ঢাকা     বুধবার   ১৯ জানুয়ারি ২০২২ ||  মাঘ ৬ ১৪২৮ ||  ১৫ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

ড. সেলিমের মৃত্যু ও অভিভাবক শূন্য দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মাছুম বিল্লাহ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:২৭, ৭ ডিসেম্বর ২০২১  
ড. সেলিমের মৃত্যু ও অভিভাবক শূন্য দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনো ঘটনা ঘটলেই অনির্দিষ্টকালের জন্য হল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কর্তৃপক্ষ মনে করে এটাই সহজ সমাধান। এই পুরনো ওষুধ কতদিন চলবে?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১৯ মাস বন্ধ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার পর মাত্র দুই সপ্তাহ ক্লাস হয়েছে কুয়েটে। তারপর সেখানে দুই ছাত্রের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় প্রায় এক সপ্তাহ ক্লাস বন্ধ থাকে। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সেলিম হোসেনের করুণ, মর্মান্তিক ও রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গত ০৩ ডিসেম্বর শিক্ষার্থীদের হলত্যাগের নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ।

কুয়েটে চার হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮০০ মেয়ে শিক্ষার্থী। হঠাৎ করে হল বন্ধ হলে এবং বিকেল চারটার মধ্যে হল ত্যাগের নির্দেশ দিলে মেয়েরা কোথায় যাবে- বিষয়টি আজ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় এলো না! হঠাৎ করে হল বন্ধ হওয়ার কালচার শুরু হয়েছে এরশাদের আমল থেকে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোটা সময় কেটেছে এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন; যেটাকে আমরা বলতাম এরশাদ ভ্যাকেশনে। একবার এমন হয়েছিল কর্তৃপক্ষ বিকেল পাঁচটার মধ্যে যখন হল ছাড়তে বললো তখন কোথায় যাব? এদিক পুলিশের গাড়ি মহা উৎসাহে চারদিক ঘিরে ফেলেছে; লাঠিসোটা আর বন্দী করার সব সরঞ্জাম নিয়ে হাজির। কোনো দিকে যাওয়ার পথ নেই। বহু কষ্টে বেরিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট অফিসের পিওনের ছোট কক্ষে সারারাত কাটালাম; সারারাত দেখলাম পুলিশের গাড়ির টহল, মনে হচ্ছে যেন যুদ্ধাবস্থা! 

পরদিন সকালে অতি সন্তর্পণে রাস্তায় এসে কোনো রকমে এটি গাড়িতে চেপে বসলাম বরিশাল যাওয়ার জন্য। কারণ পথে পথে পুলিশের তল্লাশি, ছাত্র পেলেই আর কথা নেই। পুলিশের সেকি উৎসাহ আর বীরত্ব! এর আগে কয়েকবার এরকম হওয়ায় ঢাকা চলে আসতাম।

এবার ভেবে দেখুন নারী শিক্ষার্থী যাদের বাড়ি অনেক দূরে এবং ঢাকায় যাদের আত্মীয়-স্বজন নেই তাদের এই পরিস্থিতিতে কী অবস্থা হয়? তবে, জাহাঙ্গীরনগরে যারা পড়েন তাদের হয়তো কোনো না কোনোভাবে ঢাকায় থাকার একটা ব্যবস্থা হয়। কিন্তু খুলনা, পটুয়াখালী, দিনাজপুর কিংবা সিলেট এসব জায়গার উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হঠাৎ বন্ধ হওয়া আর হঠাৎ হল ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ এলে নারী শিক্ষার্থীদের মহা বিপদে পড়তে হয়। কাজেই কর্তৃপক্ষের বিষয়টি সুবিবেচনায় নিতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীরা, উন্মুক্ত জীবনের ছোঁয়া আর রাজনীতির ছত্রছায়ায় যেসব কাণ্ড ঘটাতে পারে এবং ঘটাচ্ছে তা যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন তাদের জানা। এসব শিক্ষার্থীরা ধরাকে সরা জ্ঞান করে, তোয়াক্কা করে না কাউকে। ক’দিন আগে আমরা দেখলাম সিলেট মেডিকেল কলেজের এক শিক্ষার্থীকে নিজ সংগঠনের সহপাঠীদের কাছে মূল্য দিতে হয়েছে! তারপরও আমরা এগুলোকে প্রশ্রয় দেই। দুদিন পর ভুলে যাই। কিন্তু একজন তরুণ মেধাবী শিক্ষকের এমন মৃত্যু সহজে ভোলা যায় না। অধ্যাপক সেলিম হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছেন। পত্রিকায় পড়েছি শক্তিশালী ছাত্র সংগঠনের কয়েকজন ছাত্র তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছিল, শিক্ষক হিসেবে তিনি তা মেনে নিতে পারেননি।

পত্রিকায় পড়ে জেনেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের লালন শাহ হলে ডাইনিং ম্যানেজার নির্বাচন নিয়ে কয়েকদিন ধরে ছাত্র নেতারা প্রভোস্ট ড. সেলিম হাসানকে চাপ দিচ্ছিলেন। ২৯ নভেম্বর দুপুরে নেতারা ওই শিক্ষকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং হুমকি দেন। ছাত্ররা এটি করেছে কারণ তারা জানে কেউ তাদের কিছু বলতে পারবে না। তাদের বিরুদ্ধে শিক্ষক কিংবা কর্তৃপক্ষের কিছু করার সাহস নেই। এখন প্রশ্ন হলো- উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এগুলো কি চলতেই  থাকবে?

আমার অবাক লাগে, দেশের শিক্ষা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দৈন্যদশা নিয়ে কোনো আলোচনা শুনি না। টেলিভিশনে বহু বিষয় নিয়ে রাতদিন টক-শো হয়, কিন্তু এ বিষয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। পত্রিকায় দেখলাম অধ্যাপক সেলিমের মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির দুজন তদন্তকাজ করতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। এখানেই তো অনেক রহস্য। হতে পারে উক্ত দুই শিক্ষক যে কালারের, মৃত্যুবরণকারী শিক্ষক সেই কালারের নন। অথবা, তারা যে রিপোর্ট দেবেন সেটি তারা যেভাবে চাইবেন সেভাবে দিতে পারবেন না। অথবা হতে পারে কোনো অজানা আঙুলের ইশারায় তারা তদন্তকাজ করতে চাচ্ছেন না। এভাবেই আমরা সত্যকে চাপা দিয়ে থাকি। চাপা দিতে দিতে পরিস্থিতি আজকের পর্যায়ে এসেছে।

ছাত্রজীবনে যেসব বন্ধুদের দেখেছি হকিস্টীক নিয়ে মারামারি করতে, আর পিস্তল হাতে নিয়ে সহপাঠীদের তাড়া করতে, তাদের দেখেছি চাকরির জন্য একই কাতারে এসে প্রতিযোগিতায় নামতে। কেউ হয়তো অন্য পথে হেঁটে সামান্য কিছু পেয়েছে কিন্তু বাকিরা কিছুই পায়নি। আরো একটি দুঃখজনক ও উদ্বেগের বিষয় হলো, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর এখন প্রকৃত অর্থে কোনো অভিভাবক নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ প্রতিষ্ঠান সৎভাবে, সঠিকভাবে চালাতে আসেন না, তারা আসেন অন্য কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য। তাই তাদের কাছ থেকে কোনো নিরপেক্ষ, সৎ ও সাহসী পদক্ষেপ বা ভূমিকা কেউ আশা করতে পারেন না; করেনও না। তাই এসব দুঃখজনক ঘটনার পরে তাদের বক্তব্য বা ভূমিকা নিয়ে কেউ আর মাথা ঘামান না। কারণ সবাই জানে তারা কিছুই করতে পারেন না। তবে, নিরীহ ছাত্রদের ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে তারা আবার পিছপা হন না।

এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে অবস্থা তাতে বর্তমান পদ্ধতিতে যেভাবে  ভিসি বা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোতে অধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হয় তার পরিবর্তন প্রয়োজন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, তাদের দ্বারা বর্তমান পরিস্থিতির শিক্ষা ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা সম্ভব নয় এবং হচ্ছেও না।  এই পদগুলো সাংবিধানিক পদের মতো চিন্তা করা প্রয়োজন যাতে তারা নিজেদের মতো কাজ করতে পারেন, এবং ইচ্ছে করলেই কেউ তাদের অপসারণ করতে পারবেন না। প্রচলিত পদ্ধতিতে কোনো শক্তিশালী ছাত্র সংগঠন যদি গরম গরম দু’একটা মিছিল করে, চোখ রাঙিয়ে কথা বলে তাহলেই দেখা যায় এসব প্রতিষ্ঠান প্রধানদের গদি টলমলে হয়ে যায়। এর সুরাহা হওয়া উচিত। কারণ আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এভাবে পেশী শক্তি প্রদর্শনের মহরা চলতে দেওয়া যায় না। মেধাবী শিক্ষার্থীদের দেশে প্রকৃত উচ্চশিক্ষার পরিবেশ আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু অসৎ, দলকানা, মেরুদণ্ড শক্ত নয় এমন ভিসি দিয়ে তা হবে না। 

লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক
 

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়