ঢাকা, রবিবার, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো চরিত্র হারিয়েছে : সাক্ষাৎকারে আলাল

আরিফ সাওন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-০৩ ১০:৫৪:৩৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-০৪ ৮:২৬:২৮ এএম
ছবি : শাহীন ভূঁইয়া

রাষ্ট্রের সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, সাংবিধানিক চরিত্র হারিয়ে দলীয় অনুগত চরিত্র ধারণ করেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আওয়ামী লীগের দখলমুক্ত করতে না পারলে রাষ্ট্রীয় চরিত্রের পরিবর্তন হবে না।

দেশের চলমান অস্থির পরিস্থিত থেকে পরিত্রাণ প্রসঙ্গে নিজ বাসায় বসে রাইজিংবিডিকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এমনটাই বলেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ‌্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল।

তিনি বলেন, ‘পরিত্রাণের সর্বোত্তম এবং প্রধান পদক্ষেপ সেটা হতে হবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গুলো, সেগুলোর মালিকানা, যেগুলো সরাসরি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ, সেই ধরনের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গুলোকে আওয়ামী লীগের দখলমুক্ত করতে হবে। প্রায় সমস্ত প্রতিষ্ঠান। হাতে গোনা কয়েকজন সচেতন ব্যক্তিত্বরা বাদে প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানের সাংবিধানিক চরিত্র হারিয়ে দলীয় অনুগত চরিত্র ধারণ করেছে। সেটা নির্বাচন কমিশনে হোক, আইন কমিশনে হোক, সেটা এমনকি দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় বিচার বিভাগেরও কিছু অংশ অতিউৎসাহী অংশ এবং যতগুলো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এরকম আছে। এই দলীয় আনুগত্যের আবরণ সরাতে না পারলে, কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে, প্রাণহানি সংঘর্ষ অভ্যুত্থান বিপ্লব অনেক কিছু হতে পারে। রাষ্ট্রীয় চরিত্রের পরিবর্তন হবে না।’

রাষ্ট্রীয় চরিত্রের পরিবর্তন করতে হলে, মেধাভিত্তিক এবং সততার ভিত্তিতে এ প্রতিষ্ঠানগুলির মূল কর্ণধার যিনি, তিনিসহ তার সহযোগীদের নিয়োগ দিতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটা হচ্ছে জাতীয় জীবনের সবচাইতে বড় সমস্যা। কারণ লুটপাট, অনৈতিকতা, চরিত্রহীনতা, সম্পদের পাহাড় গড়ার প্রতিযোগিতা সবকিছু মিলে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যক্তিগত চরিত্রের আদলে দিন দিন লালন করা হচ্ছে। এগুলো জাতির জন্য ভয়ঙ্কর।’

বর্তমান বাংলাদেশ তাদের কাছে সম্পূর্ণ অচেনা উল্লেখ করে যুবদলের এই সাবেক সভাপতি বলেন, ‘এই স্বপ্ন নিয়ে তো আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করিনি। বর্তমানে বাংলাদেশ আমাদের কাছে অচেনা। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি, আমরা যারা ১৯৭৫ দেখেছি, ১৯৮১ দেখেছি, আমরা ’৯০ দেখেছি। পরবর্তী অধ্যায়গুলো দেখেছি, এক এগারো দেখেছি-তাদের কাছে এ বাংলাদেশ সম্পূর্ণ অচেনা।’

তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী তো ধর্ষণ করেছে- প্রাপ্ত বয়স্ক নারীদের। এখন ধর্ষিত হচ্ছে আমাদের শিশুরা। পাঁচ বছর, আড়াই বছর, তিন বছরের শিশু, ৮০ বছরের বৃদ্ধারা; ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে।’

প্রত্যেকটি জায়গায় সরকারের লোক উল্লেখ করে মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘আপনি দেখেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যে আজকে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ-যত ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে-একটি প্রতিষ্ঠানেও নির্বাচন হচ্ছে না। সরকারের কোলে বসে থাকা লোকগুলোই যেনতেন করে এগুলোর প্রতিনিধিত্ব করছে। আন্ডার ইনভয়েসিং ওভার ইনভয়েস করে তারা লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছে। আর সরকারি দলে তহবিল জোগান দিচ্ছে, চাঁদা দিচ্ছে।’

প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘তার অর্থ কী? মানে পুরো দেশটাকে একটা পারিবারিক সম্পত্তির মত বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এর থেকে উত্তরণ পেতে হলে এই ধরনের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে একটা বড় ধরনের সার্জারি ছাড়া এর থেকে বের হওয়ার রাজনৈতিক উপায় আছে বলে আমি মনে করি না। রাজনীতি এখানে সহযোগী হিসেবে কাজ করতে পারে। মূল টার্গেট থাকবে যে এটাই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে। শুধু প্রতিষ্ঠান গুলোতে দুর্নীতিবাজ তাই না, তাদের নৈতিক চরিত্রেরও অধঃপতন ঘটেছে। ’

সরকারের উন্নয়নের সমালোচনা করে আলাল বলেন, ‘আপনি দেখেন এই সরকার বলেছে-দেশকে বানাবো সিঙ্গাপুর; কিন্তু প্রশাসনে থাকা লোকেরা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান থাকা লোকেরা, তাদের নৈতিক চরিত্রের অধঃপতন ঘটিয়ে সেই সিঙ্গাপুরকে বানিয়ে ফেলেছে জামালপুর; যেমন- জামালপুরের ডিসি। সিঙ্গাপুরকে বানিয়ে ফেলেছে তারা ফরিদপুর; যেমন-ফরিদপুরের পর্দাকাণ্ড। এই সিঙ্গাপুরকে তারা বানিয়েছে রূপপুর; যেমন- বালিশকাণ্ড। এই সিঙ্গাপুরকে তারা বানিয়েছে দিনাজপুর; যেখানে হাজার হাজার টন পাথর কয়লা খেয়ে ফেলেছে। এগুলো তো কখনো বাংলাদেশের মানুষ শোনেওনি, কল্পনাও করেনি। আর সেইটার বিচার প্রক্রিয়া- তদন্ত এত ধীরে চলেছে, সেটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’

সাংবিধানিক পরিবর্তনগুলোর করার জন্য জাতীয় নেতৃত্ব প্রয়োজন উল্লেখ করে বিএনপির এই যুগ্ম মহাসচিব বলেন, ‘আন্দোলন-সংগ্রাম তো করতেই হবে। এই সাংবিধানিক পরিবর্তনগুলোর করার জন্য যে জাতীয় নেতৃত্ব প্রয়োজন, সেই নেতৃত্ব তো আর প্রতিষ্ঠানগুলোতে নেই। নেতৃত্ব আছে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সম্পন্ন মানুষদের মাঝে, সেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সম্পন্ন মানুষদের মধ্যে অপূর্ণতা, আপনি যেটা দেখেছেন বাংলাদেশে যত আন্দোলন হয়েছে, ৭১ থেকে শুরু করে একদম এরশাদ বিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত কিংবা এক-এগারো পরবর্তী রাজনৈতিক সরকার আসার যে প্রেক্ষিতে তৈরি হয়েছিল, সেখানে রাজনীতিকদের পাশাপাশি বিশিষ্টজনরা সমাজ নিয়ে যারা চিন্তা করে তারা, সাংবাদিকরা, বুদ্ধিজীবীরা- এক কথায় দেশের সচেতন জনগোষ্ঠী যারা তাদেরও অংশগ্রহণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দুটো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। ’

তিনি বলেন, ‘সেটা রাস্তায় হতে পারে, বিভিন্ন আঙ্গিকে হতে পারে। সভা-সেমিনার, ঘেরাও-অনশন। নানা কর্মসূচির মাধ্যমে হতে পারে। তবে মূল শক্তিটা আসবে যে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে। তার জন্য উপযুক্ত রাজনৈতিক দল হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল।’

চলমান পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন‌্য বিএনপির আন্দোলনের প্রস্তুতি রয়েছে উল্লেখ করে আলাল বলেন, ‘বিএনপির কর্মসূচি তো করেই যাচ্ছে। ঘরে-বাইরে দুদিকেই সমান তালে। বাংলাদেশের ইতিহাস বলে এবং এই দেশের মাটির যে বৈশিষ্ট্য চরিত্র তাতে দেখা যায় যে, এই বিস্ফোরণের যে অবস্থা, সে অবস্থা কখনো দিন তারিখ ঘোষণা করে কিংবা আগাম বলে দিয়ে হয় না। যেমন ২৭ নভেম্বর ডা. মিলনের মৃত্যু না হলে এরশাদ পতনের আন্দোলনে অত জনস্রোত নাম তো ওই সময় এটা কিন্তু কোনো ব্যাকরোলে মেলে না। সুতরাং ওই ধরনের প্রস্তুতি তৈরির জন্য যে যে ধরনের উপাদান সেগুলো বিএনপি'র মধ্যে রয়েছে।’

বিএনপি'র কিছু কিছু নেতাদের যে পিছুটান আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যে ভীতিটা আছে এই ভীতির পর্দাটাকে সরিয়ে ফেলতে হবে। যদি তারা না সরান, সেখানে পরবর্তী স্তরে নেতৃত্ব এসে এই ভীতির পর্দা ছড়িয়ে যখন নামতে পারবে তখনই এ আন্দোলনের মূল কর্মকাণ্ড শুরু হবে।’


ঢাকা/সাওন/সনি/নাসিম

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন