Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০৯ ডিসেম্বর ২০২১ ||  অগ্রহায়ণ ২৫ ১৪২৮ ||  ০৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

দেবী দুর্গার সৃষ্টি-রহস্য 

গোপাল অধিকারী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:০৫, ১১ অক্টোবর ২০২১   আপডেট: ১৭:০০, ১১ অক্টোবর ২০২১
দেবী দুর্গার সৃষ্টি-রহস্য 

দুর্গা নামের বুৎপত্তিগত অর্থ যিনি দুর্গ অর্থাৎ সঙ্কট হতে ত্রাণ করেন। শাস্ত্রে ‘দুর্গা’ শব্দটির ব্যাখ্যা রয়েছে। তাতে বলা হয়েছে দুর্গার ‘দ’ অক্ষর দৈত্যনাশক, ‘উ’-কার বিঘ্ননাশক, ‘রেফ’ রোগনাশক, ‘গ’ পাপনাশক এবং ‘আ-কার’ ভয়-শত্রুনাশক। অর্থাৎ দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও ভয়-শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই দুর্গা। পণ্ডিতরা বলছেন, শরৎকালের প্রথম শুক্লপক্ষের প্রতিপদ তিথিতে মহালয়ার দিনে দেবীঘট স্থাপন করে শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা হয়। শরৎকালের এ পক্ষকে দেবীপক্ষও বলা হয়। 

শাস্ত্রে আছে, দেবীদুর্গা হিমালয়বাসিনী দক্ষরাজার কন্যা। পিতৃগৃহে আগমন উপলক্ষে ষষ্ঠীর দিনে বিজয় শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে মর্ত্যলোকে মা দুর্গার আগমনকে স্বাগত জানানো হয়। এটিই দেবীর বোধন। এরপর যথাক্রমে মহাসপ্তমীতে নবপত্রিকা প্রবেশ, অষ্টমীতে কুমারী ও সন্ধিপূজা এভাবে নবমী পার হয়ে দশমীর দিনে দেবী বিসর্জন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেও পক্ষকাল চলে বিজয়া পুনর্মিলনী উপলক্ষে বিভিন্ন লোকজ উৎসব।

দেবী দুর্গার সৃষ্টি-রহস্যসমৃদ্ধ শাস্ত্রগ্রন্থ শ্রীশ্রী চণ্ডীতে উল্লেখ আছে, ব্রহ্মা মহিষাসুরের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে বর দিয়েছিলেন কোনো পুরুষ তোমাকে বধ করতে পারবে না। ব্রহ্মার বর পেয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠে মহিষাসুর। একে একে বিতাড়ন করেন স্বর্গের সব দেবতাদের। উপায়ন্তর না পেয়ে দেবতারা অবশেষে ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন। কিন্তু কী করবেন তিনি। নিজের দেয়া বর ফেরাবেন কী করে? এ অবস্থায় শিব ও অন্যান্য দেবতাকে সঙ্গে নিয়ে ব্রহ্মা যান স্বয়ং বিষ্ণুর কাছে। বিষ্ণু তাদের দুর্দশার কথা শুনে দেবতাদের বলেন, দেবতাদের নিজ নিজ তেজ জাগ্রত করতে হবে। তখন দেবতাদের সমবেত তেজের মিলনে আবির্ভূত হবে এক নারী মূর্তি। সেই নারীই বিনাশ করবে মহিষাসুরকে। বিষ্ণুর থেকে সবকিছু অবগত হয়ে দেবতারা হিমালয়ের পাদদেশে পুণ্যসলিলা গঙ্গার সামনে এসে প্রার্থনা শুরু করেন। দেবতাদের সম্মিলিত তেজরাশি থেকে দশদিক আলোকিত করে আবির্ভূত হন এক নারীমূর্তি। ইনিই দেবী দুর্গা নামে অভিহিত। তিনি আবির্ভূত হন দশভূজারূপে। দেবতাদের সব দুর্গতি বিনাশ করায় দুর্গা দুর্গতিনাশিনী, মহিষমর্দিনী এবং অসুরদলনী নামেও পরিচিত। বৈদিক সূত্রে এ দেবীর উল্লেখ আছে। পুরাকালে দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল বসন্তকালে। এ সময় দেবী দুর্গা ‘বাসন্তী’ নামে পূজিত হতেন যা এখনও প্রচলন আছে।

মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গার পরিবারসমন্বিতা মূর্তির প্রচলন হয় ষোড়শ শতাব্দির প্রথম দিকে। পরিবারসমন্বিতা এই মূর্তিকাঠামোর মধ্যস্থলে দেবী দুর্গা সিংহবাহিনী ও মহিষাসুরমর্দিনী। তাঁর উপরিভাগে ধ্যানমগ্ন মহাদেব। মহিষাসুরমর্দিনীর ঠিক ডানপাশে উপরে দেবী লক্ষ্মী ও নিচে গণেশ; বামপাশে উপরে দেবী সরস্বতী ও নিচে কার্তিক। পরিবারসমন্বিতা এই রূপে দুর্গাপূজা প্রথম অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার তাহিরপুরে। কংসনারায়ণের পূজার পরপরই আড়ম্বরপূর্ণ দুর্গাপূজার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন অবিভক্ত বাংলার জমিদাররা। নতুন আঙ্গিকের এই পূজার শাস্ত্রীয় ও সামাজিক আয়োজন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় দুর্গাপূজা পরিণত হয় জমিদারদের উৎসবে। জমিদারী প্রথা বিলোপের পর দুর্গোৎসবে জমিদারদের অংশগ্রহণের হার কমে আসে স্বাভাবিকভাবেই। নব্য ধণিকশ্রেণীর উদ্ভবের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্গোৎসব আয়োজকগোষ্ঠীতে যুক্ত হয় অনেক নতুন মুখ। তবে প্রতিটি দুর্গোৎসবই তখন আয়োজিত হতো সম্পূর্ণ একক উদ্যোগে। 

আনুমানিক ১৭৯০ সালে একটি ঘটনা ঘটে অবিভক্ত বাংলার পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায়। গুপ্তিপাড়ার একটি ধনী পরিবারের আকস্মিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে অনিশ্চয়তার সন্মূখীন হয় বাড়িটির বাৎসরিক পূজার আয়োজন। গুপ্তিপাড়ার বারো জন বন্ধুস্থানীয় যুবক তখন এগিয়ে আসেন। এই বারোজন ‘ইয়ার’ বা বন্ধু সংঘবদ্ধভাবে গ্রহণ করে পূজার দায়িত্ব। গুপ্তিপাড়ার এই পূজাটি মানুষের কাছে পরিচিত হয় ‘বারোইয়ারি’ বা বারোয়ারি পূজা নামে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে বাংলায় দুর্গাপূজার সংখ্যা বাড়ল ব্যাপকহারে। তারপর থেকেই বিভিন্ন বাড়োয়ারী মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় উৎসবটি।

বিগত দুই বছরের সব উৎসবই কিছুটা ব্যতিক্রম। আমরা একটি মহামারিকাল অতিক্রম করছি। তবে এ বছর করোনার সংক্রমণ কম থাকায় উৎসবে ভিন্নমাত্রা যোগ হবে। এ বছর সারা দেশে ৩২ হাজার ১১৮টি মন্দির বা মণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপিত হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ। যা গত বছরের চাইতে এক হাজার ৯০৫টি বেশি। ঢাকা মহানগরে পূজা মণ্ডপের সংখ্যা ২৩৮টি যা গত বছরের থেকে চারটি বেশি। বর্তমান সরকার দায়িত্বে আসার পর প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে পূজা মণ্ডপের সংখ্যা বাড়ছে। 

জগতের সব কিছুই সৃষ্টি হয় শুভর জন্য। তবুও অশুভর আগমন ঘটে, ঘটেছে, ঘটবে। জীবনে যেমন সুখ-দুঃখ রয়েছে তেমনি জগতেও থাকবে শুভ ও অশুভ। তবে অশুভর বিদায়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। কারণ অশুভ কখনও কাক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। সব সময় অশুভর পরাজয় ঘটে। যেভাবে মহিষাসুর নামক অসুরদের হাত থেকে দেবকুল রক্ষা করেছিলেন দুর্গা, তেমনি তিনিই করোনা নামক অশুভের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করবেন। এ বছর দেবী দুর্গা আসছেন ঘোটকে। এতে রবি শস্য ভালো হবে। দেবী বিদায় নেবেন দোলায় চড়ে। এতে দূর হবে সকল অসুখ-বিসুখ। 

লেখক: সাংবাদিক
 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়