ঢাকা     শুক্রবার   ০১ জুলাই ২০২২ ||  আষাঢ় ১৭ ১৪২৯ ||  ০১ জিলহজ ১৪৪৩

বাংলাদেশ ক্রিকেটে পঞ্চপাণ্ডবের প্রভাব

সালেক সুফী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:১৬, ১০ মে ২০২২   আপডেট: ১৩:১৬, ১০ মে ২০২২
বাংলাদেশ ক্রিকেটে পঞ্চপাণ্ডবের প্রভাব

বাংলাদেশ ক্রিকেটে তথাকথিত পঞ্চপাণ্ডবের অবদান কী, সেটা ক্রিকেট অনুরাগী কোটি মানুষের কাছে বিস্তারিত বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না। ১৯৭২-৭৩ এ হামাগুড়ি দেওয়া বাংলাদেশ ক্রিকেটের এখন সোনালি কৈশোর। যদিও সব ফরম্যাটে অর্জন আকাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলব না, তবে অর্জনটাও কম বলা যাবে না। ১৯৯৭-২০২২ এর মধ্যে যা কিছু অর্জন হয়েছে, তার একটি বড় অংশজুড়ে অবশ্যই বর্তমান পাঁচ তারকার কারো না কারো অবদান আছে। এর বাইরে হয়তো মোহাম্মদ আশরাফুল, মোহাম্মদ রফিক, মোস্তাফিজের নাম উচ্চারিত হতে পারে।

কোনো একটি দেশের ক্রিকেটের টেকসই উন্নয়ন আর ধারাবাহিক সাফল্যের জন্য মানসম্পন্ন ক্রিকেটারদের ক্রমাগত উত্থান ও বিকাশ না হওয়ার কারণে এই ধরনের তারকারা এক সময় পাণ্ডবে পরিণত হন। তাদের পারফরম্যান্স দিয়ে চ্যালেঞ্জ করার মতো তরুণরা সুযোগ পান না বা তাদের পরিমার্জন করে গড়ে তোলা হয় না। ফলশ্রুতিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বা শ্রীলঙ্কার মতো পরিণতি হয়, অস্ট্রেলিয়া বা ভারত হতে পারে না দেশগুলো। বাংলাদেশ কোন পথে সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।

মাশরাফি মুর্তজা, মাহমুদউল্লাহ, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান- এই পাঁচ তারকা ক্রিকেটারকে কে প্রথম পঞ্চপাণ্ডব নাম দিয়েছেন, ক্রিকেট অনুরাগীরা গবেষণা করতে পারেন। কিন্তু এটি স্বীকার না করলে ভুল হবে, দেড় দশক ধরে বাংলাদেশ ক্রিকেটের যা কিছু অর্জন তার মূলে এই পাঁচ তারকা ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত বড় ভূমিকা আছে। যদি একটি প্রচণ্ড ঝড়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্যতম তারকা মোহাম্মদ আশরাফুল ঝরে না পড়তেন, তাহলে হয়তো অর্জনের পালা আরো বিস্তৃত হতো।

সেই যে ২০০৭ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ঐতিহাসিক জয় দিয়ে ওদের উত্থান, তার সর্বশেষ সমিল্লিত উল্লাস ছিল ২০১৯ বিশ্বকাপ। যদিও সেটি ছিল শারীরিকভাবে শতভাগ ফিট না থাকা কিংবদন্তি অধিনায়ক মাশরাফির গোধূলিবেলা। অনেকে বলেন টুর্নামেন্টের মাঝপথে তাকে বিশ্রাম দিয়ে আবু জায়েদ রাহীকে খেলানোই অধিক ফলদায়ক হতো।

ঘটনাটির কথা এই কারণে উল্লেখ করছি যে এর পর থেকে এযাবত ওই পাঁচ জন আর কখনো একসঙ্গে বাংলাদেশের হয়ে খেলেননি। মাশরাফি অনেকটা অলিখিতভাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নিয়েছেন। কিছুটা অবহেলার প্রতিক্রিয়ায় মাহমুদউল্লাহ টেস্ট ক্রিকেট থেকে নিয়েছেন অবসর। তামিম আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে স্বেচ্ছায় নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। সাকিব নানা কারণে বেছে খেলছেন, নিজের ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে। বাকি রইলেন মুশফিক।

আমি কানাঘুষায় কান পাতি না। তবু জানি সেই চন্ডিকা হাথুরুসিংহের জামানা থেকেই মাশরাফি, তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহকে নিজেদের বিদায়ের পথ বেছে নেওয়ার দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ক্রিকেটসংশ্লিষ্ট একটি মহল চাইছিল তারা যেন নিজে থেকেই নিজেদের গুটিয়ে ফেলেন।

২০১৯ থেকেই বাংলাদেশ শিবিরে গুমোট ধোঁয়াশা ছিল। ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সিনিয়র খেলোয়াড়দের কারো কারো সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়েছিল। মাশরাফির মতো কিংবদন্তি ক্রিকেটার অনেকটা অবহেলায় চলে গেলেন। মাহমুদউল্লাহর মতো নিবেদিত ক্রিকেটার একটু অভিমানী সিদ্ধান্তই নিলেন টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে। তামিম টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন অভিমান করেই বলব। সাকিবের বিশাল প্রভাবের কাছে ব্যবস্থাপনা অনেকটা অসহায়। অবশ্য চৌকষ অবদানের জন্য সব ফরম্যাটের দলে তার অবস্থান অপরিহার্য এখনও। কিন্তু নিবেদনে ঘাটতি আছে। ক্রিকেটের বাইরে নানা কাজে জড়িত আছেন সাকিব। পর্যাপ্ত যত্ন নিলে মেহেদী মিরাজ, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনকে বিকল্প হিসাবে বিকশিত করা যেত। কিন্তু করা হয়নি ব্যবস্থাপনার দূরদর্শিতার অভাবে।

বাকি রইলেন মুশফিক। বাটিংয়ে লিটন, উইকেটকিপিংয়ে নুরুল হাসান সোহান এই মুহূর্তে মুশফিকের বিকল্প হতে পারেন। কিন্তু দুজনকে যোগ করে এখনও কেউ মুশফিককে সব ফরম্যাটে প্রতিস্থাপন করতে পারেন বলে মনে করি না। মুশফিক যদিও নিজের সেরা ফর্মে এখনও নেই, তবুও তার ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা এখন যথাযথ মনে করি না। তবে নিজের স্বার্থেই মুশফিক টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর অন্তত একটি ফরম্যাট থেকে গুটিয়ে গেলে ভালো করবেন। একইভাবে ২০২৩ বিশ্বকাপের পর থেকে তামিম, মুশফিক সাদা বলের ক্রিকেটকে বিদায় জানানোই ভালো হবে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশ ক্রিকেট তারকাদের প্রাপ্য সম্মান প্রদান করে না। অনেক তারকা খেলোয়াড়কেই অযত্ন অবহেলায় বিদায় নিতে হয়েছে। অনেকের ক্ষেত্রই বিদায়ী ম্যাচ করা যেত, করা হয়নি। বাংলাদেশের ক্রিকেট সংস্কৃতি গড়ে উঠেনি। ক্রিকেটের স্বার্থেই এটি হওয়া উচিত।

চোখ মেললেই দেখবেন ম্যাকগ্রা, ওয়ার্ন, গিলক্রিস্ট, হেইডেন, ল্যাঙ্গার, পন্টিং মোটামুটি স্বল্প বিরতিতে চলে গেলেও শূন্যতা আসেনি অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে। একইভাবে শেবাগ, গাঙ্গুলি, শচীন, লক্ষ্ণণ চলে গেলেও ঝরে পড়েনি ভারত। আবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্বর্ণযুগের পর ওদের ক্রিকেট মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। একই অবস্থা অনেকটা শ্রীলঙ্কার। ঠিক এই মুহূর্তে পঞ্চপাণ্ডবের টিকে থাকা ৪ জন বিদায় নিলে এমনিতেই নড়বড়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট হালে পানি পাবে না। ব্যর্থতা যে ব্যবস্থাপনার সেটি আর বলার প্রয়োজন আছে কি?

লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ক্রিকেট বিশ্লেষক।

ঢাকা/ফাহিম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়