Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ০১ ডিসেম্বর ২০২১ ||  অগ্রহায়ণ ১৭ ১৪২৮ ||  ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩

পরাজয়ের ময়নাতদন্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ দেশপ্রেম

মোস্তফা মোরশেদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:১৩, ২৩ নভেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৫:১৩, ২৩ নভেম্বর ২০২১
পরাজয়ের ময়নাতদন্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ দেশপ্রেম

‘প্রত্যাশিত’ হারের মধ্য দিয়ে শেষ হলো পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠের টি-টুয়েন্টি সিরিজ। সিরিজ হারের কারণ ব্যাখ্যা করতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। একটি দুর্বল দল নিয়ে সম্প্রতি শেষ হওয়া টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট দলের বিপক্ষে জয়ের আশা করা যৌক্তিক ছিল না; যদিও নিজেদের মাঠে খেলা বলে বাড়তি অনুপ্রেরণা ছিল। কিন্তু সেই অনুপ্রেরণা কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ।

বিশ্বকাপে হতাশাজনক ফলের পর দল গঠন নিয়ে অনেক কাদা ছোড়াছুড়ি হয়েছে। টিম ম্যনেজমেন্টের দাবি অনুসারে কয়েকজন সিনিয়র খেলোয়াড়কে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে। যদিও মুশফিক এ বিষয়ে দ্বিমত করেছেন। তামিম এখনও কেন খেলছেন না- সে বিষয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা অনুপস্থিত; থাকলেও আমরা জানি না। লিটন, সৌম্য যথারীতি বাদ পড়েছেন। এটা মানতে হবে, লিটন আমাদের অন্যতম সেরা ব্যাটার। কারণ, তিনি উইকেটের চারপাশে শট খেলতে পারেন। ঘরের মাঠে তাকে রাখা যেত। ঠিক এ কারণেই সৌম্যকে সব সময়ের জন্য বাদ দিতে হবে।

মিরপুরে বিশ্বকাপের দুই ফাইনালিস্টের বিপক্ষে ভালো বোলিং করা নাসুম দলে থাকলেও প্রথম দু’ম্যাচে খেলার সুযোগ পাননি। কী ব্যাখ্যা দেবেন? দলের কম্বিনেশন ঠিক করা যায়নি? তিনি কার বদলে নামতেন? দলে নতুন যোগ দেওয়া আমিনুলের জায়গায় খেলতে পারতেন?

মেনে নিলাম দীর্ঘ মেয়াদে দলের ভালোর জন্য একজন লেগ স্পিনারের অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজন ছিল। যদি সে বিবেচনায় আমিনুলকে দলে রাখা হয়ে থাকে তবে মাহমুদউল্লাহ কেন তাকে বসিয়ে রেখে প্রথম ম্যাচে নিজে বল করলেন? ম্যাচ জেতার বাসনা নিয়ে খেলতে নেমে থাকলে নাসুম অবশ্যই সেরা একাদশে থাকতে পারতেন।

দলনায়ক হিসেবে মাহমুদউল্লাহ ভালো করতে পারেননি। প্রথম ম্যাচে নিজে হাতে বল তুলে নিয়েছেন। খুব একটা খারাপ করেননি, তবে তার বল করার সিদ্ধান্ত দুটি বিষয়ের অবতারণা করে। এক. বোলিং নিয়ে তার পরিকল্পনার অভাব, এবং দুই. অধিনায়ক হিসেবে নিয়মিত বোলারদের সেরা খেলাটা বের করার যে দায়িত্ব ছিল তা পালন করতে না পারা। অধিনায়ক হবার পর তার ব্যাটিং থেকেও কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। তার জায়গায় অধিনায়ক হিসেবে কে বিকল্প হতে পারেন সে বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা চোখে পড়ছে না। সিরিজের শেষ ম্যাচে তিনি শেষ এক ওভার বল করেছেন। জয়ের জন্য ৬ বলে ৮ রান থাকা অবস্থায় বল করতে এসে আশা জাগিয়েছিলেন। আসলে শেষ ওভারে আন্তর্জাতিক মানের স্পিনার না হলে কেউ বল হাতে তুলে নেন না। মাহমুদউল্লাহ জুয়া খেলতে চেয়েছিলেন, এবং কিছুটা সফলও। কিন্তু দিন শেষে পরিসংখ্যান আমাদের পক্ষে থাকেনি। 

ক্রিকেট নিয়ে আমাদের সমস্যাগুলো এখন আর নতুন নয়। ২০০৬ সালে টি-টুয়েন্টিতে অভিষিক্ত বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় পাড়ি দিয়ে ফেলেছে। ৭৭টি পরাজয়ের বিপরীতে জয় মাত্র ৪৩টি-তে। জয়ের সংখ্যা কম না হলেও বেশিরভাগই দুর্বল দল (জিম্বাবুয়ে) এবং অনেকক্ষেত্রে বড় দলের খর্ব শক্তির দলের বিরুদ্ধে। তাই বোধকরি, আর পিছনে ফিরে না থাকিয়ে সময় এসেছে নুতন করে ভাবার।

ব্যাটারদের কাজ যদি প্রত্যাশা থেকে অনেক কম হয়, বোলারদের কিছু করার থাকে না। ব্যাটারগণ নিজেদের হারিয়ে ফেলেছেন। তার উপর চাপে পড়ে মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন- যার প্রভাব শরীরের ভাষায়ও পড়েছে। ক্ষেত্র বিশেষে সোশ্যাল মিডিয়ার চাপও মাথায় নিতে হচ্ছে। আরও একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে যে, হাল আমলের ক্রিকেটে নতুন নতুন দেশ উঠে আসছে। আফ্রিকা, ইউরোপের অনেক নতুন দেশসহ অনেকেই আগ্রহী হচ্ছে যা প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। তাই আমাদের পিছিয়ে পড়ার যে আশঙ্কা রয়েছে তা নিয়ে ভাবতেই হবে।

সমাধান কী? সমাধান অনেক; মাত্র তিনটি বিষয়ের উল্লেখ করতে চাই। এক. ঘরোয়া ক্রিকেটের মানোন্নয়ন করতে হবে। দুই. মিরপুরের স্পিনিং উইকেটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে উপযোগী করে ভিন্ন ভিন্ন উইকেট তৈরি করে সেখানে নিজেদের মানিয়ে নিতে হবে। এছাড়া, বোর্ড ও টিম ম্যানেজমেন্ট নিয়ে যে অজানা আশঙ্কা, অস্থিরতা, সংশয়, বিশ্বাসহীনতা তৈরি হয়েছে তা ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থে নিরসন করতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না ক্রিকেট হলো জাতির আশা ভরসার অন্যতম প্রতীক। ক্রিকেট ঘিরে আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাসি; বুকে বুক মিলিয়ে চোখের জল ফেলি আর হাত হাত রেখে এগিয়ে যাই। তবে এসবের মাঝে এক নতুন ইস্যু যুক্ত হয়েছে।

সবকিছু ছাপিয়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে পাকিস্তানের প্রতি কিছু পথভ্রষ্ট মানুষের সমর্থন প্রকাশ। আমি মনে করেছিলাম, বাংলাদশে বসবাসকারী পাকিস্তানি নাগরিকগণ হয়তো গ্যালারিতে উপস্থিত হয়ে পাকিস্তানের পতাকা প্রদর্শন করছেন। প্রিন্ট মিডিয়ার পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া দেখে আমার সেই ভুল ভেঙেছে। পাকিস্তানের জার্সি গায়ে চাপিয়ে, পাকিস্তানের পতাকা নিয়ে এক শ্রেণির দর্শক যেভাবে পাকিস্তানকে সমর্থন করছেন তা আমাদের জন্য কষ্ট, যন্ত্রণা ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কষ্ট ও যন্ত্রণার কারণ এ জন্য যে- নিজ দেশের বিপক্ষে কেউ কেউ তার অযাচিত অনুভূতি প্রকাশ করছেন।  করছেন।

এর পাশাপাশি উদ্বেগের কারণ হলো- দেশের অভ্যন্তরে ‘দেশদ্রোহী’ বা অন্যভাবে বললে ‘দেশবিরোধী’ কিছু মানুষ রয়েছেন যারা প্রত্যক্ষভাবে নিজের দেশের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। যদি প্রত্যক্ষভাবে এরকম হয়ে থাকে তবে পরোক্ষভাবে কী হতে পারে তা গুছিয়ে ভাবতে পারছি না। তারা কি আমাদের স্বাধীনতাকে অগ্রাহ্য করতে চায়? কিংবা বর্তমান উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিতে তারা কি সহযাত্রী হতে পারবে? সহজ উত্তর হলো- এরা আসলে আমাদের সহযাত্রী নয়। 

অনেকে এভাবে বলছেন, সদ্য সমাপ্ত টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার টুয়েলভ-এ জয় বঞ্চিত বাংলাদেশকে নিয়ে মানুষের যে ক্ষোভ তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এ সিরিজে। আপাত দৃষ্টিতে বিষয়টি এরকম মনে হলেও পাকিস্তানের প্রতি ন্যাক্কারজনক সমর্থনের বিষয়টিকে অবজ্ঞা করার কোনো সুযোগ নেই। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, পাকিস্তান বা অন্য কোনো দেশ যদি আমাদের সাথে সবসময়ই জিততে থাকে তবে আমরা কি নিজের দলের প্রতি সমর্থন বাদ দিয়ে দেব? কিংবা দল হিসেবে বাংলাদেশ যদি এভাবে হারতেই থাকে তাহলে কি আমরা দেশের প্রতি সমর্থন ফিরিয়ে নেব?

একটু ভিন্নরূপে এর উত্তর দিতে চাই। দেশকে ‘মা’ আখ্যায়িত করা হয়। ক্রিকেটে ব্যর্থতার জন্য আমাদের মন খারাপ হতে পারে কিন্তু তাই বলে আমি কি আমার মাকে অস্বীকার করব? কেউ একজন বাবার উদাহরণ দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন: ‘নিজের বাবার অর্থবিত্ত কম থাকার কারণে কেউ কি পাশের বাসার বিত্তশালী লোকটিকে নিজের বাবা হিসেবে মেনে নেবে?’

উন্নয়নের জন্য একটি সমাজে সামাজিক মূলধনের গুরুত্ব রয়েছে। গ্যালারিতে পাকিস্তানের সমর্থনে কিছু বাঙালির যে উল্লাস তা সামাজিক মূলধনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এ বিষয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র বিজ্ঞানীদের ভাবনার অবকাশ রয়েছে। সামজিক মূলধনের গতিপ্রকৃতি যদি একই স্রোতে বহমান হয় তবে উন্নয়নের গতি তরান্বিত হয়। দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের জন্য সবাইকে মূলস্রোতে রাখার জন্য প্রচেষ্টা নিতে হবে। 

মনে রাখতে হবে, আমাদের স্বাধীনতা অর্থবহ। জাতি হিসেবে আমাদের উত্থানের যে ইতিহাস তা পৃথিবীর অন্য যে কোনো দেশের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশ হিসেবে আর্থ-সামাজিক অগ্রগতিতে আমরা পাকিস্তানের চেয়ে সকল বিবেচনায় এগিয়ে যাচ্ছি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার আদলে রূপকল্প-২০৪১ বিনির্মাণে জাতি হিসেবে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতেই হবে। সেখানে বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচে কিছু মানুষের নিজ দেশ বাদ দিয়ে পাকিস্তানকে সমর্থন কিসের ইঙ্গিত বহন করে ভেবে দেখার বিষয় বটে।      

ঢাকা/তারা

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়