ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ চৈত্র ১৪২৬, ০৯ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

তরুণ চিকিৎসকদের সামাজিক সেবা

জুনাইদ আল হাবিব : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-২৭ ৮:১১:৫৫ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-২৭ ৩:৫৫:৩৮ পিএম

আপনার চেনা-জানা কয়েকজন চিকিৎসকের কথা বলুন। তাদের কাজ কী? নিশ্চয়ই আপনি বলবেন, তারা মানুষকে চিকিৎসা সেবা দেন। কিন্তু এর বিপরীতে আরেকটি সম্ভাবনাময় চিত্র আছে। যা হয়তো অনেকেরই অজানা। বাংলাদেশে এমন একদল তরুণ চিকিৎসক আছেন, যারা মানুষকে চিকিৎসা সেবা দেয়ার পাশাপাশি সামাজিক সেবা দিয়ে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ডু সামথিং ফাউন্ডেশন’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সাভারে জাতীয় স্মৃতি সৌধের পাশে এবং সিরাজগঞ্জের কাগমারীতে পথশিশুদের জন্য তারা গড়ে তুলেছেন অ আ ক খ স্কুল।

মাত্র দশ টাকা বেতন দিয়ে সেই স্কুলে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা পড়ছে। পাচ্ছে পুষ্টিকর খাবার, স্কুল ড্রেস, উন্নত মানের চিকিৎসা সেবা। সাভারের স্কুলে পড়ছে ৮৯ জন শিশু। সিরাজগঞ্জের যমুনার চরে ১১৪ জন। ইতোমধ্যে দু'টি শাখার দুই শতাধিক শিশুর জীবনে দেখা দিয়েছে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় আলো। যে শিশুরা দুদিন আগেও ফুটপাতে কিছু বিক্রি করত জীবিকার প্রয়োজনে কিংবা জড়িয়ে পড়ত নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে, তারা এখন লেখাপড়া শিখে বড় মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

এমন ব্যতিক্রমী কাজের উদ্যোক্তা ডা. নাজমুল ইসলাম। তিনি গণস্বাস্থ্য মেডিকেলের ছাত্র। একদল স্বপ্নবাজ তরুণ-তরুণীদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন ডু সামথিং ফাউন্ডেশন। লেখাপড়ার কঠিন ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশ গড়ার প্রত্যয়ে যাত্রা শুরু করে সংগঠনটির সদস্যরা। ২০১৬ সালের ১৯ মে শুরু হয় সংগঠনের কার্যক্রম। সংগঠনে আছেন আতাউর রহমান রুবেল, মুরশিদ আলম ইরফান, ডা. প্রিয়াংকা মাহমুদ রথি, ডা. ফাবিহা, ডা. জুই প্রমুখ।

‘শুরুর পথ তেমন একটা মসৃণ ছিল না। বস্তির বাচ্চাগুলোকে স্কুলে নিয়ে আসতে অনেক কষ্ট হতো। খাবার দিয়ে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডেকে এনে ক্লাস করানো হতো। বস্তির শিশু বলে কেউ আমাদের বাসা ভাড়া দেয়নি। খোলা আকাশের নিচে ক্লাস নিতাম আমরা তখন। আমরা সকলেই স্বেচ্ছায় শ্রম দিতাম। স্কুলের সকল কার্যক্রম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে নিয়মিত আপডেট করতাম। সেখান থেকে বিভিন্ন জন এগিয়ে আসে।’ বলছিলেন নাজমুল ইসলাম।

ফাউন্ডেশনের সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে ‘অ আ ক খ শিক্ষা পরিবার’ এবং ‘ইয়ুথস ফর দ্য নেশন’ নামে দুটি শাখা রয়েছে। এখান থেকে প্রতি বছর দেয়া হয় শিক্ষাবৃত্তি। বর্তমানে বৃত্তির আওতায় ১৫ জন ছাত্রছাত্রী রয়েছে যারা বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। যমুনার দুর্গম চরে সংগঠনটির প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সেন্টারও রয়েছে। আরো রয়েছে নিজস্ব কম্বল ফ্যাক্টরি।

শিশু শ্রেণি থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়ানো হয় শিশুদের। স্কুল ড্রেস, ব্যাগ, খাতা, কলম, বই, জুতা- সব কিছু দেয়া হয় বিনামূল্যে। সরকারি সিলেবাসের পাশাপাশি সাধারণ জ্ঞান এবং অঙ্কন বিদ্যার বই পড়ানো হয় শিশুদের। শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে পড়াশোনার পাশাপাশি আয়ের পথও বাতলে দেয়ার চেষ্টা করে সংগঠনটি। শিক্ষার্থীদের হ্যান্ড ক্রাফট তৈরি, সেলাই প্রশিক্ষণ দেয়ার কারণে তারা নিজেদের পোশাক নিজেরাই তৈরি করতে পারে। এমনকি দেয়া হয় কম্পিউটার প্রশিক্ষণ। ছাত্রীদের জন্য রয়েছে স্যানিটারি প্যাড কর্ণার। আছে বিশাল লাইব্রেরি। যেখানে ৭৫০-এর উপরে বই আছে। পাশাপাশি বার্ষিক বনভোজন, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাপ্তাহিক হেলথ ক্যাম্প এবং সাংস্কৃতিক ক্লাসও হয়। মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্য রয়েছে আলাদা বৃত্তির ব্যবস্থা। ক্লাস উপস্থিতির উপর পুরস্কার। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, খেলাধুলার ব্যবস্থা, লিডারশিপ ট্রেনিং, স্কুলে প্রজেক্টরের মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষনীয় ভিডিও দেখানোর সুযোগ।

শিশুরা যাতে গরিব-হতদরিদ্র, পথশিশু, টোকাই ইত্যাদি পরিচয়ে বেড়ে না উঠে স্বাভাবিক জীবনের আলোয় বেড়ে উঠতে পারে সেজন্য স্কুলটি কাজ করে। অন্যদিকে সমাজের অবহেলিত, অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কাজ করে ইয়ুথস ফর দ্য নেশন। তাদের স্লোগান- যে কোন দুর্যোগে আমরা। ২০১৭ সালে এই শাখার যাত্রা শুরু। উত্তর বঙ্গসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ২০১৭ সালের বন্যা ছিল ভয়াবহ। তখন  থেকে সংগঠনটি শিক্ষার পাশাপাশি দুর্যোগে কাজ করার জন্য ইয়ুথস ফর দ্য নেশন প্রতিষ্ঠা করে। তখন সংগঠনটি কুড়িগ্রাম জেলায় তিন লাখ টাকার ত্রাণ, জামালপুর জেলায় ২ লাখ টাকার ত্রাণ, সিরাজগঞ্জ জেলায় বন্যা পরবর্তী পুর্নবাসনের জন্য ৩ লাখ টাকা বিতরণ করে। এছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে স্বাস্থ্য সেবাসহ ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করে প্রায় ৪০ লাখ টাকার।

নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের হেলথ ক্যাম্পের ছবি বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে রোহিঙ্গাদের চিকিৎসা সেবার জন্য প্রকাশিত বইয়ে প্রচ্ছদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আমরা প্রতিমাসে দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়মিত ফ্রি হেলথ ক্যাম্প আয়োজন করি। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় আমরা এ পর্যন্ত ৩০টি ক্যাম্প পরিচালনার মাধ্যমে ৬ হাজার লোককে স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছি। সিরাজগঞ্জের চরে আমরা একটি প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র তৈরি করেছি এবং মৌলভীবাজার জেলার শমশের নগর চা বাগানে চা শ্রমিকদের জন্য ফার্মেসি স্থাপন করেছি। এবার শীতে ইতোমধেই আমরা ৮ লাখ টাকার শীত বস্ত্র বিতরণ করেছি। মেয়েদের জন্য মাসিকের সময় স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করার কাজও করে যাচ্ছি আমরা।’

সংগঠনের ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী? জানতে চাইলে নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় অ আ ক খ স্কুল প্রতিষ্ঠা করা। প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য উন্নত দেশের আদলে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রনয়ন করা। শিক্ষার পাশাপাশি কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং জীবনমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা।’


ঢাকা/তারা