে মেধাবী ও যোগ্য ব্যক্তিরা শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী হবেন। একজন যোগ্য শিক্ষকের হাতেই কেবল যোগ্য শিষ্য তৈরি হতে পারে। শিক্ষার্থীর মানসগঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর। পরিতাপের বিষয়, আর্থিক সুযোগ-সুবিধা অপ্রতুল হওয়ায় যোগ্য ও মেধাবী ব্যক্তিরা এই স্তরে আসতে আগ্রহী নন। ফলে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীদের হাতে আমরা ছেড়ে দিচ্ছি আমাদের অনাগত প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। মাত্র এসএসসি পাস করেই প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারটিও ভাবতে হবে। এটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নয়কি? একটি ফলবানবৃক্ষ পেতে আমারা যেমন ছোট কিংবা মাঝারি অবস্থায় অধিক পরিচর্যা করে থাকি। তেমনই একটি সভ্য ও সুশিক্ষিত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পেতে হলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে যথাযথ পরিচর্যা প্রয়োজন।

শিক্ষার মান অবনমনের নেপথ্যে আরও একটি প্রধান অন্তরায় হলো দুর্নীতি। রাজনৈতিক বিবেচনায় দলের প্রার্থী অযোগ্য হলেও শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। অবিশ্বাস্য শোনালেও একথা সত্য যে, এখন ঘুষের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে। স্বজনপ্রীতিও দেখা যায়। যদি অসৎ পথে কেউ শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান, তবে তার নিকট থেকে নীতি ও প্রীতির প্রত্যাশা করা অর্থহীন। বর্তমানে শিক্ষার মান নিম্নগামী হওয়ার নেপথ্যে এই দুর্নীতির দায় অস্বীকার করা যায় না। শিক্ষক যেহেতু আদর্শের প্রতীক। সেহেতু তাঁর মাঝে অসৎ ও অনৈতিক চিহ্ন থাকা বেমানান। আমাদের শিক্ষক সম্প্রদায়ের মধ্যে যে দু’একজন অসৎ শিক্ষক মাঝেমধ্যে পত্রিকার শিরোনাম হন, তারা মূলত রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করে শিক্ষক হয়েছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করা তাদের একমাত্র লক্ষ্য। 

সর্বোপরি শিক্ষক সেই ব্যক্তি, যিনি জ্ঞানের আলো বিতরণের ভেতর দিয়ে সমাজ ও সভ্যতাকে সচল রেখে চলেছেন। বাবা-মায়ের পরে একজন শিক্ষকের স্থান। সন্তানকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষক অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। শিক্ষক দিবসে আমাদের প্রত্যাশা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রকৃত মেধাবীরা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সুযোগ পাক, বন্ধ হোক ঘুষের বিনিময়। আমাদের শিক্ষাঙ্গন রাজনীতির রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি লাভ করলে তবেই এসব করা সম্ভব। শিক্ষকের মান ও সুনাম বজায় থাকুক। ভুলে না যাই, শিক্ষক হলেন মহাপুরুষদের উত্তরসূরি। একজন মহৎ শিক্ষক তাঁর সময়ের শ্রেষ্ঠ মানুষের উদাহরণ।

লেখক: কবি ও শিক্ষক

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়