ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ আষাঢ় ১৪২৭, ১৪ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে দুর্গম চরে স্কুল

জুনাইদ আল হাবিব : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-২৮ ৪:০৭:৪০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-২৯ ৯:৪৯:০৭ এএম

ফেসবুক আমাদের কী দিয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই বলবেন, ফেসবুকের কারণে এই প্রজন্মের বারোটা বেজে গেছে! ফেসবুক আসক্তিতে তরুণরা বাজে সময় নষ্ট করছে। ফেসবুকের মাধ্যমে গুজব ছড়ানো হচ্ছে ইত্যাদি।

ফেসবুকের পজেটিভ দিকও কিন্তু রয়েছে। বিজ্ঞান আমাদের জন্য আশীর্বাদ না অভিশাপ এই প্রশ্নের উত্তরে আশীর্বাদের পাল্লাই কিন্তু ভারী হবে। সামাজিক যোগাযোগের এই মাধ্যম ব্যবহার করে কেউ মুমূর্ষু রোগীর জন্য রক্ত সংগ্রহ করছেন। উদ্যোক্তারা ব্যবসার পরিচিতি বাড়াচ্ছেন। সামাজিক অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরা যাচ্ছে। এমনকি সমাজের কোথাও যদি সাহায্যের প্রয়োজন জরুরি হয় তাহলে প্রতিকারের ব্যবস্থাও নেয়া যায়।

অনেক সময় ফেসবুকের কল্যাণে সামাজিক উদ্যোক্তারা সমাজ উন্নয়নে বৃহৎ ভূমিকা রাখছেন। তেমনই একটি দৃষ্টান্ত, টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর থানার গাবসারা ইউনিয়ের যমুনা নদীর বুকে জেগে ওঠা চৌদ্দ বাড়ির চরে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা। দুর্গম চরাঞ্চলে এই স্কুল প্রতিষ্ঠার পেছনে ফেসবুকের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

গ্রাম পাঠাগার আন্দোলনের প্রধান সংগঠক আব্দুস সাত্তার খান। ফেসবুকে তিনি প্রথম চরে স্কুলের প্রয়োজন নিয়ে একটি পোস্ট দেন। এরপর অনেকেই তার উদ্যোগের প্রশংসা করে আর্থিকভাবে পাশে দাঁড়ান। আবদুস সাত্তার খান এতে উৎসাহ পান। নিজেই টাকা সংগ্রহ করে কয়েকজন তরুণকে নিয়ে চরে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। স্কুলের নাম দেন বঙ্গবন্ধু বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় চৌদ্দ বাড়ির চরে ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়েছিলেন স্কুলটির উদ্যোক্তারা। তখন চরের মানুষ তাদের বলেছিলেন, একটি স্কুল করে দিতে। চর থেকে নিকটবর্তী স্কুলের দূরত্ব প্রায় পাঁচ কি.মি.। শিশুরা সেখানে গিয়ে পড়তে পারে না। বর্ষার সময় চর পানিতে ডুবে থাকে। তারপর স্কুল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন তারা। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ফেসবুকে পোস্ট দেয়া হয়। ব্যাপক সাড়া পাওয়া যায়। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই দাঁড়িয়ে যায় স্কুলটি।

স্কুলের অন্যতম উদ্যোক্তা ও শিক্ষক রিপন হোসাইন বলেন, বিদ্যালয়টি যমুনা নদীর এমন একটা চরে অবস্থিত, যার আশেপাশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অনেক দূরে। হেঁটে যেতেও দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লাগে। তাহলে লেখাপড়ার প্রতি শিশুদের কতটা আগ্রহ থাকবে? আবার বাড়িতে বাচ্চাদের পড়াতে পারবে এমন পরিবার শতকরা দশটিও নেই। বলা হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা। তাহলে এই চরের শিশুরা কেন নিরক্ষর থাকবে?

রিপন হোসাইন আরো বলেন, চরের মানুষের জীবিকার মাধ্যম হলো, অর্থকরী ফসল। গরু, ছাগল পালন এবং নদীতে মাছ ধরা। এগুলো বিক্রি করে তাদের দিন চলে। অধিকাংশ শিশু জানেই না এই চরের পরিবেশের বাইরে অন্য কোনো গ্রাম, শহর বা দেশ আছে। তারা মনে করে, এটাই তাদের পৃথিবী। আর এভাবেই তাদের বাবা, চাচাদের মতো হাল চাষ করে বেঁচে থাকতে হয়।

বঙ্গবন্ধু বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৬০ জন ছাত্রছাত্রী নিয়মিত পাঠ নিচ্ছে। রিপন হোসাইন বলেন, আমাদের অনেক সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে। তারপরও আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। যেমন, বাচ্চাদের বই সংগ্রহ করা, পরীক্ষার সময় প্রশ্ন সংগ্রহ করা এবং শিক্ষকদের বেতন দেয়া। আমরা তা পারি না। ফেসবুকে পোস্ট করে কারো সহযোগিতা পেলে আমরা সেগুলো দিয়ে স্কুল পরিচালনা করি।

স্কুলটি প্রতিষ্ঠার পর কেমন অভিজ্ঞতা হলো? জানতে চাইলে আবদুস সাত্তার খান বলেন, অভিজ্ঞতা ভালো না। অভিভাবকরা তেমন একটা সচেতন না। শিক্ষকদের ঠিকমতো বেতন দিতে পারি না। বর্ষার সময় ৩ মাস ক্লাস চালিয়ে নেয়া দুরূহ ব্যাপার। তখন সবকিছু পানিতে ডুবে যায়। সেসময় নদীও বড় হয়ে যায়। নানা কারণে শিক্ষার্থী আসে না।

আবদুস সাত্তার খান তবুও স্বপ্ন দেখেন একদিন স্কুলটি সরকারি হবে। চরের শিশুদের দায়িত্ব সরকার নিবে। যতদিন সরকারি না হয়, ততদিন কোন সহৃদয়বান ব্যক্তিই শেষ ভরসা। মানুষ এগিয়ে এলেই স্কুলটি সচল রাখা যাবে।

কিন্তু দেশের মানুষদের এই কথাগুলো জানাতে হবে। এজন্য মাধ্যম হিসেবে ফেসবুককেই বেছে নিয়েছেন তারা। গত ২ বছর হলো স্কুলটি চালু হয়েছে। এই স্কুলে পড়েই স্থানীয় শিশুরা পড়তে, লিখতে পারছে। হয়তো একদিন তারাও ফেসবুক ব্যবহার করবে। তখন তারা নিজেরাই বিশ্ববাসীকে জানাবে নিজেদের প্রয়োজন। 


ঢাকা/তারা