ঢাকা     শনিবার   ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ২১ ১৪২৯

রুশরা সত্যিই কি ভাবছে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে? 

অদিতি ফাল্গুনী || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:০২, ১১ নভেম্বর ২০২২   আপডেট: ১৬:০১, ১২ নভেম্বর ২০২২
রুশরা সত্যিই কি ভাবছে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে? 

ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন মোটামুটি এই প্রত্যয় থেকে যে, যেন-বা ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে রুশ বাহিনীর বিজয়ের একটি পুনঃচিত্রায়ণ সংঘটিত হতে যাচ্ছে, তার বাহিনী কিয়েভের ভেতর দিয়ে মার্চপাস্ট করে চলবে এবং পুতিন, ঠিক স্ট্যালিনের মতো রেড স্কোয়ারে দাঁড়িয়ে সেই প্যারেড প্রত্যক্ষ করবেন। অবস্থাদৃষ্টে এখন তেমনটাই মনে হচ্ছে যে, পুতিন যেন সেই ১৯৪১-এর সময় ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছেন- নাজি জার্মানির বিরুদ্ধে রুশদের মহান দেশপ্রেমিক যুদ্ধের যে নাটকীয় সূচনা হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই তিনি সব কিছু শুরু করতে চেয়েছেন বা চাইছেন। 

এটাই মূলত ক্রেমলিনের মূল পরিকল্পনার তৃতীয় সংস্করণ। প্রথম পরিকল্পনাটি ছিল ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমে কিইভ দখল করা যা প্রথম মাসেই ব্যর্থ হয়ে যায়। শুরুতে অনিবার্যভাবে আক্রমণাত্মক মনে হলেও, পরিকল্পনার দ্বিতীয় সংস্করণ গ্রীষ্মেই অচল হয়ে পড়ে এবং ইউক্রেনের পাল্টা আক্রমণের সাফল্যের মুখে সেপ্টেম্বরের শুরুতেই বাতিল হয়ে যায়। পরিকল্পনার তৃতীয় সংস্করণমাফিক, রুশ মাতৃভূমি বিপদে পতিত হিসেবে ইতোমধ্যে ঘোষিত হয়েছে এবং শত শত হাজার হাজার রুশ পুরুষকে যুদ্ধে যোগদানের জন্য ডাকা হচ্ছে। গত ২১শে সেপ্টেম্বর পুতিন কর্তৃক ঘোষিত ‘আংশিক সেনা সংযোজনী‘-কে অনেকটা জোর করে করা বলে মনে হয়েছে যা ইতোমধ্যেই রুশী সমাজে স্বার্থ ও আনুগত্যের ভারসাম্য বিনষ্ট করছে যেখানে কিনা যুদ্ধ নিয়ে সাধারণ মানুষের ভেতর প্রতিক্রিয়া খুবই মিশ্র। 

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কিছু জনমত জরিপ অনুযায়ী (এসব জরিপের ভেতর জরিপ পরিচালনায় শীর্ষস্থানীয় সংস্থাদের অন্যতম হিসেবে পরিচিত লেভাডা সেন্টার পরিচালিত জরিপও আছে যাদের মস্কোয় অফিস আছে) দেখা যাচ্ছে- রুশদের ভেতর ৭০-৭৫ শতাংশ মানুষ ইউক্রেনে যুদ্ধকে সমর্থন করেন। এই জরিপগুলো অবশ্য পুতিন নতুন করে ‘সেনা সংযোজনী‘ ঘোষণার আগেই পরিচালিত হয়েছিল। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক রুশ যুদ্ধ সমর্থন করেন বলে জরিপে যা দেখা যাচ্ছে, সেই শতাংশ হার বাস্তবে সত্য নাও হতে পারে। দেশমাতৃকার ঘোষিত যুদ্ধের বিরোধিতা করলে ফৌজদারি অপরাধের দায়েও একজন নাগরিক অভিযুক্ত হতে পারেন। সুতরাং এই যুদ্ধ এবং পুতিনের নেতৃত্বের বিরোধিতাকারীরাও জনমত জরিপকারীদের কাছে প্রাণ খুলে মনের কথাটি বলবেন বলে আশা করা যায় না। ফলে জরিপে যা আসছে সেটি তির্যক বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে এবং যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থনের হার বহুগুণ বাড়িয়ে দেখাচ্ছে।  

এই যুদ্ধ-সমর্থক সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার প্রকৃতি এবং গঠন বুঝতে হলে, আপনাকে আরো গভীরে যেতে হবে। ‘দ্য রাশিয়ান ফিল্ড গ্রুপ‘ নামে একটি স্বাধীন জনমত জরিপ সংস্থা পরিচালিত জরিপের কিছু অতিরিক্ত প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে, যদিও রুশ জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ নিরেট ভাবে যুদ্ধের পক্ষে, ১৫ শতাংশ মানুষ যুদ্ধ সমর্থন করলেও তাদের এ প্রসঙ্গে কিছু ‘কিন্তু’ রয়েছে এবং আরো ২০ শতাংশ মানুষ যুদ্ধ সমর্থন করলেও তারা মনে করেন যে, সবচেয়ে ভালো হতো যদি যুদ্ধটা কখনোই না হতো। রাশিয়ায় জনমত গঠনে প্রধান নিয়ামক গণমাধ্যম বা ‘রুশ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন‘ এ ধরনের দর্শকের মনোভাব গঠনে কাজ করে থাকে। 

যুদ্ধ নিয়ে মোটা দাগে দু‘টো প্রধান আলাপ এখন রাশিয়ার বাতাসে চালু বা ঘুরছে-ফিরছে। একটি হলো ‘সবজান্তা টক-শো অতিথিদের‘ মুখে প্রচারিত বক্তব্য যে ‘বিশেষ অভিযান‘ পশ্চিমের সাথে রাশিয়ার সামগ্রিক এবং অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ এবং পশ্চিম রাশিয়াকে নরকে পাঠাতে বা ধ্বংস করতেই চাচ্ছে। এই সর্বনাশা আখ্যান ইউক্রেনকে আরেকটি মহাযুদ্ধের এলাকা হিসেবে সবার কাছে প্রতীয়মান করে। দ্বিতীয় আখ্যানটি, বিভিন্ন সংবাদ নির্ভর অনুষ্ঠানে যেমন দেখায়, বারবারই এই কথাটিতে জোর দিচ্ছে যে, ইউক্রেনে পরিচালিত এই ‘বিশেষ সামরিক অভিযান‘ খুবই পেশাদার সেনানায়কদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে যাতে দনবাস ও অন্যান্য পার্শ্ববর্তী এলাকার রুশদের মুক্ত করা যায়। দুর্দশাগ্রস্ত রুশদের সাহায্য করার জন্য রুশদেরই অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবে এই ‘ন্যায়যুদ্ধ‘কে দেখানো হচ্ছে। 

রুশদের ভেতর যুদ্ধের সমর্থকদের ভেতর রয়েছে মূলত তিন শ্রেণির মানুষ। এক পক্ষ সম্পূর্ণ বা সর্বাত্মক যুদ্ধের পক্ষে এবং পশ্চিমের সাথে একটি মীমাংসামূলক সংঘর্ষে যেতে চায়; দ্বিতীয়পক্ষ ‘রুশদের রক্ষা করার দায়িত্ব‘ নামক পতাকার নিচে সমবেত হয়ে বিশ্বাস করছে যে রাশিয়া একটি ন্যায়যুদ্ধ লড়ছে। তৃতীয় পক্ষটির অধিকাংশ মানুষ যদিও সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করছে, তবে সেটা মূলত তারা পুতিন ও তার সমর্থকদের ক্রুদ্ধ করার ঝুঁকি নিতে চান না বলেই। প্রথম পক্ষটি যুদ্ধকে তীব্র আবেগের সাথে সমর্থন করছেন যেহেতু তারা বোধ করেন যে শত্রু ইতোমধ্যেই রাশিয়ার দরজায় সজোরে কড়া নাড়ছে; অন্য দুই পক্ষ বিপদকে এখনো বহু দূরে দন্ডায়মান হিসেবেই প্রত্যক্ষ করছেন। 

গত ২১শে সেপ্টেম্বর সেনা সমাবেশে পুতিন বক্তৃতায় শত্রু ঘাড়ের কাছে শ্বাস ফেলছে এবং সেজন্যই মাতৃভূমিকে রক্ষার প্রয়োজনে রুশ নাগরিকদের সর্বাত্মক যুদ্ধে অংশ নেবার মতো সব শব্দালঙ্কার ব্যবহার করেন। অনেক বিশ্লেষকই পুতিনের এই বক্তৃতার পরিপ্রেক্ষিতে জানিয়েছেন যে পুতিনের বক্তৃতায় ব্যবহৃত এ জাতীয় শব্দালঙ্কার যুদ্ধের পক্ষে ভঙ্গুর জনসমর্থনকে আরো দুর্বল করবে। তবে এ বিষয়ে আমি বিশ্লেষকদের একটু সতর্ক মনোভাব ব্যক্ত করতে বলবো। জনগণের অনুভূতিকে কতটা দক্ষতার সাথে পক্ষে আনা যায়, সে বিষয়ে পুতিনের আছে দীর্ঘ সাফল্যের খতিয়ান। যুদ্ধের সমর্থক শিবিরের অধিকতর জঙ্গি পক্ষটির পাশে থেকে (যারা দীর্ঘদিন হয় বাড়তি সেনা সমাবেশের দাবি করে আসছেন) পুতিন কিন্তু এতদিন যারা যুদ্ধের পক্ষে সর্বাত্মক সমর্থন দেবে কিনা এমন দ্বন্দ্বে ভুগছিলেন, তাদের বাধ্য করতে পারেন যে কোনো একটি পক্ষ নিতে এবং এভাবেই সমাজের মেরুকরণও ঘটাতে পারেন। এটুকু হিসাব তিনি করতেই পারেন যে, ইউক্রেনে রুশ জনতার অধিকতর (যদিও সীমিত মাত্রায়) হারে সংযুক্তি সব রুশ নাগরিককেই তাদের উর্দি পরিহিত ছেলেদের আরো জোরের সাথে সমর্থন দানে বাধ্য করবে। এর ফলে যেসব পরিবারের সদস্যরা যুদ্ধে যাচ্ছে এবং যারা সীমান্তের উদ্দেশ্যে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে দৌড়াচ্ছে অথবা যুদ্ধকে অভিশাপ দিচ্ছে তাদের ভেতরেও বিভাজন সৃষ্টিতে সক্ষম হবে। 

তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখলে এই বিভাজন সৃষ্টি কাজে দেবে। শিক্ষিত ও বিত্তশালী, মুখ্যত নগরবাসী অংশটি সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তির হাত এড়াতে পালাচ্ছে। সমাজের তুলনামূলক অস্বচ্ছল অংশের যুবকেরাই সেনা নিযুক্তি শিবিরগুলোয় গিয়ে নাম লেখাচ্ছে। এই তরুণেরা ভীত ও উদ্বিগ্ন হতে পারে, যুদ্ধ করতে ততটা আগ্রহীও না হতে পারে, তবে তারা এক কল্পিত ‘জাতীয় সংস্থা‘ থেকে ছুটে পালাতে চায় না যার আশা-আকাঙ্খা তাদের স্বপক্ষের মানুষ হিসেবে পুতিন ব্যক্ত করেন। সৈন্য হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য তাদের পরিপূর্ণ সিদ্ধান্ত যুদ্ধবিমুখ জনতার প্রতি বৈরীতা বাড়াবে। বরং স্বপক্ষত্যাগীদের দেশত্যাগ অধিকতর বিশ্বস্ত এক জাতির জন্ম দেবে যারা মাতৃভূমির জন্য কোনো দ্বিধা ছাড়াই লড়াই করবে এবং শহীদ হবে। 

বাস্তবে অবশ্য সেনাবাহিনী ঢেলে সাজানোর এই বিষয়টি পুতিনের সব হিসাবকে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা, রাষ্ট্রযন্ত্রের দক্ষতা এবং জাতীয় জীবনের বৃহত্তর লক্ষ্যের প্রতি নিবেদন খর্ব করেছে। এভাবেই এই সেনা সংযোজনীর মাধ্যমে পুতিন বরং যেভাবে রাশিয়ার একতা ও জাতীয়তাবোধের ধারণাকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন, তার মাহাত্ম্যকেই বরং ছোট করেছে। এর প্রথম কারণ হলো এই সেনা সমাবেশের ঘোষণা বড় বেশি দেরিতে করা হয়েছে, যখন কিনা রুশ সেনাবাহিনী ইতোমধ্যেই ইউক্রেনীয় বাহিনীর হাতে পরাভূত হচ্ছিলো। অন্য কারণটি হলো পুতিনের হাতে গড়ে তোলা কেন্দ্রীভূত প্রশাসন যন্ত্রই দেখিয়েছে জরুরি অবস্থায় এই প্রশাসন যন্ত্রকে কাজে লাগাতে কতটা সংগ্রাম করতে হয়। কারণ এই প্রশাসন যন্ত্র দুর্নীতি ও তোষামোদি দিয়ে নির্মিত, দক্ষতার ভিত্তিতে নয়।      

সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করলে, এই যুদ্ধের ফলাফল যুদ্ধ সমর্থক এবং যুদ্ধের প্রতি অনুগতদের মনোভাবের উপর নির্ভর করবে। এর কারণ হচ্ছে যুদ্ধের সবচেয়ে প্রবল সমর্থক তথা প্রবক্তারা এবং সুকঠিন যুদ্ধ বিরোধীরা- এই দুই পক্ষের কেউই তাদের হৃদয়ের পরিবর্তন ঘটাবে না। এ জন্যই দাগেস্থান এবং ইয়াকুতিয়ায় সংগঠিত সেনা সমাবেশের সৈন্যদের আত্মীয়রা যতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পেরেছে সেটা মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবুর্গে যুদ্ধ-বিরোধী কর্মীরা করতে পারেনি। এই যুদ্ধের বৈধতাপ্রদানকারী আখ্যান যত বেশি তীব্র হবে, ততই ব্যয় বাড়বে এবং সেনা সমাবেশের ব্যবস্থাপনা তত বেশি ফলহীন বা নৈরাশ্যজনক হবে এবং তখন যুদ্ধের পক্ষে গঠিত ঐক্যমত্যের ভীতেও ফাটল ধরবে। সেনা সমাবেশের প্রচারণা অভিযানের গোলমেলে সূচনার পরও এমন হবার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। তবে ফাটল যে ধরেছে বা ফাটল ধরাটা অনিবার্য সেটা এখনি বলাটা বড্ড বেশি তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে এবং দায়িত্বহীন শোনাবে। 

মূল: কিরিল রোগোভ। তিনি রুশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাংবাদিক ও লেখক। লেখাটি গত ৮ অক্টোবর, ২০২২ তারিখে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে। ভাষান্তর করেছেন অদিতি ফাল্গুনী 
 

/তারা/ 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়