RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     শুক্রবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ২০ ১৪২৭ ||  ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২

শসা চাষ পাল্টে দিয়েছে ২৮ গ্রামের চিত্র

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:১৪, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
শসা চাষ পাল্টে দিয়েছে ২৮ গ্রামের চিত্র

চারদিকে সবুজের সমারোহ। রাস্তার পাশে বিস্তীর্ণ বিলজুড়ে শসা খেত। ঘেরের পাড় বা আইলে সারি সারি মাচায় ঝুলছে শসা আর শসা। শসা চাষ পাল্টে দিয়েছে ২৮ গ্রামের চিত্র।

রূপসা উপজেলার একটি গ্রাম আনন্দনগর। এ গ্রামে রয়েছে ছোট-বড় অনেক মাছের ঘের। একসময় এসব ঘেরের পাড়ে কোনো ফসল চাষ করা হতো না। পতিত থাকত। এখন এসব মাছের ঘেরের পাড়ে শসা চাষে এ গ্রামের কৃষকের জীবনে এসেছে আর্থিক স্বচ্ছলতা, হয়েছেন স্বাবলম্বী। শসা চাষ করে বেকার সমস্যার সমাধানের পথও খুঁজে পেয়েছেন অনেকে।

রূপসা কৃষি অফিসের সূত্র জানায়, এ উপজেলার দুর্জনীমহল, ডোমরা, চন্দনশ্রী, ভবানীপুর, পেয়ারা, জাবুসা, আমদাবাদ, দেবীপুর, নৈহাটী, সামন্তসেনা, তিলক, খাজাডাঙ্গা, স্বল্পবাহিরদিয়া, আলাইপুর, পুটিমারি, আনন্দনগর, পিঠাভোগ, গোয়ালবাড়ির চর, সিঁন্দুরডাঙ্গা, নারিকেলী চাঁদপুর, ডোবা, বলটি, নতুনদিয়া, ধোপাখোলা, গোয়াড়া, শিয়ালী, চাঁদপুর ও বামনডাঙ্গা গ্রামের মাছের ঘেরের পাড়ে প্রায় ৪০০ হেক্টর জমিতে এ বছর শসা চাষ হয়েছে।

আনন্দনগর গ্রামের শসাচাষি মুরাদ লস্কর জানান, এ বছর তিনি ৫০ শতক ঘেরের পাড়ের জমিতে টাকি নামের হাইব্রিড জাতের শসা চাষ করেছেন। তিনি শ্রাবণ মাসের মাঝামাঝি ঘেরের পাড়ে দুই হাত দূরে দূরে গর্ত/মাদা করে শসা বীজ বপন করেন। বীজ বপনের দেড় মাস পর থেকে শসা সংগ্রহ শুরু করেছেন। গ্রামের আড়তে পাইকারি বিক্রেতার কাছে তিনি প্রতি মণ শসা ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। তার এই ৫০ শতক ঘেরের পাড়ের জমিতে শসা চাষ করতে ৭০-৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তিনি এ পর্যন্ত ২৫ হাজার টাকার শসা বিক্রি করেছেন। ঘেরের পাড়ের এ জমি থেকে আরো দেড় লাখ টাকার শসা বিক্রি করতে পারবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করছেন।

একই গ্রামের কৃষক জুম্মান লস্কর। তিনিও এ বছর ঘেরের এক বিঘা (৩৩ শতক) জমিতে গ্রিন লাইন জাতের শসা চাষ করেছেন। এতে তার খরচ হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। তিনি এ পর্যন্ত ১৫ হাজার টাকার শসা বিক্রি করেছেন এবং আরো ৩০ হাজার টাকার শসা বিক্রি করতে পারবেন বলে জানান।

মুরাদ লস্কর ও জুম্মান লস্কর ছাড়াও আনন্দনগর গ্রামের চাঁন মিয়া, সানু লস্কর, ইমতিয়াজ লস্কর, আবু সালেহ, লাবলু লস্কর, বনি আমিন, আব্দুর রহমান গাজী ও জাবের লস্করসহ শতাধিক কৃষক মাছের ঘেরের পাড়ে হাইব্রিড জাতের শসা চাষ করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন।

এলাকার কৃষকরা আরো জানান, মাছের ঘেরের পাড়ে শসা চাষ করে ধান ও মাছের পাশাপাশি জমি থেকে একটা বাড়তি ফসল পাওয়া যায়। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত শসা বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায়। ঘেরের পাড়ের মাটি বেশ উর্বর। এতে চাষকৃত শসা গাছ চারদিক থেকেই সূর্যের আলো পায়। এতে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন ভালো হয়। সাধারণত মাছের ঘেরের পাড় উঁচু হয়। তাই বৃষ্টির পানি দ্রুত সরে যায়। এ কারণে বর্ষাকালে ঘেরের পাড়ে খুব সহজে শসা চাষ করা যায়। ঘেরের ভেতর পানির ওপর মাচা তৈরি করে সেখানে শসা চাষ করায় বাড়তি জায়গা লাগে না। ঘেরের পাশে পানি থাকায় শসা গাছে পানি সেচ দিতে সুবিধা হয়। তাছাড়া, ঘেরের পাড়ের শসা গাছের পরিচর্যা করতেও সুবিধা হয়। বসতবাড়ি কিংবা মাঠের চেয়ে ঘেরের পাড়ে শসা চাষ করে অধিক ফলন পাওয়া যায়। অন্য ফসলের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি লাভ হওয়ায় ঘেরের পাড়ে শসা চাষের দিকে ঝুঁকছেন এখানকার কৃষকরা। এছাড়া ধানের তুলনায় শসা চাষে ২/৩ গুণ বেশি লাভ হয়। অল্প পুঁজিতে লাভ বেশি হওয়ায় ঘেরের পাড়ে শসা চাষ এলাকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ঘেরের পাড়ে শসা ও অন্যান্য শাক-সবজি চাষে এখন তাদের মুখে হাসি ফুটেছে।

রূপসা উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, এ উপজেলার ঘাটভোগ ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে সবচেয়ে বেশি জমিতে শসা চাষ হয়েছে। ঘেরের পাড়ে শসা চাষ করে কম সময়ে অধিক ফলন ও ভালো দাম পেয়ে এসব গ্রামের কৃষকরা খুব খুশি। মূলত, ঘেরের পাড়ে শসা চাষ পাল্টে দিচ্ছে রূপসা উপজেলার গ্রামগুলোর চিত্র। তবে, মাছের ঘেরের পাড়ে শসা চাষে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পোকা-মাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পোকার মধ্যে থ্রিপস পোকা ও মাকড় এবং রোগের মধ্যে ডাউনি মিলডিউ শসার ক্ষতি করে। এছাড়া, শসা গাছের পাতা ও ফলে অনুখাদ্য বোরন ও ম্যাগনেশিয়ামের অভাব দেখা যায়। নিম্নমানের বীজ ব্যবহারের কারণে অনেক সময় শসার আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও খরার কারণে শসা চাষ ব্যাহত হয়।

ঘেরের পাড়ে উৎপাদিত শসা কেনাবেচার জন্য গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠেছে শসার মৌসুমি আড়ত। তাই শসা বিক্রি করতে সাধারণত পরিবহন খরচ লাগে না। কৃষকরা খেত থেকে শসা তুলে এনে আড়তে বিক্রি করেন। শসা চাষে মহিলা ও বেকার যুবকসহ স্কুল-কলেজের ছাত্রদেরও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে ট্রাকযোগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যাচ্ছে এখানকার শসা। স্থানীয় বাজারের ক্রেতারা টাটকা ও তাজা শসা কিনতে পেরে খুশি।

রূপসা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ফরিদুজ্জামান বলেন, অন্যান্য ফসলের তুলনায় মাছের ঘেরের পাড়ে শসা চাষ লাভজনক হওয়ায় এ উপজেলায় দিন দিন শসা চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘেরের পাড়ে কম খরচে শসা চাষ করে লাভবান হওয়ার জন্য এ উপজেলার প্রতিটি ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ চাষিদের পাশে থেকে সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। এছাড়া, উপজেলা কৃষি অফিস থেকে কৃষকদের প্রশিক্ষণসহ সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। ফলে এ বছর কৃষকরা ঘেরের পাড়ে শসা চাষ করে আশাতীত ফলন পেয়ে লাভবান হয়েছেন। এতে কৃষকের মধ্যে ঘেরের পাড়ে শসা চাষে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। তারা আগামীতে মাছের ঘেরের পাড়ে আরো বেশি করে শসা চাষ করবেন বলে আশা করছেন।

 

খুলনা/মুহাম্মদ নূরুজ্জামান/রফিক

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়